কবি আনন্দচন্দ্র মিত্রের কবিতা ও গান
গোলাপ ফুল
কবি আনন্দচন্দ্র মিত্র
দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার ১২৯২বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায়
(নভেম্বর ১৮৮৫) প্রকাশিত।


সাধে কি গোলাপ ফুলে
.                আমি ভালবাসি সই ;
আমার মনের কথা,
.                শোন্ সখি তোরে কই।
---আমি যাঁরে ভালবাসি,
.                তাঁর মৃদু মৃদু হাসি,
সুধাংশু কিরণ সম
.                মাঝে মাঝে পড়ে খসি ;
সে অমূল্য ধন পেয়ে
.                চির পিপাসিত হিয়ে,
পৃথিবী হৃদয় মাঝে
.                রাখে সখি লুকাইয়ে ;
হে হাসি জমাট হয়ে
.                ধরা বক্ষ বিদারিয়ে,
বাগানে গোলাপ রূপে
.                ফুটে ফুটে ওঠে ওই।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বঙ্গবিধবা
( জ্ঞানদাসের ছন্দানুকৃতি )
পথিক
কবি আনন্দচন্দ্র মিত্র, “পথিক” ভণিতায় লিখতেন।
কালীপ্রসন্ন ঘোষ সম্পাদিত “বান্ধব” পত্রিকার ১২৮৫ বঙ্গাব্দের ৪র্থ সংখ্যায় (১৮৭৮) প্রকাশিত।



সখিরে কি কব মনের দুখ ;
কি সুধাও সই কি কহিব তোরে,
ভাবিতে বিদরে বুক।
(সখিরে) বিধাতা করিলা জনম দুখিনী,
যুবতি বিধবা বালা ;
(ছায়) অনুদিন সই, নয়নের জলে,
ঘুচাই মনের জ্বালা।


সখিরে, আমি হেন অভাগিনী,
নাহি জানি পতি কিবা সে মূরতি,
বিবাহ কি নাহি জানি।
(সখি) মা বাপ নিদয়, শৈশব সময়ে,
পর হাতে সঁপি দিলা,
(আমি) অনিচ্ছাতে সই, খেলিনু তখন,
সে এক দুঃখের খেলা।


সখিরে কি কব প্রাণের জ্বালা ;
ছিড়িয়া কলিকা, কণ্টক লতায়,
বিঁধিয়া গাঁথিল মালা!
(সখি) তাতেও আবার, বিধাতা বিমুখ ;
সেও মালা ছিঁড়ে গোল ;
আমি ধূলায় পড়িয়া, যাই গড়গড়ি,
এ মোর কপালে ছিল!


সখিরে, বিধাতা নিঠুর অতি ;
দুঃখের অনলে, দহিতে নিয়ত,
গড়েছিলা এমূরতি।
(সই) হেন যদি বিধি, করিলা অবিধি,
কেন না হরিলা স্মৃতি ;
কেন লো স্বজনি, বাসনা কামনা
(পাপ) হৃদয়ে করিলা স্থিতি@।


সখিরে, কাল নিশি অবসানে ;
দেখেছি যেরূপ, পাশরিতে নারি,
ধৈরয না ধরে প্রাণে!
(সখি) কুসুম কাননে, একাকী বিরলে,
যখন ছিলাম বসি ;
(আমি) সহসা দেখিনু, হাসিতে হাসিতে,
ভূতলে নামিল শশী।


সখিরে, কি কব রূপের কথা ;
সে মুখ স্মরিতে, ঝড়ে দুনয়ন,
মরমে উপজে ব্যথা!
(ছায়) কিবা অনুপম, সে শ্যাম মূরতি,
বদনে প্রীতির ভার ;
(সই) চাহিতে চাহিতে, দেখিতে দেখিতে,
হরে নিল মন আমার।


সখিরে কিবা সে মধুর ভাষা ;
শুনিতে শুনিতে বাড়িল পিয়াস,
না পূরিল মন আশা!
(জিনি) বংশীর সুরব, কোকিল কাকলি,
কহিলা করুণ স্বরে ;
“(বড়) ভাল বাসি আমি, তোমারে সুন্দরি,
এসেছি তোমার তরে।”


সখিরে, আমি হেন অভাগিনী ;
ভাল বাসি তোরে এমধুর কথা,
জনমে নাহিক শুনি!
(হল) আলু থালু প্রাণ, হারাইনু জ্ঞান্
হইনু পাগল পারা ;
(তখন) খসিল বসন, ঘন বহে শ্বাস,
স্থির দুনয়ন তারা!


সখিরে, কি কব এ পোড়া মুখে,
মনে হল সাধ, কণ্ঠহার করি,
পরি সে রতনে বুকে।
(আমার) মনে হল সাধ, প্রড়িনু প্রমাদে,
দুরু দুরু হিয়া কাঁপে ;
(তখন) চারিদিকে চাই, দেখে যদি কেহ,
পুড়িব কলঙ্ক তাপে!

১০
সখিরে, বলিতে বিদরে হিয়ে!
নেহারিনু আমি, সেইরূপ রাশি,
নয়নে নয়ন দিয়ে।
(তখন) সেই সুধাকর, কোমল দুকর,
কণ্ঠেতে করিল দান ;
(অমনি) সাপটিয়া সই, ধরিনু উরসে,
পরশে অবশপ্রাণ!

১১
সখিরে, আচম্বিতে এ কি হল ;
অধরে চুম্বিতে, পূর্ণিমার চাঁদ,
আকাশে মিশিয়া গেল।
(সখি) হইতাম যদি, বন বিহঙ্গিনী,
উড়িতাম তার তরে ;
(আমি) হইতাম সুখী, বারেক নিরখি,
সেই পূর্ণ শশধরে।

১২
সখিরে, আমি হেন অভাগিনী,
এ পাপ পরশ, সহেনা সে দেহে,
হায় আগে নাহি জানি!
(আহা!) পাই যদি পুনঃ সেই সুধাকরে,
দেখিয়া ঘুচাই ক্ষুদা ;
(আমি) দূর হতে সই, চকোরের মত,
খাই সে মুখের সুধা!

১৩
সখিরে, পাসরিয়া ভয় লাজে ;
যোগিনী হইয়া বেড়াইব সখি,
গহন কানন মাঝে।
(সখি) কখন কাঁদিব, কখন হাসিব,
কভু পড়ি ধরাতলে ;
(আমি) নখরে কাটিয়া, সরোবর সই,
ভরিব নয়ন জলে!

১৪
সখিরে, সেই সরোবর মাঝে ;
কুমুদিনী হয়ে, বেড়াব ভাসিয়ে,
দেখিতে সে দ্বিরাজে?
(আমি) আকাশের পানে থাকিব চাহিয়া,
ঐরূপ করিব ধ্যান ;
(সখি) না পাইলে তারে, অগাধ সলিলে,
ডুবিয়া ত্যজিব প্রাণ!

১৫
সখিরে, কি কাজ বিলম্ব করি?
আর এক পথ, আছেরে আমার,
শোন তবে সহচরি।
(সই) সাজাইয়া চিতা, জ্বলন্ত অনলে,
পাপ দেহ করি ছাই ;
মনের আগুন, মিশিবে আগুনে,
(আমার) বেঁচে থেকে কাজ নাই!

১৬
সখিরে, সেই সুখের শ্মশান পরে ;
অশোক বকুল, তমালের তরু,
রোপিস্ যতন করে।
(যখন) পথিক আসিয়ে পথশ্রান্ত হয়ে,
বসিবে সে তরুতলে ;
(তখন) কহিস “এখানে, বঙ্গের বিধবা,
পুড়িয়াছে চিতানলে!” (পথিক)


@ - স্থিতি করিলা সকর্ম্মকরূপে ব্যবহৃত।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
চোকের দেখা
কবি আনন্দচন্দ্র মিত্র
কবির ১৩০৪ বঙ্গাব্দে (১৮৯৭) প্রকাশিত “মিত্রকাব্য” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


অনেক দিনের পরে প্রিয়ে,
.                সে দিন তোমায় দেখেছি,
নয়ন-জলে বক্ষস্থলে
.                পদচিহ্ন এঁকেছি।
প্রেম-নয়নে মুখের পানে
.                সেই য়ে তুমি চেয়েছিলে,
কোথা হতে নয়ন-পথে
.                না জানি কি ঢেলে দিলে,
অবসন্ন হলো দেহ,
.                স্থির হইল নয়ন-তারা,
আপনি আপনি বলেছিলেম
.                কি যেন পাগলের পায়া  ;
আত্মহারা হয়ে গেলেম
.                অচল হলো পা দুখানি,
প্রাণের মাঝে কি যে হলো,
.                প্রাণ জানে, আর আমি জানি!
উথলিয়া উঠলো হৃদয়
.                দেখে তোমার বদন-চাঁদ,
আর খানিকটা হলে পরে
.                ভেঙ্গে যেতো বুকের বাঁধ!
দূরে থেকে চোকের দেখা
.                দেখেই যদি এমনি হয়,
স্পর্ষ হলে কি যে হতো,
.                ভেবেই আমার হচ্ছে ভয়!
কি আর হতো? পা দুখানি
.                যদি তোমার বক্ষে পেতেম
প্রেমের শত খণ্ড
.                হয়ে না হয় ভেঙ্গে যেতেম।
মাটির দেহ পড়ে থাকতো,
.                বেড়িয়ে যেত অমর প্রাণ ;
অমর লোকে গিয়ে আমি
.                গেতেম তোমার প্রেমের গান।

.              ********************
              

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*