মিলনসাগরে আমরা কবির উপরোক্ত গ্রন্থ থেকে ১৪টি গান ও ১০টি কবিতা তুলে দিয়েছি। কিশোর কবি
সুকান্ত ভট্টাচার্যর পরে এই আরেক কিশোর কবি অনির্বাণ, বিদ্যুতের ঝলকানি দিয়ে চলে গেলেন। অতি
অল্পক্ষণের জন্য হলেও সারা আকাশ ও পৃথিবী বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়। তাঁর রচনার ভাবনা ও
বিষয়ের পরিপক্কতা এতটাই পরিণত যে বিশ্বাস হতে চায় না যে এই কবি কৈশোরের চৌকাঠও পার হতে
পারেননি। এত অল্প বয়সে তাঁর অনেক কবিতা ও গানে তাঁর ঈশ্বর-চিন্তা ও জীবনবোধের উপলব্ধি পরিণত
বয়সের মানুষকেও বিস্মিত করে।
আমরা মিলনসাগরে কবি অনির্বাণ সিনহার গান ও কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে
পারলে আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক মনে করবো।
কবি অনির্বাণ সিনহার মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
উত্স -
- সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, ভূমিকা, কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৯৫ সালে আনন্দ
পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ।
- অমরনাথ নাগ, কবিপরিচিতি, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ।
- অরুণিমা সিংহ ও ইন্দ্রজিৎ সিংহ, নিবেদন, “জাগো জাগো কবি” কাব্যগ্রন্থ।
- কবির মাসী শ্রীমতী অরুন্ধতী দেবের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সাক্ষাত্কার। মিলনসাগরের পক্ষে
সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেছিলেন সাগরিকা সেনগুপ্ত ও মিলন সেনগুপ্ত।
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২৪.০৬.২০১৮
...
কবির মাতামহীর পিতার পিতামহ দ্বারকানাথ ভঞ্জ ছিলেন বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী ও শীক্ষাবীদ। তিনি ১৮৫৬ সালে
২৪ পরগণার বহরুতে সাউথ সাবার্বান বহরু স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে বহরু হাই স্কুল নামে খ্যাত।
এই স্কুলের প্রাক্তনীদের মধ্যে রয়েছেন ডঃ নীলরতন সরকার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রমুখরা। দ্বারকানাথ ভঞ্জর প্রতিষ্ঠিত বালমিকি প্রেস থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বর্ণকুমারী দেবী,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখদের বিভিন্ন গ্রন্থাবলী ছাপা হয়েছে।
কবি, ১৬ বছর বয়সে দুর্বার ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হন। দুবছর দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করে ১৯৯৪ সালের
১৬ই ফেব্রুয়ারী, মাত্র ১৮ বছর বয়েসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কবি দশ বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। কবিতা তাঁর এতই মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল যে এমন
অনেক দিন গিয়েছে, যেদিন তিনি বাড়ীর সবার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে কথা বলেছেন! কবিতার পাশাপাশি তিনি
গান লিখে সুরও দিয়েছেন। গান ছিল তাঁর একান্ত নিজের, সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। তাঁর ইচ্ছে ছিল যে তিনি
গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। প্রথমে গান শিখেছিলেন এ.টি. কাননের ছাত্রী লতা ব্যানার্জীর কাছে।
পরে নাড়া বেঁধেছিলেন ওস্তাদ দিলশাদ খাঁর কাছে।
তাঁর বিদ্যালয়, ‘সেন্ট জোসেফ স্কুল’-এর পত্রিকায় তাঁর দু-একটি ইংরেজী কবিতা ছেপে বেরিয়েছিল। এছাড়া
তাঁর জীবিত অবস্থায় তাঁর লেখা আর কোথাও প্রকাশিত হয় নি। প্রয়াণের পরে তাঁর পিতা-মাতা তাঁর
স্মৃতিতে দুটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের সূচনা করেন। ৯ই জুন, অনির্বাণের জন্মদিনে অনির্বাণ সঙ্গীত সম্মেলন এবং
১৬ই ফেব্রুয়ারী তাঁর প্রয়াণ দিবসে অনির্বাণ মেমোরিয়াল কনসার্ট। এছাড়া, ‘জাগো জাগো কবি’ নামে তাঁর
কবিতা ও গানের একটি সংকলন প্রকাশিত করেন আনন্দ পাবলিশার্স। তাতে ভূমিকা লিখেছিলেন সঞ্জীব
চট্টোপাধ্যায়, কবিপরিচিতি লিখেছিলেন অমরনাথ নাগ এবং বইটি নিবেদন করেছিলেন কবির মাতা
অরুণিমা সিংহ এবং পিতা ইন্দ্রজিৎ সিংহ।
এই তিনটি লেথা, আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি কবিকে আরও ভালভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে।
জাগো জাগো কবি কাব্যগ্রন্থের "নিবেদন" - পাতার উপরে . . .
“অনির্বাণ যতদিন আমাদের মধ্যে ছিল, তার বাংলা লেখা কোথাও কখনো ছাপা হয়নি। তার স্কুলের
পত্রিকায় কেবল, তার দু’-একটি ইংরিজি কবিতা বেরিয়েছিল। নিজের লেখা প্রকাশ করবার ব্যাপারে তেমন
কোনও ঝোঁক তার কোনওদিনই ছিল না। বিশেষ করে গান ছিল তার একান্ত নিজের জিনিস। কবিতা লিখে
অনেক সময় শোনাতো বা দেখাতো, কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে যে, সে থাকাকালীন আমরা কেউই কোনও
সময় তার গানের আশ্চর্য ভাব-জগতের কথা জানতে পারিনি। অনির্বাণ গায়ক হিসেবে একদিন আত্মপ্রকাশ
করবে, এই ছিল তার অভিলাষ। তার বদলে আত্মপ্রকাশ করলো তার লেখা কবিতা ও গান---হয়তো সে নেই
বলেই।
এই বইয়ের প্রকাশনার ব্যাপারে স্কটিশ চার্চ কলেজের গ্রন্থাগারিক শ্রীমতী কবিতা রায়ের অবদানের জন্য
আমরা তাঁর কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তিনি আন্তরিক আগ্রহে, বইয়ের আহাগোড়া প্রুফ দেখে দিয়েছেন
এবং সম্পাদনার কাজে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। ‘কবির পরিচয়’ লিখেছেন শ্রীঅমরনাথ নাগ। তাঁর
স্বতঃস্ফূর্ত অবদানের জন্য আমরা তাঁর কাছেও কৃতজ্ঞ। সর্বোপরি আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ‘আনন্দ
পাবলিশার্স’কে, যাঁরা এক অস্ফুট কিশোর কবির রচনা প্রকাশ করতে নিঃসংকোচে এগিয়ে এসেছেন।”
অরুণিমা সিংহ, ইন্দ্রজিৎ সিংহ।
কবি অনির্বাণ সিনহা - জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। পিতা
ইন্দ্রজিৎ সিংহ এবং মাতা অরুণিমা দেবী। মাতামহের পিতামহ
প্রিন্সিপাল ক্ষুদিরাম বোস, ১৮৯৩ সালে কলকাতায়, সেন্ট্রাল
কলেজিয়েট স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা বর্তমানে ক্ষুদিরাম
বোস সেন্ট্রাল কলেজ নামে খ্যাত। তাঁর নামে কলকাতায় একটি
জনপথ রয়েছে। হাজার কণ্ঠে সম্মেলক রবীন্দ্র সঙ্গীতের পথিকৃৎ
শ্রীমতী অরুন্ধতী দেব, কবির মাসী হন।
জাগো জাগো কবি কাব্যগ্রন্থের "কবি পরিচিতি" - পাতার উপরে . . .
“১৬ই ফেব্রুয়ারী, বুধবার। যাবার সময়ে বীণাপাণি তাঁর বরপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। আকাশের চোখের
জল বৃষ্টি হয়ে নেমেছিল সেদিন। সেই চেখের জলের শব্দে পৃথিবী শুনেছিল বিসর্জনের বাজনা। ছেলেবেলায়
যে নিজে মন্ত্রপাঠ ক’রে সরস্বতী পূজো করতো, নৈবেদ্য সাজাতো, শেষে সে নিজেই নৈবেদ্য হয়ে গেল।
অনির্বাণ চলে গেল হাসিমুখে, প্রিয়জনদের হাসি নিয়ে। ঊষার প্রথম প্রহরে শুকতারার মতো মুখ লুকালো
আকাশে। চলে গিয়ে বুঝিয়ে গেল, প্রদীপকে ঘরে রাখা যায় ; জ্যোতিষ্ককে নয়। তার সঞ্চরণ আকাশে। সে
ছুটে চলে---“গৃহ হতে গৃহহীন গ্রহ তারকার পথে।”
মাত্র আটারো বছর সে ছিল আমাদের কাছে। তার এই আসা যাওয়ার পথের মাঝে ছড়িয়ে গেছে নানা
মণিমাণিক্য। কবিতা লিখেছে, গান লিখেছে, গানে সুর দিয়েছে। আর সব থেকে আনন্দ পেত গান গেয়ে। গান
ছিল তার প্রাণের আরাধনা। সুরের মধ্যে ডুবে থাকতো সারাক্ষণ। হয় গান গাইতো না হয় গান শুনতো।
নাডা বেঁধেছিল ওস্তাদ দিলশাদ খাঁর কাছে। তার আগে গান শিখেছে এ.টি. কাননের ছাত্রী লতা ব্যানার্জীর
কাছে। চলে যাওয়ার ঠিক আগে শুনেছে অজয় চক্রবর্তীর শ্যামাসঙ্গীত। শোনার ইচ্ছে ছিল গুরুপত্নী পরভীন
সুলতানার কণ্ঠে রাগ কৌশি কানাড়ায় নতুন বন্দিশ। সে আশা আর পূর্ণ হল না। বসন্তেই এল কালবৈশাখী
ঝড়। ঝড়ে মুহূর্তে স্মৃতি হয়ে গেল সে। ভগবান বুদ্ধ নির্বাণ চেয়েছিলেন। সে তো নির্বাণ চায় নি। সে
চেয়েছিল অনির্বাণ হয়ে জ্বলতে তার গানে, সৃষ্টির আনন্দে, সুরের মাধুর্যে, কবিতার ছন্দে।
অফুরন্ত আনন্দের উত্স ছিল সে। ভালবাসার রক্ত গোলাপ ছিল বুকে। চেনা অচেনা যে কাছে এসেছে
তাকেই আপন করে নিয়েছে। দু’বছর ক্যান্সারের সঙ্গে দুরূহ লড়াই করেও মনে তার কখনো ক্লান্তির ছাপ
পড়েনি। সুখ-দুঃখ, প্রিয়-অপ্রিয়---সবই তার কাছে ছিল সহজে সহনীয়। দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে হাসি মুখে।
শেষ দিনটি পর্যন্ত মুখের নির্মল হাসিটি ছিল অম্লান। রোগকে তুড়ি মেরে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে কবিতা
লিখেছে। শিল্পীর হাতে তা নিজে গিয়ে দিয়ে এসেছে। অসুস্থ অবস্থাতেও গান গেয়েছে হাসপাতালে। এমনকি
অপারেশন টেবিলে শুয়েও রাগ-রাগিনীর আলাপ করেছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন ডাক্তারেরা।
অনির্বাণ ভালবাসতো রঙ্গ রসিকতায় নির্মল পরিহাসে গল্প করতে। কখনো ইচ্ছে বাড়ীর সবার সঙ্গে সারাদিন
ছন্দ মিলিয়ে কথা বলেছে। সে এক শব্দ মেলানোর মজার খেলা। তার বৈঠকী আসরে কথনো সঙ্গী হয়েছে
টাকুমা দিদিমা, কখনো বন্ধুবান্ধব, কখনো বা ছোট ছোট শিশুরা। সবার রঙে রঙ মিশিয়ে জীবনকে উপভোগ
করতো সে, তাই ছোট থেকে বড় সবাই ছিল তার বন্ধু। ভালবাসতো রকমারি খাবার খেতে। কবে কোথায়
কি কি ভাল খাবার খেয়েছে লিখে গেছে ডায়রীর পাতায় পাতায়।
শান্ত স্নিগ্ধ স্বভাবে, নম্র মধুর ব্যবহারে সে সবার মন জয় করেছিল। সেন্ট জোসেফ স্কুলের কৃতি ছাত্র
অনির্বাণ, স্কুলেও ছিল সবার প্রিয়। আসলে সে ছিল এক মৌচাক। বিধাতা অলক্ষ্যে ঢিল মেরে ভেঙ্গে দিলেন
সেই মৌচাক। এখন তার রস চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। যে রসে মজে আছে তার আত্মীয় পরিজন বন্ধুবান্ধব
সবাই।
দশ বছর বয়স থেকেই কবিতা লিখেছে অনির্বাণ। শুধু কবিতা কেন, আছে গদ্য, আছে প্রবন্ধ। সে চলে
যাবার পর, তার শৈশবের সযত্নরক্ষিত কবিতার খাতা এবং কিছু ছেঁড়া টুকরো কাগজ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে
গাঁথা হল কবিতার এই মালিকা। তার অপরিণত মনের ছাপ হয়তো বা পড়েছে কবিতার ছন্দে, কিন্তু
সবগুলিতেই ফল্গুধারার মতো বয়ে চলেছে এক পরিণত মনের চিন্তাধারা।”
অমরনাথ নাগ।
জাগো জাগো কবি কাব্যগ্রন্থের "ভূমিকা" - পাতার উপরে . . .
“অনির্বাণ নাম ছিল তার। সে অকালে চলে গেল কিন্তু স্মৃতিতে হয়ে রইল অনির্বাণ। মানুষ মরণশীল একথা
আমরা জানি, কিন্তু সময়ের আগেই যাঁরা চলে যান, তাঁরা বেদনার মতো বুকে বেজে থাকেন। একটা
হাহাকার। আমি আছি, তুমি নেই কেন। এ-প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। মহাকাল নিরুত্তর।
দেখেছি প্রতিভাধররা পৃথিবীতে বেশী দিন থাকতে চান না। সব দিক যখন পরিপূর্ণ, যখন আনন্দের মাত্রা
জমজমাট, ঠিক সেই সময়---‘এই রইল আমার সব আয়োজন, আমার সুর, আমার সৃষ্টি, আমার জীবন
সৌরভ। হেথা আর নয় অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।’ এই বলে আলো নিবিয়ে উড়ে যাওয়া আর এক
আলোকিত দিগন্তে।
শিল্পীরা মনে হয় অতিশয় অভিমানী। এই বাবে শূন্য করে চলে যাওয়াটাই বোধ হয় তাঁদের ধর্ম। কারণ
তাঁরা জানেন, দীপ নিবে গেলেও রোশনাই থাকবে। যন্ত্র নীরব হলেও থাকবে রণন।
আমরা তার সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টাকে দেখব।”
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।