কবি নিমানন্দ দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
নাগর-নাগরি-কেলি-বিলাস
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, মানান্তে মিলন, পৃষ্ঠা ১৭২। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত
“পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


.        ॥ ধানশী॥

নাগর-নাগরি-কেলি-বিলাস।
দুহুঁ মিলি করতহি রস-প্রকাশ॥
দুহুঁ মেলি দুহুঁ জনে করলহি কোর।
দুহুঁক আনন্দে আজু নহি ওর॥
দুহুঁ-মুখে দুহুঁ-জনে চুম্বন কেল।
দুহুঁ অধরামৃত দুহুঁ হরি নেল॥
দুহুঁ-তনি দুহুঁ-মন একই সমান।
হেরি সব সখিগণ ভুলল নয়ান॥
সারী শুক দেখি ভেল আনন্দিত।
কোকিল কোকিলা মিলি গায়ত গীত॥
ভ্রমর ভ্রমরী মিলি করত ঝঙ্কার।
কপোত কপোতি ভাষে আনন্দ অপার॥
কুরঙ্গ কুরঙ্গী সুখে নাচিয়া বেড়ায়।
নিমানন্দ দাসের মন দেখিবারে চায়॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শ্যামের মুরলী শুনিতে পাই
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, রাস লীলা, পৃষ্ঠা ১৭৩। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার”
গ্রন্থের পদ।


.        ॥ ধানশী॥

শ্যামের মুরলী শুনিতে পাই।
পিছু না গুণয়ে ধাইয়া যাই॥
কারু পতি দেখি রাখিল বান্ধি।
যাইতে না পারে মরয়ে কান্দি॥
সোঙরি শ্যামের পিরিতি লেহ।
তখনি ছাড়িল আপন দেহ॥
গুণময় দেহ ছাড়িয়া তবে।
শ্যামচাঁদ আগে পাইল সভে॥
সকল গোপিনী হইয়া সুখী।
এ বড় কৌশল দেখ না সখি॥
ইহাদের পতি বান্ধিয়া থুইল।
কেমন করিয়া গোবিন্দ পাইল॥
নিমানন্দ দাস বলিছে তায়।
সাবিত্রা পাইল এ শ্যাম-রায়॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সব গোপীগণে আনন্দে ভাসল
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত  সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, পৃষ্ঠা ১৭৩। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


॥ তুড়ী॥

সব গোপীগণে                                 আনন্দে ভাসল
বিচ্ছেদ নাহিক জানে।
বিচ্ছেদ নহিলে                                প্রেম না উথলে
ভাবয়ে এ শ্যাম মনে॥
শ্যাম বিচারয়ে মনে।
অনুরাগ বিনে                                  রসের মাধুরী
কেহ সে নাহিক জানে॥ ধ্রু॥
ইহা বলি শ্যাম                                হৈলা অন্তর্দ্ধান
রাধিকা লইয়া সাথে।
রাই-বিনোদিনী                                 শ্যাম-চাঁদ সনে
চলিলা বিপিন পথে॥
কানুরে কহিছে                                রাধিকা সুন্দরী
চলিতে নাহিক পারি।
যেন-মতে পার                                তেন মতে লেহ
শুনহে পরাণ-হরি॥
এ বোল শুনিয়া                                  নাগর রসিয়া
রাধিকা কোলেতে করি।
যায়্যা কত দূরে                                ছাড়িল তাহারে
নিঠুর হইয়া হরি॥
আর সব গোপী                                  একত্রে রহিল
রাধিকা রহিল একা।
নিমানন্দের পহু                                হেলে হারাইলে
আর কি পাইবে দেখা॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দু-জনার পদ-অনুসারে
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র  রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, পৃষ্ঠা ১৭৩।  নিমানন্দ দাস  বিরচিত  ও  সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের
পদ।


.        ॥ কামোদ॥

দু-জনার পদ-অনুসারে।
খুঁজি বুলে কানন-ভিতরে॥
এক চিন্তা পড়িয়াছে পথে।
আর চিন্তা নাহি তার সাথে॥
সঙ্গে করি যাবে লয়্যা আল্য।
সেই জন কোথাকারে গেল॥
কেহ তবে অনুমানে বোলে।
হরি বুঝি করি নিল কোলে॥
এই দেখ দুহাকার তরে।
পশিয়াছে ধরণী উপরে॥
তারে যায়্যা দেখে গোপ-নারী।
পড়ি আছে হয়্যা একেশ্বরী॥
শুন শুন ওগো রসবতি।
তোমার এমন কেন গতি॥
বড়ই আদরে লয়্যা আল্য।
তবে কেন তোমারে ছাড়িল॥
রাধিকা কহয়ে শুন বাণী।
অপরাধ করিয়াছি আমি॥
তেঞি মোরে নিঠুর হইয়া।
বন মাঝে গেল ফেলাইয়া॥
সকল গোপিনী এর-মেলা।
করি সভে নানা-মত-লীলা॥
নিমানন্দ দাস তারে দেখি।
নিঝুরে ঝুরয়ে দু-টি আঁখি॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গোপী-গণের দুঃখ মরমে জানিয়া
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র  রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, পৃষ্ঠা ১৭৪। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


॥ কামোদ॥

গোপী-গণের দুঃখ                                  মরমে জানিয়া
শ্যাম সে আইল ত্বরা।
মৃত-দেহে যেন                                        জীবন পাইল
তেমতি মানয়ে তারা॥
সভাই আনন্দে ভাসি।
চকোর যেমন                                     বিধু বরে মিলে
তেমতি মিলিল আসি॥ ধ্রু॥
অম্বুজ জিনিয়া                                      শ্যাম-মুখ খানি
সভাই দেখিয়া ভোরা।
আনন্দ-সাগরে                                    সাঁতার না জানে
দু-নয়নে প্রেম-ধারা॥
বন-মালা গলে                                   কিবা সে সাজিছে
পীত পিন্ধন তার।
মন্মথের মন                                         মথন করিছে
নিমানন্দ দাসে গায়॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গোপের রমণী গোবিন্দ পাইয়া
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব
পদাবলী সংকলন, পৃষ্ঠা ১৭৪। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


॥ তুড়ী॥

গোপের রমণী                                গোবিন্দ পাইয়া।
আনন্দ হইল তায়।
কেহ আসি ধরে                                  শ্রীবাহু-যুগলে
কেহ আসি ধরে পায়॥
বড়ই আনন্দ মনে।
কেহ ত বসন                                     তুরিতে ধরল
কেহ চাহে মুখ পানে॥ ধ্রু॥
শ্রীচরণ কেহ                                   পয়োধরে রাখি
অনিমিখে মুখ হেরে।
তাম্বুল চর্ব্বিত                                  কেহ সে খাইল
আলিঙ্ন কেহ করে॥
গোপী-গণ সব                                  প্রেমেতে ভাসল
পুলকে পূরিত হৈল।
নিমানন্দ দাসে                                  সে শ্যাম পাইল
বিরহ দূরেতে গেল॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নাচত নব নন্দ-লাল
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র  রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, পৃষ্ঠা ১৭৪। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


॥ কেদার॥

নাচত নব                                       নন্দ-লাল
রসবতি করি সঙ্গে।
রবাব খবাব                                বিণ কবিলাস
বাজত কত রঙ্গে॥
কোই গায়ত                                  কোই বায়ত
কোই ধরত তালে।
সখিগণ মিলি                                  নাচই গাওই
মোহিত নন্দলাল॥
শূক নাচিছে                                   সারী নাচিছে
বসিয়া তরুর ডালে।
কপোত কপোতা                            দুজনে মিলায়া
ধরিছে কতই তালে॥
কুরঙ্গ নাচিছে                                কুরুঙ্গী নাচিছে
রাই-শ্যাম-মুখ দেখি।
বিহঙ্গ নাচিছে                                মউর নাচিছে
নাচিছে কোকিল পাখী॥
বায়স নাচিছে                                পেচক নাচিছে
নাচিছে কর্ণকহারি (?)।
তরু-লতা যত                               আনন্দে নাচিছে
ফল-ফুল সারি সারি॥
ফুলের উপরে                                 ভ্রমরা নাচিছে
ভ্রমরী নাচিছে সঙ্গে।
মধুকর যত                                 নাচে কত শত
মধু পিয়ে তারা রঙ্গে॥
যমুনা নাচিছে                                 তরঙ্গের ছলে
তাহাতে মকর-মানে।
জলচর পাখী                                 নাচিয়া বুলিছে
নাহি জানে রাতি-দিনে॥
ঊর্দ্ধে নাচিছে                                    যত দেবগণ
হইয়া আনন্দ-চীত।
গন্ধর্ব্ব-কিন্নর                                 নাচিয়া নাচিয়া
গাইছে মধুর গীত॥
ব্রহ্মা নাচিছে                                 সাবিত্রী সহিতে
পুলকে পূরি-তঅঙ্গ।
বৃষের উপর                                    নাচে মহেশ্বর
পার্ব্বতী করিয়া সঙ্গ॥
মিহির নাচিছে                                স্ব-পত্নী সহিতে
রোহিণী সহিতে চান্দে।
যত দেব-গণে                                আনন্দে নাচিছে
হিয়া থির নাহি বান্ধে॥
সুরাসুর আদি                                আনন্দে নাচিছে
পাতালে নাগের সনে।
কূর্ম্মের সনে                                    আনন্ত নাচিছে
অতি আনন্দিত মনে॥
সুমেরু সহিতে                                পৃথিবী নাচিছে
বলিছে ভালি রে ভালি।
গোবর্দ্ধন গিরি                                আনন্দে নাচিছে
যার তটে রাস-কেলি॥
এ সব নাচন                                     দেখিয়া মগন
বহিছে আনন্দ ধারা।
নিমানন্দ দাস                                  নাচন দেখিয়া
নাচিছে বাউল পারা॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সব সখী মিলি হৈয়া কুতূহলী
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত  সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, রসোদ্গার, পৃষ্ঠা ১৭৫। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


সখীগণের প্রশ্ন ---

॥ সুহই॥

সব সখী মিলি                                  হৈয়া কুতূহলী
আইল সুন্দরী-পাশে।
রজনী-কাহিনী                                   কহ না সজনী
কহিছে মধুর-ভাষে॥
কহ কহ রসবতি।
তোমরা দু-জনে                                নিকুঞ্জ কাননে
কি সুখে বঞ্চিলে রাতি॥ ধ্রু॥
আমরা সকলে                                আছিলু বাহিরে
তোমরা মন্দির মাঝ।
কত অনুরাগে                                করিল সোহাগে
সে হেন রসিক-রাজ॥
তোমার বদনে                                  শুনিব শ্রবণে
পূরিব মনের সাধা।
নিমানন্দ বোলে                                 হয় কুতূহলে
তুরিতে কহ না রাধা॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বনায়্যা আমার বেশ উভ করি বান্ধে কেশ
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে প্রকাশিত  সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, রসোদ্গার, পৃষ্ঠা ১৭৫। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


শ্রীরাধার প্রত্যুত্তর ---

॥ ললিত॥

বনায়্যা আমার বেশ                             উভ করি বান্ধে কেশ
তাহে দেয় মউরের পুচ্ছ।
নিরখি নিরখি কত                                বনায় নিজ অভিমত
গাঁথি দেয় মালতীর গুচ্ছ॥
সই নানা-ফুলে গাঁখি দেয় মালে।
কুঙ্কুম চন্দন ঘসি                                     মাজয়ে বদন-শশী
অলকা তিলক দেয় ভালে॥ ধ্রু॥
রঙ্গিম-পাটের ধটি                                পরায় কত পরিপাটী
করের মুরলী দেয় হাতে।
হৈয়া কত কুতূহলে                                ত্রিভঙ্গ হইতে বোলে
কত সুখে করে সাথে সাথে॥
কখন উরুতে রাখে                                   কখন ধরয়ে বুকে
সমুখে বসায়্যা মুখ চায়।
নিমানন্দ দাস বোলে                                  বন্ধু বিদগধ হৈলে
কত সুখ-সাগরে ভাসায়॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একে হাম অবলা তাহে কুলবতী বালা
কবি নিমানন্দ দাস
১৯২৬ সালে  প্রকাশিত সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” নামের বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন, রসোদ্গার, পৃষ্ঠা ১৭৬। নিমানন্দ দাস বিরচিত ও সংকলিত “পদরসসার” গ্রন্থের পদ।


মাধুর বিরহ

॥ সুহই॥

একে হাম অবলা                                 তাহে কুলবতী বালা
ঝুরি ঝুর খীণ ভেল চীত।
বিরহ-বিয়াধি                                   অন্তরে আসি উপজল
শমন সমান তছু বীত॥
কহ সখি কি করি উপায়।
মোরে পরিহরি                                শ্যাম মখুরা রহল গিয়া
দুখে হিয়া বিদরিতে চায়॥ ধ্রু॥
কানুর লাগিয়া চিত                                সদাই বিকল মোর
নিবারিব কেমন করিয়া।
বিধাতা কতেক দুখ                             কপালে লিখিল মোর
সভে মিলি দেখহ @ড়িয়া॥
ইহা বলি সুন্দরি                                      আনমিখ লোচনে
ঝর ঝর লোর বহি যায়।
নিমানন্দ দাস                                        হেরি তহি কাতর
সখী-গণ করে হায় হায়॥

.        *************************          
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর