কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্রের কবিতা
*
অর্চ্চনা
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত "অর্চনা" পত্রিকা ১৩২১বঙ্গাব্দের ফাল্গুন সংখ্যায়
(ফেব্রুয়ারী ১৯১৫) প্রকাশিত, কবিতা।

এ জীবন হ’ক চির অর্চ্চনা তোমার,
প্রতি কর্ম্ম হ’ক তব পূজা-উপচার ;
এ প্রতি নিশ্বাসে তব হোমাগ্নি জ্বলুক,
সকল সম্ভোগ সেথা আহুতি পড়ুক ;
পলকে পলকে এই নয়নে আমার
প্রকাশ হউক দীপ তব বন্দনার ;
গন্ধময়ী ধরণীর গন্ধে গন্ধে, তব
আরতির ধূপগন্ধ হ’ক অনুভব ;
জগতের কণ্ঠরব, অনন্ত বিচ্ত্র,
হ’ক তব মন্দিরের পবিত্র বাদিত্র ;
একাদশ ইন্দ্রীয়ের বিষয় আমার
হ’ক চিরনিবেদিত নৈবেদ্য তোমার ;
প্রসাদের পূতচিহ্নে লাঞ্ছিত এ প্রাণ
তব বাঞ্ছারূপ যূপে যা’ক বলিদান।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
কবিতা
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত "অর্চনা" পত্রিকা ১৩২৬বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যায় (অগাস্ট ১৯১৯)
প্রকাশিত, কবিতা।

কিছু আর ত বাসনা নাই ;
জীবনের সাধ                         তোমার প্রসাদ
জীবনে যেন মা পাই।
আমি শিশুকাল হতে                   এই পথে পথে
তোমার মন্দির-ধারে
ঘুরিয়া ঘুরিয়া                        প্রতিমা হেরিয়া
এসে দাঁড়ায়েছি দ্বারে ;
বড় সাধ মনে                          তোমার অঙ্গনে
ফুটে যে কুসুম-রাশি,
চারিটি তুলিয়া                         ও চরণে দিয়া
আনন্দ-সলিলে ভাসি ;
আর কিছু নয়,                            হইয়া সদয়
সেগুলি চরণে রেখো,
হারায়ে চরণ                           যেন এ জীবন
বিফল না হয় দেখো।
তুমি আঁধারে আলোক             মর্ত্তে দেব-লোক,
@@@ @@@ গড় ;
নির্ধনেরধন                               পরশ-রতন,
সব রতনের বড় ;
অকর্ণের হাসি,                        চন্দ্রকর রাশি
তোমার চরণে মাখা ;
বর্ণে বর্ণে লেখা                        ইন্দ্র-ধনু-রেখা
নয়ন-উপরে আঁকা ;
তোমার অঞ্চল                         অনিল চঞ্চল
অবনী অম্বরময়,
তারকা-কণায়,                        খদ্যোত-ভূষায়
সতত খচিত রয় ;
তোমার অঙ্গন                           ধরার নন্দন,
আনন্দ-প্রতিমা তুমি ;
তোমার ভবন                          শিব-নিকেতন
মানস-কৈলাসভূমি ;
হিমাদ্রি-শিখরে                        ছায়াপথ ’পরে
তোমার আসন পাতা ;
মন্দাকিনী-নীরে                      তুমি ধীরে ধীরে
নামিয়ে এসেছ মাতা।
এ মানস-তীরে                       তোমার মন্দিরে
বিজনে বসিতে দিও ;
বনফুল তুলে                           পাদমূলে থুলে,
চরণে পাতিয়া নিও।

@ - অপাঠ্য অক্ষর।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
বিজয়া
রায় শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র মিত্র এম্-এ-বি-এল বাহাদুর
অক্ষয়কুমার নন্দী ও সুরবালা দত্ত সম্পাদিত “মাতৃ-মন্দির” পত্রিকার ১৩৩১বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায়
(অক্টোবর ১৯২৪) প্রকাশিত।


আজি সে কোথায় গেল,                   কিবা ছিল কি হইল,
কি হইল পলকেতে সে আনন বিহনে ;
আলোকে আলোকময়                        ছিল এ দিবস-ত্রয়
এ আলোকহীন পুরী দ্যুলোকের বরণে ;
বহিল আনন্দে তার                        আনন্দের পারাবার
মন্দিরে অঙ্গনে পথে নিরানন্দ ভুবনে ;
যেন ঊষা পূর্ব্বাকাশে                      দিবস সর্ব্বরী হাসে,
যেন নিশি পৌর্ণমাসী নিশিদিন গগনে ;
প্রফুল্ল প্রসূনাবলী---                           ফুল্ল যেন বনস্থলী
পিককুলে-কাকলীতে প্রিপূর্ণ প্রভাতে,
হর্ষময় কলরবে                             তিন দিন মত্ত সবে,
সুশোভিত ছিল সব ত্রিদিবের শোভাতে ;
আজি সব কোথা গেল,                     কিবা ছিল কি হইল,
কি রহিল বল এই নিরানন্দ নীরবে ;
কি আলোক, কিবা আশা,                কিবা সান্ত্বনার ভাষা
কহিল তিমিরাচ্ছন্ন ছিন্ন ছিন্ন এ ভবে।
সে কি সব নিয়ে গেছে?              কিবা কিছু বাকী আছে?
কিবা কিছু চিরন্তন দিয়ে গেছে সন্তানে,
আলোক আধাঁয়ে যায়                     সমভাবে দেখা যায়,
আনন্দ আনন্দ ভুলে থাকে যার সন্ধানে,
আনন্দের সে প্রতিমা,                        সুষমার সে উপমা
গঙ্গাজলে ভেসে গেছে গঙ্গাধর সদনে ;
নিমগ্ন হ’য়েছে কায়া,                        লগ্ন তার অঙ্গছায়া
নিস্তরঙ্গ গঙ্গাজলে অচঞ্চল আসনে,
কৌমুদী নিভিলে পরে                          নীলতর নীলাম্বরে
যে ছায়া বসিয়া থাকে অনাকুল আননে
এ যে শান্তি, দেবতার                          সব প্সাদের সার,
দেবপদে অন্তরের অতি নম্র প্রণামে
আপনি নামিয়া আসে,                   অন্তরে বাহিরে ভাসে,
এ প্রপঞ্চ আবরিয়া বৈকুণ্ঠের বিরামে ;
দেবতার দরশন,                            আনন্দের সন্ধিক্ষণ
ক্ষণপ্রভা সম হেসে মিশে যায় তখনি ;
পা দু’খানি চ’লে যায়,                      পদধূলি বিশ্ব ছায়,
সে ধূলিতে চির তৃপ্ত শান্ত থাকে অবনী ;
এই শান্তিজল আজ                         বহুক এ বিশ্বমাঝ,
শান্ত হ’ক এ অনন্ত সে অমৃত পরশি ;
শান্ত হোক্ রোগ শোক,               পাপ তাপ শান্ত হোক,
দ্বেষ হিংসা ধৌত করি’ এস শান্তি বরষি’ ;
এস শান্তি নবস্থলে,                         এস শান্তিভূমণ্ডলে,
এস শান্তি অন্তরীক্ষে, পর্ব্বতের কন্দরে,
এস নীল সিন্ধুজলে,                          শ্যামল বিটপীদলে,
এস শান্তি মানবের এ অশান্ত অন্তরে ;
শান্ত কর মত্ত ক্রোধ,                       ভ্রাতৃবৃন্দে এ বিরোধ,
এই ভেদ এক মার এই সব নন্দনে,
শান্ত কর সব ভাণ,                        জাতি-কুল-অভিমান,
শান্ত কর ধনমদ নির্ধনের বন্দনে ;
শান্ত কর দুরাশায়,                        পরবিত্ত-পিপাসায়
শান্ত কর লোলুপের এ নৃশংস কবলে ;
শান্ত কর ধর্ম্মবৈরী,                        জগৎ হিতের অরি,
শান্ত কর অন্যায়ের এ প্রসার ভূতলে ;
শান্ত কর ক্ষমতার                        অবিনয়, অত্যাচার ;
শান্ত কর ক্ষমাহীন মানসের তাড়নে ;
শান্ত কর সবাকার                        সর্ব্ববিধ অহংকার,
শান্ত কর জ্ঞান-গর্ব্ব ভক্তি-বারি-সেচনে।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রতি
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত "অর্চনা" পত্রিকার ১৩১৮বঙ্গাব্দের (১৯১১) চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত,
কবিতা। এই কবিতাটি ১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থে “শৈশব স্মৃতি” নামে অন্তর্ভুক্ত
করা হয়।

আজি ভাই গৌরবের উচ্চ শিখরের ’পরে,
দাঁড়ায়ে চাহিয়ে দেখ নিম্নে তিলেকের তরে!
ওই দূর তলদেশে আনন্দে আলোকে কিবা
ফুটিয়া উঠেছে তব, জীবন-তরুণ দিবা।

.                        ২
স্নিগ্ধ শ্যাম বটচ্ছায়ে সুন্দর সৈকত তীরে,
পবিত্র আশ্রম দেখ ধৌত জলাহ্গীর নীরে,
হাস্যময় ও আশ্রম হাস্য-সবিতার করে,
হাস্যময় তপোবন সে তপনে তৃপ্তিভরে।

.                        ৩
ও আশ্রমে আনন্দের মহর্ষি আসীন সুখে
হরষ লহর সুধা উঠিছে ছুটিছে মুখে ;
আধি-ব্যাধি ভাসাইয়া প্রবাহিছে অবিপত
ফুটিছে কানন ভরি মালতী মল্লিকা কত।

.                        ৪
আজি দেখিতেছি তাঁরে, অপসৃত করি সুখে
কালের এ অন্তরাল, বিজড়িত সুখে দুঃখে,
আর তাঁর পাশে সেই সুন্দর শিশুটি তুমি,
শৈশবের সে শোভার উজলিয়ে পুণ্য ভূমি।

.                        ৫
সুন্দর শিশুটি তুমি গাইছ তুলিয়া তান
“এমন সুন্দর শিসু কার ছেলে” সেই গান ;
আহা যেন বাল্মীকির হৃদয় আনন্দে ছেয়ে
মধুময় রামায়ণ শিশু কণ্ঠ উঠে গেয়ে।

.                        ৬
আশ্রম বালক মোরা শুনিতাম প্রীতি-ভরে
পিতার মধুর গাথা তোমার মধুর স্বরে ;
সে অধ্যায় সুধাময় জীবনের সূচনায়,
শৈশবের সে সৌহার্দ্দ জীবনে কি ভোলা যায়?

.                        ৭
সেই চিত্র সুললিত আজি চিত্ত আঁকিয়াছে,
সাধের আলেখ্যখানি এনেছি রাখিও কাছে ;
শৈশবের স্নিগ্ধ স্মৃতি চির প্রীতিকর ভাই,
প্রীতি-ভরে পূর্ব্ব-কথা তুলিলাম আজি তাই।

.                        ৮
সেই দীক্ষা শৈশবের ভুল নাই এ জীবনে ;
কবি-দিষ্ট কুঞ্জবনে ভ্রমিয়াছ হৃষ্টমনে ;
আজি নানাবিধ ফুলে, সাজি তব ভরিয়াছে,
পর্য্যাপ্ত প্রসূন-পথ সম্মুখে বিস্তৃত আছে।

.                        ৯
‘শিশু মানবের পিতা,’ নহে শুধু কাব্যকথা,
তোমার জীবনে তার আছে পূর্ণ সার্থকতা ;
যেই শিশু কলকণ্ঠে রোমাঞ্চিত হ’ত কেশ
আজি তাহে মুখরিত পবিত্র ‘তোমার দেশ’।

১৯১১ সালের "অর্চনা" পত্রিকায় কবিতার পাতার টীকা ---
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল ৫|৬ বত্সর বয়সকালে স্বীয় পিতৃদেব দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায়ের বন্ধু রায় দীনবন্ধু
মিত্রকে তদীয় এমন সুন্দর তবিতা আবৃত্তি করিয়া মোহিত করিতেন। তখন দীনবন্ধু বাবু খড়িয়ার
(জলাঙ্গীর) তীরে ষষ্ঠিতলায়র বাটিতে থাকিতেন। বলা যাইতে পারে তত্কালে দীনবন্ধুর মধুর হাসি ও
দেওয়ানজীর পবিত্র গান কৃষ্ণনগরের সরভাজা সরপুরিয়ার ন্যায় আর একটি বিশেষত্ব ছিল।

১৯১৩ সালের কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্রের "আকিঞ্চন" কাব্যগ্রন্থে এই কবিতার পাতার টীকা ---
পিতৃদেব যখন খড়িয়ার (জলাঙ্গীর) তীরে ষষ্ঠীতলার বাটীতে থাকিতেন, তখন তাঁহার বন্ধু দেওয়ান
কার্ত্তিকেয় চন্দ্রের পুত্র পঞ্চমবয়স্ক দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁহার এমন সুন্দর শিশু কার ছেলে হায় রে!
কবিতা আবৃত্তি করিয়া তাঁহাকে মোহিত করিতেন। সেই স্মৃতি লইয়া এই কবিতা। ইহার উত্তরে
দ্বিজ্ন্দ্রলাল যে কবিতা রচনা করিয়াছিলেন তাহা পরে সন্নিবিষ্ট হইল।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
উত্তর
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
এই কবিতাটি কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় "অর্চনা" পত্রিকা ১৩১৮বঙ্গাব্দের (১৯১১) চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত, কবি
বঙ্কিমচন্দ্র মিত্রের “কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রতি” নামে কবিতার প্রত্যুত্তরে রচনা করেছিলেন। দুটি
কবিতাই একসঙ্গে "অর্চনা" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ১৯১৩ সালে কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র তাঁর
"আকিঞ্চন" কাব্যগ্রন্থেও কবিটা-দুটি অন্তর্ভুক্ত করেন।

অনেক দিনের কথা - ঠিক নাহি আসে মনে
মধুর শৈশবগাথা সে প্রথম জাগরণে ;
তবু যেন পড়ে মনে স্নিগ্ধ শ্যাম বটচ্ছায়,
এখনও গভীর সেই সাম গান শোনা যায়---

.                        ২
বিজড়িত সঙ্গে তার সে নিশার অবসান,
পবন হিল্লেল আর প্রভাতের পিকতান,
প্রাতঃসূর্য্য বিহসিত সে আমার জন্মভূমি,
সঙ্গে তার বিজড়িত প্রিয়বর আছ তুমি।

.                        ৩
মনে পড়ে আজি এই জীবনের এ সন্ধ্যায়
যেন সেই সুগভীর মহাগীত শোনা যায় ;
তাহার মধুর স্মৃতি এখনও বাজিছে প্রাণে,
বাজিবে তাহার সুর এ জীবন অবসানে।

.                        ৪
ঠিক মনে নাই বটে---সেই হাসি সেই গান,
দীনবন্ধু কার্ত্তিকেয় দুই বন্ধু এক প্রাণ,
সেই হাসি সেই গান আমার জীবনে আসি
বিজড়িয়া রচিয়াছে এই গান এই হাসি,

.                        ৫
কিম্বা সব কল্পনা এ --- ভালবাস বলে তাই,
সকল সুন্দর দেখ আমার প্রাণের ভাই।
রচিয়াছি যেই হাসি, যেই গান রচিয়াছি
সে হাসির সে গানের নহে নহে কাছাকাছি ;

.                        ৬
অন্য কোন নাই সুখ, অন্য কোন নাহি আশা,
শুধু চাহি এ জীবনে তোমাদের ভালবাসা।
যদি এই গানে হাস্যে লভিয়াছি তব প্রীতি,
সার্থক আমার হাস্য সার্থক আমার গীতি,

.                        ৭
প্রভাতে এ জীবনের হাসায়েছি বঙ্গভূমি,
করিয়াছি তীব্রব্যঙ্গ বন্ধুবর জানো তুমি ;
জীবনের এ সন্ধ্যায় মিলায়ে গিয়াছে হাসি
সব হাস্য শুয়ে আছে রোদনের পাশাপাশি।

.                        ৮
মানুষের সুখ দুঃখ, মানুষের পুণ্যপাপ,
দেবতার বর আর পিশাচের অভিশাপ,
নাটকের যে আকারে রচিতেছি বন্ধু আজ,
ইহাই আমার ব্রত, ইহাই আমার কাজ।

.                        ৯
ঈশ্বরের কাছে আর অন্য কিছু নাহি চাই,
আমার এ খ্যাতি শুধু পুণ্যে গড়া হোক তাই
তোমাদের শুভ ইচ্ছা আমার মস্তকে ধরি,
যেন বন্ধু তোমাদের ভালবাসা নিয়ে মরি।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
উত্সর্গ
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র, দীনধাম, ১৩২০বঙ্গাব্দ।
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

পিতৃদেব দীনবন্ধু মিত্রের
প্রতিকৃতি তলে।

পিতা আমি ব’সে আছি তোমার চরণতলে,
হৃদয় উছলি’ দেখ বহিছে নয়ন জলে ;
সে যে মলিনতাময়, কালিমা র’য়েছে ঘিরে,
কেহ না শুধায় এসে, কেহ নাহি চায় ফিরে।

মরমের ব্যথা মোর রয়েছে মরম জুড়ে ;
দেবতা মমতা ভুলে পাষাণে ফেলেছে ছুড়ে,
সম-অনুভূতি-হীন, শুষ্ক মরুবায়ু সম,
সংসার নীরস করে পরশে হৃদয় মম।

কোমার স্নেহের সেই পুতুল আনন্দে ভরা---
আনন্দে আনন্দময় দেখিতে এ বসুন্ধরা---
চঞ্চল এ ক্রীড়নক সব ক্রীড়া ভুলে গেছে,
যন্ত্রখানি ফেলে যেন যন্ত্রী কোথা পলায়েছে।

বুঝিল না কেহ হেথা অবুঝের মর্ম্মব্যথা,
শুনিবে না আর কেহ কাতর প্রাণের কথা,
এ অন্তঃসলিলা ধারা অন্তরে লুকায়ে রবে,
যতদিন নাহি সেই অনন্তে মিলিত হবে।

তুমি অন্তর্যামী মাঝে অন্তর্যামী হ’য়ে আছ,
আমার এ জীবনের সকলি ত’ জানিয়াছ,
তাই এসে বসে থাকি ওই প্রতিকৃতি তলে,
মরমে চরণ দুটি ভিজাই নয়নজলে।

আজি সে চন্দ্রিকা নাই, যূথিকা-সৌরভ (ও) নাই,
সে চারু গৌরব তরে বৃথা সে পূরবে চাই,
শুকায়েছে সে শ্যামতা, কঠিন সে কোমলতা,
শুকায়েছে তরুসনে পল্লবিনী সেই লতা।

হৃদয়ের এ বিজনে স্বজন তোমার স্মৃতি,
আঁধারে হাসিছে তব জ্যোতির্ম্ময় প্রতিকৃতি,
সেই স্মচিময় ছায়ে বিস্মৃত শ্যামতা ফুটে,
পাষাণ নিষিক্তি করি’তরল প্রবাহ ছুটে।

সে অমৃতময় নীরে, সে মধুর চন্দ্রালোকে,
আবরিয়া অবনীর বিড়ম্বনা রোগ শোকে,
ফুটেছে কুসুমগুচ্ছ হৃদয়ের নিরালায়,
এ অনন্ত অন্বেষিয়া তাই চিত্ত কোথা চায়।

কোথা তুমি, কোথা আমি, মধ্যে মহাপারাবার,
তীর নাই, তরী নাই, ধুধু করে অন্ধকার ;
কোথা তুমি, কোথা তুমি, ডাকে প্রাণ অনিবার,
এ অপার পার হ’য়ে এস হেথা একবার।

ওই দেব অবয়ব জীবনবিভব পা’ক্ ,
ওই দিব্য আস্য ভরি’ হাস্য উছলিয়া যা’ক্ ,
বহুদিন পরে সেই স্নেহবিগলিত ভাষা
অমিয় সিঞ্চন করি’ মিটা’ক আমার আশা।

তোমার স্নেহের নীরে যে পাদপ অঙ্কুরিত,
তাহার প্রসূনে দেব হবে তুমি হরষিত,
তাই আনিয়াছি ইহা, সে স্নেহে হাসিয়া ধর,
অভাগা জীবন মোর তিলেক শীতল কর।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
ভারতবর্ষ
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


মহিয়সী মাতৃকা মাতৃভূমি,
সব-সুখ-সম্পদ-সাধিকা তুমি।

সুনীল অম্বরে অঙ্কিত মায়া,
স্নিগ্ধ ধরাময় স্নেহের ছায়া,
সলিল কল্লোলে,                অনিল হিল্লোলে,
সতত মধুর সুরব শুনি ;
আরুণরঞ্জিত আননে হাসি,
চন্দ্রমা-প্রস্ফুট লাবণ্যরাশি,
প্রসন্ন প্রফুল্ল দিবা-রজনী।

হিমানী-মণ্ডিত হিমাদ্রি, মুকুট ;
নীলাম্বু লুণ্ঠিত, পদে পাদপীঠ ;
তরুরাজিভূষণা,                আলোক-বসনা
ত্রিলোক-রমণীয়া রাজরাণী ;
ত্রিলোক-বন্দিত বেদের মাতা,
ব্যাস-বাল্মিকী-বিরচিত গাথা
তোমার শিরোপরে শিরোমণি।

কীর্ত্তিময়ী তুমি মর্ত্ত ভবনে
সাঙ্খ্য-পাতঞ্জল ষড় দরশনে,
অসংখ্য সুযশঃ-                কবীন্দ্রতাপস-
যশঃ প্রভাসিত মহিমাখনি ;
ধর্ম্ম-কর্ম্ম-ধ্যান-ভক্তি-আকর,
জ্ঞান-দিবাকর দীপ্ত চরাচর,
গৌরাঙ্গ-শঙ্কর-বুদ্ধ-জননী।

অসুর-মর্দ্দন-শৌর্য্য-প্রদায়িনী,
সন্ততি-কল্যাণে অদিতি রূপিণী,
বক্ষে পবিত্র                        কৌরব-ক্ষেত্র,
গৌরভ-সৌরভ-আমোদিনী ;
ধনধান্যে ভরা অলকাভুবনে,
কারুকার্য্য চারু সজ্জিত ভবনে,
রত্নময়ী ওমা রত্ন-প্রসবিনী।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
বঙ্গভাষা
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


মাতৃ-কণ্ঠ-স্রুত চির আনন্দ-লহরী,
রয়েছে শ্রবণ মন প্রাণ পূর্ণ করি ;
ললিত হৃদয়লতা সিঞ্চিয়া প্রথমে,
যেদিন বহিয়াছিলে কোমল মরমে,
ও কল্লোলে শুনিলাম স্নেহের কিঙ্কিণী---
জনক জননী ভাই ভগিনীর বাণী ;
তদবধি ওই স্রোতে, অনন্ত আলোকে,
অনন্ত বিশ্বের শোভা হেরেছি পুলকে ;
তীরে তীরে পরিচিত প্রিয়তম স্থান,
দেবতা পূজার দিব্য পুষ্পের উদ্যান,
আশাসুখ তৃপ্তি শান্তি বুক ভরা সব,
ভক্তি মুক্তি বহি আনে ওই দিব্য রব ;
তীর্থে তীর্থে ও তরঙ্গে সুখে করি স্নান,
ধরণীর অন্য নীরে তৃপ্ত নহে প্রাণ।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
চন্দ্রালোকে বারাণসী
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


দেখিলাম বারাণসী নিশির হৃদয়দেশে---
বিশ্বেশ্বর ব’সে যেন ভুবনমোহনবেশে ;
শুভ্রকান্তি-সৌধময় স্ফাটিক প্রতিমা-প্রায়,
সুপ্রসন্ন সমুজ্জ্বল শুভ্র চারু চন্দ্রিকায় ;
পরিপূর্ণ শোভাধর, শিরে শোভে শশধর ;
ব্যোমজটা উজলিয়া উছলিছে চন্দ্রকর ;
তারকা-কুসুমজালে সজ্জিত সুকেশদাম ;
দিগম্বরে বামদেব ত্রিভূবন অভিরাম।
সমাসীন যোগীশ্বর দিব্য যোগাসন ’পরে,
দুই ধারে দুই ঊরু অসি বরুণার ধারে,
সম্মুখে সন্নদ্ধ সুখে বিশ্ববন্দ্য পদদ্বয়
অর্দ্ধচন্দ্র-অনুকারী জাহ্নবীর বারিময় ;
শশিস্নাত সোপানের শত শ্রেণী সুবিমল
পদে যেন ভক্তার্পিত সচন্দন মাল্যদল।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
লছমন্ ঝোলায় গঙ্গা
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


ও কার করুণা বহে তরল তরঙ্গরূপে,
দ্রব করি’ প্রবেশিছে প্রবল প্রস্তর স্তূপে ;
ও কার মমতা নাহি পাষাণে পাষাণ জানে,
ঝরিতেছে অবিরত স্বর্গমর্ত্ত্য সমজ্ঞানে ;
ও কার হৃদয় যেন স্নেহের উন্মাদে ধায়
ঊর্দ্ধতম ব্যোম হ’তে এই নিম্ন বসুধায় ;
ও কেরে পতিত হ’য়ে, কাতরে ক্রোড়েতে ধরে ;
ও কার মোহিনী মায়া পাষাণে জীবন আনে,
পেলব করিছে তারে পুষ্পিত পল্লব দানে ;
ও কার অমল প্রেম বিমল প্রবাহে বয়,
সান্তনা-সম্পদ দিয়া বিপন্ন ভুবনময় ;
ও কার সরস বাণী অনিল আনিছে ব’য়ে ;
সরস প্রাণের তার সরস পরশ ল’য়ে ;
ও কার পরশে, ভাষে, জাগিয়া উঠিছে সব ;
অনন্ত মুখর হ’য়ে আনন্দে করিছে রব?
হায় হরি, এ প্রাণের দুঃখ আর কারে কব ;
এ বিশ্ব উদ্ধার হবে, একা আমি প’ড়ে রব।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর