কবি রায় বসন্তর বৈষ্ণব পদাবলী
*
সুরপতি ধনুকি শিখণ্ডুক চূড়ে
কবি রায় বসন্ত / কবি গোবিন্দ দাস
নরহরি (ঘনশ্যাম) চক্রবর্তী প্রণীত ও সংকলিত, ১৯৪৯ সালে (৪৬২গৌরাব্দ), হরিদাস দাস
দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত শ্রীশ্রীগীতচন্দ্রোদয় (পূর্বরাগ) পদ সংকলন গ্রন্থ, অথ শ্রীকৃষ্ণস্য,
পদসংখ্যা-১, পৃষ্ঠা-৫।

.        অখ শ্রীকৃষ্ণস্য

.        ॥ শ্রীরাগ॥

সুরপতি ধনুকি শিখণ্ডক চূড়ে।
মালতি-ঝুরিকি বলাকিনী উড়ে॥
ভালে কি ঝাপল বিধু আধ খণ্ড।
কবিবর-কর কিয়ে ও ভুজদণ্ড॥
ও কি শ্যাম নটরাজ।
জলদ-কলপতরু তরুণি-সমাজ॥ ধ্রু॥
কর-কিশলয় কিয়ে অরুণ-বিকাশ।
মরলী খুরলী কিয়ে চাতকভাষ॥
হাস কি ঝরয়ে অমিয়া মকরন্দ।
হার কি তারক দোতিক ছন্দ॥
পদতল সুথল-কমল অনুরাগ।
তাহে কলহংসক নূপুর জাগ॥
গোবিন্দদাস কহয়ে মতিমন্ত।
ভুলল যাহে দ্বিজ রায় বসন্ত॥

ই পদটি, আনুমানিক ১৭৫০ সালে পদকর্তা বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থে দুটি রূপে দুবার দেওয়া রয়েছে পদসংখ্যা ১০৫০ ও
২৪৩৪ হিসেবে। দুটি রূপেই আমরা এখানে উপস্থাপন করছি। এই গ্রন্থের পদসূচীতে, এই
পদ দুটির পদকর্তার নামের জায়গায় নির্দিষ্ট কারো নাম দেওয়া নেই! অর্থাৎ তাঁরাও
নির্ধারণ করে উঠতে পারেন নি যে পদটি আসলে কার রচিত, রায় বসন্তের না গোবিন্দ
দাসের!

১। শ্রীশ্রীপদকল্পতরু, সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), প্রথম প্রকাশ ১৮৯৭, ২য় খণ্ড,
৩য় শাখা, ১৪শ পল্লব, রূপোল্লাস, পদসংখ্যা ১০৫০।

.        ॥ শ্রীরাগ॥

সুর-পতি-ধনু কি শিখণ্ডক চূড়ে।
মালতি-ঝুরি কি বলাকিনি ঊড়ে॥
ভাল কি ঝাঁপল বিধু আধ-খণ্ড।
কবিবর-কর কিয়ে ও ভুজ-দণ্ড॥
ও কি শ্যাম নট-রাজ।
জলদ কলপ-তরু তরুণি-সমাজ॥ ধ্রু॥
কর-কিসলয় কিয়ে অরুণ-বিকাশ।
মরলি-খুরলি কিয়ে চাতক-ভাষ॥
হাস কি ঝরয়ে অমিয়া মকরন্দ।
হার কি তারক-দোতিক ছন্দ॥
পদ-তলে কি থল-কমল ঘন-রাগ।
তাহে কলহংস কি নূপুর জাগ॥
গোবিন্দদাস কহয়ে মতিমন্ত।
ভুলল যাহে দ্বিজ রায় বসন্ত॥

পদকল্পতরুর প্রাপ্ত আকর-পুথিসমুহ ক, খ, চ, প তে “রায়” বসন্তের বদলে “রাজ” বসন্ত
পাওয়া গিয়েছে।


২। শ্রীশ্রীপদকল্পতরু, সটীক সংস্করণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭), প্রথম প্রকাশ ১৮৯৭, ৪র্থ খণ্ড,
৪র্থ শাখা ২য় ভাগ, ২৮শ পল্লব, শ্রীকৃষ্ণের রূপ, পদসংখ্যা ২৪৩৪।

.        ॥ শ্রীরাগ॥

সুর-পতি-ধনু কি শিখণ্ডক চূড়ে।
মালতি-ঝুরি কি বলাকিনি ঊড়ে॥
ভাল কি ঝাঁপল বিধু আধ-খণ্ড।
কবিবর-কর কিয়ে ও ভুজ-দণ্ড॥
ও কি শ্যাম নট-রাজ।
জলদ কলপ-তরু তরুণি-সমাজ॥ ধ্রু॥
কর-কিসলয় কিয়ে অরুণ-বিকাশ।
মরলি-খুরলি কিয়ে চাতক-ভাষ॥
হাস কি ঝরয়ে অমিয়া-মকরন্দ।
হার কি তারক-দোতিক ছন্দ॥
পদ-তল থল কি কমল ঘন-রাগ।
তাহে কলহংস কি নূপুর জাগ॥
গোবিন্দদাস কহয়ে মতিমন্ত।
ভূলল যাহে দ্বিজ রায় বসন্ত॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
আওয়ে মধু-ঋতু মধুর যামিনী
কবি রায় বসন্ত / কবি গোবিন্দ দাস
যদিও গোবিন্দ দাস ও রায় বসন্ত দুজের ভণিতা রয়েছে, এই গ্রন্থে এ পদ গোবিন্দ দাসের বলা হয়েছে।
আনুমানিক ১৭২৫ সালে রাধামোহন ঠাকুর (রাধামোহন দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৮৭৮ সালে,
রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত সমুদ্র”, তৎ কালোচিতদ্যূত্যুক্তি,
পৃষ্ঠা ৩১৯।

তৎ কালোচিত দ্যূত্যুক্তিঃ।

॥ পূরবি রাগ চঞ্চুপুটতালৌ॥

আওয়ে মধু খতু মধুর যামিনি কামিনী চিত চোর।
কুসুম শায়ক জীবন গাহক তুহুঁ সে মধুপুর ভোর॥
শুনহ নিরদয় হৃদয় মাধব সে যে সুন্দরী রাই।
বিরহ জরে জরি কনক মঞ্জরী রহল রূপক ছায়॥
অঙ্গ ছটফটি কৈছে মেটব তপত সহচরী অঙ্গ।
নয়ন পঙ্কজ জোরে ঝর ঝর লোরে মহি করু পঙ্ক॥
তো বিনু কিসলয় শয়ন বীজন বিফল ধনি মণিমন্ত।
দাস গোবিন্দ এ রস গাহক ভাওয়ে রায় বসন্ত॥

পদামৃত সমুদ্র গ্রন্থে রাধামোহন ঠাকুরের সংস্কৃতে টীকা -
ততঃ আওয়ে মধু ঋতু ইত্যাদিনা ব্যাধি দশামাহ অত্র ক্রমেণ দশা বর্ণনং বৈবশ্যান্নকৃতমিতি ভাবঃ। কিঞ্চ
ক্রমেণ দশাস্তু পশ্চাদুদাহরিষ্যন্তে দান গোবিন্দ এ রস গাহকঃ এব ভবানেব রস রসায়নৌষধি বিশেষ স্তস্য
গ্রাহকঃ। রায় বসন্তায়চ  সোপি রোচতে যদ্বা বসন্তে রায় তব গমনং রোচতে। অয় রয় গতাবিত্যস্য ভাব
ঘণন্তস্য রূপং॥
পদকল্পতরু গ্রন্থে সতীশচন্দ্র রায়েরএই টীকার বাংলা ভাষায় ব্যাখ্যা, পদকল্পতরুর সটীক সংস্করণ
থেকে
নীচে দেওয়া পদের সঙ্গে পড়ুন।

ই পদটি, পদকর্তা বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় পরিবর্ধিত ও সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদ-কল্প-তরু
গ্রন্থ, প্রথম সংস্করণ (১৮৯৭), ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, পদসংখ্যা ১৭১৮, ১২৩৮-পৃষ্ঠায় এভাবে রয়েছে।

অথ ব্যাধিদশামাহ যথা।

॥ ধানশী॥

আওয়ে মধু-খতু    
                  মধুর যামিনী
কামিনী-চিত চোর।
কুসুম-শায়ক       
                   জীবন গাহক
তুহুঁ সে মধুপুরে ভোর॥
শুন হে নিরদয়-                        হৃদয় মাধব
সে যে সুন্দরী রাই।
বিরহ-জ্বরে জ্বরি
                     কনয়া-মঞ্জরী
রহল রূপক ছাই॥
অঙ্গ ছটফটি            
                কৈছে মেটব
তপত সহচরী-অঙ্গ।
নয়ন-পঙ্কজ             
            জোরে ঝর ঝর
লোরে মহী করু পঙ্ক॥
তো বিনু কিশলয়-       
              শয়ন বীজন
বিফল ভেল মণি মন্ত।
দাস গোবিন্দ               
            এ রস-গাহক
ভাওয়ে রায় বসন্ত॥

রবর্তী সংস্করণে অর্থাৎ সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩০
বঙ্গাব্দ (১৯২৩), ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, ৮ম পল্লব, বসন্ত সময়োচিত বিরহ, পদসংখ্যা ১৭২০, এভাবে দেওয়া
রয়েছে।

ব্যাধি-দশা।

॥ ধানশী॥

আওয়ে মধু-খতু      
                মধুর যামিনি
কামিনী-চিত চোর।
কুসুম-শায়ক         
                   জীবন-গাহক
তুহুঁ সে মধুপুরে ভোর॥
শুন হে নিরদয়-        
                 হৃদয় মাধব
সে যে সুন্দরি রাই।
বিরহ-জরে জরি        
             কনয়া-মঞ্জরি-
রহল রূপক ছাই॥
অঙ্গ ছটফটি                
           কৈছে মীটব
তপত সহচরী-অঙ্গ।
নয়ন-পঙ্কজ-                        জোরে ঝর ঝর
লোরে মহী করু পঙ্ক॥
তো বিনু কিশলয়-      
               শয়ন বীজন
বিফল ভেল মণি মন্ত।
দাস গোবিন্দ           
              এ রস-গাহক
ভাওয়ে রায় বসন্ত॥

পদামৃত সমুদ্র গ্রন্থে রাধামোহন ঠাকুরের সংস্কৃত টীকার বাংলা ব্যাখ্যা -
১৩-১৬। রাধামোহন ঠাকুর “এ রস গাহক” ইত্যাদির অর্থ লিখিয়াছেন, --- “এষ(আমরা পাচ্ছি - এব)
ভবানেব” রসঃ রসায়নৌষধিবিশেষস্তস্য গ্রাহকঃ। রায়বসন্তায় চ সোহপি রোচতে। “অয় বয় গতাবিত্যস্য
ভাবঘণস্তস্য রূপম্।” সুতরাং “তো বিনু” ইত্যাদির অর্থ --- তোমা ব্যতীত (শ্রীরাধার) নব-পল্লব-শষ্যা ও
(চন্দনানিল) ব্যজন, মণি-(ধারণ) ও মন্ত্র-(প্রয়োগ) --- সকলই ব্যর্থ হইল, অর্থাৎ কিছুতেই শ্রীরাধার বিরহ-
পীড়ার উপশম হইল না ; (সখী-স্থানীয়) গোবিন্দদাস (শ্রীরাধার বিরহ-তাপ শান্তির জন্য) কেবল রসায়নৌষধি-
স্বরূপ এই বস্তুটির (অর্থাৎ তোমার) ভিখারী ; (গোবিন্দদাসের বন্ধু সম-সাময়িক পদ-কর্ত্তা) রায় বসন্তেরও
তাহাই অভিরুচি বটে। (গত্যর্থক ‘রয়’ ধাতুর উত্তর ভাব-বাচ্যে ‘ঘণ্’ প্রত্যয় দ্বারা ‘গমন’ অর্থে ‘রায়’ শব্দ
সিদ্ধ হইতে পারে ; সুতরাং রাধামোহনের মতে ‘ভাওয়ে’ ইত্যাদি ছত্রটির --- ‘তোমার বসন্তে (ব্রজে) গমন
শোভন বটে’ এই রূপ অর্থও হইতে পারে)।
---সতীশচন্দ্র রায়, শ্রীশ্রীপদকল্পতরু॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর