ভোরের বেলায় কাগজ প’ড়ে জানতে পারি খবর, হাজার মানুষ জ্যান্ত হয়ে উঠছে ছেড়ে কবর। তড়িঘড়ি ছুটে সেথায় সবই শুনি বাজে, কলকাতাতে এমন খবর ছাপে সব কাগজে॥
নতুন দিনে নতুন বাড়ির গৃহপ্রবেশ হবে, তার-ই আগে খস্ বে সব ইঁট, দেয়াল হেলে যাবে। এমনটি ‘কেস’ নতুন কি আর, এমন ঘরেই জমা, কলকাতাকে কেউ কি বলে সাধেই তিলোত্তমা॥
ফুটপাথে হকারেরা জুড়ে দুইধার, কেনা-বেচা, দরাদরি---চলা সেথা ভার। ট্রামলাইনে লোক হয়ে নিরুপায়, যেতে গিয়ে চড়ে চাপা---এই কলকাতায়॥
যতই বল--- ; এমনি শহর নেইকো ডুপলিকেট, তিনশ’ বছর করল একাই ভারতে আপসেট। সোনার অক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসে, কলকাতাকে কত লোকে কতই ভালবাসে॥
লণ্ডন, মস্কো, নিউ-ইয়র্ক ফেলে, বিলিতি লোকও আসে কলকাতায় চলে। চার্ণক গড়ে গেছে যে সোনা শহর, কলকাতা নাম তার, অদ্বিতীয়---অমর॥ . *****************
জীবনপ্রদীপ কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
জীবন যেন প্রদীপখানি সম, . জ্বলতে খাকে তেল যতক্ষণ রহে। বয়স ততই বাড়তে চলে মম, . যতদিন রক্ত আমার দেহে। দুরন্ত ঘুর্ণী হাওয়া কাঁপায় যখন শিখা, . শিখা তখন নিবু-নিবু প্রায়--- মনে করো ভাগ্যে আমার লিখা, . জীবন আমার আর নিরাপদ নয়। তেল যখন ফুরিয়ে য়েতে চায়, . প্রদীপ কহে ‘নিবতে হবে জানি’। আমি বুঝি মোর জীবনে হায়, . বৃদ্ধকালের লেশ এনেছি টানি। যদি কভু হঠাৎ জীবনপ্রদীপ, . পড়ে গিয়ে চুরমার হয় ধূলে, আমি জানি অন্ত আমার সমীপ, . অন্ধকারে হৃদয় উঠে দুলে। প্রদীপ যদি টিমটিমিয়ে জ্বলে, . সলতে তাহার দেখায় যদি ভোঁতা, জানব আমি জন্মেছিলাম ভুলে, . জীবন আমার হ’ল কেবল বৃথা। . *****************
মন্দ ভালোর ছন্দ কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
মন্দ ভালোর ছন্দে ভরা গান আমার, যাো শুনে যাও শুনে, আর একটি বার। . গান শুনে মোর . কেউ ভরে ঘর . হাততালিতে, . কেউ গালিতে। ভালবাসে কেউ গানেরে, কেউ করে ধিক্কার॥ . তুমি যেও না চলে . মোর গানকে ফেলে, . মোর গান তোমারি . হায় হে পূজারি॥ . শুনে এ গান . ভরে যে প্রাণ . এক নিমেষে . কি গান শেষে। হয়তো আমার গানের আসো আসলে আমার। . *****************
চাই কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। সরোদীয়া শ্রীবুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ৬০ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে কবি এই কবিতাটি লিখে, নিজের হাতে তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন।
চাই একটি সরোদ, কিছু ভাল শ্রোতা, দুটি হাত, চাই বাগেশ্রী, বারওয়া, বেহাগ, . হয়তো গোটা একটি রাত॥ চাই সাধনার জোয়ারে ভাসা . সুরের একটি ভেলা, চাই আলাপের অভিযান, গতের আবেদন, . ঝালার চঞ্চল খেলা॥ চাই ভাষাহীন শব্দের বিড়ম্বনা, . মধ্যম থেকে কোমল গান্ধারের করুণ মীড়, চাই ফাঁকিহীন, ত্রুটিহীন জবার ডারা-ডিরির ভীড়॥ চাই কাঁদাতে চোখ, ধুয়ে ফেলতে দুঃখ, . চাই ভোলাতে মন, জীবনের কিছু ক্ষণ॥ এক কথায়--- চাই আপনাকে, আপনার সরোদ . এবং সময়হীন একটি পরিবেশন॥ . *****************
যুগলবন্দী কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। এই কবিতাটির মাধ্যমে কবি তাঁর গুরু দিলশাদ খাঁ ও পরভীন সুলতানাকে ১৩৯৯ সনে (১৯৯২) শারদীয় প্রণাম নিবেদন করেছিলেন।
গানের অবসর বসেছে আজ, বিশ্বজোড়া শ্রোতা, হল্-এ হুলুস্থুলু, সীট নোইকো ফাঁকা কোথা! স্টেজের পিছে হচ্ছে কি যে, জানে না তো কেউ, শ্রোতার মাঝে তাই তো আজি উত্তেজনার ঢেউ। যথাসময়ে হলের আলো নিবলো যত সব, হঠাৎই বন্ধ হ’ল চিত্কার কলরব ; চারিদিকে আঁধার, তবে মঞ্চে আলোর চাঁদ, একই সাথে গাইবে রাতে--- . পরভীন্-দিলশাদ্॥ সবার বুকেই দুরুদুরু---কি রাগ হবে আজ, মালকোষ কি মুলতানি, ইমন কি খাম্বাজ ? সারা হল্-এ যত আছেন গুণিজন সবে, জানেন তাঁরা খাঁ সাহেবের নিজের রাগই হবে॥ যাহোক্ এবার হ’ল শুরু, ‘আলাপ’ প্রথমেই, ষড়জ এমন নিখুঁত যে হয় বুঝলো সবাই এই। খাঁ সাহেবের গভীর গলার নাদের যে নেই শেষ, পরভীনের মিষ্টি সুরেও মন ভরেছে বেশ। দু’জনার কণ্ঠ যেন এক হয়েছে মিশে ;--- কত রেয়াজ তবেই না আজ মিলেছে দুই দিশে। ক্রমে এল তানের ঝলক, তারপরে সরগম্ , জানলো কি কেউ, এর পিছনে আছে এত শ্রম। বিলম্বিতের রেশ কাটিয়ে যখন এল দ্রুত, কেউ বললো, “অসম্ভব”, কেউ বা “অদ্ভুত”। একের পর এক সপ্তক হ’ল সুরেই জয়, নিন্দুকেরাও নিন্দা ভুলে ডুবলো যে বিস্ময়ে। তারপরেতে ঠুংরি হ’ল, হ’ল ভজন-তিন, সব আবেদন করলো উজাড়--- . দিলশাদ ও পরভীন॥ মিথ্যে যেন কথার ঠেলায় হচ্ছে সময় নষ্ট, এক মিনিটে, গানেই যে হয় সব কথাটা স্পষ্ট। আরো কত লিখবে, ভেবে পায় না অনির্বাণ, তাদের একটি সুরের পাশে কাব্য যে হয় ম্লান। পুজোয় এবার এই ‘কবিতা’ই দিলাম ‘উপহার’, সঙ্গে আছে ‘ভালোবাসা’ এবং ‘নমস্কার’॥ . *****************
একই দেশের ভাই কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
মোরা, একই গাছের পাতা সবাই . একই দেশের ভাই, তবু মোরা নিজের মাঝে . কেন করি লড়াই। একই নদীর ওই সহস্র ঢেউ, . মোদের মত লড়ে না কেউ, শান্তি পেলেও কেন মোরা, . অশান্তিকে চাই--- . একই দেশের ভাই। দূর গগনের তারার ও দল জানে না তো লড়ার এ ছল, তাদের মত আমরা কেন, . থাকি না এক ঠাঁই--- . একই দেশের ভাই। . *****************
শ্যামবাজারে কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
সেদিন হঠাৎ শ্যামবাজারে বোম পড়ল পথের ধারে। চলতি যে ট্রাম থামল এসে বাস দাঁড়ালো ট্রামকে ঘেঁষে। রবিবারের বারবেলাতে লোকের কি ভীড় ; বোম পড়াতে ছুটছে সবাই, দিশেহারা, পুলিশ এসে লাগায় তাড়া। ল্যাম্প-পোস্টের কাকগুলি সব, সে কি বিষম তুলেছে রব। এর-ই মাঝে বঙ্গ নেতা দেখিয়ে গেলেন অঙ্গের কেতা। ফাটিয়ে গলা, ফাটিয়ে কান, কহেন, বলি “সে কোন জন ?” “সি.পি.এমের সাহস এত সামনে আসুক, দেখব কত।” ওদিকেতে অপর পার্টি চড়িয়ে গলা আরেক কাঠি, বলেন, “দেখে নেবো মোরা, কি করবি তা কর রে তোরা।” এদের কথা হাজার কথায় রইল মিশে মোড়ের মাথায়। লোক হয়েছে জড়ো আরো, লোকের চাপে লোকই মরো। হেঁকে সবাই রাতারাতি, শ্যামবাজার আজ করল মাতি। এমন সময়--- ডিটেকটিভ এক সায়েব এসে, খোঁজ নিল তাঁর প্রথম ‘কেসে’, খবর নিয়ে বললে, “আরে, আজব কাণ্ড শ্যামবাজারে! ফাটল যে বোম তা আসলে বোম নয় সে, পাইপ জলের।” . *****************
পড়া! পড়া! পড়া! কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
সারাদিন পড়া, পড়া, পড়া, অসম্ভবের সাথে লড়া--- ; কত দিন আর প’ড়ে যাব, কখন যে একটু জিরাব! বললেই বাবা বলে মোরে, “পড়ার কি শেষ আছে ওরে ; আমি তো এখন-ও প’ড়ে যাই ; আমি বুঝ্, বোঝে না বাবা-ই। খেতে গেলে, “কোথা ভাত হয়?” ভুগোলের মাস্টার কয়। বিজ্ঞান আসে তেড়ে-মেরে, বলে, “ফল কেন নিচে পড়ে।” ইতিহাস ছুটে আসে রাতে, দেখি আমি ‘শিবাজী’র সাথে। সবচেয়ে বাজে লাগে, যেই অঙ্ক মেলে না কিছুতেই। ভাঙে মোর দাঁতগুলি হায়, বাংলা বানানের ঠেলায়। যদি বলি, ‘এবারেতে খেলি’, মা বলেন “পড়াশুনা ফেলি ?” ফিরে যাই পড়ার ঘরে আবার, পড়াশুনোরে---ধিক্কার! যত বলি পড়াশুনা হ’ল কত, আর নয়, শেষ ঠিকমত, বাবা বলে কুঁচকিয়ে ভুরু, “দূর বোকা! এ তো সবে শুরু।” দিনরাত শুধু পড়া ক’রে, মাথা মোর রোজ যায় ধ’রে। ইচ্ছে করে বই সব তুলে, সারাদিন থাকি তারে ভুলে। ফলবে না জানি সে উপায়, পা আছে যে বই-এরও পাতায়। ফের সারাদিন ‘পড়া, পড়া’, তার ফাঁকে লুকিয়ে এ ছড়া, লিখে আমি বাঁচলাম শেষে, “শেষ নাকি ?” বাবা বলে হেসে। হাত তুলে মা করেন তাড়া--- আবার সেই পড়া, পড়া, পড়া! . *****************
শুভ ভাই কবি অনির্বাণ সিনহা কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
দুষ্টু হলেও মিষ্টি বড়ই ছোট্ট ছেলেরা আদর, অভিমান, আর কেবল বায়না ধরা। . মায়ের ওপর অত্যাচার . দাদাকে বিষম মার সেই মার, সেই যন্ত্রণা, ভালবাসায় ভরা। . *****************