কবি রায় বসন্তর বৈষ্ণব পদাবলী
*
মানিনি দুর কর দারুণ মানে
কবি রায় বসন্ত
আনুমানিক ১৭৫০ সালে পদকর্তা বৈষ্ণবদাস সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু
গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), প্রথম প্রকাশ ১৮৯৭, প্রথম খণ্ড, ২য় শাখা, ২০শ পল্লব,
বিবিধ মান, পদসংখ্যা ৫৫২।


॥ শ্রীরাগ॥

মানিনি দুর কর দারুণ মানে।
তুয়া বিনে মোহন                        চীত-পুতলি সম
তেজন ভোজন-পানে॥
কোমল অমল                             শেজ কুসুম-দল
তুয়া বিনু তেজল শয়নে।
গন্ধ-চতুঃসম                                 অঙ্গ-বিলেপন
তেজল তাম্বুল বয়নে॥
কত কত যুবতি-                           যূথ-শত সেবই
তাহে যে বোধ না মানে।
সো তুয়া লাগি অব                        সতত উতাপিত
মুন্দি রহত দুই নয়ানে॥
এ ধনি রমণি-                            শিরোমণি মানিনি
কিয়ে তুয়া মানক কাঁতি।
রায় বসন্ত কত                           তোঁহে বুঝায়ব
নাহ দেখিলুঁ এক ভাতি॥


টীকা -
হে ধন্যে রমণি-শিরোমণি মানিনি শ্রীরাধে! তোমার মানের (ইহা) কিরূপ ভঙ্গী ? রায় বসন্ত তোমাকে কত
বুঝাইবে ; তোমার নাথ (শ্রীকৃষ্ণকে) এক-ভাবেই দেখিলাম অর্থাৎ অস্থিরপ্রকৃতি তোমার মানসিক ভাবের
নানারূপ পরিবর্ত্তন হইলেও ধীর-স্বভাব শ্রীকৃষ্ণের ভাবের কোন পরিবর্ত্তন দেখিলাম না অর্থাৎ তিনি তোমার
প্রতি পূর্ব্ববৎ অনুরক্ত রহিয়াছেন। সতীশচন্দ্র রায়, "শ্রীশ্রীপদকল্পতরু", পদসংখ্যা ৫৫২ এর টীকা।

টীকা -
এটি দূতীর উক্তি। শ্রীকৃষ্ণ তোমার জন্য অন্নজল (ভোজন-পান) ত্যাগ করিয়াছেন ; তুমি সেই মোহনের
চিত্তপুতিতলীর তুল্য। নাহ দেখিলুঁ এক ভাতি ---নাথকে এক কৌশলে দেখিয়া আসিলাম। শ্রীরাধার দূতী
নিজেকে প্রকাশ না করিয়া, কৌশলে অপ্রত্যক্ষ থাকিয়া শ্রীকৃষ্ণের অবস্থা দেখিয়া আসিয়া বলিতেছেন।
বিমানবিহারী মজুমদার, “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী”, পদসংখ্যা ১৬০ এর টীকা।

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
বঁধু! তুহুঁ দয়ার সাগর
কবি রায় বসন্ত
এই পদটি ঠিক এই রুপ ও ভণিতায়, ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত
“প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৭৭-এ, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত
করা হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার দ্বারা  
সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন পদরত্নাবলী-র পরিবর্ধিত আনন্দ সংস্করণ, ২০০৬,
পৃষ্ঠা-১০৩-তে পদটি রয়েছে। রবীন্দ্রনাথই  পদকর্তা  বসন্ত রায়ের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রমাণ
করেছিলেন।  

.        ॥ বিভাস॥

বঁধু! তুহুঁ দয়ার সাগর।
হাম নারী মতিহীনে এতেক আদর॥
আহিরিণী গোয়ালিনী মুঞি কোন ছার।
পরাণ নিছিয়া দেই পিরীতে তোমার॥
তোহারি গরবে ব্রজে হাম গরবিনী।
গহীন পিরীতি তোর আমি কিবা জানি॥
আমি সোনা, তুঁহু বঁধু নিকষ পাষাণ।
পরশে করিলা মোরে হেম নাখা বাণ॥
সাধ করে সীথায় তোমা সিন্দুর করি ধরি।
হার বানাইয়া কিয়ে গলায় গাঁথি পরি॥
যত যত দেখি আঁখি নহে তিরপিত।
রায় বসন্ত কহে নিগূঢ় পিরীত॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
চলই সুধামুখী ভেটইতে কান   
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম
খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৪। এই পদটি এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর
অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।  

.        ॥ মঙ্গল॥

চলই সুধামুখী ভেটইতে কান।
আরতি অতিশয় পহুঁকে ধেয়ান॥
কি কহব আজুক কস অভিসার।
মনমথ নীত চিত অনিবার॥
চললি নিকুঞ্জে কুঞ্জর-বর-গমনী।
ভেটব নাগর-গুরু মনে অনুমানি॥
দুহুঁ অবলোকন দুহুঁ মুখচন্দ্রে।
দূরেহুঁ দূরে রহুঁ দ্বিজ-রাজেন্দ্রে॥
মধুর যামিনী, মধুমাস বসন্ত।
মধুর গাওত রায় বসন্ত॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
তোহারি সম্বাদে, আসিতে মাধব
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৫। এই পদটি
এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

॥ ধানশী॥

তোহারি সম্বাদে,                                আসিতে মাধব,
কাননে যামুন তীর।
চন্দ্রা কলাবতী,                                পথেতে ভেটল,
ধরল মাধব চীর॥
করে কর ধরি,                                ভুজে ভুজে বেঢ়ি,
লৈ গেল আপন গেহ।
সহজে ভ্রমরা,                                   মধুপানে মাতল,
পাই কমলিনী লেহ॥
তোহারি বচনে,                                     রহল এ ধনি,
পুন কি পায়ব কান?
পন্থ হেরি হেরি,                               নীদ নাহি আয়ত,
নিশি ভেও গেহ অবসান॥
রায় বসন্ত কো,                                   বচন শুনি ধনী,
মনে পড়ি গেও ধন্দ।
অধর বান্ধুলি                                    মলিন ভই গেও
যৈছক দিবসক চন্দ॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
সুখে থাকিতে বিহি লাগল রে
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৫। এই পদটি
এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

॥ শ্রীরাগ॥

সুখে থাকিতে                                  বিহি লাগল রে,
ভুলনু কানু আশোয়াসে।
আপনক কুমতি                                 পরিতাপহু রে,
দারুণ মদন হুতাশে॥
মুঞি পাপিনী                                  যদি যানতহু রে,
পিরীরি পরিণামে।
স্বপনেহু সাধ                                     না করতুহু রে,
শুনইতে পুরখ নামে॥
না বোল না বোল                              সখি! সম্বাদহু রে,
নাহি মোর লেহ অভিলাষে।
রায় বসন্ত চিত                              দুখিত ভেলহু রে,
রাইক নিকরুণ ভাষে॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
কিশলয় শেযি, শুতল নবনাগর
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৫। এই পদটি
এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

॥ ধানশী॥

কিশলয় শেযি,                                   শুতল নবনাগর
জরজর মনমথ বাণে।
উঠই পড়ই,                                         পন্থ নেহারই,
ক্ষণে ক্ষণে তোহারি ধেয়ানে॥
সুন্দরি! কি কহব তোহারি সোহাগ।
ঐছন এ তিন ভুবনে,                                 নাহি দেখনু,
যৈছন তুয়া অনুরাগ॥
সই পুরুখ অতি,                               তুয়া গুণে আরতি,
অতিশয় সহজ স্বভাব।
অঙ্গ পরশ রস,                                    মিলন দূরে রহুঁ,
দেখবি দরশন লাভ॥
সো পঁহু মিনতি অতি,                             শুন বর-যুবতি,
ধর ধর শ্যা অঙ্গের মালা।
অধর সুধারস,                                      যৌবন সরবস,
পূরহ নাগরি বালা॥
রসময় নাগর,                                      তুহুঁ রস নাগরী,
এ মধুনিশি পরকাশে।
রায় বসন্ত ভণে,                                তেজহ কঠিন পণে,
পুরাহ কানু মন আশে॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
কহইতে গোরী, লোরে ভরু লোচন
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৫। এই পদটি
এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

॥ সুহই॥

কহইতে গোরী,                                  লোরে ভরু লোচন,
মূরছি পড়ল তছু ভোরি।
কাহিনী বোলত,                                  শ্যাম নাহি আয়ত,
নিমিখ তেজলি গোরী॥
রাইক বিপতি দেখি,                                 সহচরী আকুল,
করতহি বিবিধ উপায়।
কোই কোরে আগোরি,                             বসনে মুখ মুছই,
শ্রবণে কানুর গুণ গায়॥
রায় বসন্ত ভণ,                                       সমুচিত ঔষধ,
সো নাম-লুবধ ধনী গোরী।
শ্যাম নাম শ্রবণে,                                        যব পৈঠল,
অমনি উঠল তনু মোড়ি॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
বুঝনু মরমক ভাব
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৬।
এই পদটি এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

॥ গান্ধার॥

বুঝনু মরমক ভাব।
ইহ নব প্রেম ভুরি,                                সুখ সম্পদ ছোড়ি,
বরজ-পুর কাহে যাব?
সম্প্রতি পুরপতি,                                    ভুপতি মহামতি,
কাঁহা সোই পশুপতি ভাণ?
তাঁহা গোদল, শিঙ্গা,                                  বংশী মূরলীরব,
ইহাঁ কত রাজ নিশান॥
কালিন্দী তট বট,                                   নিকট ছায়ে বাস,
নিজ তনু হেরিতে নারে।
হিয়া অট্টালিকোপরি,                                  রতন পরিযঙ্ক,
মুকুর জড়িত কত পুরে॥
তাঁহা নব পল্লব,                                        বীজই দুর্লভ,
গলে বনফুল মাল।
ইহাঁ কত চামর,                                      দাসে ঢলায়ত,
ভূষিত মতি প্রবাল॥
আভীর নাগরী                                    নিরগুণ পরাধিনী,
যতনে কাননে মেল।
ইহাঁ কত পুরনারী,                              স্বতন্তরী পথোপরি,
কুবুজা ভূরি সুখ নেল॥
ভালে ভালে তুহুঁ                                দশদিন গোঁয়ায়লি,
গোকুল গতি ইতি কহনা।
বসন্ত রায় গেহে,                                আগ দেই আয়লি,
তাপই নিরবধি দহনা॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর       
*
রাইক শেষ দশা শুনি মাধব
কবি রায় বসন্ত
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”, পৃষ্ঠা ৬৬।
এই পদটি এই গ্রন্থে “রায় বসন্ত” ভণিতাতেই, বিদ্যাপতির পদাবলীর অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

॥ ধানশী॥

রাইক শেষ দশা                                       শুনি মাধব
লোচন ঝর ঝর পানী।
অবনত মাথে                                      কর অবলম্বন,
বদনে না সরয়ে বাণী॥
ধৈরজ ধরি হরি,                                 দূতী বদন হেরি,
পুছই গদ গদ রায়।
দুই এক দিবসে                                 হাম যাওব দূতি,
তুহুঁ প্রবোধবি তায়॥
নাগর বচনে,                                 হরষিত চিতে দূতী,
বরজ করল পয়ান।
রায় বসন্ত কহ,                                  ইহ আশোয়াসে,
রাই ধনী রাখব পরাণ॥

.        *************************      
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর