কবি শ্রীরূপ গোস্বামী - প্রসিদ্ধ ষট্ গোস্বামীর অন্যতম। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও রস-গ্রন্থের রচয়িতা বলে খ্যাত। তাঁর জন্মস্থানের কোনো উল্লেখ নেই। পিতা কুমারদেব শুদ্ধাচারী ও সম্পন্ন ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁর বাড়ী ছিল কাটোয়ার নিকটে অবস্থিত নবহট্টে অথবা নৈহাটিতে। এছাড়া তিনি বরিশালের বাকলা-চন্দ্রদ্বীপে ও যশোহরের ফতেয়াবাদে বাড়ী তৈরী করে বাস করেছেন। রূপ গোস্বামীরা তিন ভাই। দাদা সনাতন ও ভাই বল্লভ। বল্লভের এক পুত্র জীব। সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে, পূর্বাশ্রমে, রূপ ও সনাতন গোস্বামীর স্ত্রী, পরিবার ও সন্তানাদির কোন উল্লখে আমরা পাই না।
তাঁরা বিদ্যাবাচষ্পতি মহাশয়ের কাছে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে অল্প বয়সেই মহাপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের বিচার বুদ্ধি ও বৈষয়িক কাজে-কর্মে পারদর্শিতার পরিচয় পেয়ে তদানীন্তন গৌড়ের শাসক আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (রাজত্বকাল ১৪৯৪ - ১৫১৯) রুপ গোস্বামীকে তাঁর একান্ত বা আপ্ত বা খাস্ সহায়ক বা “দবীর-ই- খাস” পদে এবং তাঁর দাদা সনাতন গোস্বামীকে অন্তরঙ্গ বা কাছের মন্ত্রী বা “সঘীর মালিক” বা “সাকর মল্লিক” পদে নিযুক্ত করেন।
রূপ ও সনাতন গোস্বামী, তাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্র জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট এবং রঘুনাথ দাস, বৃন্দাবনের এই ছয়জন গোস্বামীই ষট্-গোস্বামী নামে পরিচিত। এঁরাই গৌড়ীয় বৈষ্ণবরসতত্ত্ব ও মঞ্জরী-ভাবের উপাসনা-রীতির প্রবর্তক।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাবপাতার উপরে . . . সেই সময়ে শ্রীচৈতন্য দেবের ভক্তি আন্দোলনে বাংলায় একপ্রকার নব জাগরণের পরিবেশ চলছে। তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে, নবাব আলাউদ্দীন হোসেন শাহ তাঁর সৈন্যদের আদেশ দিয়েছিলেন যাতে চৈতন্য দেবের গায়ে আঁচরটিও না লাগে। বৃন্দাবন যাবার পথে রামকেলিতে গিয়ে কবি ও তাঁর ভাইয়েরা শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে দেখা করেন এবং তখনই বিষয়-আশয় ছেড়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করার মনস্থির করেন।
সনাতন, রাজকার্য ছেড়ে দিলে হোসেন শাহ তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মত পরিবর্তন না করাতে পেরে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। রূপ ও বল্লভ, বিষয়-সম্পত্তির ভার বল্লভের পুত্র জীবের উপরে ন্যস্ত করে মথুরার উদ্দেশে রওনা দেন, শ্রীচৈতন্য দেবের শরণাপন্ন হবার জন্য। যাবার সময়ে দাদা সনাতনকে একটি চিঠিতে লিখে পাঠালেন . . .
আমি দুই ভাই চলিলাঙ তাঁহারে মিলিতে। তুমি যৈছে তৈছে ছুটি আইস তাঁহা হৈতে॥ দশ সহস্র মুদ্রা তথা আছে মুদি স্থানে। তাহা দিয়া কর শীঘ্র আত্ম-বিমোচনে॥ ( চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১৯শ )
সনাতন গোস্বামী, কারাগারে রূপ গোস্বামীর এই চিঠি পেয়ে রক্ষীকে সাত হাজার মুদ্রা উৎকোচ দিয়ে, সেখান থেকে পালিয়ে বারাণসীতে গিয়ে চৈতন্যদেবের সাক্ষাত পেয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁরা সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং রূপ, সনাতন এবং তাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্র জীব গোস্বামী, ক্রমে বৈষ্ণব ধর্মের ছয়-গোস্বামীর অন্যতম হয়ে ওঠেন।
রূপ গোস্বামীর ভণীতা “সনাতন”পাতার উপরে . . . রূপ গোস্বামী বাংলা ভাষায় কোনো পদ রচনা করেছিলেন কি না তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই। সতীশচন্দ্র রায় তাঁর দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণবদাস সঙ্কলিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”, ৫ খণ্ডে, সটীক সংস্করণে (১৯৩১) জানিয়েছেন যে - রূপ গোস্বামী, নিজের নামের ভণিতা না দিয়ে, তাঁর পূজনীয় অগ্রজ সনাতন গোস্বামীর নামের ভণিতায়ুক্ত পদ রচনা করে গিয়েছেন। এই বিভ্রান্তির জন্য গোপীকান্ত দাস প্রভৃতি পদকর্তারা ভুলবশত রূপ গোস্বামীর পদগুলো সনাতন গোস্বামীর পদ বলে উল্লেখ করে পদ রচনা করে গিয়েছেন। যেমন . . .
“অর্থাৎ রসামৃত-কার গুরুদেব শ্রীরূপের কৃত স্তবমালা তাঁহার অনুজীবী জীবের দ্বারা সংগৃহীত হইল। এই স্তব-মালার অন্তর্গত গীতাবলী থেকেই পদকল্পতরুর (তার পূর্বে পদামৃত সমুদ্রেও) আলোচ্য পদ বা গীতগুলি উদ্ধৃত হইয়াছে।” (পদকল্পতরু, ৫ম খণ্ড, ১৯৩১, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ২০৪)।
১২৯২ বঙ্গাব্দে (১৮৮৬ সাল) রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা ব্যাখ্যায়িত শ্রীজীব গোস্বামীর “স্তবমালা” গ্রন্থে এই শ্লোকের তিনি এই ব্যাখ্যা করেছিলেন - “আমার পিতৃব্য শ্রীরূপগোস্বামী, যিনি ভক্তিরসামৃতসিন্ধু নামক গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, তিনি শ্রীচৈতন্যদেব প্রভৃতি শ্রীবিগ্রহের কতিপয় স্তব প্রস্তুত করিয়াছিলেন, ভক্তগণের কণ্ঠভূষণ হইবে বলিয়া নানা স্থান স্থিত ঐ সমুদয় স্তবগুলি যথাক্রমে সংগ্রহ পূর্ব্বক তদীয় শিষ্য জীব নামক আমি উহা মালাকারে প্রস্তুত করিলাম॥”
এ থেকে বোঝা যায় যে "সনাতন" গোস্বামীর ভণিতায় রচিত পদগুলি আসলে রূপ গোস্বামীরই রচিত। তাঁর পদাবলী সংস্কৃত ভাষায় রচিত। আমরা চেষ্টা করেছি, এই পদগুলির প্রখ্যাত টিকাকারদের দ্বারা করা অনুবাদ সঙ্গে তুলে ধরতে। কিছু পদে যা সম্ভব হয়নি। তাঁর জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।
রূপ গোস্বামী রচিত গ্রন্থাবলীপাতার উপরে . . . রূপ গোস্বামী রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে “ভক্তিরসামৃতসিন্ধু”, “লঘু-ভাগবাতামৃত”, “হংসদূত”, “উদ্ধব- সন্দেশ”, “কৃষ্ণজন্ম-তিথিবিধি”, “স্তবমালা”, “লঘু-গণোদ্দেশদীপিকা”, “বৃহদ্গণোদ্দেশদীপিকা”, “বিদগ্ধমাধব”, “ললিতমাধব”, “দানকেলিকৌমুদী”, “উজ্জ্বলনীলমণি”, “চন্দোহষ্টাদশ”, “উত্কলিকাবল্লী”, “শ্রীরূপচিন্তামণি”, “হরিভক্তিরসামৃতসিন্ধুবিন্দু”, “আখ্যাতচন্দ্রিকা”, “মথুরামাহাত্য”, “পদ্যাবলী”, “নাটকচন্দ্রিকা”, “রাগময়ী কণা”, “তুলস্যষ্টক”, “বৃন্দাদেবাষ্টক”, “শ্রীনন্দনন্দনাষ্টক”, “মুকুন্দমুক্তাবলী স্তব”, “বৃন্দাবনধ্যান”, “চাটুপুষ্পাঞ্জলি”, “গোবিন্দবিরুদাবলী”, “প্রেমেন্দুসাগর”, “প্রেমেন্দুকারিকা” প্রভৃতি। (গৌরপদ-তরঙ্গিণী, পরিকর ও ভক্তদিগের পরিচয়, পৃষ্ঠা ৬৯)
আমরা প্রতিটি পদে, সেই পদেটির উত্স-গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছি। একাধিক ক্ষেত্রে একাধিক রূপে পাওয়া একই পদ একত্রে তুলে দিয়েছি তুলনার জন্য। সংস্কৃত ভাষার পদগুলির বাংলায় অনুবাদ বা ব্যাখ্যা হাতে পেলেই তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আমরা মিলনসাগরে কবি শ্রীরূপ গোস্বামীর বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।