কবি মীর মোশার্রফ হোসেনের গান ও কবিতা
|
গোরাই ব্রীজ অথবা গৌরী-সেতু
কবি মীর মশার্রফ হোসেন
এই নামের কাব্যগ্রন্থটি ক্রকাশিত হয় ১৮৭৩ সালে। ডঃ বিষ্ণু বসু সম্পাদিত “মীর মশার্রফ
হোসেন রচনাসংগ্রহ, প্রথম খণ্ড” (১৯৫৭) থেকে নেওয়া।
ত্রেতাযুগে সীতানাথ সীতা উদ্ধারিতে।
বেঁধেছিল সিন্ধুসেতু বানর সহিতে॥
নল নীল হনুমান জাম্বুবান আদি।
সমতুল কপিকূল নাহি অন্যবাদী॥
প্রাণপণে সয়তনে সবে করি বল।
বাঁধিল দুরন্ত সিন্ধু মরি কি কৌশল॥
ধন্য ধন্য ধন্য বার ধন্য রঘুমণি।
সেতু বেঁধে উদ্ধারিলে আপন রমণী॥
সেতুবন্ধ রামেশ্বর মহা তীর্থস্থান।
কতই হয়েছে মরি তাহার সম্মান॥
এবে কলিকালে দেখ কলি মহারাজ।
সাজায় ভারত-মায়ে মনোমত সাজ॥
এমন নিঠুর রাজা দেখি না কোথায়।
লৌহহার পরাইছে মায়ের গলায়॥
ওদিকে হয়েছে লারা পশ্চিম প্রদেশ।
বাকি ছিল তাও হল বাঙ্গালোর দেশ॥
ধিক তোরে কলিরাজা বলিব কি আর।
বৃদ্ধা মার হলে দেও লৌহময় হার॥
বাঙ্গালী হবে না এত নিঠুর হৃদয়।
তাই ভেবে রাঙ্গামুখ করেছ আশ্রয়॥
রাঙ্গামুখ কটা চ’ক বড় বুদ্ধিমান।
কৌশলে মায়ের গলে মালা করে দান॥
কলিকাতা ঢাকা আর কেন ফাক রয়।
দেও হার গলে তুলি কলিরাজ কয়॥
অমনি সাজিল বীর কত শত শত |
জগতী হইতে সবে হইল নির্গত ||
সে কালের মত বীর এরা কেহ নয় |
অসি চর্ম্ম বর্ম্ম আদি কিছু নাহি লয় ||
দড়া দড়ি খুট খস্তা এদের সম্বল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
বাঙ্গাল কাঙ্গাল বড় কিছু দড় নয় |
ধবল মুখের বোলে কম্পিত হৃদয় ||
ছিলাম জঙ্গলে সবে বাঙ্গাল দেশেতে |
কটা চ’কে তোষি কত প্রাণের ভয়েতে ||
ঘরবাড়ী ভেঙ্গেচুরে করে ছারখার |
তবু বলি রক্ষা কর ধর্ম্ম-অবতার ||
দেখিতে দেখিতে গৌরীতটে উপনীত |
হুজুর মজুর লয়ে বড়ই দুঃখিত ||
বেগবতী স্রোতস্বতী গৌরী ভয়ঙ্করী |
দেখে ভেবে ভয়াকুল উপায় কি করি ||
এর পারে লৌহকার কেমনে লইব |
কেমনে লঙ্ঘিব এবে কেমনে যাইব ||
সকলেই এই ভেবে হইল অস্থির |
বাঁধিব গৌরীর সেতু শেষে করি স্থির ||
সেতু বেঁধে পার হব পারে লব হার |
দেখিব গৌরীর গর্ব্ব দেখিব এবার ||
দলে দলে শ্বেতকার জুটিল আসিয়া |
কেমনে বাঁধিবে গৌরী ভাবিছে বসিয়া ||
পরামর্শ হল শেষ অশেষপ্রকার |
বাঁধিব বাঁধিব সেতু বাঁধিব এবার ||
দলের প্রধান যিনি বসি উচ্চাসনে |
করিলেন আজ্ঞা সবে মধুর বচনে ||
গৌরীর পশ্চিম তটে কিছু ভয় নাই |
চারিদিগে ঘিরে আছি আমরা সবাই ||
সুনিয়মে সব কার্য্য সমাধা হইবে |
অল্প সংখ্যা লোক মাত্র এপারপে থাকিবে ||
পূর্ব্ব পারে আমাদের থাকিবে সকল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
পূর্ব্বপারে আমাদের কোন মিত্র নাই |
সতর্কে থাকিতে হবে একত্রে সবাই ||
আমরা বিদেশী এসে ঘিরিয়াছি দেশ |
কাছেই হইবে মনে তাহাদের দ্বেষ ||
ঢাকাই বাঙ্গাল দল আমাদের দলে |
আসিয়া মিলিছে তারা ফল পাবে ব’লে ||
কিন্তু তারা এদেশের কিছুই জানে না |
এদেশে তাদের কথা কেহই বোঝে না ||
ছলে হো’ক বলে হো’ক কৌশল করিয়া |
দিতে হবে দেশী লোক দলে মিশাইয়া ||
সুধু চাষা নিলে কিছু উপকার নাই |
সব দল হতে কিছু কিছু লওয়া চাই ||
চাষাদের কুলি ব’লে কর সম্ভাষণ |
তাতেই সন্তুষ্ট হবে তাহাদের মন ||
শাদা বস্ত্র জুতা পায় যাদের দেখিবে |
বাবু বলে সমাদর তাদের করিবে ||
হিন্দুস্থানী মারয়ারী খোটা বুনগণ |
বাছিয়া লইবে সংখ্যা করিয়ে গণন ||
এসকলে কোন কালে হবে না প্রণয় |
আমরা করিব তাহা যাহা মনে লয় ||
হবে না হবে না ঐক্য, এ দল ও দল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
অর্থের অসাধ্য কিছু নাই এ মহীতে |
উপস্থিত হল সব দেখিতে দেখিতে ||
কার্য্যকর্ত্তা হইলেন লেসলী প্রধান |
ইহার বুদ্ধিতে সেতু হইবে নির্ম্মাণ ||
বেনিডিক্ ট এসিষ্টেন্ট হইল তাঁহার |
নিকলসন্ ন্যাস্ কেরি গুণের আধার ||
রাঙ্গা কালা শাদা মুখ সাহেব-তনয় |
ঝাঁকে ঝাঁকে পালে পালে উপস্থিত হয় ||
বাঁধিতে গৌরীর সেতু হরষিত মন |
শাদা বস্ত্র জুতা ধারী জোটে অগণন ||
বাপের তাড়ান কত মায়ের খেদান |
জোটা মাত্র পদ পেয়ে বাড়িল সম্মান ||
রাম কৃষ্ণ, যাদু যাদু, প্রসন্ন রাখাল |
নসী, শশী, নন্দ, চন্দ্র,গোবিন্দ, গোপাল ||
সূর্য্য, শীল, আইজদ্দী, মহেন্দ্র, মহেশ |
গুপ্তবাবু জিতেন্দ্রিয় গুণেতে অশেষ ||
আর কত বাবুগণ কে পারে গণিতে |
কতজন সাজে বঙ্গে কে পারে বর্ণিতে ||
নানা রঙ্গে বাজিরাজি সাজায় বিস্তর |
মহিষ বলদ মেষ কুকুর শূকর ||
সংগ্রহ করিছে কত নানামত ফল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
দাঁড়াইল গৌরীতীরে সারি সারি সবে |
দেখি চমকিত লোক এরা কারা হবে ||
গৌরী পার হবে ব’লে সাজিল সকল |
বাজিল বাঁশির বাদ্য ইঞ্জিনারী কল ||
ষ্টীমার পল্টুন জোড়া বোট ডিঙি |
ফেলাট ঢাকাই বোট বড়লাল ডিঙি ||
আসিল এপারে সবে করিবারে পার |
দেখি হরষিত-চিতে মরি কি বাহার ||
সকলেই পারে যাবে বলে দাঁড়াইল |
হাসি হাসি কর্ত্তা আসি কহিতে লাগিল ||
ক্রমে পার হও সবে হয়ো না অস্থির |
হয় নাই এ পারের কোন কার্য্য স্থির ||
কে থাকিবে কার্য্যকর্ত্তা, কুলি কতজন |
কে করিবে বার্ত্তাবহকার্য্য সংঘটন ||
জীবামে রাখিয়া যাই কার্য্যভার দিয়া |
বার্ত্তাবহ কর্ত্তা দেই সূর্য্যকে করিয়া ||
সূর্য্য যদি বার্ত্তাবহকর্ত্তা হয়ে রয় |
সুনিয়মে সব কার্য্য হইবে নিশ্চয় ||
অপর এপারে থেকে না পাইবে দিশে |
থাক সূর্য্য এই পারে মনের হরিষে ||
এত বলি সবে মিলি তরী আরোহিল |
বদর বলিয়া মাঝি তরণী খুলিল ||
ষ্টীমারে ধপ ধপ করিতেছে কল |
বোটে দাঁড়ে মারে দাঁড়ী করে কত বল ||
দরিয়া গাজি বলে কেহ ছাড়িয়া তরণী |
পড়িছে ছিঁড়িয়া দাঁড় উঠিছে অমনি ||
ওপারে চলিয়া যায় দেখিতে দেখিতে |
গৌরী পার হলো সবে হাসিতে হাসিতে ||
ভীষণ তরঙ্গ গৌরী করে কল কল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
উঠিল কাসীমপুরে একত্রে সকলে |
নিরূপিত স্থানে স্থানে সব যায় চ’লে ||
কাশীমপুরেতে কেহ, কেহ বা করায় |
রহিলেন বাসা কবি যথায় তথায় ||
কোন বাবু বিবি আনি রাখিলেন ঘিরে |
কেহ মাঠে কেহ গ্রামে কেহ গৌরীতীরে ||
শত শত বার নারী আসিয়া জুটিল |
কেহ নিজে ঘরে কেহ বাসায় রহিল ||
সাহেবের বিবি সব গাউন পরিয়া |
সকালে বিকালে মাঠে বেড়ায় ঘুরিয়া ||
বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী কটা কটা কেশ |
মুখে গন্ধ, সব মন্দ সুধু ভাল বেশ ||
কেবা বা কার ভালবাসা, কেবা কার নারী |
অঙ্গভঙ্গ রঙ্গ দেখে চিনিবারে নারি ||
সকলেই করে কর, করিছে দলন |
সকলেই মুখে মুখ, করিছে চুম্বন ||
দেখিয়া অবাক মোরা, বাঁচি না লজ্জায় |
কেবা কার চেনা ভার, এত বড় দায় ||
এ দেখে এ দেশে নারী-স্বাধীনতা কাজে |
মত দিতে বিধিমতে হৃদে শেল বাজে ||
সুরেশ্বরী ধান্যেশ্বরী বোতল সহায় |
উপস্থিত হইলেন আসিয়া কয়ায় ||
গলবস্ত্রে কত বাবু করে জোড় কর |
কত মতে করিতেছে মায়ের আদর ||
বারাঙ্গনাগণ সবে প্রাঙ্গনে আসিয়া |
কহিছে কাতরে কত মিনতি করিয়া ||
থাক মা এপারে থাক সুরার ঈশ্বরী |
সেবিব তোমারে মোরা, ওমা ধান্যেশ্বরি ||
সাহেবেরা করিবে না তোমায় আদর,
ক্ষতি নাই তাতে দুখ, করো না অন্তর ||
আমরা করিব সেবা, তোমার চরণ |
গটুহেল ক’রে দিব, রাঙ্গা মুখগণ ||
আসিতে দিও না কাছে, সাহেবের দল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
শিকলে আঁটিয়া কল দোলাইল কত |
রথ কল টানা কল, কল নানা মত ||
জল তোলা, মাটি কাটা, কাদা করা কল |
কত কল পল্টুনেতে, মরি কি কৌশল ||
সূত্রধর বুন কুলি, খাটে অগণন |
প্রাণপণে খাটে কত দেশী বাবুগণ ||
শিকলে আঁটিয়া কত বড় বড় চঙ্গ |
পুঁথিছে গৌরীর গর্ভে ক’রে নানা রঙ্গ ||
ধপ ধপ করে ওঠে, এঞ্জিনের ধূম |
পল্টুনে গৌরীর গর্ভে লেগে গেল ধুম ||
গৌরীজল কলে ওঠে এত বল ক’রে |
দু দিন শুকায়ে গৌরী যেন যাবে ম’রে ||
ছলে বলে সুকৌশলে গৌরীর বুকেতে |
ক্রমে লৌহস্তম্ভ সব লাগিল পুঁতিতে ||
পাথর ফেলিল কত গৌরীর জীবনে |
মারিবে জীবনে গৌরী আশা আছে মনে ||
তরঙ্গের রঙ্গ আর দেখা নাহি যায় |
কেবল কান্দিছে গৌরী ক’রে হায় হায় ||
এদিকে খালাসী দল আল্লা আল্লা ব’লে |
পুঁতিছে লোহার থাম জাঁতা কলে বলে ||
হা ইলেছা ব’লে সবে টানিতেছে কল |
ধন্য ধন্য রাঙ্গামুখ ধন্য বুদ্ধিবল ||
কারো কারো বাসায় নিশিতে বড় রং |
কেহ নাচে কেহ গায় কেহ দেয় সং ||
সাহেব মাতিছে মদে বিড়ালাক্ষী নিয়ে |
পড়িছে বিবির গায় ঢলিয়ে ঢলিয়ে ||