| কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা |
| "ভুলে যাও" না বলিলে ভুলিতাম তায় কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (বাসন্তী কাব্য থেকে নেওয়া) (১) "ভুলে যাও" না বলিলে ভুলিতাম তায় | দূর হতে ম্লান মুখে, না চাহিলে আমা পানে, ভাসিয়া যাইত প্রেম এই নিরাশায় | বুঝাতেম হৃদয়ের, ত্যজিতাম এ দুরাশা, "অভাগিনী" না বলিলে কথায় কথায় | ভুলিলে সে সুখে রবে, সে কথা বলিত যদি ভুলিয়ে হ'তেম সুখী কিন্তু তা নয় || (২) সেই নিশি---সেই কক্ষ---সেই দরশন! মনে হ'লে বক্ষঃস্থল, এখনো ফাটিয়া যায়, পৃথিবী ঘুরিতে থাকে কেঁদে ওঠে মন | বিদীর্ণ হৃদয় আমি, দাঁড়াইয়া বাতায়নে, মথিত হইতেছিল অন্তর তখন | অদূরে বসিয়া মম, জীবনের বৈতরণী, হৃদয় সমুদ্র মোর করিছে মন্থন || (৩) কতক্ষণে ত্যজি শ্বাস চাহিয়া বদনে | দাঁড়াইয়া কি বলিল, পশিল না শ্রুতিমূলে, চলে গেল কক্ষান্তরে----আমি শূণ্য মনে, ভাবিনু চিত্কার করে, বলি তায় কোথা যাও, আছাড়ি চরণ-প্রন্ত করিব বেষ্টন | খুলিয়া শাণিত ছুরি, বিদারিব বক্ষঃস্থল, নিষ্ঠুর সরমে নাহি সরিল বচন || (৪) দেখিলাম কতক্ষণ বাতায়নে | বিদ্ধ বিহঙ্গিনী মত, আঁধার সে কক্ষান্তরে, ভ্রমিতে লাগিল একা অস্থির চরণে || অবশ চরণে পুন, দাঁড়াইয়া স্থির নেত্রে নিরখিলা কতক্ষণ থাকিয়া গোপনে | কাতরে ডাকিনু তায়, দিল না উত্তর তবু, একটি সুদীর্ঘ শ্বাস পশিল শ্রবণে || (৫) পরদিন সন্ধ্যাকালে বসিয়া শয়নে | হৃদয়ের সিন্ধু মম, উথলি উঠিতেছিল, অশ্রুময় নেত্রদ্বয় হতাশ রোদনে || ছিন্ন লিপি এক খণ্ড, সহসা পশিল করে, শিহরিয়া খুলি তায় পড়িনু যতনে | প্রতি ছত্রে লেখা তার, "বড় অভাগিনী আমি," "কেন হেন ভাব তব উপজিল মনে ||" (৬) ইচ্ছা হল ভেঙ্গে ফেলি তখনি হৃদয় | নূতন করিয়া গঠি, প্রথমে যেমন ছিল, ভুলে যাই জন্মশোধ দুখের প্রণয় || সে কাঁদিবে চিরদিন, আমিও কাঁদিব সদা, সুখের সংসার হবে দুখের নিলয় | প্রাণের ভেতর দেখি, শিহরি উঠিল মন, উথলিছে শত সিন্ধু প্লাবিয়া হৃদয় || (৭) নহে দিন---নহে মাস---নহেক বত্সর | পঞ্চম বত্সর আজ, লুকায়ে রাখিয়াছিনু, এই নিরাশার স্রোত প্রাণের ভিতর || কখনো সন্ন্যাসী হ'য়ে, ভাবিয়াছি ধাই বনে, না দেখি ভুলিব তায় জুড়াবে অন্তর | দৃঢ় রজ্জু---তীক্ষ্ণ বিষ, হাতে করি দাঁড়ায়েছি, জীবনের সন্ধিস্থলে হইয়া কাতর || (৮) দারুণ যন্ত্রণা এত সহি নিরন্তর | তবু কি ভুলিতে তায়, পারিয়াছি একদিন, তবু কি যাতনা কভু ভেবেছি কঠোর! তাহার ভাবনাগুলি, যতনে রাখিলে বুকে, তবু যেন পূর্ণ থাকে প্রাণের ভিতর | এ স্মৃতি হইলে লোপ, কি লয়ে পরাণ রবে, শূণ্যময় মরুভূমি হইবে অন্তর! (৯) কিন্তু যার তরে এই জীবন কাতর | ভবের ভিখারী সাজি, যৌবনে সন্ন্যাসী হ'য়ে, যার প্রেম-সাধনায় ব্রতী নিরন্তর! সে আজ নিষ্ঠুর মনে, বলে কিনা "ভুলে যাও," কিসে নিরমিলে বিধি নারীর অন্তর! কঠিন পাষাণও গলে, অবিরত বিন্দুপাতে, রমণী-হৃদয় কি হে তা হ'তে কঠোর! (১০) চিনিলে না রমণীরে এ প্রেম কেমন | বুকভরা ভালবাসা, দিয়েছিনু হাতে তুলে, যুবকের সুধাপূর্ণ নবীন জীবন | বুক চিরে রাখিতাম, সোহাগে মণ্ডিত করি, মরতের বৈজয়ন্ত দেখিতে কেমন--- আপনি কাঁদিবে দুখে, কাঁদাইবে অভাগারে, নিরাশায় যাবে সখি দুইটি জীবন || (১১) কোন কথা প্রিয়তমে হইব বিস্মৃত | অতীত ঘটনাগুলি, হৃদয়ের স্তরে স্তরে, অঙ্ত রয়েছে যেন চিত্রিতের মত || পঞ্চম বত্সর আজ, নিভৃত চিন্তায় বসি, জড়ায়েছি আশালতা হৃদয়েতে কত! সাধের সে ভালবাসা, সেই মধুমাখা আশা, ভুলে যাও বলিলে কি হবে অন্তরিত || (১২) জীবনের রঙ্গভূমে প্রথমে যখন--- বিশ্ববিমোহিনী রূপে, প্রবেশিলে ধীরে ধীরে, সেই কথা আজ সখি হতেছে স্মরণ || দুইটি বৃহৎ আঁখি, অনিন্দ্য বদনখানি, নিরখিয়া কি চঞ্চল হয়েছিল মন! অতৃপ্ত হৃদয় সেই, প্রথমে দেখিয়াছিনু, অতৃপ্ত হৃদয় সেই রহিল এখন || (১৩) রূপলালসায় নহে সে চিত্ত চঞ্চল, তা হ'লে অনেক ছিল, সে সাধ মিটিয়া যে'ত, তা হ'লে নয়নে আজ ঝরিত না জল | নারীর অধিক ভাবি, দেখেছিনু মুগ্ধ নেত্রে, নরের অধিক হয়ে হয়েছি বিকল | সুধুই বাসিলে ভাল, ভুলিয়ে যেতাম তোমা, সুধু ভালবাসা এত হয়না অটল || (১৪) অভিমানে পরিপূর্ণ পুরুষের মন | প্রতিদান নাহি পেলে, প্রণয় শুখায়ে যায়, ঘৃণায় প্রেমের বেগ করে সম্বরণ | প্রবৃত্তির তীব্র স্রোত, অহঙ্কারে চূর্ণ হয়, সময়ে চিত্তের গতি করে নিবারণ | বন্ধুত্বে তাচ্ছিল্য সখি, অন্তরে বড়ই বাজে, সে যন্ত্রণা পুরুষের বড় নিদারুণ! (১৫) নিরব যন্ত্রণা তুষালনের মতন | হৃদয়ের স্তরে স্তরে, নিরন্তর দগ্ধ করে, ভাষায় নাহিক তার একটি বচন | স্বর্গের অমিয়া আনি, যদি কেহ দেয় হাতে, সে দুখীর তৃপ্তি তাহে হয় না সাধন | ফুটিতে পারে না ব'লে, যাতনা দ্বিগুণ তার, নির্জন রোদনে তার সুধু আকিঞ্চন || (১৬) সেই নিদারুণ ব্যথা হৃদয়ে আমার | এই যে বিদীর্ণ বুক, এই যে অনন্ত দুখ, এই ভিখারীর বেশ---এই নেত্রাসার | এই আত্মবলিদান, এ সংসার বিষজ্ঞান, রমণি রে! অভিনেতা তুমিই তাহার | বড় ভাল বাসিতাম, বড়া ভক্তি করিতাম, ভাল প্রতিদান সখি পাইলাম তার! . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| মহাশ্বেতা কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (বাসন্তী কাব্য থেকে নেওয়া) একটি মধুর ছবি, অতীত কালের পটে, রয়েছে অঙ্কিত আজো উজ্জ্বল রেখায় | তপস্বিনী মহাশ্বেতা, নিবিড় কানন কোলে, জ্যোত্স্নার ছায়া যথা বনরাজিগায় || নিবিড় তনুয়া কিবা, বরাঙ্গের স্ফুট বিভা, নয়নে বদনে ঘন মাখানো মাধুরী | কল্পনায় সে প্রতিমা, ধেয়ান করিলে তবু, উঠে ভাবুকের চিতে কি সুখলহরী || কিবা---তপস্বিনী বেশ, কিবা বিষাদের লেশ, কি গম্ভীর হাবভাব, কি অমিয়া তায়! পলকে পলকে তার, কি গম্ভীর দৃষ্টি ঝরে, কি পূত ধারণা তার অঙ্গের সীমায় || বিষাদ-ভাবনা-ভরে, সতত বিষন্ন আঁখি সুন্দর উরসে কিবা ভাবনা মধুর | অপাঙ্গে নিরবে ঝরে, মধুর নয়ন জল, মধুর শোকেতে বালা কিবা সে আতুর || বাঁশরি তুলিয়া মুখে, কি গীত গাহিল ওই, ছুটিল পরাণ তার ভাসিয়া সে সুরে | গভীর প্রভাহে মরি, মধুর নিনাদ করি পড়িল ছড়ায়ে প্রাণ সে কানন পুরে || বিকচ-যৌবন-ভরে, ঢল ঢল তনুখানি গভীর বিপিনে একা বসি তপস্বিনী | পারশে পড়িয়া তার, নাথের অচেত তনু নয়ন রাখিয়া তায় গায় বিষাদিনী || প্রাণ প্রাণ প্রাণ মম, যায় যায় যায় যে রে অধরে ফুটিছে শ্বাস বাঁশরির গায় | দ্রবিয়া হৃদয় লোহ, আনত নয়ন যুগে নিরবে পড়িছে ঝরি সেই যাতনায় || বল রে জগৎ! তোর, বিপুল সংসারে কোথা আছে সুখ ওই মত রোদনে যা মিলে | কিবা সে গভীর ব্যথা, মধুরে পরাণে বাজে, কিবা সে অবশ তনু শোক পরশিলে || কিবা সে স্মৃতির জ্বালা, পরাণ আকুল করে, কি আবেশে ঝরে জল মুদিত নয়নে | স্তবধ পরাণে যেন উথলে তরঙ্গরাশি ঘাত-প্রতিঘাতে কত সুখ উঠে মনে || বিধি রে জন্মান্তরে, দিও দুখ হৃদি পুরে কাঁদিব পরাণ-ভরে বসি একমনে | সংসার বন্ধনগুলি, দিও জন্মান্তরে খুলি দিও কিন্তু আশা তৃষ্ণা ঢালিয়া জীবনে || আধ লাজ আধ ক্ষুধা দিও না রে হেন দ্বিধা পরাণ ভরিয়া যেন পারি কাঁদিবারে | অমনি বাঁশরি-গলে পরাণ ঢালিয়া দিব ছড়ায়ে পড়িবে প্রাণ অমনি সংসারে || পাতায় লতায় মূলে, ও গীত যেমনি বাজে, যেমনি কাননপুরে উঠে প্রতিধ্বনি | আমারো সে গীত যেন, বাজে নরনারী-প্রাণে সংসার পুরিয়া যেন উঠে সে নিক্কণি || ওই শুন তপস্বিনী রাখিয়া বাঁশরিখানি সজল নয়নে চাহি শবের বদনে | না পরশি তনু তার, শুধুই নয়নে হেরে কি তৃষ্ণা-পূণিত দৃষ্টি ঝরে ও নয়নে || নাথের যুগল আঁখি, পল্লবে রয়েছে ঢাকা গভীর নিদ্রায় যেন রয়েছে মুদিত | বিকসিত ওষ্ঠাধরে, বিরাজে রক্তিম রাগ বদনমণ্ডল যেন ভাষায় জড়িত || সে মৃণাল ভুজদ্বয় আলসে অবশ যেন সেই পদ্মরাগ শোভে বিশাল উরসে | প্রশস্ত ললাট খানি, শান্ত খেদ-ক্লেদহীন প্রসারিত যেন ঘোর নিদ্রার পরশে || জীবিত এখনো যেন, নিদ্রিত শুধু কি তবে সে কি রে বিষাদ কেন এতই নিষ্ঠুর | তপস্বিনী প্রিয়তমা, এ দীর্ঘ বত্সর ধরি কাঁদিছে পারশে তবু নিদ্রা নহে দূর || জাগ জাগ পুণ্ডরীক দেখরে নয়ন মেলি কি রত্ন পড়িয়া আজ পারশে তোমার | স্বরগের পারিজাত, মরতের কোহিনূর এ রতন তুলনায় সকলি সে ছার || কে বলে তাপস তোমা, কে বলে ভিখারি তুমি কি নরেন্দ্র কি দেবেন্দ্র কাহার ভাণ্ডারে | আছে ও অমূল মণি, আছে ও প্রেমের খনি ও অশ্রু রয়েছে বিশ্বে আর কার তরে || কোন্ ব্রতে ছিলে ব্রতী কি তপ করিলে বল অতীত জীবনে বল কি পূণ্য লভিলে | কি শিক্ষা শিখিয়াছিলে, কি মন্ত্র আয়ত্ব করি এমন দুর্লভ রত্নে সঞ্চয় করিলে || অভাগা কবির ভাগ্যে সাধ্য কি সে দৃঢ় ব্রত? কি কঠিন পণ তায় কি বা সে আচার | সাধি যদি যুগে যুগে ধরি সে কঠোর ব্রত ফলিবে কি সে তপস্যা অদৃষ্টে আমার || পূণ্যবান্ পুণ্ডরীক পূণ্যবতী মহাশ্বেতা জগতের রম্য ছবি তোমা দুজন | কালের বিশাল বক্ষে এমনি মধুর ভাবে বিরাজিবে চিরদিন যাবত ভূবন || . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| আমার প্রাণ কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (চিন্তা কাব্য থেকে নেওয়া) কল্পনে! . বুকের পাষাণ মম, এ জ্যোত্স্নায় একবার, দেও সরাইয়া--- প্রকৃতির প্রীতিমাখা, মধুর হৃদয়ে আমি, যাই মিশাইয়া! তুষার আবৃত ভূমে, তরুণ অরুণ ভাতি, যেমতি বিভাত! দিক্ হতে দিগন্তরে, বিমল কৌমুদী রাশি, তেমতি সম্পাত! জীবন্ত স্বপন যেন, অনন্ত গগন-বক্ষে, পড়েছে ছড়ায়ে! স্থাবর জঙ্গম জীব, সকলি মোহেতে যেন, নয়ন মেলায়ে! আশার মধুর স্মৃতি, যেন আজ বিশ্বখানি আবেশে অচল | বিধির প্রথম সৃষ্টি, মধুর আলোকে যেন, ভূবন উজ্জ্বল | কল্পনে! বারেক আজ, বুকের পাষাণখানি, দেও সরাইয়া | শূণ্য-পথ ভাসাইয়া, জনস্রোত মাতাইয়া, এই জ্যোত্স্নার সনে যাই মিশাইয়া | ইচ্ছা করে একবার, অনাদি অনন্ত ওই, গগনের তলে | কলেবর বিস্তারিয়া, হৃদয় বিদীর্ণ করি, দিই প্রাণ ঢেলে | ক্ষত মর্মস্থান হ'তে, অজস্র প্রপাত পাতে, প্রাণ আমার | জ্যোত্স্নায়, জ্যোত্স্নায়, ঝরিয়া পড়ুক ভূমে, ভাসায়ে সংসার! ভূতলে কঠিন যাহা, দ্রবীভূত করি তাহা, প্রাণের অমৃতে | ক্ষিতি, শিলা, নর, নারী, পাষাণ পরাণ আর যা কিছু মহীতে | পরাণ পরাণে এই শূণ্য পথ ভেসে যাক্, আর---এ সংসার | আত্মপর জ্ঞান ভুলে, মুহূর্তেক মগ্ন হোক্, পরাণে আমার | প্রাণের নিভৃত ব্যথা, নর, নারী,হৃদে যাহা--- আমার মতন, আমার পরাণ সনে, উথলি উঠুক তাহা, আকুলি ভূবন | . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |