কবি শ্রীরূপ গোস্বামীর বৈষ্ণব পদাবলী
*
রাধে নিগদ নিজং গদমূলম
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
নরহরি (ঘনশ্যাম) চক্রবর্তী প্রণীত শ্রীশ্রীগীতচন্দ্রোদয় গ্রন্থের পদ। বৈষ্ণবদাস
সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক
সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ১ম শাখা, ৪র্থ পল্লব, শ্রীরাধাকৃষ্ণের পূর্ব্বরাগ,
পদসংখ্যা ৬৯।


.                অথ শ্রীরাধিকাং প্রতি সখ্যুক্তিঃ।

.                ॥ বালাধানশী॥

.            রাধে নিগদ নিজং গদমূলম
উদয়তি তনুমনু                কিমিতি তাপ-কুল-
.             মনুকৃত-বিকট-কুকূলম॥ ধ্রু॥
প্রচুর-পুরন্দর-                        গোর-বিনিন্দক-
.               কানিতু-পটলমনুকূলম্।
ক্ষিপসি বিদূরে                        মৃদুলং মুহুরপি
.                সংভৃতমুরসি দুকূলম্॥
অভিনন্দসি নহি                        চন্দ্র-রজোভর-
.                বাসিতমপি তাম্বুলম্।
ইদমপি বিকিরসি                বর-চম্পক-কৃত-
.                মনুপদ-দাম সচুলম্॥
ভজদনবস্থিতি-                        মখিল-পদে সখি
.               সপদি বিড়ম্বিত-তূলম।
কলিত-সনাতন-                        কৌতুকমপি তব
.                হৃদয়ং স্ফুরতি সশূলম্॥

অনুবাদ -
১-৩। হে রাধে! তুমি নিজের ব্যাধির কারণ বল ; দারুণ তুষানলের ন্যায় সন্তাপ-সমূহ
তোমার দেহে কেন প্রকাশিত প্রকাশিত হইতেছে ?
৪-৭। পুঞ্জীভূত ইন্দ্রগোপ-কীটের কান্তি হইতে লোহিততর বক্ষঃস্থলে উত্তরীয়-বসন মৃদুল ও
সুখ-স্পর্শ হইলেও কি জন্য উহা দূরে নিক্ষেপ করিতেছ ?
৮-১১। তাম্বুল কর্পূর-চূর্ণ দ্বারা সুবাসিত হইলেও কি জন্য গ্রহণ করিতেছ না ? আর এই
সীমন্ত-ভূষণ সহ উত্কৃষ্ট চম্পক-পুষ্পমাল্যকে কি জন্য ছুড়িয়া ফেলিতেছ ?
১২-১৫। হে সথি! সমস্ত বিষয়ে অভিনিবেশহীন তোমার হৃদয় “কলিত-সনাতন-কৌতুক”
হইলেও কি জন্য শূল-যুক্ত বোধ হইতেছে ?
“কলিত-সনাতন-কৌতুক” শব্দটির ত্রিবিধ অর্থ আছে ; প্রথম অর্থ, --- শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গমে
অভিলাষ-যুক্ত। দ্বিতীয় অর্থ ---চির-স্থায়ি-কৌতুহল-যুক্ত। তৃতীয় অর্থ --- সনাতন নামক
কবির কৌতূহলের উত্পাদক। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কুটিলং মানব-লোক্য নবাম্বুজ
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ১ম শাখা, ৪র্থ পল্লব, শ্রীরাধাকৃষ্ণের
পূর্ব্বরাগ, পদসংখ্যা ৭২।


.                তত্র স্বয়মুক্তিঃ।

.                ॥ পাহিড়া॥

কুটিলং মানব-                        লোক্য নবাম্বুজ-
.                মুপরি চুচুম্ব স রঙ্গী।
তেন হঠাদহ-                        মভবং বেপথু-
.                মণ্ডল-সঞ্চলদঙ্গী॥
.        ভাবিনি পৃচ্ছ ন বারং বারম্।
হন্ত বিমুহ্যতি                        বীক্ষ্য মনো মম
.                বল্লব-রাজকুমারম॥ ধ্রু॥
দাড়িম-লতিকা-                        মনু নিস্তল-ফল-
.                নমিতাং স দধে হস্তম্।
তদনুভবাম্মম                        ধর্ম্মোজ্জ্বলমপি
.                ধৈর্য্য-ধনং গতমস্তম্॥
অদশদশোক-                        লতা-পল্লবময়-
.                মতনু-সনাতন-নর্ম্মা।
তদহমবেক্ষ্য                        বভূব চিরং বত
.                বিস্মৃত-কায়িক-কর্ম্মা॥


অনুবাদ -
১-৪। সেই বিলাসী শ্রীকৃষ্ণ আমাকে বহ্কিম-নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া, পদ্ম-কোরত
করে ধারণ করিয়া, তাহার উপরে চুম্বন করিলেন ; তাহাতে আমি অকস্মাৎ (সাত্ত্বিক-
ভাবের উদয় হেতু) কম্পাকুলদেহা হইয়া পড়িলাম।
৫-৭। হে ভাবিনি! পুনঃ পুনঃ কেন জিজ্ঞাসা করিতেছ ? হায়! গোপেন্দ্র-নন্দনকে দেখিয়া
আমার চিত্ত ব্যাকুল হইয়াছে।
৮-১১। তিনি সুবর্ত্তুল ফলের ভারে আনমিত দাড়িম-তরুর শাখায় হস্ত অর্পিত করিলেন, ---
তাঁহার সেই ভাব বুঝিয়া, ধর্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা সমুজ্জবল হইলেও আমার ধৈর্য্য-রত্ন বিনষ্ট হইল।
১২-১৫। “অতনু-সনাতন-নর্ম্মা” ইনি অশোক-লতার পল্লবে দংশন করিলেন, তাহা দেখিয়া
আমি বহুক্ষণ পর্য্যন্ত সকল কার্য বিস্মৃত হইয়া (মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায়) রহিলাম।
“অতনু-সনাতন-নর্ম্মা”  - অতনু (বহু) এবং সনাতন (নিত্য) নর্ম্ম (ক্রীড়া) যাঁহার, কিংবা
অতনু অর্থাৎ কন্দর্পের সনাতন নর্ম্ম যাঁহা হইতে এবং পক্ষান্তরে --- অতনু (প্রভূত) পদ-
কর্ত্তা সনাতনের নর্ম্ম (আন্নদ) যাঁহা হইতে --- এইরূপ সমাস দ্বারা “অতনু-সনাতন-নর্ম্মা” শ্লিষ্ট
শব্দটি সিদ্ধ হইয়াছে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অনধিগতাকস্মিক-গদ-কারণ
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ১ম শাখা, ৭ম পল্লব, শ্রীকৃষ্ণের
পূর্ব্বরাগ - সবিস্তার, পদসংখ্যা ১৭২।


.        ॥ পাহিড়া॥

অনধিগতাকস্মিক-গদ-কারণ-
মর্পিত-মন্ত্রৌষধি-নিকুরম্বম্।
অবিরত রুদিত-বিলোহিত-লোচন-
মনুশোচতি তামখিল-কুটুম্বম্॥
দেব হরে ভব করুণাশালী।
সা তব নিশিত-কটাক্ষ-শরাহত-
হৃদয়া জীবতু কৃশতনুরালী॥ ধ্রু॥
হৃদি বলদবিরল-সংজ্বর-পটলী-
স্ফুটদুজ্জ্বল-মৌক্তিক সমুদায়া।
শীতল-ভূতল-নিশ্চল-তনুরিয়-
মবসীদতি সংপ্রতি নিরুপায়া॥
গোষ্ঠ-জনাভয়-সত্র-মহাব্রত-
দীক্ষিত ভবতো মাধব বালা।
কথমর্হতি তাং হন্ত সনাতন-
বিষম-দশাং-গুণ-বৃন্দ-বিশালা॥

অনুবাদ -
১-৪। (শ্রীরাধার) আকস্মিক রোগের কারণ বুঝিতে না পারিয়া নানাবিধ মন্ত্র ও ঔষধের
প্রয়োগ করিয়া (কোন ফল না পাইয়া), অবিরত রোদনে নয়ন আরক্তিম করিয়া শ্রীরাধার
পরিজনবর্গ তাঁহার জন্য অনুতাপ করিতেছেন।
৫-৭। হে শ্রীকৃষ্ণ! তুমি (শ্রীরাধার প্রতি) করুণাপরায়ণ হও ; তোমার তীক্ষ্ণ কটাক্ষ-বাণে
বিদীর্ণহৃদয়া আমাদিগের কৃশাঙ্গী সখী (কোনও প্রকারে) বাঁচিয়া থাকুন।
৮-১১। তাঁহার অন্তরের দারুণ সন্তাপে উজ্জ্বস মুক্তাসমূহ বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে ; তিনি
সম্প্রতি নিরুপায় হইয়া শীতল ভূমি-তলে নিশ্চল-দেহে অসহ্য ক্লেশ অনুভব করিতেছেন।
১২-১৫। গোকুল-বাসীদিগের অভয়-দান-রূপ মহাব্রতে দীক্ষিত হে মাধব! হায়! গুণ-গণ-
বরেণ্যা বালিকা রাধা তোমার নিকট কিসে সেই সনাতন-শোচনীয় দশা পাইবার
যোগ্য হইল ?
“সনাতন-শোচনীয়-দশা” --- এই শ্লিষ্ট (যার দুটি মানে হয়) শব্দটির এক অর্থ --- চিরস্থায়ী
শোচনীয় দশা ; অপর অর্থ --- কৃষ্ণ-বিরহার্ত্ত পদ-কর্ত্তা সনাতনের ন্যায় শোচনীয় দশা।
(সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কুসুমাবলিভিরুপস্কুরু তল্পম্
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু
সংকলনের, সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ৭ম পল্লব,
সর্ব্বকালোচিত বাসকসজ্জা, পদসংখ্যা ৩৫৭। রাধামোহন ঠাকুর সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৮৭৮ সালে, রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলন “পদামৃত সমুদ্র” সংকলনের, বাসক সজ্জার পদসংখ্যা ২।


.        ॥ কল্যাণী॥

কুসুমাবলিভিরুপস্কুরু তল্পম্।
মাল্যঞ্চামর-মণিসর-কল্পম্॥
প্রিয়সখি কেলি-পরিচ্ছদ-পুঞ্জম্।
উপকল্পয় সত্বরমধিকুঞ্জম্॥ ধ্রু॥
মণি-সম্পুটপনয় তাম্বুলম্।
শয়নাঞ্চলমপি পীত-দুকূলম্॥
বিদ্ধি সমাগতমপ্রতিবন্ধম্।
মাধবমাশু সনাতন-সন্ধম্॥

অনুবাদ -
১-২। কুসুমাবলী দ্বারা শয্যা ও দেব-মণিহার-তুল্য মাল্য সজ্জিত কর।
৩-৪। হে প্রিয়-সখি! কেলির উপকরণসমূহ সত্ত্বর কুঞ্জের মধ্যে স্থাপিত কর।
৫-৬। মণি-রচিত তাম্বূলাধার, তাম্বূল ও পীত উত্তরীয়-বস্ত্র শয্যার প্রান্তে স্থাপিত কর।
৭-৮। সখি! মনে জানিও, সনাতন-সন্ধ (এক অর্থে --- স্থির-প্রতিজ্ঞ ; অন্য অর্থে সনাতন-
নামক পদকর্ত্তার সহিত সন্ধি-কারী) অপ্রতিহত-গতি মাধব শীঘ্রই কুঞ্জে আসিতেছেন।
(সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কিমু চন্দ্রাবলিরনয়গভীরা
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ৭ম পল্লব, সর্ব্বকালোচিত
খণ্ডিতা, পদসংখ্যা ৩৬৪।


.        ॥ কেদার॥

কিমু চন্দ্রাবলিরনয়গভীরা।
অরুণদমুং রতি-বীরমধীরা॥
অতিচিরমজনি রজনিরতিকালী।
সঙ্গমবিন্দত নহি বনমালী॥ ধ্রু॥
কিমিহ জনে ধৃত-পঙ্ক-বিপাকে।
বিল্মৃতিরস্য বভূব বরাকে॥
কিমুত সনাতন-তনুরলঘিষ্ঠম্।
রণমারভত সুরারিভিরিষ্টম্॥

অনুবাদ -
১-২। গভীর-দুর্ণয়-বিশিষ্টা চঞ্চলা চন্দ্রাবলি সেই রতি-বীর স্রীকৃষ্ণকে আবদ্ধ করিয়াছে কি ?
৩-৪। অনেক ক্ষণ যাবৎ রজনী ঘোর-কৃষ্ণা হইয়াছে ; বনমালী আমার সঙ্গ লাভ করিলেন না

৫-৬। কলঙ্ক-কালিম-গর্স্তা এই দুর্ভাগিনীকে কি তিনি বিস্মৃত হইলেন ?
৭-৮। সনাতন-মূর্ত্তি স্রীকৃষ্ণ কি দেবারি-গণের সহিত সুদীর্ঘ যুদ্ধ আরহ্ধ করিয়াছেন ?
(সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

তাত্পর্য্য -
কবি এই ক্ষুদ্র পদটির রচনায় অপূর্ব্ব কবিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন ; উত্তমা নায়িকা শ্রীরাধার
মনে প্রিয়তমের প্রতি প্রথমে স্ত্রী-জাতি-সুলভ সন্দেহ ও ঈর্ষা-ভাব উদিত হইলেও, তিনি
তাঁহার প্রিয়তমের উপর কোন দোষারোপ না করিয়া, চন্দ্রাবলিকেই দোষী স্থির  
করিতেছেন এবং তাঁহার প্রিয়তমের অতুলনীয় প্রেমের কথা স্মরণ হওয়ায় তাঁহার সেই
সন্দেহ ও ঈর্ষা তকনই অপনীত হইতেছে। তার পর মনে হইতেছে যে, অনেক ক্ষণ যাবৎ
রজনী গাঢ়ান্ধকারা হইয়াছে --- সুতরাং বোধ হয়, অন্ধকারে পথ দেখিতে না পাইয়াই
প্রয়তম আমার সহিত সম্মিলিত হইতে পারেন নাই ; পরক্ষণেই ভাবিতেছেন,  
চতুরশিরোমণির পক্ষে পথ-ভ্রান্তি কি সম্ভবপর ? বোধ হয়, ইহা আমারই কলঙ্কের  
অনিবার্য্য ফল যে, তিনিও আমাকে অধম বলিয়া বিস্মৃত হইয়াছেন ; কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের ন্যায়
পতিত-পাবন প্রেমিক-শিরোমণির পক্ষো কি এরূপ বিস্মৃতি সম্ভবপর হইতে পারে ? তাই
নায়িকা-শিরোমণি শ্রীরাধা পূর্ব্বোক্ত সকল সন্দেহ পরিত্যাগ করিয়া, অবশেষে ইহাই  
আশঙ্কা করিতেছেন যে, বোধ হয়, জগৎ-পালক শ্রীকৃষ্ণ জগতের রক্ষার জন্যই দৈত্যগণের
সহিত অবশ্য-কর্তব্য যুদ্ধে ব্যাপৃত হইয়াছেন এবং সে জন্যই ইচ্ছা সত্ত্বেও কুঞ্জে আসিতে
পারেন নাই।
এই পদটি গীতগোবিন্দের নিম্নলিখিত স্লোকের ছায়া অবলম্বনে রচিত বলিয়া বোধ হয়, ---

তৎ কিং কামপি কামিনীমভিসৃতঃ কিম্বা কলাকেলিভি-
র্বদ্ধো বন্ধুভিরন্ধকারিণি বনাভ্যর্ণে কিমুদ্ভ্রাম্যতি |
কান্তঃ ক্লান্তমনা মনাগপি পথি প্রস্থাতুমেবাক্ষমঃ
সঙ্কেতিকৃত-মঞ্জুবঞ্জুলতা-কুঞ্জেহপি যন্নাগতঃ || গীতগোবিন্দ, ৭ম সর্গ। (সতীশচন্দ্র রায়,
পদকল্পতরু)

কবি বিজয়চন্দ্র মজুমদারের অনুবাদ সহ জয়দেবের গীতগোবিন্দ পড়তে করতে এখানে
ক্লিক করুন . . .
https://www.milansagar.com/kobi/boishnabpodaboli/jaidev/kobi-jaidev.html       

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
হৃদয়ান্তরমধিশয়িতম্
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ৭ম পল্লব, সর্ব্বকালোচিত
খণ্ডিতা, পদসংখ্যা ৩৭২।


.        ॥ বিভাষ॥

হৃদয়ান্তরমধিশয়িতম্।
রময় জনং নিজ-দয়িতম্॥
কিং ফলমপরাধিকয়া।
সম্প্রতি তব রাধিকয়া॥
মাধব পরিহর পটিম-তরঙ্গম্।
বেত্তি ন কা তব রঙ্গম্॥ ধ্রু॥
আঘূর্ণতি তব নয়নম্।
যাগি ঘটিং ভজ শয়নম্॥
অনুলেপং রচয়ালম্।
নশ্যতু নখ-পদ-জালম্॥
ত্বামিহ বিহসতি বালা।
মুখর-সখানাং মালা॥
দেব সনাতন বন্দে।
ন কুরু বিলম্বমলিন্দে॥

অনুবাদ -
১-১৪। হৃদয়মধ্যে বিরাজিত নিজের প্রিয়তমার সন্তোষ-সাধন কর ; এখন অপরাধিনী
রাধিকার দ্বারা তোমার কি প্রয়োজন আছে ? হে মাধ! প্রবঞ্চনা-পরিপাট্য পরিত্যাগ কর ;
তোমার বিলাস-রহস্য কোন রমণীর অবিদিত আছে ? তোমার নয়ন ঘুর্ণিত হইতেছে ;
যাও, --- ঘটিকা-পরিমিত কাল নিদ্রা সেবন কর ; উত্তম-রূপে অনুলেপন রচনা কর, --- নখ-
ক্ষতগুলি অদৃশ্য হউক ; এখানে তোমাকে যুবতী ও মুখরা সখী-শ্রেণী উপহাস করিতেছে।
হে সনাতন দেব! তোমাকে প্রণাম করি, --- তুমি আর আমার গৃহের বারান্দায় বিলম্ব
করিও না। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

তাত্পর্য্য -
“হৃদয়-মধ্যে বিরাজিত” বাক্যের ধ্বনি এই যে, সেই নায়িকা তোমার হৃদয় সম্পূর্ণ অধিকার
করিয়া রহিয়াছে, --- সেখানে অন্যে প্রবেশ করে, এরূপ স্থান নাই ; অতএব তাহার সন্তোষ-
বিধানে তোমার সর্ব্বদা নিযুক্ত থাকা কর্ত্তব্য। “অপরাধিনী রাধিকা” শব্দের ধ্বনি এই যে,
প্রিয়তমের অপ্রীতিজনক অসুন্দরতা ইত্যাদি দোষবত্তা হেতু রাধা শ্রীকৃষ্ণের নিকট নিজকে
অপরাধিনী মনে করিতেছেন, --- নতুবা শ্রীকৃষ্ম অন্য নায়িকায় অনুরক্ত হইবেন কেন ?
“উত্তম-রূপে অনুলেপন রচনা কর”, --- ইত্যাদি বাক্যের ধ্বনি এই যে, শ্রীকৃষ্ণ
শ্রীরাধার প্রতি প্রণয়-ভাব পরিত্যাগ করিলেও শ্রীরাধা প্রিয়তমের নিন্দা সহ্য করিতে
পারিতেছেন না। কয়েকটি মাত্র বাক্য ও শব্দের ধ্বনি আংশিক ভাবে ব্যাখ্যাত হইল ; এই
অপূর্ব্ব পদটির প্রায় প্রত্যোক চরণেই বিচিত্র ধ্বনি রহিয়াছে এবং তদ্দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের
অপ্রেমিক ব্যবহার সত্ত্বেও তাঁহার প্রতি শ্রীরাধার অতুলনীয় অনুরাগ ও তাঁহার তাদৃশ
অবস্থা-দর্শনে সকরুণ মনোবেদনা ব্যঞ্জিত হইতেছে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সীদতি সখি মম হৃদয়মধীরম্
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ১৫শ পল্লব, কলহান্তরিতা,
পদসংখ্যা ৪৬৪।


.  ॥ কৌ রাগিণী, একতাল ধরা॥

সীদতি সখি মম হৃদয়মধীরম্।
যদভজমিহ নহি গোকুল-বীরম্॥
নাকর্ণয়মপি সুহৃদপদেশম্।
মাধব-চাটু-পটলমপি লেশম্॥
নালোকয়মরিপুতমরু-হারম্।
প্রণমন্তঞ্চ দয়িতমনুবারম্॥
হন্ত সনাতন-গুণমভিযান্তম্।
কিমধারয়মহমুরসি ন কান্তম্॥

অনুবাদ -
১-৮। সখি! আমি যে এই নিকুঞ্জে গোকুল-পালক শ্রীকৃষ্ণকে ভজন করি নাই, তজ্জন্য আমার
উত্কণ্ঠিত হৃদয় অবসন্ন হইতেছে। আমি সুহৃদগণেরও উপদেশ এবং শ্রীকৃষ্ণের চাটু-বচন-
সমূহের লেশমাত্র শ্রবণ করি নাই। আমি শ্রীকৃষ্ণের অর্পিত বিশাল হার এবং বারংবার
চরণপতিত শ্রীকৃষ্ণের প্রতিও দৃষ্টিপাত করি নাই। হায়! আমি কি জন্য সনাতন-গুণবিশিষ্ট
(পক্ষান্তরে সনাতন-কর্ত্তৃক কীর্ত্তিত-গুণযুক্ত) অভিসারে সমাগত প্রিয়তমকে বক্ষে ধারণ
করিলাম না!

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
যাং সেবিতবানসি জাগরী
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ৮ম পল্লব, ধীরা মধ্যা খণ্ডিতা,
পদসংখ্যা ৩৮৮।


.        ॥ ভৈরবী॥

যাং সেবিতবানসি জাগরী।
ত্বামজয়ত সা নিশি নাগরী॥
কপটমিদং তব বিন্দতি হরে।
নাবসরং পুনরালিনিকরে॥
মা কুরু শপথং গোকুল-পতে।
বেত্তি চিরং কা চরিতং ন তে॥ ধ্রু॥
মুক্ত-সনাতন-সৌহৃদ-ভরে।
ন পুনরহং ত্বয়ি রসমাহরে॥

অনুবাদ -
১-৮। জাগরণপরায়ণ হইয়া যাহাকে সেবন করিয়াছিলে, --- সেই সুচতুরা নায়িকা (প্রীতির
প্রতিদানস্বরূপ) তোমাকে রজনীতে (রতি-যুদ্ধে) পরাজিত করিয়াছে। হে কৃষ্ণ! তোমার এই
প্রবঞ্চনা-বাক্য আমার সখীগণের বিশ্বাস উত্পাদন করিতে পারিতেছে না। হো
গোকুল-পতি! তুমি শপথ করিও না ; (এই গোকুলে) কোন্ নায়িকা বহুকাল হইতে তোমার
চরিত্র অবগত নহে ? যে চিরন্তন সৌহৃদ্য পরিত্যাগ করিয়াছে, তাহার সহিত আমি
পুনরায় প্রীতি স্থাপন করিতে ইচ্ছা করি না। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তব চঞ্চল-মতিরয়মঘহন্তা
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ১৮শ পল্লব, মান-প্রকারান্তর,
পদসংখ্যা ৫৩৩।


.        ॥ ধানশী॥

তব চঞ্চল-মতিরয়মঘহন্তা।
অহমুত্তম-ধৃতি-দিগ্ধ-দিগন্তা॥
দূতি বিদূরয় কোমল-কথনম্।
পুনরভিধাস্যে নগি মধু-মথনম্॥ ধ্রু॥
শঠ-চরিতোহয়ং তব বনমালী।
মৃদু-হৃদায়হং নিজ-কুলপালী॥
তব হরিরেষ নিরঙ্কুশ-নর্ম্মা।
অহমনুবদ্ধ-সনাতন-ধর্ম্মা॥

অনুবাদ -
১-৮। তোমার (প্রভু) এই অম্বাসুর-বিনাশী (শ্রীকৃষ্ণ) চঞ্চল-স্বভাব ; আমার উত্তম
ধৈর্য্য-গুণের (খ্যাতি) দ্বারা দিগ্মণ্ডল পূর্ণ হইয়াছে। হে দূতি! তুমি চাটুকার মধুসূদনকে দূর
করিয়া দেও ; আমি আর তাহার সহিত বাক্য প্রয়োগ করিব না। তোমার এই বনমালী শঠ-
চরিত্র ; আমি কোমল হৃদয়া ও কুল-রীতিপরায়ণা। তোমার এই হরি উচ্ছৃঙ্খল-কেলি-নিরত
; আমি সনাত-ধর্ম্মাচরণ-পরায়ণা। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

তাত্পর্য্য -
চঞ্চলের সহিত ধৈর্য্য-শালিনীর, --- কঠোরের সহিত কোমল-হৃদয়ার, --- উচ্ছৃঙ্খলের সহিত
ধর্ম্ম-পরায়ণার মৈত্রী বিরুদ্ধ স্বভাব-হেতু রখনও অধিক কাল স্থায়ী হয় না এবং নিতান্ত
ক্লেশের কারণ হইয়া থাকে ; সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের সহিত আমি আর কোন সম্বন্ধ রাখিতে
ইচ্ছা করি না --- ইহাই উক্তির তাত্পর্য্য বটে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ন কুরু কদর্থনমত্র সরণ্যাং
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২য় পল্লব, স্বয়ং দৌত্য,
পদসংখ্যা ৬৩১।


.        অথ বর্ত্ম-রোধনম্।

.        ॥ বরাড়ী॥

ন কুরু কদর্থনমত্র সরণ্যাং।
মামবলোক্য সতীমশরণ্যাং॥
চঞ্চল মুঞ্চ পটাঞ্চলভাগং।
করবান্যধুনা ভাস্কর-যাগং॥ ধ্রু॥
ম রচয় গোকুল-বীর বিলম্বং।
বিদধে বিধুমুখ বিনতি-কদম্বং॥
রহসি বিভেমি বিলোল-দৃগন্তং।
বীক্ষ্য সনাতন দেব ভবন্তং॥

অনুবাদ -
১-২। অসহায়া পতিব্রতা আমাকে এখানে পথে দেখিয়া কুত্সা করিও না।
৩-৪। হে চঞ্চল! আমার পট্টবসনপ্রান্ত পরিত্যাগ কর ; আমি এখন সূর্য্য-পূজা করিব।
৫-৬। হে গোকুলবীর! আমার কালহানি করিও না ; হে চন্দ্রবদন! তোমাকে আমি শত শত
প্রণাম করিতেছি।
৭-৮। হে সনাতন দেব! তোমাকে নির্জ্জনে বিলোল-কটাক্ষ-যুক্ত দেখিয়া আমার ভয়
পাইতেছে! (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)


তাত্পর্য্য -
প্রথম দুই পংক্তির ভাবার্থ এই যে, যদিও একাকিনী কোনো যুবতিকে দূর পথে গমন
করিতে দেখিলে, তাহার চরিত্র সম্বন্ধে মনে আশঙ্কা জন্মিতে পারে, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে
সহায়হীনা সতী নারীও পথগমন করিয়া থাকেন ; সুতরাং কেবল একাকী পথ গমন করা
হইতেই অসচ্চরিত্রের অনুমান সমুচিত নহে। ৭-৮ পংক্তির ভাবার্থ এই যে, যিনি সনাতন
দেবতা অর্থাৎ নির্বিকারাত্মক ভহবান্, তিনি জগজ্জনের মঙ্গলার্থে কোন সময়ে স্বেচ্ছায়
বিকার-ভাব অবলম্বন করিলেও তাঁহার পক্ষে জন-শূন্য স্থলে নিষ্পেরোয়জনে বিলোল কটাক্ষ
প্রভৃতি অনুভাব দ্বারা বিকার-ভাব প্রকাশ করা অতি আশ্চর্য্যজনক বটে, --- সুতরাং না
জানি, অকস্মাৎ জগতের কি এক বিভ্রাট উপস্থিত হইল, ইহা মনে করিয়া দর্শকের মনে
ভয়ের স়্চার হওয়া স্বাভাবিক। ন কুরু কদর্থনং ইত্যাদি বাক্যগুলির সরল অর্থ ছাড়া
সুধীজনবোধ্য অপর গূঢ় ব্যঙ্গার্থ আছে ; সেই ব্যঙ্গার্থের ইঙ্গিতে শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণকে
স্বেচ্ছানুরূপ কার্য্য করিতেই প্রোত্সাহিত করিতেছেন। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর