অনুবাদ - ১-৩। হে রাধে! তুমি নিজের ব্যাধির কারণ বল ; দারুণ তুষানলের ন্যায় সন্তাপ-সমূহ তোমার দেহে কেন প্রকাশিত প্রকাশিত হইতেছে ? ৪-৭। পুঞ্জীভূত ইন্দ্রগোপ-কীটের কান্তি হইতে লোহিততর বক্ষঃস্থলে উত্তরীয়-বসন মৃদুল ও সুখ-স্পর্শ হইলেও কি জন্য উহা দূরে নিক্ষেপ করিতেছ ? ৮-১১। তাম্বুল কর্পূর-চূর্ণ দ্বারা সুবাসিত হইলেও কি জন্য গ্রহণ করিতেছ না ? আর এই সীমন্ত-ভূষণ সহ উত্কৃষ্ট চম্পক-পুষ্পমাল্যকে কি জন্য ছুড়িয়া ফেলিতেছ ? ১২-১৫। হে সথি! সমস্ত বিষয়ে অভিনিবেশহীন তোমার হৃদয় “কলিত-সনাতন-কৌতুক” হইলেও কি জন্য শূল-যুক্ত বোধ হইতেছে ? “কলিত-সনাতন-কৌতুক” শব্দটির ত্রিবিধ অর্থ আছে ; প্রথম অর্থ, --- শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গমে অভিলাষ-যুক্ত। দ্বিতীয় অর্থ ---চির-স্থায়ি-কৌতুহল-যুক্ত। তৃতীয় অর্থ --- সনাতন নামক কবির কৌতূহলের উত্পাদক। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
অনুবাদ - ১-২। গভীর-দুর্ণয়-বিশিষ্টা চঞ্চলা চন্দ্রাবলি সেই রতি-বীর স্রীকৃষ্ণকে আবদ্ধ করিয়াছে কি ? ৩-৪। অনেক ক্ষণ যাবৎ রজনী ঘোর-কৃষ্ণা হইয়াছে ; বনমালী আমার সঙ্গ লাভ করিলেন না । ৫-৬। কলঙ্ক-কালিম-গর্স্তা এই দুর্ভাগিনীকে কি তিনি বিস্মৃত হইলেন ? ৭-৮। সনাতন-মূর্ত্তি স্রীকৃষ্ণ কি দেবারি-গণের সহিত সুদীর্ঘ যুদ্ধ আরহ্ধ করিয়াছেন ? (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
তাত্পর্য্য - কবি এই ক্ষুদ্র পদটির রচনায় অপূর্ব্ব কবিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন ; উত্তমা নায়িকা শ্রীরাধার মনে প্রিয়তমের প্রতি প্রথমে স্ত্রী-জাতি-সুলভ সন্দেহ ও ঈর্ষা-ভাব উদিত হইলেও, তিনি তাঁহার প্রিয়তমের উপর কোন দোষারোপ না করিয়া, চন্দ্রাবলিকেই দোষী স্থির করিতেছেন এবং তাঁহার প্রিয়তমের অতুলনীয় প্রেমের কথা স্মরণ হওয়ায় তাঁহার সেই সন্দেহ ও ঈর্ষা তকনই অপনীত হইতেছে। তার পর মনে হইতেছে যে, অনেক ক্ষণ যাবৎ রজনী গাঢ়ান্ধকারা হইয়াছে --- সুতরাং বোধ হয়, অন্ধকারে পথ দেখিতে না পাইয়াই প্রয়তম আমার সহিত সম্মিলিত হইতে পারেন নাই ; পরক্ষণেই ভাবিতেছেন, চতুরশিরোমণির পক্ষে পথ-ভ্রান্তি কি সম্ভবপর ? বোধ হয়, ইহা আমারই কলঙ্কের অনিবার্য্য ফল যে, তিনিও আমাকে অধম বলিয়া বিস্মৃত হইয়াছেন ; কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় পতিত-পাবন প্রেমিক-শিরোমণির পক্ষো কি এরূপ বিস্মৃতি সম্ভবপর হইতে পারে ? তাই নায়িকা-শিরোমণি শ্রীরাধা পূর্ব্বোক্ত সকল সন্দেহ পরিত্যাগ করিয়া, অবশেষে ইহাই আশঙ্কা করিতেছেন যে, বোধ হয়, জগৎ-পালক শ্রীকৃষ্ণ জগতের রক্ষার জন্যই দৈত্যগণের সহিত অবশ্য-কর্তব্য যুদ্ধে ব্যাপৃত হইয়াছেন এবং সে জন্যই ইচ্ছা সত্ত্বেও কুঞ্জে আসিতে পারেন নাই। এই পদটি গীতগোবিন্দের নিম্নলিখিত স্লোকের ছায়া অবলম্বনে রচিত বলিয়া বোধ হয়, ---
অনুবাদ - ১-১৪। হৃদয়মধ্যে বিরাজিত নিজের প্রিয়তমার সন্তোষ-সাধন কর ; এখন অপরাধিনী রাধিকার দ্বারা তোমার কি প্রয়োজন আছে ? হে মাধ! প্রবঞ্চনা-পরিপাট্য পরিত্যাগ কর ; তোমার বিলাস-রহস্য কোন রমণীর অবিদিত আছে ? তোমার নয়ন ঘুর্ণিত হইতেছে ; যাও, --- ঘটিকা-পরিমিত কাল নিদ্রা সেবন কর ; উত্তম-রূপে অনুলেপন রচনা কর, --- নখ- ক্ষতগুলি অদৃশ্য হউক ; এখানে তোমাকে যুবতী ও মুখরা সখী-শ্রেণী উপহাস করিতেছে। হে সনাতন দেব! তোমাকে প্রণাম করি, --- তুমি আর আমার গৃহের বারান্দায় বিলম্ব করিও না। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
তাত্পর্য্য - “হৃদয়-মধ্যে বিরাজিত” বাক্যের ধ্বনি এই যে, সেই নায়িকা তোমার হৃদয় সম্পূর্ণ অধিকার করিয়া রহিয়াছে, --- সেখানে অন্যে প্রবেশ করে, এরূপ স্থান নাই ; অতএব তাহার সন্তোষ- বিধানে তোমার সর্ব্বদা নিযুক্ত থাকা কর্ত্তব্য। “অপরাধিনী রাধিকা” শব্দের ধ্বনি এই যে, প্রিয়তমের অপ্রীতিজনক অসুন্দরতা ইত্যাদি দোষবত্তা হেতু রাধা শ্রীকৃষ্ণের নিকট নিজকে অপরাধিনী মনে করিতেছেন, --- নতুবা শ্রীকৃষ্ম অন্য নায়িকায় অনুরক্ত হইবেন কেন ? “উত্তম-রূপে অনুলেপন রচনা কর”, --- ইত্যাদি বাক্যের ধ্বনি এই যে, শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার প্রতি প্রণয়-ভাব পরিত্যাগ করিলেও শ্রীরাধা প্রিয়তমের নিন্দা সহ্য করিতে পারিতেছেন না। কয়েকটি মাত্র বাক্য ও শব্দের ধ্বনি আংশিক ভাবে ব্যাখ্যাত হইল ; এই অপূর্ব্ব পদটির প্রায় প্রত্যোক চরণেই বিচিত্র ধ্বনি রহিয়াছে এবং তদ্দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের অপ্রেমিক ব্যবহার সত্ত্বেও তাঁহার প্রতি শ্রীরাধার অতুলনীয় অনুরাগ ও তাঁহার তাদৃশ অবস্থা-দর্শনে সকরুণ মনোবেদনা ব্যঞ্জিত হইতেছে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
অনুবাদ - ১-৮। সখি! আমি যে এই নিকুঞ্জে গোকুল-পালক শ্রীকৃষ্ণকে ভজন করি নাই, তজ্জন্য আমার উত্কণ্ঠিত হৃদয় অবসন্ন হইতেছে। আমি সুহৃদগণেরও উপদেশ এবং শ্রীকৃষ্ণের চাটু-বচন- সমূহের লেশমাত্র শ্রবণ করি নাই। আমি শ্রীকৃষ্ণের অর্পিত বিশাল হার এবং বারংবার চরণপতিত শ্রীকৃষ্ণের প্রতিও দৃষ্টিপাত করি নাই। হায়! আমি কি জন্য সনাতন-গুণবিশিষ্ট (পক্ষান্তরে সনাতন-কর্ত্তৃক কীর্ত্তিত-গুণযুক্ত) অভিসারে সমাগত প্রিয়তমকে বক্ষে ধারণ করিলাম না!
অনুবাদ - ১-৮। তোমার (প্রভু) এই অম্বাসুর-বিনাশী (শ্রীকৃষ্ণ) চঞ্চল-স্বভাব ; আমার উত্তম ধৈর্য্য-গুণের (খ্যাতি) দ্বারা দিগ্মণ্ডল পূর্ণ হইয়াছে। হে দূতি! তুমি চাটুকার মধুসূদনকে দূর করিয়া দেও ; আমি আর তাহার সহিত বাক্য প্রয়োগ করিব না। তোমার এই বনমালী শঠ- চরিত্র ; আমি কোমল হৃদয়া ও কুল-রীতিপরায়ণা। তোমার এই হরি উচ্ছৃঙ্খল-কেলি-নিরত ; আমি সনাত-ধর্ম্মাচরণ-পরায়ণা। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
তাত্পর্য্য - চঞ্চলের সহিত ধৈর্য্য-শালিনীর, --- কঠোরের সহিত কোমল-হৃদয়ার, --- উচ্ছৃঙ্খলের সহিত ধর্ম্ম-পরায়ণার মৈত্রী বিরুদ্ধ স্বভাব-হেতু রখনও অধিক কাল স্থায়ী হয় না এবং নিতান্ত ক্লেশের কারণ হইয়া থাকে ; সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের সহিত আমি আর কোন সম্বন্ধ রাখিতে ইচ্ছা করি না --- ইহাই উক্তির তাত্পর্য্য বটে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
অনুবাদ - ১-২। অসহায়া পতিব্রতা আমাকে এখানে পথে দেখিয়া কুত্সা করিও না। ৩-৪। হে চঞ্চল! আমার পট্টবসনপ্রান্ত পরিত্যাগ কর ; আমি এখন সূর্য্য-পূজা করিব। ৫-৬। হে গোকুলবীর! আমার কালহানি করিও না ; হে চন্দ্রবদন! তোমাকে আমি শত শত প্রণাম করিতেছি। ৭-৮। হে সনাতন দেব! তোমাকে নির্জ্জনে বিলোল-কটাক্ষ-যুক্ত দেখিয়া আমার ভয় পাইতেছে! (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)
তাত্পর্য্য - প্রথম দুই পংক্তির ভাবার্থ এই যে, যদিও একাকিনী কোনো যুবতিকে দূর পথে গমন করিতে দেখিলে, তাহার চরিত্র সম্বন্ধে মনে আশঙ্কা জন্মিতে পারে, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে সহায়হীনা সতী নারীও পথগমন করিয়া থাকেন ; সুতরাং কেবল একাকী পথ গমন করা হইতেই অসচ্চরিত্রের অনুমান সমুচিত নহে। ৭-৮ পংক্তির ভাবার্থ এই যে, যিনি সনাতন দেবতা অর্থাৎ নির্বিকারাত্মক ভহবান্, তিনি জগজ্জনের মঙ্গলার্থে কোন সময়ে স্বেচ্ছায় বিকার-ভাব অবলম্বন করিলেও তাঁহার পক্ষে জন-শূন্য স্থলে নিষ্পেরোয়জনে বিলোল কটাক্ষ প্রভৃতি অনুভাব দ্বারা বিকার-ভাব প্রকাশ করা অতি আশ্চর্য্যজনক বটে, --- সুতরাং না জানি, অকস্মাৎ জগতের কি এক বিভ্রাট উপস্থিত হইল, ইহা মনে করিয়া দর্শকের মনে ভয়ের স়্চার হওয়া স্বাভাবিক। ন কুরু কদর্থনং ইত্যাদি বাক্যগুলির সরল অর্থ ছাড়া সুধীজনবোধ্য অপর গূঢ় ব্যঙ্গার্থ আছে ; সেই ব্যঙ্গার্থের ইঙ্গিতে শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণকে স্বেচ্ছানুরূপ কার্য্য করিতেই প্রোত্সাহিত করিতেছেন। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)