কবি নিত্যানন্দ দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
জয় জয় শ্রীচৈতন্য আচার্য্য জয় জয়
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, দ্বিতীয় বিলাস, শ্রীনিবাস ঠাকুরের জন্মোত্সব বর্ণন,
১৩-পৃষ্ঠা।

দ্বিতীয় বিলাস।

জয় জয় শ্রীচৈতন্য আচার্য্য জয় জয়।
জয় জয় লক্ষ্মীপ্রিয়া ,করণ হৃদয়॥
জয় জয় শ্রোতাগণ শুন সাবধানে।
রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা যাঁর প্রাণধনে॥
পুত্র জন্মি শুনি লোক,                                পাসরিল দুঃখ শোক,
দেকিবারে চলে নরনারী।
রাধাকৃষ্ণ গুণ গায়,                                     পঙ্গু জড় অন্ধ ধায়,
গৃহ পুত্র সকল পাসরি॥
আচার্য্য যাইয়া ঘরে,                                   আনন্দে নয়ন ভ’রে,
দেখি পুত্রের সে চান্দবদন।
নয়নে গলয়ে নীর,                                        নিরক্ষিয়া অস্থির,
নিছিয়া নিছিয়া দেয় প্রাণ॥
দেখিয়া আসিতে নারে,                                 সে দুটি নয়ন ঝরে,
ধন্য মাতা ধরিল উদরে।
গন্ধর্ব্ব কিন্নর কিবা,                                    তুলনা নাহিক দিবা,
ডুবিলেন প্রেমের সাগরে॥
নাচয়ে নর্ত্তকী গণ,                                        নর্ত্তকাদি যত জন,
নাচে গায় সুমধুর স্বরে।
ভাট লোক পড়ে কত,                                     কৃষ্ণলীলা অদ্ভূত,
পুলকিত তনু হর্ষভরে॥
মৃদঙ্গ ঝাঁঝরি ঢোল,                                     বাজনার উতরোল,
করতাল পাখোয়াজ বাজায়।
মহুরি পিনাক বাজে,                                       অন্ধ বধির জনে,
সেহ বিধি করয়ে নিন্দন॥
দেখিতাম নয়ন ভরি,                                হেন দুঃখে প্রাণে মরি,
অরে বিধি তুহু নিকরুণ।
ইহা বলি নাচে গায়,                                কান্দে ভূমে গড়ি যায়,
রাধাকৃষ্ণ বলি উল্লসিত।
লক্ষ লক্ষ ধায় লোক,                               তেজি ভয় দুঃখ শোক,
ধায় কত বিষয়ী পণ্ডিত॥
আনন্দে পূরিল দেহ,                                     ধনধান্য পূরে গেহ,
প্রেমে সব হইল মূর্চ্ছিত॥
শ্রীনিবাস জন্ম এই,                                    তোমারে কহিল ভাই,
শুনে যেই সফল জীবনে।
নিত্যানন্দ দাস গানে,                                    বিতরিব প্রেমধনে,
নিজতনু করিতে শোধনে॥
শ্রীজাহ্নবাবীরচন্দ্র পদে যার আশ,
প্রেমবিলাস কহে নিত্যানন্দ দাস॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জগৎ মঙ্গল হৈল নরোত্তম প্রকটিল
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, নবম বিলাস (আংশিক), নরোত্তমের জন্ম, ৫৪-পৃষ্ঠা।

॥ শ্রীরাগ॥

জগৎ মঙ্গল হৈল,                                     নরোত্তম প্রকটিল,
হরিনাম প্রতি ঘরে ঘরে।
জন্ম অন্ধ আদি করি,                               সব দেহে প্রেম ভরি,
অশ্রু কম্প সবার শরীরে॥
প্রেমে মত্ত হৈলা সব,                                    হরিনাম মহারব,
বর্ণাশ্রম সব গেল দূর।
ব্রাহ্মণ শূদ্রেতে খেলা,                               প্রেমে মত্ত সবে হৈলা,
কৃষ্ণ নামে সবে হৈলা শূর॥
বত্স সঙ্গে গাভীগণ,                                   হাম্বা রব অনুক্ষণ,
ধায় সবে শিরে নিজ পুচ্ছে।
ব্রাহ্মণে মঙ্গল পড়ে,                                 কেহো ধায় উভরড়ে,
শোক দুঃখ ত্যজি সব নাচে॥
কুলবধু ঘর হৈতে,                                  নাহি পার বাহিরাতে,
নাচিবার তার হয় মন।
সব লাগে উচাটন,                                        ধন গৃহ পতিজন,
না দেখিয়া না রহে জীবন॥
একত্র হইয়া কবে,                                    বালক দেখিবে সব,
বিধাতারে করয়ে বিনয়।
স্বামী সঙ্গে রজনীতে,                              আইলা বালক দেখিতে,
আনন্দেতে মুখ নিরখয়॥
ছাড়ে সব লজ্জা ভয়,                                  আনন্দ করি হৃদয়,
ঘরে তারা না পারে থাকিতে।
ক্ষণে ইতি উতি ধায়,                                ক্ষণে করে হায় হায়,
এ না দুঃখ পারি না সহিতে॥
থালি ভরি স্বর্ণ ধান,                                    একত্র লৈয়া জান,
যৌতুকেতে ঘর ভরি গেল।
দেখিয়া বালকের জ্যোতি,                             যেন পূর্ণিমার শশী,
অন্ধকার ঘর আলা হৈল॥
ভাট নর্ত্তকের গণে,                                    নানা রত্ন আভারণে,
দিল সবে বহু ধন দান।১
বন্দিগণে ছাড়ি দিল,                                 তারা সব ছুটি গেল,
নিত্যানন্দ দাস গুণ গান॥


টীকা-
১। ঘরে আছিল যত,                        যৌতুক পাইল কত,
ব্রাহ্মণেরে সব দিল দান॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শ্রীবাসের জ্যেষ্ঠ ভাই ছিল নলিন পণ্ডিত
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, প্রেমবিলাস, ত্রয়োবিংশ বিলাস
(আংশিক), বৃন্দাবন দাসের জন্মবৃত্তান্ত, ২২২-পৃষ্ঠা। চৈতন্য ভাগবত ও
চৈতন্যচরিতামৃতে না থাকলেও, প্রেমবিলাসে স্পষ্ট করে বৃন্দাবনদাসের পিতার নাম উল্লেখ
করা হয়েছে।

বৃন্দাবন দাসের জন্মবৃত্তান্ত।

শ্রীবাসের জ্যেষ্ঠ ভাই ছিল নলিন পণ্ডিত।
নারায়ণী তাঁর কন্যা জগতে বিদিত॥
নারায়ণী যবে এক বত্সরের হৈল।
মাতা পিতা তাঁর পরলোকে চলি গেল॥
শ্রীবাসের পত্নী তারে করয়ে পালন।
নারায়ণী হৈল প্রভুর উচ্ছিষ্ট-ভাজন॥
শ্রীগৌরাঙ্গে আজ্ঞা-কৃপায় নারায়ণী।
হা কৃষ্ণ বলিয়া কান্দে পড়য়ে ধরণী॥
চারি বত্সরের শিশু বালিকা অজ্ঞান।
প্রভু তাঁরে ভুক্ত শেষ করিলেন দান॥
বৃন্দাবনে কৃষ্ণোচ্ছিষ্ট যে কৈলা ভোজন।
সেই কিলিম্বিকা এবে নারায়ণী হন॥
সন্ন্যাস করি মহাপ্রভু নীলাচলে রৈল।
শ্রীবাস শ্রীরাম কুমারহট্টে চলি গেল॥
কুমারহট্টবাসী বিপ্র বৈকুণ্ঠদাস যেঁহো।
তাঁর সহিত নারায়ণীর হইল বিবাহ॥
তাঁর গর্ব্ভে জন্মিলা বৃন্দাবন দাস।
তিঁহো হন শ্রীল বেদব্যাসের প্রকাশ॥
বৃন্দাবন দাস যবে আছিলেন গর্ব্ভে।
তাঁর পিতা বৈকুণ্ঠদাস চলি গেল স্বর্গে॥
ভ্রাতৃ-কন্যা গর্ব্ভবতী পতিহীনা দেখি।
আনিয়া শ্রীবাস নিজ গৃহে দিল রাখি॥
পঞ্চবত্সরের শিশু বৃন্দাবন দাস।
মাতামহ মামগাছি করিলা নিবাস॥
বাসুদেব দত্ত প্রভুর কৃপার ভাজন।
মাতাসহ বৃন্দাবনের করে ভরণ পোষণ॥
বাসুদেব দত্তের ঠাকুর বাড়ীতে বাস কৈল।
নানাশাস্ত্র বৃন্দাবন পড়িতে লাগিল॥
নানাশাস্ত্র পড়ি হৈল পরম পণ্ডিত।
চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ যাহার রচিত॥
ভাগবতের অনুরূপ চৈতন্য মঙ্গল।
দেখিয়া বৃন্দাবনবাসী ভকত সকল॥
চৈতন্য ভাগবত নাম দিল তাঁর।
যাহা পাঠ করি ভক্তের আনন্দ অপার॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গান অতি চমত্কার
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, উনবিংশ বিলাস (আংশিক), কৃষ্ণ-
মঙ্গল গান, মাধব আচার্য্যের বিবরণ, ১৮৩-পৃষ্ঠা। কবি এখানে “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্যের
রচয়িতা মাধব আচার্য্য বা দ্বিজ মাধবের জীবনের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন।

মাধব আচার্য্যের বিবরণ।

শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গান অতি চমত্কার।
শুনিলে দ্রবয়ে চিত্ত আনন্দাশ্রু ধার॥
শ্রীমদ্ভাগবতের শ্রীদশমস্কন্ধ।
রচিলা মাধব আচার্য্য করি নানা ছন্দ॥
মাধব আচার্য্য গুণ বর্ণিয়া কিঞ্চিৎ।
যাহার চরিত্র গুণ জগতে বিদিত॥
দুর্গাদাস মিশ্র সব গুণের আকর।
বৈদিক ব্রাহ্মণ বাস নদীয়া নগর॥
তাহার পত্নীর হয় শ্রীবিজয়া নাম।
প্রসবিলা দুই পুত্র অতি গুণধাম॥
জ্যেষ্ঠ সনাতন কনিষ্ঠ পরাশর কালিদাস।১
পরম পণ্ডিত সর্ব্ব গুণের আবাস॥
সনাতনের পত্নীর নাম হয় মহামায়া।
একমাত্র কন্যা প্রসবিলা বিষ্ণুপ্রিয়া॥
একমাত্র কন্যা আর না হৈল সন্তান।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচন্দ্রে তারে কৈলা দান॥
কালিদাস মিশ্র-পত্নী বিধুমুখী নাম।
প্রসবিল পুত্ররত্ন সর্ব্ব গুণধাম॥
একমাত্র পুত্র রাখিয়া কালিদাস।
পৃথি ছাড়ি স্বর্গলোকে করিলেন বাস॥
বিধুমুখী মাধব নামে পুত্র কোলে করি।
অল্প বয়সের কালে হইলেন রাঁড়ি॥
গর্ভাষ্টমে মাধবের যজ্ঞোপবীত হৈল।
নানাবিধ শাস্ত্র তিঁহো পড়িতে লাগিল॥
নানাবিধ শাস্ত্র পড়ি হইলা পণ্ডিত।
আচার্য্য উপাধিতে তিঁহো হইলা বিদিত॥

শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অভিষেক সময়।
মাধব আচার্য্য গেলা শ্রীনিবাসালয়॥
দেখিয়া গৌরাঙ্গ রূপ হইলা উন্মত্ত।
সেই হৈতে হৈলা তিঁহো চৈতন্যের ভক্ত॥
যেই দিন শ্রীচৈতন্য নিজ হরিনামে।
ইচ্চৈস্বরে উপদেশ কৈলা ভক্তগণে॥
সেই দিন সেই স্থানে ছিলেন মাধব।
কর্ণে প্রবেশিল তার মহামন্ত্র রব॥
নাম শুনিয়া তার প্রেমোদয় হৈল।
চৈতন্যচরণে দণ্ডবৎ প্রণমিল॥
শ্রীচৈতন্য প্রভু তারে অনুগ্রহ করি।
চরণ তুলিয়া দিল মস্তকের উপরি॥
মাধব, নামের নীতি প্রভুরে পুছিলা।
সংখ্যা করি লইতে নাম প্রভু আজ্ঞা কৈলা॥
সংখ্যা করি লক্ষ নাম লয় অনুরাগে।
সেই হৈতে হৈল তার সংসার বিরাগে॥
শ্রীমহাপ্রভুর সন্ন্যাসের বহু দিন পরে।
কৃষ্ণ-লালামৃত ভাষার বর্ণে হর্ষান্তরে॥
শ্রীমদ্ভাগবতের শ্রীদশমস্কন্ধ।
গীতি বর্ণনাতে তিঁহো করি নানা ছন্দ॥২
অন্য পুরাণ হৈতে কিছু করিয়া গ্রহণ।
কৃষ্ণ মঙ্গলে তাহা কৈলা নিয়েজন॥
রাখিলা গ্রন্থের নাম শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল।
শ্রীচৈতন্য পদে তাহা সমর্পণ কৈল॥
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য তারে কৈল অনুগ্রহ।
সব ভক্ত তারে করিলেন স্নেহ॥
মহাপ্রভু অদ্বৈতেরে করিলা আদেশ।
দীক্ষামন্ত্র মাধবেরে কর উপদেশ॥
শ্রীঅদ্বৈতপ্রভু মহাপ্রভু, আজ্ঞামতে।
মাধবের কর্ণে মন্ত্র লাগিলা কহিতে॥
আগে হরিনাম কৈলা অর্থের সহিতে।
রাধাকৃষ্ণ মন্ত্র পরে কহিলা কর্ণেতে॥
কামগায়ত্রী কামবীজ উপদেশ কৈলা।
অর্থ জানাইয়া সব তত্ত্ব জানাইলা॥
সেই হৈতে মাধব হৈলা ভজনে নিপুণ।
সংসারে থাকিতে তার নাহি আর মন॥
মাধবের মাতা তারে দেখিয়া উদাস।
সংসার ছাড়িবে বলি মনে হৈল ত্রাস॥
মাধবের মাতা তারে বিয়ে করাইতে।
শীঘ্র করি উদযোগ কৈলা ভয় পাইয়া চিতে॥
মাতার উদযোগ দেখি মাধব তখন।
পলায়ন করি চলি গেল বৃন্দাবন॥
শ্রীরূপের পদে গিয়া আত্ম সমর্পিলা।
ভজনের তত্ত্ব যত সকল জানিলা॥
সন্ন্যাস করিয়া তিঁহো রবি বৃন্দাবন।
ব্রজের মধুর ভাবে করয়ে ভজন॥
মাধ আচার্য্য শ্রী মাধবী সখী হন।
শ্রীরূপের কৃপায় তার হৈল উদ্দীপন॥

টীকা -
১। পরাশর কালী ভক্ত ছিলেন বলে তাঁর নাম কালিদাস হয়।
২। গীতে বর্ণিলা তিঁহো করি নানা ছন্দ॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রহ রহ বলি তমু যাও
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৮৪৯ সালে প্রকাশিত, গৌরমোহন দাস সংকলিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“পদকল্পলতিকা”, ২৮-পৃষ্ঠা।

.        ॥ শ্রীরাগ॥

রহ রহ বলি তমু যাও।
ডাকিলে না শুন কানে এত অহঙ্কার কেনে গরবে ফিরিয়া নাহি চাও॥ ধ্রু॥
গোলোকের নাথ আমি আমারে না চিন তুমি কতনা বিনয় করি বলি।
ব্রহ্মা আদি যত দেবে আমার চরণ সেবে তুমি মোরে নাচাও মুখ তুলি॥
শুনিয়া কানুর বাণী হৃদয়ে হরিষ ধনী কপটে কঠিন কহে কথা।
গোলোক ছাড়িয়া কেনে গোধন চরাও বনে কি সুখে গোলোকপতি হেথা॥
তোমার কারণে ধনী পথে আমি মহাদানী গোচারণ ছলে থাকি বনে।
নিশি দিশি তোমা বিনে আন না লয় মনে কাল আমি তোমার কারণে॥
@ব তুমি বচন বল কখন না দেখি ভাল মণি লোভে @@ কালসাপে।
পরদারে নাহি ডর ডুবাবে নন্দের ঘর গোকুল মজিব এই পাপে॥
ক্ষীরসর ছেনা দধী ঘৃত দুগ্ধ আদি সকলে দান দিব রাধে।
পাইয়া কংসের পান সাধিতে যৌবনের দান দেহ দা@ কি কা@ বিরোধে॥
হরিয়া অহল্যা সতী @নহ ইন্দ্রের গতি সীতা হরি রাবণ সংহার।
বোলাহ গোলোকপতি তব কেনে হেন মতি ভাল বুঝ ধরম বিচার॥
নিত্যানন্দ দাসে কয় পিরীতে সকল @@ বচসা করিয়া কাজ নাই।
হাসিয়া সুবোল বল পিরীতে ডুবিয়া চল পিরীতে গোলোকপতি পাই॥


@ - অপাঠ্য শব্দ।

.                            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পনর শত বাইশ যখন শকাব্দের আসিল
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, চতুর্বিংশ বিলাস (আংশিক),
প্রেমবিলাস গ্রন্থের রচনাকাল ও সমাপ্তি, ৩০১-পৃষ্ঠা।  


পনর শত বাইশ যখন শকাব্দের আসিল।
ফাল্গুন মাস আসিয়া উপস্থিত হৈল॥
কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথি মনের উল্লাস।
পূর্ণ করিল গ্রন্থ শ্রীপ্রেমবিলাস॥

প্রথম হৈতে আঠার বিলাস লিখিনু খণ্ডকে বসিয়া।
উনিশ বিশ দুই বিলাস লিখিনু খড়দহে গিয়া॥
একুশ, বাইশ, তেইশ, চব্বিশ, এই চারি বিলাস।
কাটোয়ায় বসিয়া লিখিনু পাইয়া উল্লাস॥
অর্দ্ধবিলাসে গ্রন্থের সূচী বর্ণন কৈল।
শ্রীজীব গোসাঞি শ্রীনিবাস নরোত্তমের পত্র থুইল॥
গ্রন্থ শেষ হৈলে হৈল পত্রের প্রাপন।
অর্দ্ধবিলাসে তাহা করিনু স্থাপন॥
বৃদ্ধ বয়সে গ্রন্থ করি সমাপন।
বীরচন্দ্রের পদ-মূলে করিনু অর্পণ॥
বৃদ্ধ বয়সে লিখি ভুল অনুক্ষণ।
যে সময়ে যা মনে আসে করিনু লিখন॥
আগের কথা পাছে লিখি পাছের কথা আগে।
ভাবিয়া লিখিনু গ্রন্থ যাহা মনে জাগে॥
এক কথাও বার বার করেছি লিখন।
সব ঘটনা সব সময় না ছিল স্মরণ॥
এক জনার কথা লিখিতে আরম্ভিল।
যে তক মনে আসে এক অধ্যায়ে লিখিল॥
কিছু দিন পরে তার আরো এক ঘটনা।
মনোমধ্যে আসিয়া হইল যোজনা॥
অন্য এক অধ্যায়ে তাহা করিনু বর্ণন।
পুনরুক্তি দোষ মোর হৈল তে কারণ॥
রচনা করিয়া গ্রন্থ শোধিতে নারিল।
তে কারণে বহু দোষ গ্রন্থেতে রহিল॥
বৃদ্ধ বয়স মোর রোগ-গ্রস্ত তনু।
তো কারণে গ্রন্থ আর শোধিতে নারিনু॥
ওহে শ্রোতাগণ তোরা সভে মহাভাগ।
অনুগ্রহি ক্ষম মোর এই অপরাধ॥
প্রণত হইয়া করি এই নিবেদন।
অশুদ্ধ শোধিয়া গ্রন্থ করহ রক্ষণ॥
কতক ঘটনা আমি লিখিনু দেখিয়া।
কতক ঘটনা লিখি শুনিয়া শুনিয়া॥
তে কারণেও পুনরুক্তি দোষ হৈল।
এক সময়ে সব কথা মনে না পড়িল॥
এই যে লিখিনু গ্রন্থ গুরু-আজ্ঞা মানি।
কি লিখিনু ভাল মন্দ কিছুই না জানি॥
ওহে কৃষ্ণভক্তগণ সবে মহামতি।
কৃপা করি শ্রীচরণ দেহ মোর মাথি॥
শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত রায়।
গদাধর শ্রীবাসাদি ভক্ত সমুদায়॥
কৃপা করি মোর মাথে দেহ শ্রীচরণ।
অপরাধ যাউক ভাববন্ধ বিমোচন॥
শ্রীনিবাস নরোত্তম প্রভু শ্যামানন্দ।
কৃপা করিয়া মোর কাট ভববন্ধ॥
হে গুরু করুণাসিন্ধু পতিত পাবন।
শ্রীজাহ্নবা রূপে তুমি দিলা দরশন॥
প্রভু বীরচন্দ্র মোরে করিলা পীরিতি।
কৃপা করি দোঁহার পদ দেহ মোর মাথি॥
অন্তিমেতে যেন গুরু শ্রীচরণ পাই।
এই মনের অভিলাষ তোমাকে জানাই॥
শ্রীজাহ্নবা বীরচন্দ্র পদে যার আশ।
প্রেমবিলাস কহে নিত্যানন্দ দাস॥

ইতি প্রেমবিলাসে চতুর্ব্বিংশতি বিলাস সমাপ্ত।

.                            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এই যে লিখিনু গ্রন্থ গুরু আজ্ঞা মানি
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, বিংশ বিলাস
(আংশিক), নিত্যানন্দ দাসের আত্ম-পরিচয়, ২১২-পৃষ্ঠা।  


এই যে লিখিনু গ্রন্থ গুরু আজ্ঞা মানি।
কি লিখিব ভালমন্দ কিছুই না জানি॥
যা দেখিল  যা শুনিল শ্রীমুখ-বচন।
লিখিনু এ গ্রন্থ তাঁর ভাবিয়া চরণ॥
মোর দীক্ষা-গুরু হয় জাহ্নবা ঈশ্বরী।
যে কৃপা করিল মোরে কহিতে না পারি॥
বীরচন্দ্র প্রভু মোর শিক্ষা গুরু হয়।
আমারে করুণা তিহোঁ করিলা অতিশয়॥
মাতা সৌদামিনী, পিতা আত্মারাম দাস।
অম্বষ্ঠ কুলেতে জন্ম শ্রীখণ্ডেতে বাস॥
আমি এক পুত্র মোরে রাখিয়া বালক।
মাতা পিতা দুঁহে চলি গেলা পরলোক॥
অনাথথ হইয়া আমি ভাবি অনিবার।
রাত্রিতে স্বপন এক দেখিনু চমত্কার॥
জাহ্নবা ঈশ্বরী কহে কোন চিন্তা নাই।
খড়দহে গিয়া মন্ত্র লহ মোর ঠাঁই॥
স্বপ্ন দেখি খড়দহে কৈনু আগমন।
ঈশ্বরী করিলা মোরে কৃপার ভাজন॥
বলরাম দাস নাম পূর্ব্বে মোর ছিলা।
এবে নিত্যানন্দ দাস শ্রীমুখে রাখিলা॥
নিজ পরিচয় আমি করিনু প্রচার।
গুরু কৃষ্ণ বৈষ্ণব পদে কোটী নমস্কার॥
শ্রীজাহ্নবা বীরচন্দ্র পদে যার আশ।
প্রেমবিলাস কহে নিত্যানন্দ দাস॥

.                 *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৃন্দাবন হৈতে আইলা জাহ্নবা ঈশ্বরী
কবি নিত্যানন্দ দাস
১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস দ্বারা বিরচিত, ১৯১৩সালে বাবু
যশোদালাল তালুকদার দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, উনবিংশ বিলাসে, নিত্যানন্দ প্রভুর
জামাতা, দ্বিতীয় মাধব আচার্য্যের বিবরণ, ১৮৫-পৃষ্ঠা।


বৃন্দাবন হৈতে আইলা জাহ্নবা ঈশ্বরী। রহিলেন কত দিন আসি শ্রীখেতরী॥
তার সনে থাকে সদা মাধব আচার্য্য। গান বাদ্যে তিঁহ হরে সবাকার ধৈর্য্য॥১
মাধব আচার্য্য হয় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। নিত্যানন্দ প্রিয়ভক্ত পরম কুলীন॥
নিত্যানন্দ শিষ্য, নিতাই বিনা নাহি জানে। সদাই করয়ে তিঁহো নিতাই-পদ ধ্যানে॥
নিত্যানন্দ প্রভুর কন্যা হয় গঙ্গা নাম। মাধব আচার্য্যে প্রভু কৈলা কন্যা দান॥
বিবাহ করিলা মাধব গুরুর আজ্ঞাতে। গরু আজ্ঞা বলবতী কহয়ে শাস্ত্রেতে॥
ঈশ্বরের মহিমা কিছু বোঝা নাহি যায়। অঘট্য ঘটন হয় ঈশ্বর-ইচ্ছায়॥
রাঢ়ীতে বারেন্দ্রে বিয়ে না ভাবিহ আন। রাঢ়ী ও বারেন্দ্র হয় একের সন্তান॥
রাঢ়ী ও বারেন্দ্রে বিয়ে হৈয়েছে অনেক। দেশঙেদে নামভেদ এই পরতেক॥
আদিশূরের যজ্ঞে আইলা পাঁচজন দ্বিজ। তাহার সন্ততি রাঢ়ী বারেন্দ্র সমাজ॥
মাধব আচার্য্য গঙ্গাকে বিয়ে করি। গুরুর আজ্ঞায় তিঁহ হইলেন রাঢ়ী॥২
মাধব আচার্য্যকে শান্তনু বলি কয়। দ্রবময়ী গঙ্গা এই গঙ্গাদেবী হয়॥
মাধব আচার্য্য-স্থানে বাদ্য শিক্ষা কৈল। কৃপা করি তিঁহো মোরে বাদ্যশিক্ষা দিল॥
তার পাদপদ্মে মোর কোটি নমস্কার। কত কৃপা কৈল মোরে নাহি তার পার॥

টীকা -
১। গানে বাদ্যে তিঁহ হয় সবাকার বর্ষ্য।
২।         মাধদ আচার্য্য বিয়ে করিয়ে গঙ্গায়।
.        রাঢ়ী হইলেন তিনি গুরুর আজ্ঞায়॥

.                 *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর