কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্রের কবিতা
*
বুদ্ধমূর্ত্তি
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


কি ধ্যানে নিমগ্ন দেব, প্রদীপ্ত কি প্রতিভায়,
কি অনন্ত শান্তি ছায়া ভাসিছে ও প্রতিমায় ;
ক্লিষ্ট ছিল এক দিন ও মুখমণ্ডল খানি,
ধরার অনন্ত দুঃখে শান্তি সুখ নাহি জানি ;
ঝরিত অজস্রধারে ও আঁখিতে অশ্রুধারা,
অশ্রুময় ধরণীর অশ্রুমাঝে আত্মহারা ;
ফদ্বেল হৃদয়সিন্ধু, কাতর জীবের তরে,
করুণার সমপ্লাবনে ব্যাপ্ত হ’ল চরাচরে ;
সেথা সিন্ধু সম দুঃখ মগ্ন হ’ল বিন্দুপ্রায়
সিন্ধুসম মহাসুখে, মহাসিন্ধু-মহিমায় ;
সে মহাসিন্ধুর নীরে বিন্দু সিন্ধু একাকার,
অমৃত অমৃতে শুধু হইতেছে পারাপার ;
কে চাহিবে কোন্ ইষ্ট, কে কাঁদিবে কার করে,
বাসনা বাসনাহীন, চিরপূর্ণ তৃপ্তিভরে ;
নির্ব্বাণ সকলরূপ, নিব্বাণ সকল মায়া,
বিষাদ-আহ্লাদ-শূন্য প্রসাদের পুণ্য ছায়া।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
শ্রীকৃষ্ণ
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


কবে, কোন্ দিনে                     যমুনা পুলিনে
বাজায়ে গিয়েছ বাঁশী ;
অনন্ত জীবন---                     যমুনা এখন (ও)
উজানে যাইছে ভাসি।
ভাবনা, সাধনা,                       অনন্ত বাসনা,
ফিরেছে অনন্ত ধারে,
প্রবাহ আকুল,                      ভাসায়ে দু’কূল,
খুঁজিয়ে চলেছে কা’রে?
রাখি ঘরদ্বার                        ছুটেছে সংসার,
আপনারে পাসরিয়া ;
পবনে পবনে                           বিহগের সনে
উড়ায়ে দিতেছে হিয়া।
নভোনীলাঞ্জনে                         অঙ্কিত নয়নে
সে আনন অভিরাম,
মঞ্জু কুঞ্জবনে                         ভারমর গুঞ্জনে
শ্রবণে কূজিত নাম।
কাননে কাননে                        তোমার চরণে
বিছায়ে বিধুর প্রাণ,
তরুর মর্ম্মরে,                          নির্ঝর ঝর্ঝরে
শুনে সে মধুর তান।
কদম্বের মূলে,                         তমালে বকুলে
আকুল মধুপ প্রায়,
হেরি ভূরি ভূরি                        বঙ্কিম মাধুরী,
ঘুরিয়া ফিরিয়া ধায়।
শারদ আকাশে                     পূর্ণিমা বিকাশে
তোমার সকাশে আসে,
তোমাতে রসিয়া                    মজিয়া মিশিয়া
সেই রাসরসে ভাসে।
কবো কোন্ কালে                    লইয়া গোপালে
খেলেছিলে ধূলি’পরে ;
আজি সেই রেণু                       রাখালের বেণু
নিখিল হৃদয় ভরে।
শুনিয়া সে বেণু                        জগৎ গোধেনু
বিচিত্র বিরাট গোঠে,
সঙ্গীত ইঙ্গীতে                     ছোটে চারিভিতে,
পালটি’ ও পদে লোঠে।
গ্রহ-তারাগণে                         মহা গোচারণে
চরাইছ দিন দিন,
বিকাশ প্রভাতে,                     বিলয়ের রাতে,
জাগিছে, হইছে লীন।
কি বুঝিবে ভানু,                   কিবা সে কীটাণু,
কি যে এ তোমার লীলা,
কেন যে গড়িছ,                     কেন যে ভাঙ্গিছ,
চম্পকে বিন্ধিছ শিলা?
তুমি যে মহান্ ,                       সর্ব্বশক্তিমান্ ,
এ ভূমা প্রমাণ করে ;
তুমি যে সুন্দর---                       অনন্ত অম্বর
কহিছে অনন্তে স্বরে।
নয়ন (ও) দেখেনি,                শ্রবণ (ও) শোনেনি,
অন্তর জেনেছে যেন ;---
জনমে মরণে                           জীবনে জীবনে
আপন নাহিক হেন।
তুমি কুণ্ঠাহারী                          বৈকুণ্ঠ-বিহারী,
তোমাতে ব্যসন নাহি ;---
এ শুভ আশ্বাস,                          জীবন্ত বিশ্বাস
অশান্ত অন্তরে চাহি।
মানস তামসে                          আলোক পরশে
মিছা ভীতি কেড়ে নেবে,
অনৃত-বারণ,                             অমৃত-কারণ,
মরণে জীবন দেবে।

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর       
*
শ্রীরাম
কবি বঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
১৯১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “আকিঞ্চন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


নবদূর্ব্বাদল---                        রুচি, নিরমল,
অর্য্যের আদর্শ, ত্যাগের ছবি,
হৃদয় তরল                         কর্ত্তব্যে অচল,
সমুজ্জ্বল রবি-কুলের রবি ;
যুগ যুগ ধরি                         ও নাম সুমরি
এ ভারত ধন্য ধরণী ’পর ;
যুগ যুগ ধরি                        তোমা অনুসরি
চির পুণ্যময় আর্য্যের ঘর ;
সুপট্ট বসনে                           বল্কল-ভূষণে,
সেই অবিকল প্রশান্ত রূপ ;
প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে,                        পঞ্চবটী বনে,
চিত্ত-প্রসাদের প্রথিত ভূপ ;
কর্ত্তব্য-নির্দ্দেশে                        দীনহীনবেশে
আপনারে কোথা ভাসায়েছিলে,
আপনা হইতে                        আপন চিতে---
তাহারে কেমনে ফেলিয়া দিলে ;
সতত কঠোরা                        মহাদেবী ঘোরা
করাল-বাসনা পাষাণময়ী---
তুমি সে দেবীরে                         হৃদয়-রুধিরে
পূজিয়া হ’য়েছ হৃদয়-জয়ী ;
শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপরে                        অমৃতের স্বরে
যে পরম নীতি জগতে দিল,
তাই সে ত্রেতায়                         মূর্ত্ত মহিমায়
তোমার জীবন দেখায়ে ছিল ;
তুমি সীতাপতি                        গীতা মূর্ত্তিমতী,
ধর্ম্মক্ষেত্র তব বৈদেহী দেহ ;
পাষাণে নিহিত                        সে মহান্ ঋত
আর কি শিখাবে কেহ?

.        *************************      

.                                                                             
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর