কবি নিমানন্দ দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
নন্দদুলাল, নাচত ভাল
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, শ্রীকৃষ্ণের বাল্য-লীলা, পৃষ্ঠা ১৬৬। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


॥ সারঙ্গ॥

নন্দদুলাল,                             নাচত ভাল
যশোদা তাহে,                         ধরত তাল,
সবহুঁ বোলত,                          ভাল ভাল,
হেরি মোহিত ব্রজনাকী।
জলদ নিন্দি,                           সুন্দর শ্যাম,
কণ্ঠেতে মণি,                        মোতিম দাম,
বিন্দু বিন্দু,                             চুয়ত ঘাম,
তাহে অধিক মাধুরী॥
যশোদা রচিত                         সুন্দর সাজ,
শোহন নাচত,                        আঙ্গিনা মাঝ,
সবহুঁ ভুলত,                           নিদহি কাজ,
হেরি নয়নভঙ্গি চাকুরী।
হিলত অঙ্গ,                           বিবিধ রঙ্গ,
হেরি সবহুঁ,                            পুলক অঙ্গ,
তাহে কতহি,                           মদন ভঙ্গ,
গেখিয়া ও রূপ মাধুরী॥
বদন চান্দ,                             হসত মন্দ,
বচন কহত,                          অমিয়া ছন্দ,
তাহে উদয়,                          আনন্দ কন্দ,
সবহুঁ নয়নে খেলত বারি।
শুনিয়া রাই,                            চলত ধাই,
তুরিতে নন্দ,                          মহলে যাই,
নয়ন ভুলল,                            বদন চাই,
আনন্দের ভাসল কিশোরি গোরী॥
উদয় ভানু,                          নাচত কানু,
ধুলি ধূসর,                            চিকণ তনু,
করেতে শোভিছে,                    মোহন বেণু,
জগজনমন বিহারি।
উভকরি বান্ধি,                         চাঁচর চুল,
বেড়িয়া মল্লিকা,                      মালতি ফুল,
কুলবতীগণ,                            ভাঙ্গল কুল,
হেরিয়া চাঁদ কি উজোরি॥
কেশরী জিনিয়া,                       অধিক মাঝ,
ঘাঘর ঘুঙুর,                          কিঙ্কিণী বাজ,
শুনিয়া মোহিত,                         মদন রাজ,
কি আনন্দ আজ নন্দপুরী।
অরুণ চরণে,                          মঞ্জির বোলে,
নিমানন্দ দাস,                        পড়িল ভোলে,
কৃপাকরি রাখ,                        তাহারি তলে,
এই আশা আমি সদাই করি॥

.            *************************             
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিশাখা সখীরে দেখি ঢুলু ঢুলু করে আঁখি
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, শ্রীকৃষ্ণের বাল্য-লীলা, পৃষ্ঠা ১৬৭। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


॥ সারঙ্গ॥

বিশাখা সখীরে দেখি                ঢুলু ঢুলু করে আঁখি
বলিতে বচন নাহি স্ফুরে।
অন্তরে আছয়ে ভয়                কহিলে কি জানি হয়
ধরিল তাহার দু-টি করে॥
শুন ত নাগর ওহে                কি কথা কহিবে মোহে
কহ তুমি করিয়া নিশ্চয়।
রাধা রাজ নন্দিনী                   আহার সঙ্গিনী আমি
আমি যাব তাহারি আলয়॥
এ কথা শুনিয়া হরি                 কহে যথা ধিরি ধিরি
“তাহার লাগিয়া প্রাণ ঝুরে।
তাহারে আনিয়া দেও             আমারে কিনিয়া নেও
বিকাইলাম জনমের তরে॥”
“নবীন-বয়সী সেহ                    নাহি জানে রস লেহ
তাহে কি এমন কাজ করে।
শুনহে নিঠুর-মতি”                   নাহি জান রস-রীতি
নিমানন্দ কি বলিবে তোরে॥”

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বেলি-অবসানে সহচরী মনে
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত  “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, যমুনা তীর শ্রীরাধাকৃষ্ণের মিলন, পৃষ্ঠা ১৬৭। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


॥ ধানশী॥

বেলি-অবসানে                                সহচরী মনে
করত বিবিধ বেশ।
চিকুর আচড়ি                                বনাল্য কবরী
যতনে বান্ধিল কেশ॥
কিবা সে লোটন গোটা।
কুঙ্কুমে মাজল                                  বদন উজ্জ্বল
তাহাতে সিন্দুর ফোঁটা॥ ধ্রু॥
অলকা তিলকে                                 আধ ঝলকে
সাজনি বন্দন-চান্দে।
দেখিয়া বদন                                   ফাঁফর মদন
ঝুরিয়া ঝুরিয়া কান্দে॥

জটিলা তখন                                   কহিছে বচন
কলসী করহ কাখে।
যমুনার তীরে                                ভরি আন নীরে
দিনমণি যেন থাকে॥
শুনিয়া তখন                                     কহিছে বচন
কালিন্দী-তীরেতে যায়।
নিমানন্দ দাসে                             আনন্দেতে ভাসে
মিলিলা সে শ্যাম-রায়॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাধিকা সুন্দরী ভরিয়া গাগরী
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত  “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, যমুনা তীর শ্রীরাধাকৃষ্ণের মিলন, পৃষ্ঠা ১৬৮। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


॥ সুহই॥

রাধিকা সুন্দরী                                  ভরিয়া গাগরী
তীরেতে উঠিল যতে।
নন্দের নন্দন                                     করিয়া যতন
বসন ধরিল তবে॥
“ছাড় হে নাগর রাজ।
কেহ যদি দেখে                                 হইবে বিপাকে
তোমায় নাহিক লাজ॥ ধ্রু॥”
করি যোর-কর                                   কহিছে উত্তর
“বড়ই লাগিছে ভয়।
পথের মাঝারে                                এ কোন বেভারে
এ তোর উচিত নয়॥
ঘরে মোর বাদী                                   শাশুড়ী ননদী
মিছা কথা কত তোলে।”
তোমার চরিত                                   অতি বিপরীত
নিমানন্দ দাসে বোলে॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাধিকা যতেক মিনতি করয়ে
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত  “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, যমুনা তীর শ্রীরাধাকৃষ্ণের মিলন, পৃষ্ঠা ১৬৮। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


॥ সুহই॥

রাধিকা যতেক                                 মিনতি করয়ে
কিছুই না মানে হরি।
যে ছিল বাসনা                                 মনের কামনা
নিজ মনোরথ ভরি॥
“শুন বিনোদিনী রাই।
তোমা হেন ধন                                  অমূল্য রতন
বহুত যতনে পাই॥ ধ্রু॥
যমুনার কূলে                                    কদম্বের তলে
পূরিল মনের সাধা।
দেখি সখীগণ                                     কহিছে বচন
এ কেমন দেখি রাধা॥
যমুনা-হিলন                                     বহিছে পবন
কেন বা হেলিছে অঙ্গ।
নিমানন্দে বোলে                              গিয়াছিলে জলে
না বুঝি কেমন রঙ্গ॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সখি পর বোধি চললি বর-রঙ্গিণি
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত  “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, যমুনা তীর শ্রীরাধাকৃষ্ণের মিলন, পৃষ্ঠা ১৬৮। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


॥ সুহই॥

সখি পর বোধি চললি বর-রঙ্গিণি
পৈঠলি আপন-ভবনে।
হাহরি ছোড়ি তৈখনে সুন্দরি
তুরিতহি করল শয়নে॥
ধনি বড় কাতর-চিত।
ননদিনি কহত কাহে তুহুঁ শূতলি
না বুঝিয়ে তুহারি চরীত॥ ধ্রু॥
কহতহি সুন্দরি শুন মোর বাদিনি
তোহে কি কহব ইহ দুখে।
পথ অতি-সঙ্কট কাথে দারুণ ঘট
বেদন লাগিল জালি বুকে॥
এ সব বচন শুনি সখীগণ হাসত
রাধারে কহয়ে ভালি ভালি।
নিমানন্দ দাস কহই কস-কৌতুক
ধনি ধনি ধনি চতুরালি॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কহ কহ সুন্দরি আজুক রঙ্গ
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, রসোদ্গার, পৃষ্ঠা ১৬৮। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও
সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


.        ॥ ধানশী॥

“কহ কহ সুন্দরি আজুক রঙ্গ।
কৈছনে মিলল কানু তুয়া সঙ্গ॥”
“কহই না পারিয়ে সখিগণ মাঝ।
কহইতে কাহিনি লাগয়ে লাজ॥
আজুক কৌশল অতি অপরূপ।
শুনইতে মানবি স্বপন-স্বরূপ”॥ ধ্র॥
চঞ্চল ধরলহি অঞ্চল মোর।
“ছোড় ছোড় নাগর লাজ নাহি তোর॥”
কোরে অগোরল বাহু পসারি।
মানস পূরল নিলজ মুরারি॥
করে কর ধরি মোরে চুম্বন কেল।
মঝু মুখ নিরখিতে পুলকিত ভেত॥
পরশি পয়োধর ভৈগেল ভোর।
ভয়ে তনু কাপয়ে থরথর মোর॥
চরণ পরশি মোর বলে বার-বার।
দুখ না করবি ধনি শপথি হমার॥
কহিতে কহিতে ধনি প্রিয়-পরসঙ্গ।
ভাবে মগন ভেল পুলকিত অঙ্গ॥
এতহি কহল সব সখীগণ মাঝ।
কোরে পায়ল জনু নাগর-রাজ॥
তৈখনে ঘন-ঘন বহত নিশাস।
মানস পূরল মনমথ-আশ॥
নিমানন্দ দাস কহই রস গূড়।
বুঝব রসিক-জন না বুঝব মূড়॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কি হেরিলাম যমুনার কূলে
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, রূপাভিসার, পৃষ্ঠা ১৬৯। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত
“পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


.        ॥ ধানশী॥

কি হেরিলাম যমুনার কূলে।
চিকণ কালিয়া রূপ কদম্বের তলে॥
কেমন বান্ধ্যাছে চূড়া কুটিল কুন্তলে।
বেড়িয়া দিয়াছে তাথে বকুলের মালে॥
মউরের পাখা তাথে করে ঝলমলে।
হেরিয়া কামিনী তাথে হারাইল কুলে॥
চন্দন-তিলক শোভে সুচারু-কপালে।
অঙ্গদ-বলয়া সাজে সুবাহু-যুগলে॥
হিয়ার উপরে দোলে মালতীর মালা।
কটি মাঝে পীত-ধটী সদাই চপলা॥
চরণে পরশে আসি ধড়ার অঞ্চলে।
ভুবন মোহন রূপ নিমানন্দ বোলে॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চল দেখি যায়্যা সই চল দেখি যাঞা
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, রূপাভিসার, পৃষ্ঠা ১৬৯। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত
“পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


.               ॥ সুহই॥

চল দেখি যায়্যা সই চল দেখি যাঞা।
দাঁড়াঞা রৈয়াছে শ্যাম ত্রিভঙ্গ হইয়া॥
চরণে চরণ বেড়া ত্রিভঙ্গ হইয়া।
ঝুমরি গাইছে শ্যাম বাঁশরী বাজাঞা॥
হরিয়া লইল কুল বঙ্কিম চাহিয়া।
অঙ্গ-ভঙ্গ কৈল শ্যাম ঈষদ হাসিয়া॥
কালিয়া বরণ খানি অঞ্জন জিনিয়া।
হেরি রূপ পুলকিত নিমানন্দের হিয়া॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রহিতে না পারি আর ঘরে
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত  “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, পৃষ্ঠা ১৬৯। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


॥ বরাড়ী॥

রহিতে না পারি আর ঘরে।
চল যাব বৃন্দাবনে                                   শ্যাম-চাঁদ দরশনে
প্রাণ মোর কেমন কেমন করে॥ ধ্রু॥
আয় গো তুরিত হৈয়া                          বেশ দে মোর বানাইয়া
চল যাব শ্যাম ভেটিবারে।
কবরী-কুসুম আনি                                বান্ধ গো বিনোদ বেণী
মালতীর মালা থরে থরে॥
কুঙ্কুম চন্দ ঘসি                                     সাজা গো বদন-শশী
মোহিত করিব নট-বরে।
শুনিয়া ললিতা কহে                                    এমন উচিত নহে
গুরুতে গঞ্জন দিবে তোরে॥
কানুর পিরিতি খানি                                মরমে রাখিবি ধনি
বেকত করবি কুলাচারে।
এ ব্রজ-মণ্ডল মাঝে                              তোর সম কেবা আছে
রূপ-গুণ-রসের পাথারে॥
শুনিয়া ললিতা-কা                                 মনেতে পাইয়া বেখা
নারে চিত্ত স্থির করিবারে।
নিমানন্দ দাসে বোলে                           কি করিবে জাতি-কুলে
পিরিতি পাগলী কৈল যারে॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর