কবি শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের কবিতা
*
কবিকুঞ্জ
কবি শ্রীশচন্দ্র মজুমদার
ভারতী ও বালক, আশ্বীন ১২৯৯ (১৮৯২ অক্টোবর) সংখ্যায় প্রকাশিত।

আভীরা।

( ১ )
দূর শূন্যে নীল ছবি পাহাড়ের তলে
ছেয়ে আছে শ্যামল প্রান্তর!
দূরে দূরে সারি গাঁথা তালরাজিশিরে
কাঁপিতেছে ক্ষীণ রবিকর!

( ২ )
দিশাহারা ভাসি চলে মেঘপোত গুলি
গগনের নীলিমা সাগরে!
চমকি দেখিতেছে ধীরে জাগিতেছে দূরে
কনকার্দ্রি পাহাড়ের শিরে!

( ৩ )
আভীরা কিশোরী বসি সপ্তপর্ণ মূলে,
কাছে বসি নওল কিশোর!
বিচরিছে কাছে কাছে গাভী, বত্সগুলি,---
দোঁহে দোঁহা নেহারিতে ভোর!

( ৪ )
বালিকা মাধুরী নামে, কিশোর রাখাল
প্রতিবাসী কুটুম্বের ছেলে।---
চিরসাথী সখী সখা, শিশুকাল হ’তে---
দিবস কাটিছে হেসে খেলে!

( ৫ )
র্কীতি, সরলতা মাখা মাধুরীর মুখে,
ভাসিতেছে হাসির কিরণ!
মুক্ত অনলের সখী, বনের ব্রততী---
তেমনি সে ভোলা খোলা মন!

(৬)
চাহি চাহি সে আননে সুখে ভরা বুক
সখা বলে---“সইলো মাধুরী,
প্রভাতে শুনেছি আজি সুখের বারতা,
মাখা তাহে আনন্দ লহরী!”

( ৭ )
“মাথা খাস্, কি কথাটী বল্ না রাখাল---”
ঝরে মধু ধীর মৃদুভাষে!
সখা হেরে নবলোভা মাধুরী আননে,
আগ্রহের আলুথালু বেশে!

( ৮ )
বলে সখা---“শুয়েছিনু কুটীরে যখন,
মা বাপের কথা গেল কাণে,
দোঁহে বলিছেন, হবে সুখপরিণয়
কাখালের মাধুরীর সনে!”

( ৯ )
পলকে শুকায়ে গেল মধুর মাধুরী,
---মেঘে ছায় সলিল দর্পণ!
আবার ভাসিল হাসি তখনি পলকে
চাহি চাহি সখার আনন!

( ১০ )
“দাসী তোর পরিণয়ে হব কোন ভাই
তেয়াগিয়া বাপের ভবন ?
ঘোমটায় মুখ তবে হবে আবরিতে!---
আমা হতে হবে না তেমন!”

( ১১ )
“এম্ নি করে দুর্ব্বাদলে, গোঠের বাতাসে
দুজনে কি ছুটিবারে পাব ?
না রাখাল ও সব কথা শুনিস্ নে ভাই---
মা বলিলে, আমি তাই কব!”

( ১২ )
শ্যাম তরঙ্গের রাজি উঠিছে পরিছে
শস্য ক্ষেতে আনিল হিল্লোলে!
রাখালে মাধুরী ভোর---অবসর বুঝি
বুধ শনি ধায় কুতূহলে!

( ১৩ )
তখন চাহিয়া বালা হেরে গোঠ পানে,
অমনি সে লইল পাঁচনী।
নিথর গগন তল কাঁপাইয়ে ডাকে---
“ফিরে আয় ওলো বুধি শনি!”

( ১৪ )
ছুটি চলে তড়িতের লতিকার মত
আভীরা সে মধুর মাধুরী,
রাখাল চাহিয়ে রহে অনিমেষ আঁখি,
মরমেতে বাসনা লহরী!

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আগমনী
কবি শ্রীশচন্দ্র মজুমদার
ভারতী ও বালক, আশ্বীন ১২৯৩ (অক্টোবর ১৮৮৬) সংখ্যায় প্রকাশিত।

( ১ )
দেখিতে দেখিতে একি মেঘের কুহেলি হতে
হইল প্রকাশ---
নীলিমা ছটায় ভরা শিরে রাঙ্গা রবি পরা
সোণামাখা চূর্ণকেশে মধুর আকাশ!

( ২ )
হাসিল সংসার! হেসে বুকের দর্পণে
করিল ধারণ---
শ্যামলে নীলিমে মাখা ; ছবি খানি হাসি মাখা
নদ সরোবর---প্রশান্ত আনন!

( ৩ )
এ সৌন্দর্য্য সাগরের গহিন মরম হ’তে
কে বাজালে বাঁশী!---
কাননে শেখালি ফোটে, সলিলে কুমুদ উঠে
তারা ঘেরা শূন্য পথে শশী খেলে হাসি!

( ৪ )
বাজিল বাঁশরী যদি, ফুটাইয়ে প্রকৃতির
সৌন্দর্য্য কানন!
সে ধ্বনির প্রতিধ্বনি, নরহৃদে উঠে ধ্বনি
জাগায়ে ঘুমন্ত স্মৃতি---সুখের স্বপন!

( ৫ )
বাজিয়ে উঠেছে বাঁশী,---প্রবাসী হৃদয়
বিবশ বিহ্বল!
মনে পড়ে গেছে তার স্নেহের পুতলি গুলি,
স্মৃতির-সায়রে ভাসে আদর কমল!

( ৬ )
মুগ্ধ মনোআঁখি তার হেরিতেছে দিন রাতি
গৃহের প্রাঙ্গণ,
হাসিতে খেলাতে ভরা,---নিমেষে বাছনি হারা
চুম্বিছেন ধেয়ে সাধ্বী সে চাঁদ বয়ান!

(৭)
শ্যামল প্রান্তরে, যেন শ্যামলসাগরে রে
প্রভাতের বায়
খেলায় তরঙ্গ ভঙ্গ ; নেহারি প্রকৃতি রঙ্গ
সুবেশ কৃষক আজি গৃহ ছাড়ি ধায়!

( ৮ )
বাজিছে গ্রামের পারে আনন্দ বাজনা
---ললিতে বাঁশরী।
কে যেন কোথা ডাকে, প্রাণ যেন চায় কাকে,
আনন্দে মিশিছে ক্ষীণ বিষাদ লহরী!

( ৯ )
গ্রামে গ্রামে, গৃহে গৃহে এ বঙ্গ ব্যাপিয়া
খেলে সে লহরী!
জননী জনম-ভূমি, পারেতে সুষমা রাণী,---
দশভুজা মহামায়া পূজে নর-নারী!

( ১০ )
গড়ি মূর্ত্তি পূজি মোরা সবে মা তোমায়,
হেন ক্ষীণ প্রাণ!
শ্যামলা, নির্ম্মলা মাতা ফুল্ল কৌমুদিতে স্নাতা
ভাবিতে পারি না মূর্ত্তি, নাহি ধ্যান জ্ঞান!

( ১১ )
তোমার মরম ভেদি বাজে যে বাঁশরী
---অনন্ত সে গান!
বিহ্বল বিবশ-প্রাণে, ধাইতে অনন্ত পানে
কই তা জাগাতে নারে বাঙ্গালীর প্রাণ!

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর