কবি শ্রীরূপ গোস্বামীর বৈষ্ণব পদাবলী
*
কোমল-শশী-কর-রম্য-বনান্তর
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৪শ পল্লব, শরত্কালীয়
মাহারাস, পদসংখ্যা ১২৭৬।


.        ॥ ধানশী॥

কোমল-শশী-কর-রম্য-বনান্তর-
.                নির্ম্মিত-গীত-বিলাস।
তূর্ণ-সমাগত-বল্লব-যৌবত-
.                বীক্ষণ-কৃত-পরিহাস॥
জয় জয় ভানু-সুতা-তট-রঙ্গ-মহানট
.                সুন্দর নন্দ-কুমার।
শরদঙ্গীকৃত-দিব্য-রসাবৃত-
.                মঙ্গল-রাস-বিহার॥ ধ্রু॥
গোপী-চুম্বিত-রাগ-করম্বিত
.                মান-বিলোকন-লীন।
গুণ-বর্গোন্নত-রাধা সঙ্গত
.                সৌহৃদ-সম্পদধীন॥
তদ্বচনামৃত-পান-মদাহৃত-
.                বলয়ীকৃত-পরিবার।
সুর-তরুণীগণ-মতি-বিক্ষোভন
.                খেলন-বল্গিত-হার॥
অম্বু-বিগাহন-নন্দিত-নিজ-জন-
.                মণ্ডিত-যমুনা-তীর॥
সুখ-সম্বিদ্ঘন পূর্ণ-সনাতন
.                নির্ম্মল-নীল-শরীর॥

অনুবাদ -
১-২০। যমুনা-তট-রঙ্গভূমির নটরাজ হে সুন্দর নন্দকুমার! তোমার জয় হউক। তুমি
শরত্কালে অপ্রাকৃত-রস-পূর্ণ মঙ্গলজনক রাস-বিহার প্রকাশিত করিয়াছ। তুমি কোমলচন্দ্র-
কিরণ দ্বারা সুরম্য বন-স্থলীতে গীত-বিলাসের অনুষ্ঠান ও ত্বরার সহিত সমাগত গোপ-
যুবতিগণের ভাব-পরীক্ষার নিমিত্ত পরিহাস করিয়াছ। হো গোপীচুম্বিত রাগালাপকারী
শ্রীকৃষ্ণ! তুমি প্রিয়াগণের গর্ব্ব-ভাব দর্শনে অন্তর্হিত হইয়া গুণ-গণ-বরেণ্যা শ্রীরাধার সহিত
মিলিত এবং তাঁহার প্রেম-সম্পদের অধীন হইয়াছ। তুমি গোপীগণের তত্কালীন প্রেম-পূর্ণ
বচনামৃত-পানে বিমুগ্ধ হইয়া তাঁহাদিগের সমীপে উপস্থিত ও তাঁহাদিগের দ্বারা পরিবেষ্টিত
হইয়াছ এবং তুমি সুরঙ্গনা-গণের চিত্তোন্মোদক ক্রীড়া দ্বারা চঞ্চল-হার-বিশিষ্ট হইয়া বিরাজ
করিতেছ।তোমার জলকেলির দ্বারা আনন্দিত গোপাঙ্গনারূপ পরিজন দ্বারা যমুনার তীর-
ভূমি সুশোভিত হইয়াছে। হে নির্ম্মল-নীল-কলেবর শ্রীকৃষ্ণ! তুমি চিদানন্দ-মূর্ত্তি ও পূর্ণ-
সনাতন। (পক্ষে ---তুমি চিদানন্দ দ্বারা কবি সনাতনকে কৃতার্থ করিয়াছ।) (সতীশচন্দ্র রায়,
পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তরুণী-লোচন-তাপ-বিমোচন
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৪শ পল্লব, উত্তর-গোষ্ঠ,
পদসংখ্যা ১৩১৯। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব
পদাবলী”, ১৯৪৬, পৃষ্ঠা-১৮২।


.                        ॥ গৌরী॥

তরুণী-লোচন-                        তাপ-বিমোচন-
.                 হাস-সুধাঙ্কুর-ধারী।
মন্দ-মরুচ্চল-                        পিঞ্ছ-কৃতোজ্জ্বল-
.                 মৌলিকুদার-বিহারী॥
.            সুন্দরি পশ্য মিলতি বনমালী।
দিবসে পরণতি-                        মুপগচ্ছতি সতি
.              নব-নব-বিভ্রম-শালী॥ ধ্রু॥
ধেনু-খুরোদ্ধত                        রেণু পরিপ্লুত-
.                ফুল্ল-সরোরুহ-দামা।
অচির-বিকস্বর-                        লসদিন্দীবর-
.                মণ্ডল-সুন্দর-ধামা॥
কল-মুরলী-রুতি-                        কৃত-তাবক-রতি-
.                 রত্র দৃগন্ত-তরঙ্গী।
চারু-সনাতন-                        তনুরনুরঞ্জন-
.               কারি সুহৃদ্গণ-সঙ্গী॥

অনুবাদ -
১-১৫। হে সুন্দরি! দেখ, বনমালী আগমন করিতেছেন। তিনি তরুণীগণের লোচন-তাপ-
নাশন হাস্য-সুধাঙ্কুর-ধারী, মন্দ-পবন-চঞ্চল শিখি-পুচ্ছে উজ্জ্বল-চূড়া-বিশিষ্ট ও সুন্দর
ক্রীড়াশীল। দিবা অবসান হইলে তিনি নব নব বিলাস-বিভ্রম প্রকাশ করিয়া থাকেন।
তাঁহার ফুল্ল-পঙ্কজ-মাল্য ধেনু-খুরোদ্ধৃত ধূলি দ্বারা সমাবৃত হইয়াছে ; তিনি অচির-বিকসিত
নীলোত্পল পুঞ্জের ন্যায় কান্তি দ্বারা শোভা পাইতেছেন। তিনি মধুর মুরলী-রব দ্বারা
তোমার প্রীতি উত্পাদিত করিয়া, তোমার পানে পুনঃ পুনঃ বঙ্কিম দৃষ্টিপাত করিতেছেন ;
তিনি সুন্দর সনাতন-তনু (পক্ষান্তরে --- গোস্বামী সনাতনের আনন্দদায়ী)
ও চিত্তানুরঞ্জনকারী সুহৃদগণের দ্বারা বেষ্টিত হইয়া রহিয়াছেন। (সতীশচন্দ্র রায়,
পদকল্পতরু)।


কবি বিমানবিহারী মজুমদার, তাঁর সম্পাদিত “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী” (পদসংখ্যা ৬৭)
সংকলন গ্রন্থে, কবি শ্রীরূপ গোস্বামীর এই সংস্কৃত পদটির, পদাবলীর রুপেই অনুবাদ
করেছিলেন এইভাবে . . .  

দিবসের পরিণতি                        হেরহ এখন সতী!
.                        বনমালী আসিছেন ফিরে।
নূতন নূতন কত                          অঙ্গভঙ্গী নানামত
.                        কমলচরণ ফেলি ধীরে॥
মন্দ মন্দ গতি বায়                      ময়ূর পুচ্ছের তায়
.                        চূড়া দোলে মস্তক উপরে।
তরুণীলোচন তাপ                      দূর করে অভিশাপ
.                        হেন হাস্য আস্য-সুধাকরে॥
ধেনিখুর-সংঘর্ষণে                        উঠিছে ধূলি গগনে
.                        তাহে ব্যাপ্ত কমলের মালা।
শোভা নব ইন্দিবর                       কান্তিময় কলেবর
.                        মনোহর যেন রসশালা॥
মধুর মুরলীধ্বনি                           করিছেন গুণমণি
.                        তব রতি করিতে প্রবল।
শোভাময় সনাতন                          সঙ্গে সব সখাগণ
.                        করিছেন রস কৌতূহল॥


এই পদটিই দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব-পদলহরী”, ১৯০৫
সংকলিত হয়েছে প্রথম চারটি পংক্তি বাদ দিয়ে যে ভাবে, তা আমরা নীচে তুলে দিলাম।  
ঐ সংকল গ্রন্থে পদকর্তার নাম শ্রীরূপ গোস্বামীর বদলে রয়েছে সনাতন দাস।


.                        ॥ কেদার রাগ॥

.                সুন্দরি পশ্য মিলতি বনমালী।
দিবসে পরিণতি,                        মূপগচ্ছতি সতি,
.                    নব-নব-বিভ্রম-শালী॥
ধেনু-খুরোদ্ধত-,                                রেণু-পরিপ্লুত-
.                      ফুল্লসরোরুহদামা।
অচিরবিকস্বর,                                লসদিন্দীবর,
.                       মণ্ডল সুন্দর ধামা॥
কলমুরলীরুতি-,                                কৃততাবকরতি-
.                     রত্র দৃগন্ততরঙ্গী।
চারু সনাতন,                                তনুরনুরঞ্জন-
.                    কারী সুহৃদগণসঙ্গী॥

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অভিনব-কুট্মল-গুচ্ছ-সমুজ্জল
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৭শ পল্লব, বসন্ত-লীলা,
পদসংখ্যা ১৪২৬। আনুমানিক ১৭২৫ সালে রাধামোহন ঠাকুর সংকলিত ও বিরচিত এবং
১৮৭৮ সালে, রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত
সমুদ্র” বসন্ত বিহার, পদসংখ্যা-১৭ ।


.                ॥ বসন্তরাগ, চঞ্চুপুট তাল॥

অভিনব-কুট্মল-                        গুচ্ছ-সমুজ্জল-
.                কুঞ্চিত কুন্তল-ভার।
প্রণয়ি-জনেরিত-                                বন্দন-সহকৃত-
.                চূর্ণিত-বর-ঘন-সার॥
.                জয় জয় সুন্দর নন্দ-কুমার।
সৌরভ-সঙ্কট-                                বৃন্দাবন-তট-
.                        বিহিত-বসন্ত-বিহার॥ ধ্রু॥
অধর-বিরাজিত-                        মন্দতর-স্মিত-
.                রোচিত-নিজ-পরিবার।
চটুল-দৃগঞ্চল-                                রচিত-রসোচ্চল-
.                    রাধা-মদন-বিকার॥
ভুবন-বিমোহন-                                মঞ্জুল-নর্ত্তন-
.                গতি-বল্গিত-মণি-হার।
নিজ-বল্লব-জন                                সুহৃৎ সনাতন
.                চিত্ত-বিহরদবতার॥

অনুবাদ -
১-১৫। হে কুঞ্চিত কেশ শ্রীকৃষ্ণ। বিকাশোন্মুখ কোরকাবলি তোমার অঙ্গ-সংলগ্ন হইয়া
অধিকতর সমুজ্জ্বল এবং প্রিয়জনের নিক্ষিপ্ত কর্পূর-চূর্ণ-মিশ্রিত ফল্গু-চূর্ণে তোমার দেহ
সুশোভিত হইয়াছে। হে সুন্দর নন্দকুমার! তোমার বলিহারি! সৈরভ পরিব্যাপ্ত বৃন্দাবন-
পুলিনে তুমি কি অপূর্ব্ব বসন্ত বিহারই করিতেছ! তোমার অধরে মৃদু-মধুর হাস্য প্রস্ফুরিত
হইয়া নিজ পরিজনগণকে আনন্দিত এবং তোমার চঞ্চল কটাক্ষ-রাজি রস-বিহ্বলা শ্রীরাধার
প্রেম-বিকার উত্পাদন করিতেছে। তোমার ভুবন-মোহন মধুর নর্ত্তনের গতি দ্বারা হৃদয়-
স্থিত মণি-হার নর্ত্তিত হইতেছে ; হো অনুগত-গোপ-জন-বান্ধব সনাতন শ্রীকৃষ্ণ! তুমি
আমাদিগের, পক্ষান্তরে --- সনাতন গোস্বামীর অন্তরে তোমার অবতার-লীলা বিস্তার
করিতেছ! (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কেলি-রস-মাধুরী-ততিভিরতিমেদুরী
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৭শ পল্লব, বসন্ত-লীলা,
পদসংখ্যা ১৪২৭।


.                        ॥ বসন্তরাগ॥

কেলি-রস-মাধুরী-                        ততিভিরতিমেদুরী-
.                কৃত-নিখিল-বন্ধু-পশুপালং।
হৃদি বিদ্ধৃত-চন্দনং                        স্ফুরদরুণ-বন্দনং
.                দেহ-রুচি-নির্জ্জিত-তমালং॥
.                সুন্দরি মাধবমবকলয়ালং।
মিত্র-কর-লোলয়া                        রত্নময়-দোলয়া
.                চলিত-বপুরতিচপল-মালং॥ ধ্রু॥
ব্রজ-হরিণ-লোচনা-                        রচিত-গেরোচনা-
.                তিলক-রুচি-রুচিরতর-ভালং।
স্মিত-জনিত-লোভয়া                        বদন-শশি-শোভয়া
.                বিভ্রমিত-নব-যুবতি-জালং॥
নর্ম্মনয়-পণ্ডিতং                                পুষ্পচয়-মণ্ডিতং
.                রমণমিহ বক্ষসি বিশালং।
প্রণত-ভয়-শাতনং                        প্রিয়মধি সনাতং
.                গোষ্ঠ-জন-মানস-মরালং॥


অনুবাদ -
১-১৫। হে সুন্দরি শ্রীরাধে! তুমি শ্রীকৃষ্ণকে উত্তম-রূপে নিরীক্ষণ কর। তিনি কেলি-রস-
মাধুর্য্য বিস্তার করিয়া নিজের সুহৃৎ সমস্ত গোপালগণের চিত্ত প্রেমার্দ্র করিয়াছেন ; তাঁহার
বক্ষে শ্বেত চন্দন-চিত্র-রাজির সহিত অরুণ-বর্ণ ফল্গুচূর্ণ শোভা পাইতেছে এবং তাঁহার দেহ-
কান্তির নিকট তমাল-তরু পরাজিত হইয়াছে। মিত্রগণের কর-চালিত রত্নময় দোলায়
অধিষ্ঠিত হওয়ায় তাঁহার দেহ স়্চালিত ও কণ্ঠের মাল্য দোদুল্যমান হইয়াছে। ব্রজ-
হরিণাক্ষীদিগের রচিত গোরোচনা-তিলকের কান্তি দ্বারা তাঁহার ললাট অধিকতর সুন্দর
হইয়াছে এবং তিনি লোভ-জনক ঈষৎ-হাস্য-যুক্ত মুখ-চন্দের শোভায় নব-যুবতীগণের চিত্ত-
বিভ্রম উত্পাদন করিতেছেন। তিনি কেলি-কৌশলে সুনিপূণ, পুষ্পরাজি-বিভূষ্ত ও বিশাল-
বক্ষাঃ ; তিনি প্রণতজনের ভয়নাশন, গোপগণের সমধিক প্রিয়, সনাতন-মূর্ত্তি (পক্ষান্তরে ---
পদকর্ত্তা সনাতনের অশ্রয়ভূত)। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিহরতি সহ রাধিকা রঙ্গী
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৭শ পল্লব, হোরি-লীলা,
পদসংখ্যা ১৪৪৫। রাধামোহন ঠাকুর সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৮৭৮ সালে,
রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত সমুদ্র” সংকলন,
বসন্ত বিহার, পদসংখ্যা-২০ ।



॥ বসন্তরাগ, সমতাল॥

বিহরতি সহ রাধিকা রঙ্গী।
মধু-মধুরে বৃন্দাবন-রোধসি
হরিরিহ হর্ষ-তরঙ্গী॥ ধ্রু॥
বিকিরতি যন্ত্রেরিতমঘবৈরিণি
রাধা কুঙ্কুম-পঙ্কম্।
দয়িতাময়মপি সিঞ্চতি মৃগ-মদ-
রস-রাশিতিরবিশঙ্কম্॥
ক্ষিপতি মিথো যুবমিথুনমিদং নব-
মরুণতরং পটবাসম্।
জিতিমিতি জিতিমিতি মুহুরতি জল্পতি
কল্পয়দতনু-বিলাসম্॥
সুবলো রণয়তি ঘন-করতালীং
জিতবানিতি বনমালী।
ললিতা বদতি সনাতন-বল্লভ
মজয়ত পশ্য মমালী॥


অনুবাদ -
১-১৫। বিলাসী ও হর্ষোত্ফুল্ল শ্রীকৃষ্ণ এই বসন্তাগম-সুন্দর বৃন্দাবন-পুলিনে স্রীরাধার সহিত
ক্রীড়া করিতেছেন। শ্রীরাধা অব-রিপু শ্রীকৃষ্ণের উপরে যন্ত্র দ্বারা কুঙ্কুম-বারিবর্ষণ
করিতেছেন ; শ্রীকৃষ্ণও মৃগ-মদ-বারি দ্বারা প্রেয়সীকে সেচন করিতেছেন। তরুণ-যুগল নব ও
অতিশয় অরুণ সুগন্ধ-চূর্ণ নিক্ষেপ করিতেছেন ও ইতনু-বিলাস প্রকাশ করিয়া জিতিয়াছি,
জিতিয়াছি বলিয়া বারংবার ঘোষণা করিতেছেন। বনমালী জিতিয়াছেন বলিয়া সুবল ঘন
ঘন করতাসি বাদন করিতেছেন ; ললিতা বলিতেছেন, --- দেখ দেখ, আমার সখী প্রিয়তম
(পক্ষান্তরে --- গোস্বামী সনাতনের বল্লভ) শ্রীকৃষ্ণকে পরাজিত করিয়াছেন। (সতীশচন্দ্র রায়,
পদকল্পতরু)

তাত্পর্য্য -
শ্রীরাধার বর্ণ-সাম্য হেতু পীত-বর্ণ কুঙ্কুম-বারি শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় ও তাঁহার শ্যামাঙ্গে মরকতে
স্বর্ণ-সংযোগের ন্যায় ইহা নিতান্ত শোভাবিধায়ক বলিয়া শ্রীকৃষ্ণের দেহে কুঙ্কুম-বারি বরিষণ
দ্বারা শ্রীরাধার অপূর্ব্ব প্রিয়ানুকূলতা ও বৈদগ্ধ্য ব্যঞ্জিত হইতেছে। তদ্রূপ শ্রীকৃষ্ণের বর্ণ-
সাম্য হেতু কস্তুরী-বারি শ্রীরাধার প্রিয় এবং উহা তাঁহার অঙ্গে শশাঙ্কের কলঙ্ক-চিহ্নের ন্যায়
শোভাবর্দ্ধক বলিয়া শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার অঙ্গে কস্তুরি-বারি সেচন করায় তাংহার প্রিয়া-নিষ্ঠতা
ও বৈদগ্ধ্য ব্যঞ্জিত হইতেছে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিপততি পরিতো বন্দন-পালী
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৭শ পল্লব, হোরি-লীলা,
পদসংখ্যা ১৪৫০।


.        ॥ বসন্তরাগ॥

নিপততি পরিতো বন্দন-পালী।
তং দোলয়তি মুদা সুহৃদালী॥
বিলসতি দোলোপরি বনমালী।
তরল-সরোরুহ-শিরসি বথালী॥ ধ্রু॥
জনয়তি গোপী-জন-করতালী।
কাপি পুরো নৃত্যতি পশুপালী॥
অয়মারণ্যক-মণ্ডন শালী।
জয়তি সনাতন-রস-পরিপালী॥

অনুবাদ -
১-৮। চতুর্দ্দিকে ফল্গুচূর্ণ-রাজি বর্ষিত হইতেছে ; সুহৃদবর্গ শ্রীকৃষ্ণকে আন্দোলিত করিতেছেন
। বনমালী (পদ্মাকৃতি) দোলার উপরে বিরজিত রহিয়াছেন, --- যেন চঞ্চল পদ্মের উপরে
ভ্রমর শোভা পাইতেছে। গোপীজনের কর-তালী তাঁহার কৌতুক উত্পাদন করিতেছে।
কোন গোপী প্রিয়তমের সম্মুখে নৃত্য করিতেছেন। বন্য ভূষণে বিভূষিত ও অনন্ত-আনন্দের
(পক্ষান্তরে --- পদকর্ত্তা সনাতনের আনন্দের) পরিপোষক এই শ্রীকৃষ্ণের বলিহারি!
(সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মধুরিপুরদ্য বসন্তে
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের,
সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৭শ পল্লব, প্রকারান্তর
হোরি-লীলা, পদসংখ্যা ১৪৬৫।


.                        ॥ বসন্তরাগ॥

.                মধুরিপুরদ্য বসন্তে।
খেলতি গোকুল-                        যুবতিভিরুজ্জ্বল-
.                পুষ্প-সুগন্ধি-দিগন্তে॥ ধ্রু॥
প্রেম-করম্বিত-                        রাধা-চুম্বিত-
.                মুখ-বিধুরুত্সবশালী।
ধৃত-চন্দ্রাবলি-                        চারু-করাঙ্গুলি-
.                রিহ নব-চম্পক-মালী॥
নব-শশি-রেখা-                        লিখিত-বিশাখা-
.                পদ্মা-বিভ্রম-রঙ্গী॥
ভদ্রা-লম্বিত-                        শৈব্যোদীরিত-
.                রক্ত-রজোভরধারী।
পশ্য সনাতন-                        মূর্ত্তিরয়ং ঘন-
.                বৃন্দাবন-রুচিকারী॥


অনুবাদ -
১-১৫। পুষ্প-সুরতি নির্ম্মল আকাশবিশিষ্ট বসন্তে আজ মধুরিপু শ্রীকৃষ্ণ গোকুল-যুবতিগণের
সহিত ক্রীড়া করতেছেন॥ ধ্রু॥ অনুরাগযুক্তা শ্রীরাধা ইঁহার চন্দ্র-বদন চুম্বিত করায়, ইনি
আনন্দোত্সব-যুক্ত হইয়াছেন ; ইনি চন্দ্রাবলীর সুন্দর-করাঙ্গুলি ও নবচম্পকের মাল্য ধারণ
করিয়াছেন। ইনি (নখাঙ্ক-রূপ) নব-চন্দ্র-কলা দ্বারা বিশাখার কলেবর অঙ্কিত করিয়াছেন এ
ললিতার সঙ্গে বিরাজিত রহিয়াছেন ; ইনি শ্যামলা কর্ত্তৃক ধৃত-বাহু ও পদ্মার বিলাসোদ্রেক
দর্শনে কৌতুকযুক্ত। দেখ! ইনি ভদ্রা সখী সহকারে শৈব্যা কর্ত্তৃক উৎক্ষিপ্ত লৌহ লোহিত-
ফল্গু-চূর্ণ-ধারী বৃন্দাবনানুরাগী নিত্য (পক্ষে সনাতন গোস্বামীর শরণ) দেহ-বিশিষ্ট।
(সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঋতু রাজার্পিত তোষ তরঙ্গ
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
আনুমানিক ১৭২৫ সালে রাধামোহন ঠাকুর সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৮৭৮ সালে,
রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত সমুদ্র” সংকলন,
বসন্ত বিহার, পদসংখ্যা-১৯। আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং উনিশ
শতকে, সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক
সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, ৩য় শাখা, ২৭শ পল্লব, প্রকারান্তর হোরি-
লীলা, পদসংখ্যা ১৪৬৬।


॥ বসন্তরাগ, চঞ্চুলুটতালৌ॥

ঋতু রাজার্পিত তোষ তরঙ্গং।
রাধে ভজ বৃন্দাবন রঙ্গং॥ ধ্রু॥
মসয়ানিল গুরু শিক্ষিত লাস্যা।
নটতি লতাবলিরুজ্জ্বল হাস্যা॥
পিকততিরিহ বাদয়তি মৃদঙ্গং।
পশ্যতি তরুকূল মঙ্কুরদঙ্গং॥
গায়তি ভৃঙ্গ ঘটাদ্ভূত শীলা।
মম বংশীব সনাতন লীলা॥

অনুবাদ -
১-৮। হে শ্রীরাধে! বসন্ত নৃপতি কর্ত্তৃক জনিতানন্দ বৃন্দাবনের বিলাস অবলোকন কর।
মলয়ানিল গুরু কর্ত্তৃক শিক্ষিত-নৃত্যলীলা (পুষ্পচ্ছলে) উজ্জ্বল-হাস্য-কারিণী লতাবলি নৃত্য
করিতেছে। কোকিল-কুল (কল-নাদচ্ছলে) মৃদঙ্গ বাজাইতেছে এবং (অঙ্কুর-চ্ছলে) রোমাঞ্চিত-
দেহ তরুকুল (নৃত্য) দর্শন করিতেছে। অদ্ভূত-চরিত্র ভ্রমর-পংক্তি সনাতন (পক্ষে --- সনাতন
বর্ণিত) - লীলা-বিশিষ্ট আমার বংশীর মত গান করিতেছে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ক্ক নন্দকুল-চন্দ্রমাঃ ক্ক শিখি-চন্দ্রকালঙ্কৃতিঃ
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং উনিশ শতকে, সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা
পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ (১৯২৩),
তৃতীয় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, ৫ম পল্লব, অর্দ্ধ-বাহ্য দশার প্রলাপ, পদসংখ্যা ১৬৫০।


ততোহর্দ্ধবাহ্যদশায়াং প্রলাগো যথা।

ক্ক নন্দকুল-চন্দ্রমাঃ ক্ক শিখি-চন্দ্রকালঙ্কৃতিঃ
ক্ক মন্দ্র-মুরলী-রবঃ ক্ক নু সুরেন্দ্র-নীল-দ্যুতিঃ।
ক্ক রাস-রস-তাণ্ডবী ক্ক সখি জীব-রক্ষৌষধিঃ
নিধির্মম সুহৃত্তমঃ ক্ক তব হন্ত হা ধিগ্বিধিং॥

অনুবাদ -
১-৪। নন্দ-কুল-চন্দ্রমা কোথায় ? শিখি-পুচ্ছ-মৌলি কোথায় ? গম্ভীর-মুরলী-নাম-কারী
কোথা ? হে সখি! আমার জীবন-রক্ষার মহৌষধ কোথায় ? আমার অমূল্য-রত্ন, তোমার
সখা-শ্রেষ্ঠ কোথায় ? হায়! বিধাতাকে ধিক্!

শ্রীরূপ গোস্বামীর ললিতমাধব নাটকের তৃতীয় অঙ্ক হইতে উদ্ধৃত এই শ্লোকটি। রাধামোহন
ঠাকুর (পদামৃত সমুদ্র) বলেন যে, “ক্ক নন্দ-কুল-চন্দ্রমাঃ” ইত্যাদি শ্লোকে ক্রিয়া-পদের অভাব
ও ব্যর্থ চেষ্টা দ্বারা ইহা দিব্যোন্মাদ-দশার প্রলাপ বলিয়াই বুঝিতে হইবে ; কিন্তু পূর্ব্বাপর
ব্যবহার আছে বলিয়া অর্দ্ধ-বাহ্য প্রলাপ-দশারও এই শ্লোক ও ইহার অব্যবহিত পরবর্ত্তী
শ্লোকগুলি গান করা যাইতে পারে। (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাজপুরাদ্গোকুলমুপযাতম্
কবি শ্রীরূপ গোস্বামী
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং উনিশ শতকে, সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা
পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ (১৯২৩),
তৃতীয় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, ৮ম পল্লব, স্বপ্নে কৃষ্ণ-দর্শন, পদসংখ্যা ১৭৬৩।


.        ॥ ধানশী॥

রাজপুরাদ্গোকুলমুপযাতম্।
প্রমোদোন্মাদিত-জননী-তাতম্॥
স্বপ্নে সখি পুনরদ্য মুকুন্দম্।
আলোকয়মবতংসিত-কুন্দম্॥ ধ্রু॥
পরম-মহোত্সব-ঘূর্ণিত-ঘোষম্।
নয়নেঙ্গিত-কৃত-মত্পরিতোষম্॥
নব-গুঞ্জাবলি-কৃত-পরভাগম্।
প্রবল-সনাতন সুহৃদনুরাগম্॥

অনুবাদ -
১-৮। হে সখি! আমি অদ্য স্বপ্নে পুনর্ব্বার কুন্দ-পুষ্পের কর্ণভূষণশালী শ্রীকৃষ্ণকে দেখিয়াছি।
তিনি (যেন) রাজধানী মথুরা হইতে গোকুলে সমাগত হইয়াছেন এবং হর্ষাতিরেক দ্বারা
পিতা ও মাতাকে আধীর করিয়া তুলিয়াছেন! তিনি গোপগণকে পরম মহোত্সব
দ্বারা নর্ত্তিত করিয়া নয়নেঙ্গিত দ্বারা আমার পরিতোষ বিধান করিতেছেন! নব-গুঞ্জাবলি
দ্বারা তাঁহার সৌন্দর্য্যের উত্কর্ষ সাধিত হইয়াছে ; সুহৃদগণের প্রতি তাঁহার অনুরাগ প্রবল
ও চিরস্থায়ী! (সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু)

.                       *************************       
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর