পরমানন্দ সেন বা পুরীদাস বা কবিকর্ণপূর - সংস্কৃতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন।  
শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর সম্পাদক সতীশচন্দ্র রায়ের মতে কবিকর্ণপূরের স্থান, শ্রীমহাপ্রভুর পরবর্ত্তী যুগের  
সংস্কৃতের কবিদের মধ্যে রূপ গোস্বামীর পরেই। এঁর পদাবলী "পরমানন্দ" ও "পরমানন্দ দাস" ভণিতায়  
পাওয়া।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অপ্রকট হবার সাত কি আট বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৪৪৯ শকাব্দে বা
১৫২৭ খৃষ্টাব্দে, নদীয়া জেলার কাঁচড়াপাড়া বা কাঞ্চনপল্লী গ্রামে, সম্ভবত তাঁর মাতুলালয়ে। পিতা শিবানন্দ
সেন ছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্ত ও অন্যতম প্রধান পার্ষদ। কবি তাঁর পিতার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। তাঁর
অগ্রজদের নাম ছিল চৈতন্যদাস এবং রামদাস।
চৈতন্য দাস, রাম দাস, আর কর্ণ পূর,
তিন পুত্র শিবানন্দের, তিন ভক্ত শূর
॥ --- কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ১০ম পরিচ্ছেদ॥



কবির “পুরীদাস” নামকরণে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .   
পরমানন্দ দাসের ‘পুরীদাস’ নামের উত্পত্তি সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায় তাঁর শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের
ভূমিকার ১৯৯-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
পরমানন্দ সেন মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব্ববত্সরে শিবানন্দ সেন রথযাত্রার সময়ে সস্ত্রীক নীলাচলে
গমন করেন। তথায় শিবানন্দের পত্নী ঋতুমতী হইলে শিবানন্দ মহাসমস্যায় পতিত হন। কেন না, তীর্থস্থানে
স্ত্রী-সহবাস নিষিদ্ধ ; অথচ ঋতুকালে রোগাদি প্রতিবন্ধক কারণ না থাকিলে পত্নীর ঞতু-রক্ষা না করিলেও
প্রত্যবায় দেখা দেয়। শিবানন্দ কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া ও লজ্জাহেতু শ্রীমহাপ্রভুর নিকট এ সম্বন্ধে উপদেশ
চাহিতে পারিলেন না। কিন্তু অন্তর্য্যামী মহাপ্রভু শিবানন্দের মনোগত সমস্যার বিষয় স্বয়ং অবগত হইয়া
শিবানন্দের সন্দেহ নিরাসের জন্য তাঁহাকে বলিলেন,
“এবার তোমার যেই হইবে কুমার।
পুরিদাস বলি নাম ধরিবে তাহার॥” --- কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্যলীলা, ১২শ পরিচ্ছেদ॥
পুরীতে মাতৃগর্ভে পরমানন্দের সঞ্চার হইবে বলিয়া, তাঁহার ‘পুরীদাস” নাম রাখিতে হইবে, প্রভুর
আজ্ঞার ইহাই তাত্পর্য্য বুঝিতে পারায়, শিবানন্দের সকল সংশয় দূর হইল ; এবং পুরীধামেই মাতৃগর্ভে
পরমানন্দের সঞ্চার হইয়া যথা সময়ে তিনিন স্বদেশে ভূমিষ্ঠ হয়েন
।”

সতীশচন্দ্র রায়ের এই কাহিনীর সঙ্গে জগবন্ধু ভদ্র একমত হতে পারেন নি যথাযত প্রমাণের অভাবে।

আমরা কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের অন্ত্যলীলার ১২শ পরিচ্ছেদের আরও কিছু অংশ এখানে
তুলে দিচ্ছি। তা থেকে এটুকু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে বর্ণনাটি শিবানন্দ যখন তিন পুত্র নিয়ে মহাপ্রভুর সঙ্গে
দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখনকার ; এবং পূর্ব্বে যখন শিবানন্দ প্রভুস্থানে (নীলাচলে) গিয়েছিলেন
তখন তাঁকে চৈতন্য মহাপ্রভু আগাম হবু পুত্রের নাম পুরীদাস রাখার আজ্ঞা দিয়েছিলেন, এ বিষয়ে কোনো
সন্দেহ নেই। উপরোক্ত “কিন্তু অন্তর্য্যামী মহাপ্রভু শিবানন্দের মনোগত সমস্যার বিষয় স্বয়ং অবগত হইয়া  
শিবানন্দের সন্দেহ নিরাসের জন্য তাঁহাকে বলিলেন” একথার কোনো উল্লেখ দেখছি না। তাই, কারণ যাই
হোক, পরমানন্দের নাম ‘পুরীদাস’ মহাপ্রভুই যে রাখার আজ্ঞা দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে
পারে না। শেষে শিবানন্দের তৃতীয় পুত্রের ‘পুরীদাস’ নাম নিয়ে প্রভু উপহাসও করছেন! সেটা কি পূর্ব্বে ঘটে
যাওয়া পুত্রের গর্ভসঞ্চারের ঘটনার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল বলেই কি!
পূর্ব্ববৎ কৈল প্রভু সবার মিলন ;
স্ত্রী সব দূর হৈতে কৈল প্রভু দরশন।
বাসা ঘর পূর্ব্ববৎ সবারে দেয়াইল ;
মহাপ্রসাদ ভোজনে সবারে বোঝাইল।
শিবানন্দ তিন পুত্র গোঁষাইকে মিলাইল ;
শিবানন্দ সম্বন্ধে সবার বহু কৃপা কৈল।
ছোট পুত্র দেখি প্রভু নাম পুছিল ;
পরমানন্দ দাস নাম, সেন জানাইল।
পূর্ব্বে যবে শ্বানন্দ প্রভুস্থানে আইলা ;
তবে মহাপ্রভু তাঁরে কহিতে লাগিলা।
এবার তোমার যেই হইবে কুমার ;
পুরিদাস বলি নাম ধরিবে তাহার।
তবে মায়ের গর্ভে হয় সেই ত কুমার ;
শিবানন্দ ঘরে গেলে জন্ম হৈল তার।
প্রভুর আজ্ঞায় ধরিল নাম পরমানন্দ দাস ;
পুরীদাস বলি প্রভু করে উপহাস।
শিবানন্দ সেউ বালক যবে মিলাইল ;
মহাপ্রভু পাদাঙ্গুষ্ঠ তার মুখে দিল
।” --- কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্যলীলা, ১২শ পরিচ্ছেদ॥



কবির “কবিকর্ণপূর” নামকরণে জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি -                             পাতার উপরে . . .   
১৯৩৪ সালে প্রকাশিত জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-
তরঙ্গিণী”-এর, দ্বিতীয় সংস্করণের পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়ের ১৯৭-পৃষ্ঠায় জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি থেকে আমরা
কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি। . . .
পরমানন্দের বয়স যখন সাত বত্সর, তখন রথযাত্রা উপলক্ষে সস্ত্রীক শিবানন্দ তাঁহাকে লইয়া গৌড়ের
ভক্তবৃন্দ সহ নীলাচলে গমন করেন। তাঁহারা নীলাচলে উপস্থিত হইলে মহাপ্রভু নীলাচলের ভক্তমণ্ডলী সহ
তাঁহাদিগের সহিত  মিলিত হইবার জন্য অগ্রসর হইলেন। নরেন্দ্র সরোবরের সন্নিকটে উভয় দলের সাক্ষাৎ
হইল। তখন বালক মহাপ্রভুকে দর্শন করিবার জন্য আগ্রহ সহকারে পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘গৌরাঙ্গ প্রভু
কৈ ?’ তাহাতে শিবানন্দ সেন যে উত্তর দিয়াছিলেন, তাহা কবিকর্ণপূর পরে তাঁহার শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটকে
নিম্নলিখিত শ্লোকে বর্ণনা করেন,---

বিদ্যুদ্দামদুযুতিরতিশয়োত্কণ্ঠকণ্ঠীবরেন্দ্র-
ক্রীড়াগামী কনকপরিঘদ্রাঘিমোদ্দামবাহুঃ।
সিংহগ্রীবো নবদিনকরদ্যোতবিদ্যোতবিদ্যোতিবাসাঃ
শ্রীগৌরাঙ্গঃ স্ফূরতি পূরতো বন্দ্যতাং বন্দ্যতাং ভোঃ॥

অর্থাৎ ‘বিদ্যুদ্দামকান্তি, উত্কণ্ঠিত মৃগেন্দ্রগতি, স্বর্ণ-পরঘসম দীর্ঘোন্নত বাহু, সিংহগ্রীব, অরুণ-কিরণ-কান্তিবাসা
ঐ শ্রীগৌরাঙ্গদেব সম্মুখে রহিয়াছেন। প্রণাম কর, প্রণাম কর।’

পুত্রকে লইয়া কি করিয়া প্রভুর তরণে উপস্থিত হইবেন, শিবানন্দ তাহাই ভাবিতেছিলেন ; কারণ প্রভুর গৃহে
সর্ব্বদা বহু লোকের সমাগম। কয়েক দিন পরে সেই শুভ সুযোগ উপস্থিত হইল। কারণ, শিবানন্দ যে  
বাসাটিতে স্ত্রী পুত্র সহ বাস করিতেছিলেন, তাহার সম্মুখ দিয়া একদা তিনটি ভক্ত সহ প্রভু যাইতে ছিলেন।
ইহা দেখিয়া শিবানন্দ ও তাঁহার স্ত্রী অগ্রবর্ত্তী হইয়া প্রভুর চরণে পতিত হইলেন ও করযোড়ে বলিলেন, ‘প্রভো,
একবার দাসানুদাসের গৃহে পদধূলি দিতে আজ্ঞা হয়।’ ‘তোমার যাহা অভিরুচি’ বলিয়া শ্রীগৌরাঙ্গ ভক্তসহ
শিবানন্দের বাটীতে পদার্পণ করিলেন। তখন শিবানন্দ তাঁহার সেই সপ্তমবর্ষীয় পুত্রকে আনিয়া প্রভুর চরণ-
প্রান্তে রাখিয়া বলিলেন, ‘ভগবন, এই আপনার সেই বরপুত্র। আপনার আজ্ঞাক্রমে ইহার নাম পরমানন্দ দাস
রাখিয়াছি।’ ইহাই বলিয়া পুত্রকে বলিলেন, ‘প্রণাম কর’। বালক মস্তক অবনত করিয়া প্রণাম করিলে, প্রভু
বলিলেন, ‘তোমার দিব্য পুত্র হইয়াছে।’ তাহার পর স্নেহার্দ্র হইয়া তাহার মস্তকে চরণ দিতে গেলে, পরমানন্দ,
সম্ভবত ইহার তাত্পর্য্য না বুঝিতে পারিয়া, মস্তক অবনত না করিয়া মুখব্যাদান করিল। তখন প্রভু আপন
বৃদ্ধচরণাঙ্গুষ্ঠ বালকের মুখে দিলেন। আশ্চর্য্যের বিষয়, বালক ইহাতে কোন আপত্তি না করিয়া, কিম্বা বিরক্ত
না হইয়া, দুই হস্তে শ্রীচরণ ধরিয়া, শিশু সন্তান যেমন স্তনপান করে, সেই ভাবে অতি আরামের সহিত অঙ্গুষ্ঠ
চুষিতে লাগিল।

বালকের মুখে চরণাঙ্গুষ্ঠ দিবার সময় শ্রীগৌরাঙ্গ একটি শ্লোক বলিয়াছিলেন। কবিকর্ণপূর সেই শ্লোকটি তাঁহার
রচিত ‘আনন্দ-বৃন্দাবন-চম্পূ’তে লিপিবদ্ধ করেন। শ্লোকটি এই---

বত্সাস্বাদ্য মূহুঃ স্বয়া রসনয়া প্রাণস্য সত্কাব্যতাম্।
দেয়ং ভক্তজনেষু ভাবিষু সুরৈর্দুষ্প্রাপ্যমেতং ত্বয়া॥

অর্থাৎ --- ‘হে বত্স! তুমি স্বীয় বাসনা দ্বারা এই অঙ্গুলি আস্বাদন করিয়া সত্কবিত্ব প্রাপ্ত হইলে।
এই দেবদুর্ল্লভ কবিত্ব ভক্তজনমধ্যে প্রচার করিও।’ পরমানন্দ লিখিয়াছেন, ‘এই কথা বলিয়া প্রভু তাঁহার
পদাঙ্গুষ্ঠ আমার বদনে দিলেন।’

তাহার পর প্রভু বালকের মুখ হইতে অঙ্গুষ্ঠ বাহির করিয়া, তাহাকে বলিলেন, ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ বল।’ বালক কোন
কথা বলিল না, চুপ করিয়া রহিল। এই প্রকারে প্রভু পর পর তিন বার ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ বলাইবার চেষ্টা করিলেন,
কিন্তু কৃতকার্য্য হইলে না,---বালক নির্ব্বাক্ হইয়া রহিল। ইহাতে তাহার পিতা মাতা ব্যগ্র হইয়া পুত্রকে কৃষ্ণ
বলাইবার জন্য প্রথমে অনুনয়-বিনয়, এবং পরে তাড়না ভয় প্রদর্শন প্রভৃতি নানাবিধ চেষ্টা করিয়াও  
কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। তখন প্রভু যেন বিস্ময়ভাব দেখাইয়া ক্ষোভ করিয়া বলিলেন, ‘হায়! আমি
বিশ্বসংসারকে কৃষ্ণনাম বলাইলাম, আর এই সামান্য বালককে পারিলাম না!’

প্রভুর সঙ্গে স্বরূপ দামোদর ছিলেন ; তিনি বলিলেন, ‘প্রভু, আপনি বালককে কৃষ্ণনাম মহামন্ত্র দিলেন, সে উহা
কিরূপে প্রকাশ করিয়া উচ্চারণ করিবে ?’ এই কথা শুনিয়া শ্রীগৌরাঙ্গ যেন আশ্বস্ত হইয়া বলিলেন, ‘তাই কি
হইবে ?’

আর দিন প্রভু কহে ‘পুরীদাস’। কি আশ্চর্য্য! এই কথা বলিবা মাত্র বালক উঠিয়া দাঁড়াইল এবং করযোড়ে
একটি শ্লোক তত্ক্ষণাৎ রচনা করিয়া পড়িতে লাগিল। পরমানন্দের সেই শ্লেকটি এই,---
শ্রবসোঃ কুবলয়মক্ষ্ণোরঞ্জনমুরসো মহেন্দ্রমণিদাম।
বৃন্দাবনরমণীনাং মণ্ডনমখিলং হরির্জয়তি॥
অর্থাৎ --- ‘যিনি (ব্রজযুবতীগণের) কর্ণের কুবলয়, নয়নের সুরস অঞ্জন, বক্ষস্থলের নীলকান্তমণি, বৃন্দাবন
রমণীদিগের অখিল ভূষণস্বরূপ সেই শ্রীকৃষ্ণ জয়যুক্ত হউন!’

বালকের মুখে এই অপূর্ব্ব শ্লোক শুনিয়া তাহার পিতামাতা ও উপস্থিত ভক্তগণ আনন্দে ও বিস্ময়ে অভিভূত
হইলেন।

তখন প্রভু বলিলেন, ‘বত্স! তুমি কৃষ্ণকে বৃন্দাবন-তরুণীদের কর্ণযুগলের কুবলয় অর্থাৎ নীলোত্পল-ভূষণ
বলিয়া বর্ণনা করিলে। তোমার এই কবিতা অতি সুন্দর ও সর্ব্বতোভাবে কবিগণের কর্ণ-ভূষণ হওয়ার
উপযুক্ত। অতএব অদ্য হইতে তোমার নাম হইল ‘কবিকর্ণপূর’
।”



কবিকর্ণপূরের কবিপ্রতিভা সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি -                         পাতার উপরে . . .   
এই কবি সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্র বলেছেন . . .
তাঁহার রচিত শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটক, আনন্দবৃন্দাবনচম্পূ, শ্রীচৈতন্যচরিত মহাকাব্য, গৌরগণোদ্দেশদীপিকা
প্রভৃতি সংস্কৃত কাব্যগুলির ভাষা যেরূপ প্রাঞ্জল, ভাবও তেমনি সুমধুর ও উপাদেয় বলিয়া এই গ্রন্থগুলি  
বৈষ্ণবদিগের মুকুটমণি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অতীব দুঃখের বিষয় যে, এ হেন একজন পরমবৈষ্ণ ও
উত্কৃষ্ট গ্রন্থকারের জীবনী খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আবার আধুনিক বৈষ্ণব সাহিত্যিক গণের মধ্যে যাঁহারা
তাঁহার সম্বন্ধে যাহা কিছু লিখিয়াছেন, তাঁহাদের উক্তির মধ্যেও পরস্পরে গরমিল এবং অনেক স্থলে প্রমাণের
অভাব
।”



পরমানন্দের পদাবলী সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                           পাতার উপরে . . .   
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ভূমিকার ১৪৭-পৃষ্ঠায় পরমানন্দ সেন বা  
কবিকর্ণপূরের পদাবলী সম্বন্ধে  লিখেছেন . . .
এখানে কবিকর্ণপূরের পদাবলী সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা না করিলে চলিবে না। তাঁহার পদকল্পতরুর উদ্ধৃত
পদগুলির মধ্যে বাঙ্গালা ও ব্রজ-বুলী---উভয় পদই পাওয়া যায়। বাঙ্গালা পদগুলির মধ্যে ৬৭২ সংখ্যক,---
পরশ-মণির সনে                        কি দিব তুলনা রে
.                পরশ ছোয়াইলে হয় সোণা।
আমার গৌরাঙ্গের গুণে                        নাচিয়া গাইয়া রে
.                রতন হইল কত জনা॥
ইত্যাদি উত্কৃষ্ট ব্যঞ্জনাপূর্ণ পদটী বিশেষ প্রসিদ্ধ। ইহা ব্যতীত তাঁহার ২২০২ সংখ্যক---
গোরা-অবতারে যার                        না হৈল ভকতি-সার
.                আর তার না দেখি উপায়।
রবির কিরণে যার                        আঁখি পরসন্ন নৈল
.                বিধাতা বঞ্চিত ভেল তায়॥
ইত্যাদি সরল ও সুন্দর পদটীও পদ-কর্ত্তার সুদৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তির পরিচায়ক। যাঁহারা কবিকর্ণপূরের  
সংস্কৃত গদ্য-রচনা পড়িয়া, উহার দীর্ঘ-সমাস ও অনুপ্রাসের ছটায় পদে পদে কবি-শ্রেষ্ঠ দণ্ডীর দশকুমার-
চরিতকথা-কাব্যখানাকে স্মরণ করিতে বাধ্য হইয়াছেন, তাঁহারা কবিকর্ণপূরের এই প্রাঞ্জল পদগুলি পড়িয়া,
বোধ হয় বিশ্বাস করিতে চাহিবেন না যে, এগুলি সেই একই কবির রচনা ; কিন্তু লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে,
কবিকর্ণপূর ও শ্রীজীব গোস্বামী তাঁহাদের গদ্য-রচনায় দণ্ডী ও বাণ ভট্টের পদাঙ্কানুসরণ করিয়া থাকিলেও,
তাঁহাদের পদ শ্লোকাবলী বৈদর্ভী-রীতির লক্ষণাক্রান্ত  এবং প্রসাদ-গুণ ও প্রাঞ্জলতার জন্য পরম-উপাদেয়।
সুতরাং এ অবস্থায় বাঙ্গালা-পদ রচনা করিতে যাইয়া কবিকর্ণপূর যে, সম্পূর্ণ-রূপে বেশ-পরিবর্ত্তন
করিয়া দীন বাঙ্গালী বৈষ্ণব ভক্তের মূর্ত্তি ধারণ করিবেন, ইহাতে আশ্চর্য্যান্বিত হওয়ার কোন কারণ নাই।

পদকল্পতরুর ২৮৫৮ সংখ্যক পদে কবি বঙ্গদেশের প্রচলিত তথা-কথাত ব্রজ-বুলীর ব্যবহার না করিয়া খাঁটি
ব্রজ-মণ্ডলের ভাষা অর্থাৎ ব্রজ-ভাষার ব্যবহার করিয়াছেন, যথা---
আরতি যুগল-কিশোরকি কীজে।
তনু মন ধনহু নিছায়রি দীজে॥ ---ইত্যাদি!

বাঙ্গালায় বসিয়া ব্রজ-ভাষায় পদ-রচনা করা তেমন সঙ্গত বা সম্ভবপর বোধ হয় না ; সুতরাং এই পদের
রচয়িতা পরমানন্দ যদি ব্রজবাসী অন্য কোনও পরমানন্দ না হন, তাহা হইলে আমাদের পরমানন্দ সেনই ব্রজ-
ধামে ব্রজ-বাসী হিন্দুস্থানী ভক্তদিগের অনুরোধে তাঁহাদিগের প্রীতির জন্যে এই আরতির পদটী রচনা  
করিয়াছিলেন, ইহাই অনুমান হয়। ইহাঁর ২৮৭১ সংখ্যক ‘আরতি জয় বৃষভানু-কুমারি’ ইত্যাদি পদের  
সম্বন্ধেও এই মন্তব্য প্রযোজ্য বটে
।”



কবিকর্ণপূর বা পরমানন্দের রচনাসম্ভার -                                          পাতার উপরে . . .   
কবি কর্ণপূর বা পরমানন্দের রচনা সম্ভারে রয়েছে ১৪৯৪ শকাব্দে (১৫৭২ খৃষ্টাব্দে) রচিত শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয়
নাটক এবং শ্রীচৈতন্যচরিত কাব্য, আনন্দবৃন্দাবনচম্পূ, শ্রীচৈতন্যশতক, স্তবাবলী, বৃহৎ বা  কৃষ্ণগণো-
দ্দেশদীপিকা, অলঙ্কারকৌস্তভ, ১৪৮৮ শকাব্দে (১৫৬৬ খৃষ্টাব্দ) গৌরগণোদ্দেশদীপিকা প্রভৃতি।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি পরমানন্দ বা কবিকর্ণপূরের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।



কবি পরমানন্দ-কবিকর্ণপূরের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।   


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১১.৭.২০১৭
...                                                                                             
“পুরীদাস” নামকরণে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
“কবিকর্ণপূর” নামকরণে জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি    
কবিকর্ণপূরের কবিপ্রতিভা সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি   
পরমানন্দের পদাবলী সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
কবিকর্ণপূর বা পরমানন্দের রচনাসম্ভার   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
পরমানন্দ, কবিকর্ণপূর
জন্ম ১৪৪৯ শকাব্দে বা ১৫২৭ খৃষ্টাব্দে, মৃত্যু অজ্ঞাত
*
*
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে
আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান
তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ
প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো।
আমাদের ঠিকানা -
srimilansengupta@yahoo.co.in
ভণিতা -
পরমানন্দ, পরমানন্দ দাস
*
*
*
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .