চাষার দাবী কবি অক্রুরচন্দ্র ধর কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৭ (জুলাই ১৯২০) সংখ্যায় প্রকাশিত।
বোশেখ মাসে সূর্য্য যখন ধরার বুকে আগুন ঢালে, আষাঢ়েতে আকাশ যখন আঁধার করে মেঘের জালে, ভয় করিনে সেই দিনেও রৌদ্র-বৃষ্টি মাথায় ক’রে ঘুরে বেড়াই মাঠের মাঝে তোমার ওগো তোমার তরে। তবু আমার নামটি নাহি---তবু আমি মূর্খ চাষা “স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া আমার তরে নাইকো ভাষা!
তোমার যখন ঘুম ভাঙে না শুয়ে থাক শয্যামাঝে, আমি তখন জেগে উ’ঠে ছু’ঠে চলি মাঠের কাজে। অনাহারে অর্দ্ধাহারে মোটা সূতার গামছা প’রে। ক্ষুধার অন্ন তৃষার বারি জোগার করি তোমার তরে। তবু আমার নামটি নাহি তবু আমি মূর্খ চাষা! “স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া আমার তরে নাইকো ভাষা!
তোমার গায়ে রেশমী জামা শান্তিপুরের ধোয়া ধুতি তোমার পায়ে জরির জুতো নয়শো যুগের পুরাণপুঁথি মিশ্রিমাখা দুধের বাটী পাঁচ বেনুনের অন্নথালা জান তো সে আমারি যে নগ্ন দেহের শোণিত ঢালা? তবু আমার নাম করো না তবু আমি মূর্খ চাষা “স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া আমার তরে নাই কি ভাষা?
আমার গাছের ফলের ঝুড়ি গন্ধে ভরা পুষ্প সাজি, আমার ক্ষেতের সবুজ ফসল ধান্য দূর্ব্বা শম্পরাজি, এক কথাতে এই জগতে আমার বলতে যাহা আছে সকলিতো দান করেছি অকাতরে তোমার কাছে। তবু আমার নাম হ’লো না তবু আমি মূর্থ চাষা “স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া তোমার মুখে নাইকো ভাষা।
এত সাধের বুধী গাইয়ের মিষ্টিমধুর দুধের হাড়ি চাট্টি পয়সার বিনিময়ে দিয়ে এসে তোমার বাড়ী, বেগুণ পোড়া আলুভাতে পেয়েই আমি তুষ্ট থাকি, তবু তুমি কথায় কথায় আমার প্রতি রুষ্টআঁখি? আমার কষ্ট-উপার্জ্জিত টাকার থলি বাক্সে আমি’ সুদের সুদে তস্য সুদে আমারি খাও হাড় ক’খানি। তবু তুমি জ্ঞানবন্ত, আমি একটা মূর্খ চাষা “স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া করতে নারি কোনই আশা!
তোমরা যেগো ইমান ছাড় শিখ্ লে দুটি ম্লেচ্ছ বুলি আমরা শত বিপদেও বিশ্বেশ্বরে যাইনা ভুলি’। লক্ষপতি হলেও তোমার “দেহি দেহি” সাধ না মিটে, রাজার রাজ্য এই আমার দাদার কেলে পুরাণ ভিটে। ভেবে দেখ এই ভাবেতে অত্যাচারে অবিচারে--- হিংসা দ্বেষ ঘেন্না আদি কঠিন পাপের গুরু ভারে, মনুষ্যত্বের সোপান থেকে ক্রমেই তুমি যাচ্ছ নামি’, ধীরে ধীরে সে পথ ধরে রোজকে রোজই উঠ্ ছি আমি। যায় না তবু জ্ঞানের বড়াই কওনা দুটো মিষ্টিভাষা--- তোমার মত মানুষ হ’তে চাই না আমি---অজ্ঞ চাষা।
কামিনী ও কাঞ্চন কবি অক্রুরচন্দ্র ধর মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৩০ (জুলাই ১৯২৩) সংখ্যায় প্রকাশিত।
“কামিনী ও কাঞ্চন দুহুঁ সমতুল্য, মোহ মায়া লাঞ্ছন উজল প্রফুল্ল--- দুহুঁ বহু রংদার হাতে বাঁধা সংসার” হায় হায় জেনে শুনে কেন গুণী ভুল্ল? শত হোত ক্ষমতায়, তবু কি এ দুনিয়ায় কাঞ্চন দিতে পারে কামিনীর মূল্য?
কাঞ্চন হার গেঁথে বুকে রাখি বাইরে, অন্তর-অন্দরে কামিনীর ঠাঁই রে! কাঞ্চন চেষ্টায় বহু মিলে দেশটায়, কামিনী যে জগতের যেথা সেথা নাই রে! নিদেশে সে বিধাতার নিরুপম নিধি তার চিরদিন বিনা মূলে পাই মোরা পাইরে!
“কামিনী ও কাঞ্চন দুহুঁ পরিত্যজ্য” ---এ কি কথা শাস্ত্রের? এ কি হবে গ্রাহ্য ? কাঞ্চন ছাড়া নয় চলিলই দিন কয়, কামিনী ছেড়ে কি চলে বিধাতার রাজ্য ? ঘরে যার দারা নাই, বিপদে কে হবে ভাই ? দুঃখে কে সখা হবে করিতে সাহায্য ?