কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
"ভুলে যাও" না বলিলে ভুলিতাম তায়
কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
(বাসন্তী কাব্য থেকে নেওয়া)


(১)
"ভুলে যাও" না বলিলে ভুলিতাম তায় |
দূর হতে ম্লান মুখে,                          না চাহিলে আমা পানে,
ভাসিয়া যাইত প্রেম এই নিরাশায় |
বুঝাতেম হৃদয়ের,                              ত্যজিতাম এ দুরাশা,
"অভাগিনী" না বলিলে কথায় কথায় |
ভুলিলে সে সুখে রবে,                           সে কথা বলিত যদি
ভুলিয়ে হ'তেম সুখী কিন্তু তা নয় ||


(২)
সেই নিশি---সেই কক্ষ---সেই দরশন!
মনে হ'লে বক্ষঃস্থল,                           এখনো ফাটিয়া যায়,
পৃথিবী ঘুরিতে থাকে কেঁদে ওঠে মন |
বিদীর্ণ হৃদয় আমি,                             দাঁড়াইয়া বাতায়নে,
মথিত হইতেছিল অন্তর তখন |
অদূরে বসিয়া মম,                              জীবনের বৈতরণী,
হৃদয় সমুদ্র মোর করিছে মন্থন ||


(৩)
কতক্ষণে ত্যজি শ্বাস চাহিয়া বদনে |
দাঁড়াইয়া কি বলিল,                            পশিল না শ্রুতিমূলে,
চলে গেল কক্ষান্তরে----আমি শূণ্য মনে,
ভাবিনু চিত্কার করে,                      বলি তায় কোথা যাও,
আছাড়ি চরণ-প্রন্ত করিব বেষ্টন |
খুলিয়া শাণিত ছুরি,                             বিদারিব বক্ষঃস্থল,
নিষ্ঠুর সরমে নাহি সরিল বচন ||


(৪)
দেখিলাম কতক্ষণ বাতায়নে |
বিদ্ধ বিহঙ্গিনী মত,                          আঁধার সে কক্ষান্তরে,
ভ্রমিতে লাগিল একা অস্থির চরণে ||
অবশ চরণে পুন,                             দাঁড়াইয়া স্থির নেত্রে
নিরখিলা কতক্ষণ থাকিয়া গোপনে |
কাতরে ডাকিনু তায়,                          দিল না উত্তর তবু,
একটি সুদীর্ঘ শ্বাস পশিল শ্রবণে ||


(৫)
পরদিন সন্ধ্যাকালে বসিয়া শয়নে |
হৃদয়ের সিন্ধু মম,                             উথলি উঠিতেছিল,
অশ্রুময় নেত্রদ্বয় হতাশ রোদনে ||
ছিন্ন লিপি এক খণ্ড,                           সহসা পশিল করে,
শিহরিয়া খুলি তায় পড়িনু যতনে |
প্রতি ছত্রে লেখা তার,                    "বড় অভাগিনী আমি,"
"কেন হেন ভাব তব উপজিল মনে ||"


(৬)
ইচ্ছা হল ভেঙ্গে ফেলি তখনি হৃদয় |
নূতন করিয়া গঠি,                             প্রথমে যেমন ছিল,
ভুলে যাই জন্মশোধ দুখের প্রণয় ||
সে কাঁদিবে চিরদিন,                        আমিও কাঁদিব সদা,
সুখের সংসার হবে দুখের নিলয় |
প্রাণের ভেতর দেখি,                          শিহরি উঠিল মন,
উথলিছে শত সিন্ধু প্লাবিয়া হৃদয় ||


(৭)
নহে দিন---নহে মাস---নহেক বত্সর |
পঞ্চম বত্সর আজ,                          লুকায়ে রাখিয়াছিনু,
এই নিরাশার স্রোত প্রাণের ভিতর ||
কখনো সন্ন্যাসী হ'য়ে,                        ভাবিয়াছি ধাই বনে,
না দেখি ভুলিব তায় জুড়াবে অন্তর |
দৃঢ় রজ্জু---তীক্ষ্ণ বিষ,                      হাতে করি দাঁড়ায়েছি,
জীবনের সন্ধিস্থলে হইয়া কাতর ||


(৮)
দারুণ যন্ত্রণা এত সহি নিরন্তর |
তবু কি ভুলিতে তায়,                           পারিয়াছি একদিন,
তবু কি যাতনা কভু ভেবেছি কঠোর!
তাহার ভাবনাগুলি,                           যতনে রাখিলে বুকে,
তবু যেন পূর্ণ থাকে প্রাণের ভিতর |
এ স্মৃতি হইলে লোপ,                          কি লয়ে পরাণ রবে,
শূণ্যময় মরুভূমি হইবে অন্তর!


(৯)
কিন্তু যার তরে এই জীবন কাতর |
ভবের ভিখারী সাজি,                          যৌবনে সন্ন্যাসী হ'য়ে,
যার প্রেম-সাধনায় ব্রতী নিরন্তর!
সে আজ নিষ্ঠুর মনে,                         বলে কিনা "ভুলে যাও,"
কিসে নিরমিলে বিধি নারীর অন্তর!
কঠিন পাষাণও গলে,                           অবিরত বিন্দুপাতে,
রমণী-হৃদয় কি হে তা হ'তে কঠোর!


(১০)
চিনিলে না রমণীরে এ প্রেম কেমন |
বুকভরা ভালবাসা,                            দিয়েছিনু হাতে তুলে,
যুবকের সুধাপূর্ণ নবীন জীবন |
বুক চিরে রাখিতাম,                           সোহাগে মণ্ডিত করি,
মরতের বৈজয়ন্ত দেখিতে কেমন---
আপনি কাঁদিবে দুখে,                          কাঁদাইবে অভাগারে,
নিরাশায় যাবে সখি দুইটি জীবন ||


(১১)
কোন কথা প্রিয়তমে হইব বিস্মৃত |
অতীত ঘটনাগুলি,                                হৃদয়ের স্তরে স্তরে,
অঙ্ত রয়েছে যেন চিত্রিতের মত ||
পঞ্চম বত্সর আজ,                              নিভৃত চিন্তায় বসি,
জড়ায়েছি আশালতা হৃদয়েতে কত!
সাধের সে ভালবাসা,                            সেই মধুমাখা আশা,
ভুলে যাও বলিলে কি হবে অন্তরিত ||


(১২)
জীবনের রঙ্গভূমে প্রথমে যখন---
বিশ্ববিমোহিনী রূপে,                           প্রবেশিলে ধীরে ধীরে,
সেই কথা আজ সখি হতেছে স্মরণ ||
দুইটি বৃহৎ আঁখি,                                 অনিন্দ্য বদনখানি,
নিরখিয়া কি চঞ্চল হয়েছিল মন!
অতৃপ্ত হৃদয় সেই,                                প্রথমে দেখিয়াছিনু,
অতৃপ্ত হৃদয় সেই রহিল এখন ||


(১৩)
রূপলালসায় নহে সে চিত্ত চঞ্চল,
তা হ'লে অনেক ছিল,                       সে সাধ মিটিয়া যে'ত,
তা হ'লে নয়নে আজ ঝরিত না জল |
নারীর অধিক ভাবি,                          দেখেছিনু মুগ্ধ নেত্রে,
নরের অধিক হয়ে হয়েছি বিকল |
সুধুই বাসিলে ভাল,                         ভুলিয়ে যেতাম তোমা,
সুধু ভালবাসা এত হয়না অটল ||


(১৪)
অভিমানে পরিপূর্ণ পুরুষের মন |
প্রতিদান নাহি পেলে,                            প্রণয় শুখায়ে যায়,
ঘৃণায় প্রেমের বেগ করে সম্বরণ |
প্রবৃত্তির তীব্র স্রোত,                              অহঙ্কারে চূর্ণ হয়,
সময়ে চিত্তের গতি করে নিবারণ |
বন্ধুত্বে তাচ্ছিল্য সখি,                          অন্তরে বড়ই বাজে,
সে যন্ত্রণা পুরুষের বড় নিদারুণ!


(১৫)
নিরব যন্ত্রণা তুষালনের মতন |
হৃদয়ের স্তরে স্তরে,                                নিরন্তর দগ্ধ করে,
ভাষায় নাহিক তার একটি বচন |
স্বর্গের অমিয়া আনি,                           যদি কেহ দেয় হাতে,
সে দুখীর তৃপ্তি তাহে হয় না সাধন |
ফুটিতে পারে না ব'লে,                           যাতনা দ্বিগুণ তার,
নির্জন রোদনে তার সুধু আকিঞ্চন ||


(১৬)
সেই নিদারুণ ব্যথা হৃদয়ে আমার |
এই যে বিদীর্ণ বুক,                                এই যে অনন্ত দুখ,
এই ভিখারীর বেশ---এই নেত্রাসার |
এই আত্মবলিদান,                                এ সংসার বিষজ্ঞান,
রমণি রে! অভিনেতা তুমিই তাহার |
বড় ভাল বাসিতাম,                             বড়া ভক্তি করিতাম,
ভাল প্রতিদান সখি পাইলাম তার!

.                           ****************                          
.                                                                                          
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মহাশ্বেতা
কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
(বাসন্তী কাব্য থেকে নেওয়া)


একটি মধুর ছবি,                            অতীত কালের পটে,
রয়েছে অঙ্কিত আজো উজ্জ্বল রেখায় |
তপস্বিনী মহাশ্বেতা,                          নিবিড় কানন কোলে,
জ্যোত্স্নার ছায়া যথা বনরাজিগায় ||
নিবিড় তনুয়া কিবা,                         বরাঙ্গের স্ফুট বিভা,
নয়নে বদনে ঘন মাখানো মাধুরী |
কল্পনায় সে প্রতিমা,                            ধেয়ান করিলে তবু,
উঠে ভাবুকের চিতে কি সুখলহরী ||
কিবা---তপস্বিনী বেশ,                       কিবা বিষাদের লেশ,
কি গম্ভীর হাবভাব, কি অমিয়া তায়!
পলকে পলকে তার,                           কি গম্ভীর দৃষ্টি ঝরে,
কি পূত ধারণা তার অঙ্গের সীমায় ||
বিষাদ-ভাবনা-ভরে,                             সতত বিষন্ন আঁখি
সুন্দর উরসে কিবা ভাবনা মধুর |
অপাঙ্গে নিরবে ঝরে,                               মধুর নয়ন জল,
মধুর শোকেতে বালা কিবা সে আতুর ||
বাঁশরি তুলিয়া মুখে,                           কি গীত গাহিল ওই,
ছুটিল পরাণ তার ভাসিয়া সে সুরে |
গভীর প্রভাহে মরি,                               মধুর নিনাদ করি
পড়িল ছড়ায়ে প্রাণ সে কানন পুরে ||
বিকচ-যৌবন-ভরে,                               ঢল ঢল তনুখানি
গভীর বিপিনে একা বসি তপস্বিনী |
পারশে পড়িয়া তার,                           নাথের অচেত তনু
নয়ন রাখিয়া তায় গায় বিষাদিনী ||
প্রাণ প্রাণ প্রাণ মম,                           যায় যায় যায় যে রে
অধরে ফুটিছে শ্বাস বাঁশরির গায় |
দ্রবিয়া হৃদয় লোহ,                               আনত নয়ন যুগে
নিরবে পড়িছে ঝরি সেই যাতনায় ||
বল রে জগৎ! তোর,                        বিপুল সংসারে কোথা
আছে সুখ ওই মত রোদনে যা মিলে |
কিবা সে গভীর ব্যথা,                         মধুরে পরাণে বাজে,
কিবা সে অবশ তনু শোক পরশিলে ||
কিবা সে স্মৃতির জ্বালা,                        পরাণ আকুল করে,
কি আবেশে ঝরে জল মুদিত নয়নে |
স্তবধ পরাণে যেন                                 উথলে তরঙ্গরাশি
ঘাত-প্রতিঘাতে কত সুখ উঠে মনে ||
বিধি রে জন্মান্তরে,                              দিও দুখ হৃদি পুরে
কাঁদিব পরাণ-ভরে বসি একমনে |
সংসার বন্ধনগুলি,                              দিও জন্মান্তরে খুলি
দিও কিন্তু আশা তৃষ্ণা ঢালিয়া জীবনে ||
আধ লাজ আধ ক্ষুধা                         দিও না রে হেন দ্বিধা
পরাণ ভরিয়া যেন পারি কাঁদিবারে |
অমনি বাঁশরি-গলে                              পরাণ ঢালিয়া দিব
ছড়ায়ে পড়িবে প্রাণ অমনি সংসারে ||
পাতায় লতায় মূলে,                          ও গীত যেমনি বাজে,
যেমনি কাননপুরে উঠে প্রতিধ্বনি |
আমারো সে গীত যেন,                        বাজে নরনারী-প্রাণে
সংসার পুরিয়া যেন উঠে সে নিক্কণি ||
ওই শুন তপস্বিনী                               রাখিয়া বাঁশরিখানি
সজল নয়নে চাহি শবের বদনে |
না পরশি তনু তার,                              শুধুই নয়নে হেরে
কি তৃষ্ণা-পূণিত দৃষ্টি ঝরে ও নয়নে ||
নাথের যুগল আঁখি,                            পল্লবে রয়েছে ঢাকা
গভীর নিদ্রায় যেন রয়েছে মুদিত |
বিকসিত ওষ্ঠাধরে,                             বিরাজে রক্তিম রাগ
বদনমণ্ডল যেন ভাষায় জড়িত ||
সে মৃণাল ভুজদ্বয়                               আলসে অবশ যেন
সেই পদ্মরাগ শোভে বিশাল উরসে |
প্রশস্ত ললাট খানি,                               শান্ত খেদ-ক্লেদহীন
প্রসারিত যেন ঘোর নিদ্রার পরশে ||
জীবিত এখনো যেন,                           নিদ্রিত শুধু কি তবে
সে কি রে বিষাদ কেন এতই নিষ্ঠুর |
তপস্বিনী প্রিয়তমা,                             এ দীর্ঘ বত্সর ধরি
কাঁদিছে পারশে তবু নিদ্রা নহে দূর ||
জাগ জাগ পুণ্ডরীক                              দেখরে নয়ন মেলি
কি রত্ন পড়িয়া আজ পারশে তোমার |
স্বরগের পারিজাত,                              মরতের কোহিনূর
এ রতন তুলনায় সকলি সে ছার ||
কে বলে তাপস তোমা,                    কে বলে ভিখারি তুমি
কি নরেন্দ্র কি দেবেন্দ্র কাহার ভাণ্ডারে |
আছে ও অমূল মণি,                        আছে ও প্রেমের খনি
ও অশ্রু রয়েছে বিশ্বে আর কার তরে ||
কোন্ ব্রতে ছিলে ব্রতী                       কি তপ করিলে বল
অতীত জীবনে বল কি পূণ্য লভিলে |
কি শিক্ষা শিখিয়াছিলে,                      কি মন্ত্র আয়ত্ব করি
এমন দুর্লভ রত্নে সঞ্চয় করিলে ||
অভাগা কবির ভাগ্যে                      সাধ্য কি সে দৃঢ় ব্রত?
কি কঠিন পণ তায় কি বা সে আচার |
সাধি যদি যুগে যুগে                           ধরি সে কঠোর ব্রত
ফলিবে কি সে তপস্যা অদৃষ্টে আমার ||
পূণ্যবান্ পুণ্ডরীক                               পূণ্যবতী মহাশ্বেতা
জগতের রম্য ছবি তোমা দুজন |
কালের বিশাল বক্ষে                            এমনি মধুর ভাবে
বিরাজিবে চিরদিন যাবত ভূবন ||

.                           ****************                          
.                                                                                          
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একদিন
কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
(চিন্তা কাব্য থেকে নেওয়া)


হৃদয়-মন্দিরে প্রাণ,
দেবীর চরণ তলে
.                ছিল ঘুমাইয়া |
বিজন-মন্দিরে সেই
প্রাণীমাত্র নাহি ছিল
.                দিতে জাগাইয়া ||
অতীত পূজার বেলা,
অনশনে ক্লান্ত প্রাণ
.                ঘুমে অচেতন |
ধূলায় পড়েছে ঢলি,
পাষাণে ললাট পড়ি
.                স্বেদ ঝরে ঘন ||
কাতর বদনখানি
মুদিত নয়ন দু'টি
.                গেছে কিছু খুলে |
দুই প্রান্তে অশ্রজলে
ধারা দিয়ে পড়িতেছে
.                দেবী-পদমূলে ||
দেবীর প্রতিমাখানি
বিরাজিত সিংহাসনে
.                পাষাণ-মূরতি |
এক করে সুধাভাণ্ড,
আর করে বরাভয়
.                ওষ্ঠে ঝরে প্রীতি ||
সুগোল উন্নত গ্রীবা,
ঈষদ্ বঙ্কিমে নত,
.                তাহে দু'নয়ন |
পল্লবে আবৃত আধ,
আধ বিকসিত মৃদু
.                স্নেহে অচেতন ||
সেই দৃষ্টি বিগলিয়া
প্রাণের অধরে মম
.                পড়িতেছে ধীরে |
পূর্ণিমার আলো যেন
গিয়াছে মিলিয়া, শুষ্ক
.                সরসীর নীরে ||
অনাবৃত নেত্রপথে
পশিয়া সে ভাতি, মম
.                প্রাণের অন্তরে |
স্বপনের চন্দ্র মত
উজলিয়া অন্তঃস্থল,
.                 স্বপন বিতরে ||
অতীত পূজার বেলা,
তথাপি নীরবে প্রাণ
.                আজ কি কারণ?
একে তার ক্ষীণ দেহ,
তাহে ঘোর তপস্যায়
.                সদা নিমগন!
কি জানি কি হ'ল ভাবি,
মন্দিরের দ্বার ঠেলি
.                হেরিনু গোপনে |
দেখিনু নিদ্রিত প্রাণ,
ওই ভাবে আছে পড়ি
.                দেবীর চরণে ||
"প্রাণ---প্রাণ---প্রাণ" বলি,
বিষম কাতর স্বরে
.                করিনু চিত্কার ||
শিহরি উঠিয়া বসি
উন্মাদের মত প্রাণ,
.                চৌদিকে হেরিল |
শিহরি উঠিলা দেবী,
পাষাণ-নয়নে তাঁর
.                স্নেহ মিলাইল ||

.              ****************                          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার প্রাণ
কবি ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
(চিন্তা কাব্য থেকে নেওয়া)


কল্পনে!                                                        .
বুকের পাষাণ মম,           এ জ্যোত্স্নায় একবার,
দেও সরাইয়া---
প্রকৃতির প্রীতিমাখা,             মধুর হৃদয়ে আমি,
যাই মিশাইয়া!
তুষার আবৃত ভূমে,            তরুণ অরুণ ভাতি,
যেমতি বিভাত!
দিক্ হতে দিগন্তরে,             বিমল কৌমুদী রাশি,
তেমতি সম্পাত!
জীবন্ত স্বপন যেন,                   অনন্ত গগন-বক্ষে,
পড়েছে ছড়ায়ে!
স্থাবর জঙ্গম জীব,             সকলি মোহেতে যেন,
নয়ন মেলায়ে!
আশার মধুর স্মৃতি,             যেন আজ বিশ্বখানি
আবেশে অচল |
বিধির প্রথম সৃষ্টি,              মধুর আলোকে যেন,
ভূবন উজ্জ্বল |
কল্পনে! বারেক আজ,            বুকের পাষাণখানি,
দেও সরাইয়া |
শূণ্য-পথ ভাসাইয়া,              জনস্রোত মাতাইয়া,
এই জ্যোত্স্নার সনে যাই মিশাইয়া |
ইচ্ছা করে একবার,               অনাদি অনন্ত ওই,
গগনের তলে |
কলেবর বিস্তারিয়া,                 হৃদয় বিদীর্ণ করি,
দিই প্রাণ ঢেলে |
ক্ষত মর্মস্থান হ'তে,             অজস্র প্রপাত পাতে,
প্রাণ আমার |
জ্যোত্স্নায়, জ্যোত্স্নায়,           ঝরিয়া পড়ুক ভূমে,
ভাসায়ে সংসার!
ভূতলে কঠিন যাহা,              দ্রবীভূত করি তাহা,
প্রাণের অমৃতে |
ক্ষিতি, শিলা, নর, নারী,           পাষাণ পরাণ আর
যা কিছু মহীতে |
পরাণ পরাণে এই               শূণ্য পথ ভেসে যাক্,
আর---এ সংসার |
আত্মপর জ্ঞান ভুলে,              মুহূর্তেক মগ্ন হোক্,
পরাণে আমার |
প্রাণের নিভৃত ব্যথা,           নর, নারী,হৃদে যাহা---
আমার মতন,
আমার পরাণ সনে,                উথলি উঠুক তাহা,
আকুলি ভূবন |

.                           ****************                          
.                                                                                          
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর