কবি বরদাচরণ মিত্রের কবিতা
বদরি-নারায়ণে সূর্যোদয়
কবি বরদাচরণ মিত্র
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত “ভারতী” পত্রিকার ১৩১১ আষাঢ় (জুলাই ১৯০৪) সংখ্যায়
প্রকাশিত।


তীক্ষ্ণরশ্মি-অসি-ধারে বিদারি আঁধার,
রুধির-ধারায় প্লাবি, উঠেনিক রবি,
প্রতাপ তাঁহার মাত্র হয়ে আগুসার
বিরম্পিছে ভীতি-শীর্ণ অন্ধকার ছবি ;---
হেন কালে চেয়ে দেখি উত্তর আকাশে,
তুযার-ভূষিত যেথা বদরি-ভূধর
সুদূর অনন্ত ম্লান কান্তি পরকাশে,
দিগন্তে বিলীন দেহ,---মহান্ , ধূসর!
ধূম্র সাগরের যেন ঊর্ম্মি অচঞ্চল
মিশি নভে, ক্ষীণ-শুভ্র ফেনার কিরীটে!
বিপন্ন মহেন্দ্র কিম্বা, লগ্ন শিরস্তল
ধ্যান-মগ্ন ধূর্জ্জটির বেদীপাদপীঠে!
কিম্বা, এ কি তমোমাঝে সত্ত্বের প্রয়াস?
নিরাশা-মজ্জিত, কিম্বা, শুভ্র উচ্চ আশ?

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
গৃহী ও যোগী
কবি বরদাচরণ মিত্র
কুলদাপ্রসাদ মল্লিক সম্পাদিত, “বীরভূমি” পত্রিকার ১৩১৮সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যায়
(নভেম্বর ১৯১১) প্রকাশিত।


“নয়নে আনন্দ-আলো, প্রশান্ত বদন,---
যোগীবর, কিসে হেন চিত্ত বিনোদন?
অতুল করুণা-উত্স দেবতা-প্রতিম
জনক না দেখি তবস মমতা অসীম,
ক্ষীরপ্রস্রবণসম, হৃদে বহে যাঁর
সে জননী শক্তিময়ী না দেখি তোমার ;
জীবনে প্রথম বন্ধু, সমান-শোণিত,
সে সোদর নাহি তব আচরিতে হিত ;
না দেখি তোমার সখা, উদার-হৃদয়
বিত্তের সহায়, আর চিত্তে বিনিময় ;
শরীরে চন্দনলেপ, নয়নে অমিয়া,
হৃদয়ে ত্রিদিবানন্দ, নাহি তব প্রিয়া,
স্নেহের জমাট-বাঁধা, প্রাণের সমান,
( দীপ হতে দীপ যথা ), নাহিক সন্তান।”
যোগী কহে,---“কিসে চিত্তে সুখ নিরুপম?---
আত্মতত্ত্বজ্ঞান, পিতা ; মাতা মোর, সত্য ;
সোদর আমার ধর্ম্ম ; দয়া, সখা মম ;
শান্তিই রমণী মোর ; ক্ষমা সে অপত্য।”

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বন্দনা
কবি বরদাচরণ মিত্র
কুলদাপ্রসাদ মল্লিক সম্পাদিত, “বীরভূমি” পত্রিকার ১৩১৮সালের পৌষ সংখ্যায় (ডিসেম্বর
১৯১১) প্রকাশিত।

.                রাজ্যেশ, এস রাজ্যে!
.        মহিমান্বিতা ভার্য্যা সহিতে
.        আর্য্যভূমি এ ভারত-মহীতে,
.        মুকুটচ্ছলে শীর্ষে বহিতে
.                গুরুভার রাজকার্য্যে
ধন্য করিয়া পুণ্যধারায় জহ্নু-কন্যা গঙ্গা
বহে জ্ঞানসম শ্বেত প্রবাহে হর-জটাজূট-সঙ্গা ;
কম-হিল্লেলা যমুনা চলে শ্যামতনু রুচি বর্ণে,
কল্লেলে করি’ ভক্তি প্রেমের সুদূরধ্বনি কর্ণে
ধর্ম্মযুদ্ধে ক্ষত্র-রুধিরে রক্ত-তটিনী ছুটিল,
সমরে অমর ভহবদ্বাণী দ্বন্দ্ব দর্প টুটিল ;---
যুক্ত-বেণীতে প্রবাহী ত্রিধারা-জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম্ম,---
এ মহাতীর্থে এস, সম্রাট! পালিতে রাজার ধর্ম্ম।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
স্তুতি
কবি বরদাচরণ মিত্র
কুলদাপ্রসাদ মল্লিক সম্পাদিত, “বীরভূমি” পত্রিকার ১৩১৮সালের পৌষ সংখ্যায় (ডিসেম্বর
১৯১১) প্রকাশিত।


যুক্ত করিয়া অযুত কণ্ঠ
.                        তোল সুস্বর গগনে,
জর্জ-মেরীর পূর্ণপ্রতাপ
.                        বিঘোষিত হোক সঘনে
.        নতজানু হ’য়ে যোড় করি করে,
.        ডাক এক মনে যতেক অমরে,
চিরভাস্বর তাঁহাদের বরে
.                        হোক্ বৃটানিয়া ভুবনে।
উল্লাসময় সঙ্গীত-তালে,
.                        বিচরেণ রবি আকাশে,
দিগন্তে চাহি না দেখিতে পান
.                        রাজ্যের সীমা কোথা সে!
.        ন্যায়-দণ্ডের উজ্জ্বলভাতি
.        স্ফুরে বিদ্যুৎ কুলিশের সাথী,
দর্পে নিরাসি, সর্ব্ব অরাতি
.                        বিবর্ণ মুখ তরাসে
রত্ন-খচিত দীপ্ত কিরীটে
.                        নানা-মণি-চারু-মিলনে,
মধ্য-রত্ন বিরাজে ভারত
.                        পদ্মরাগের কিরণে!
.        ফুটে যে আলোক মুকুট-ছটায়,
.        মহামেঘ-ঘটা তাহে কেটে যায়,
মন্দ্র পাশরি তুর্ণ মিলায়
.                        ইন্দ্রচাপের বরণে!
কি মহিমময়ী বৃটন-শক্তি
.                        অদ্রির মত অচলা!
সমুদ্র কটী-বন্ধের সম,
.                        শীর্ষে সূর্য্য-উজলা!
.        করধৃত অসি দুষ্ট দলনে,
.        নয়নে কিরণ তিমির হরণে,
দেখ দাঁড়াইয়া শুভ্রবরণে,
.                        বরাভয়-দানে সফলা!

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
সুপ্রতিষ্ঠিত
কবি বরদাচরণ মিত্র
কুলদাপ্রসাদ মল্লিক সম্পাদিত, “বীরভূমি” পত্রিকার ১৩১৮সালের ফাল্গুন সংখ্যায় (ফেব্রুয়ারী
১৯১২) প্রকাশিত।


.                ১
জীবনের পরিণতি সহ
.        ঘুচিতেছে নয়নের ভুল,
অমঙ্গল-বিষদ্রুম, দেখি,
.        মঙ্গলে লভেছে দৃঢ়মূল ;
অন্তলীন পাবকের মত,
.        দেখি, প্রতি বেদনার মাঝে
( বুঝে না তা বিমূঢ় হৃদয় )
.        গূঢ় শুভ ইচ্ছাই বিরাজে।
দিবে যথা রবি অধিষ্ঠান,---
সুপ্রতিষ্ঠিত ধাতার বিধান।

.                ২
অন্ধকার, অমা-সহচর ;
.        যাতনাও পাতকে রীতি ;
জানি স্থির, পাপ দণ্ড পাবে,
.        কোন খানে চিরে বা ঝটিতি ;
জানি, দুঃখ-কঠোর-মন্থনে
.        আলোড়িত হলে হৃদিতল,
গণে আত্মা পরম কল্যাণ,
.        অমৃত-প্রবাহে লভি বল।
বিকাশের ক্লেশই নিদান,---
সুপ্রতিষ্ঠিত ধাতার বিধান।

.                ৩
ব্রহ্মাণ্ডের বিরাট-গ্রন্থনে,
.        জানি, নাহি তিলমাত্র ভ্রান্তি ;---
সার্থক সকল সত্ত্বা, সাধি
.        চরমেতে মানবের শান্তি ;
জানি, যবে দেহ-কারামুক্ত
.        আত্মা মোর করিবে প্রয়াণ,
দেশ-কাল-বিরহিত পথে,
.        মহানন্তে হ’তে অন্তর্ধান,
ধ্বনিবে ওঁকার মাঝে তার,---
সুপ্রতিষ্ঠিত ধাতার বিধান।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
চণ্ডীদাস
কবি বরদাচরণ মিত্র
কুলদাপ্রসাদ মল্লিক সম্পাদিত, “বীরভূমি” পত্রিকার ১৩১৮সালের চৈত্র সংখ্যায় (মার্চ ১৯১২)
প্রকাশিত।


নানুরে কানুর লীলা চিরমনোহর
.        বিরচিলে, চণ্ডীদাস, বাশুলি-আদেশে---
মধুর বিরহে মাথা মিলন সুন্দর,
.        হাসির মাণিক অশ্রুমুকুতায় মেশে!
নীলনভ অবলম্বি সুষমা অশেষ,---
.        কি সলাজ পূর্ব্বরাগ কিশোরী ঊষার,
সোণালী নীলাম্বরে সন্ধ্যা চারু-বেশ
.        বল্লভ আগারে চলে, কেসে তারাহার!
নানা শোভা-অভিনয়,---বাহিরে কেবলি ;
.        অন্তরে অনন্ত এক দ্বিতীয় বিহীন,---
প্রেমের অদ্বৈত গায় তব পদাবলী,
.        নীরে রচা বিচিগুলি নীরেই বিলীন!
শক্তির ভজন-প্রথা কি বুঝিব আমি,---
স্তম্ভিত জনতা---একি! ---চতুর্ভুজা রামী!

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
জয়দেব
কবি বরদাচরণ মিত্র
কুলদাপ্রসাদ মল্লিক সম্পাদিত, “বীরভূমি” পত্রিকার ১৩১৮সালের চৈত্র সংখ্যায় (মার্চ ১৯১২)
প্রকাশিত। কবিতাটি “বীরভূমবাসী” থেকে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল।


পদ্মাবতী-বল্লভ, হে জয়দেব কবি,
.        কত সুধা ছিল তব প্রিয়ার অধরে,
হরি যাহা, হৃদি ভরা মধুরতা লভি,
.        উছালিলে লেখনীতে পীযূষ লহরে!
কেঁদুলীর চাঁদে ছিল এতই অমিয়া?
.        প্রেমের প্রণব ছিল কোকিল-ঝঙ্কারে?
খেলিত মলয়ানিলে মদনের হিয়া?
.        ছিল মোক্ষ যুবতীর প্রিয়-অভিসারে?
একি প্রেম, ভক্তি, কিম্বা লালসার মায়া?
.        কিম্বা তব গীতি মাঝে বাজে এই সুর,---
আনন্দের কায়া হ’তে আনন্দের ছায়া,
.        শোধনে মিলায় জড় চেতনে মধুর!
আনন্দের দ্বন্দে সারা বঙ্গনারী-প্রায়,
স্তন-ভারে ঢলি ভক্তি মিশে প্রেম-গায়!

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
শ্রীশ্রীজগদ্ধাত্রী
কবি বরদাচরণ মিত্র
বঙ্কিমচন্দ্র সেন সম্পাদিত “দেশ” পত্রিকার ১৩৪৭ কার্তিক (নভেম্বর ১৯৪০) সংখ্যায়  
প্রকাশিত। এই কবিতাটি এই পত্রিকায়, কবির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয় তাঁর অপ্রকাশিত
কবিতা হিসেবে।

.                        ১
তূর্যমন্দ্রে সিন্ধু গর্জে বিশ্বজননী চরণে তোর,
শুভ্র দর্পে অভ্র বিদারী অদ্রিতুঙ্গ কিরীট ঘোর,
চণ্ড প্রতাপ নিদাঘ সূর্য বর্ষে অনল দহিয়া দেশ
মা তোর তীব্র শোণিত প্রবাহে জন্মে কেমনে মানুষ মেষ!

.                        ২
গভীর নিশীথে রচি শিহরণ ত্রাস-চকিত বনানী হায়
প্রতিধ্বনিত জীমূতের নাদে তব শার্দূস শিকারে যায়,
শব্দ-মথিত ঊর্দ্ধ-গগনে পাণ্ডুর শশী বেপথুমান
নিম্নে আকুর শ্বসে পশুকুল শঙ্কা-ছিন্ন ভিন্ন প্রাণ,
সম্মুখে ছোটে উড্ডীনপ্রায় দীর্ঘ-শৃঙ্গ কৃষ্ণসার
বৃথা এ চেষ্টা নিমেষ মাত্র পৃষ্ঠ উপরে যমের ভার।
ভীষণ মুণ্ডে অগ্নি কুণ্ডে চক্ষু বিবর উছলি যায়
দংষ্ট্রা ময়ূখে দীপ্ত ব্যাদান ধূমকেতুযুত রজনীপ্রায়।
মাংস ভেদিয়া ভাঙ্গি পঞ্জর খর নখাঘাতে শোণিতপাত
নিঠুর দন্তে প্রথিতকণ্ঠে রুদ্ধ যাহাতে আর্তনাদ।
প্রাণবায়ু মাখা উষ্ণ লোহেতে ঝলকে ঝলকে ভরিছে গাল
পড়েছে বহিয়া সৃক্কণীযুগ শ্যামল শষ্প করিয়া লাল।
কি শোভা রুদ্র রুধিরে আর্দ্র পীতকৃষ্ণ সমর বেশ!
মা তোর ব্যাঘ্র প্রসাবী জঠরে জন্মে কেমনে মানুষ মেষ!

.                        ৩
নির্ভয়ে ফিরি নিবিড় গহনেভ্রমে যূথপতি অমিত বল
শক্তি লুকায়ে অলস রঙ্গে খেলিছে লইয়া মৃণাল দল।
মুক্তা বরষি পত্র সহিত পদ্মকোরকে রচিত হার
গ্রথিত শুণ্ডে পর্ব-ভবনে স্রক বলয়িত স্তম্ভাকার।
পর্বতসম পৃথু কলেবর পর্বত সম উচ্চ শির
সচল অচল কঠিন অটল সুপ্ত শক্তি পুঞ্জে ধীর।
হেলায় দলিয়া মহা মহীরুহ মদের হরষে চলিয়া যায়
পদের পরষে ক্ষুব্ধ ধরণী লুব্ঝ মধূপ ঊধ্বে গায়।
বিপুল রঙ্গে, রালীয় ভঙ্গে, তুঙ্গীকৃত সে বক্র কর
বৃংহিত নাদে ভেরীর বাদ্যে বপ্রযুদ্ধে অগ্রসর।
সানুর গাত্রে গৈরিক শিলা ভেদিয়া শুভ্র দন্ত ভায়
ঊষার হর্ষ বর্ষণবৎ তরল অরুণে স্নাত প্রায়।
শুভ্র দন্তপুঞ্জ তিমির বিদারী আলোক শিখার শেষ
কুঞ্জর-ধর জঠরে মা তোর জন্মে কেমনে মানুষ মেষ!

.                        ৪
নগকন্দরে শঙ্করভূষা মনসার সথা ফণিনী বাস
সুন্দর তনু করকা শীতল তীব্র গরল জড়িত শ্বাস।
উরসগমনে দীর্ঘ শরীরে ঊর্মি বিলাস প্রকাশি পায়
নয়নে কর্ণে রুচির বর্ণে চারু চিত্রিত নগর গায়।
বক্র রেখায় রচিত বক্র কুসুমের সম সুষমাধার
নয়নের বাণে মৃগয়াকারিণী রমণীর কুচ যুগ্মহার।
শান্ত যখন চুম্বি ধরণী লুটে বিনম্র শীর্ষদেশ
একান্ত যেন অভিমানহীন মৃদু বিনয়ের উপমা শেষ ;
রুদ্ধ করুণা ক্রুদ্ধ যখন দোদুল ঊর্ধ্বে কঠিন কায়
দ্বিধা বিভিন্ন বহ্নির শিখা রক্ত জিহ্বাতে ক্ষিপ্তপ্রায়।
কঠোর আঁখিতে মঘার দৃষ্টি চক্ষে ভীষণ গর্জে রোষ
উচ্ছ্রিত ফণা লোমহর্ষণ মৃত্যু গর্ভে দন্তকোষ।
ধূর্জটি জটাপটলবিহারী সহেনা অবমাননা লেশ
মহোরগ-বহ জঠরে মা তোর জন্মে কেমনে মানুষ মেয!

.                        ৫
জ্বরে অনশনে নিধনপ্রাপ্ত চরণের তলে অয়ুত শব
জননী নিঠুর শশ্মানচারিণী কোমলতা তোর অসম্ভব।
নূপুর মুখর কঙ্কাল রাশি অক্ষি কোটরে অন্ধকার
দন্ত বিকাশে দেবতার প্রাণে বিদ্রূপযুত হাস্য যার।
কুণ্ডল তব মাগো ভৈরব কুলিশ-প্রহারী করাল মেঘ
দিগন্ত মথি ছুটে তাহে মহাঝঞ্ঝারাতের ভীষণ বেগ।
প্রলয়াবর্তে পদ্মা মেঘনা করে উদ্দাম নৃত্য ঘোর,
সে শুধু গ্রীষ্মক্লিষ্ট ললাটে উগ্র ঘর্ম-প্রবাহ তোর।
শক্তির পূজা হত ঘরে ঘরে রক্ত পিছিল আঙিনা যার
ভক্ত কণ্ঠে গভীর নিনাদে হোমানল বহে ধূমের ভার।
*        *        *        *        *        *        *
সহসা মানস নেত্রে স্বপ্ন জননী আমার বঙ্গদেশ
তুমিই ধরেছ শক্তি মূরতি দীপ্ত জগদ্ধাত্রী-বেশ।
দেবী ব্যাঘ্র-বারণ-বাহিনী গলে উপবীত ভীষণ নাগ
মহাকিরীটের কোটি প্ররোহে দহে গগনের মধ্যভাগ।
ও শ্রীপদ পানে আকুল লক্ষ নয়ন নির্ণিমেষ।
বক্ষ চিরিয়া হৃদয় পদ্ম অঞ্জলি দিবে বাসনা শেষ।

[ এই কবিতা স্বর্গীয় কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত “বঙ্গ আমার জননী আমার” সঙ্গীতের
পূর্বে রচিত হইয়াছিল। ] --- দেশ পত্রিকা।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
জাগরণ
কবি বরদাচরণ মিত্র
দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার আষাঢ় ১৩০০ (জুন ১৮৯৩) সংখ্যায় প্রকাশিত। .


তাহারি লাগিয়া                 জাগিয়া জাগিয়া
নিশিথে আপনা পাশরি,
মধু কথা তার                    স্মৃতির মাঝার
পশে যেন দূর-বাঁশরী!
জ্যোত্স্না-নিন্দিত তার রূপভাতি
উজলে আলোক হৃদয়ের রাতি,
শতেক কামনা
কুমুদ বরণা
.                        তরল রজতে ঝলসে!
নলিনী কোমল তার মুখখানি
ভাসাই মানস-সরসেতে আনি,---
লহরী-লীলায়
প্রাণ ভেঙে যায়
.                        অসহ সুখের অলসে!
পরিমল-মাখা সে মধুর হাসি
কোমল নিক্কণে বাজে হৃদে আসি,
বড় যে তাহায়
ভালবাসি, হায়,
.                        মাণিক কি তায় পড়ে গো?
মধুর বেদনে আঁখি ছল ছল
দেখেছি যে তার নয়নের জল,
চুমেছি যতনে
সে অমূল্য ধনে,---
.                        মুকুতা কি তায় গড়ে গো?
বসন্ত-পবনে সৌরভের মত,
তার মৃদু-শ্বাসে পিয়াসে সে কত,
দুলায়ে আদরে
হৃদি-ফুল-থরে,
.                        পশিত-মরম-নিভৃতে!
পরশ তাহার বিজলি-সমান
পশিলে স্মরণে মূরছে পরাণ,
মরণের সুখে
চাহি পুনঃ বুকে
.                        সে ফুল-অশনি ধরিতে!
তাহারি ত লাগি                 সারানিশি জাগি
গগনে তাকৃরকা গুণি রে,
তারি সুধা কথা,                তারি মধু ব্যথা,
তারি মৃদু-শ্বাস শুনিরে!

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বসন্তে কিংশুক
কবি বরদাচরণ মিত্র
দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩১০ (ফেব্রুয়ারী ১৯০৪) সংখ্যায় প্রকাশিত।
.

রাঙা কিংশুকে ফুটেছে বিলাস কার এ?
শুষ্ক শাখায়, নিম্নে উচ্চে,
সুধূম-বহ্নি পুষ্পগুচ্ছে
জ্বলিছে কাহার আকুল, তপ্ত,
.                অসরম কামনা রে?
শিশির-শীর্ণ রিক্ত তরুতে,
কিবা এ দৃশ্য, মলয়-মরুতে,---
অস্থি বিদারি শোণিত-উত্স,
.                দীপ্ত লালসা-সারে!
তুমি কি, বৃক্ষ, সমাধি-মগ্ন
পঞ্জর-শেষ তাপস নগ্ন?---
বাসব-অসূয়া-কেন্দ্র হয়েছ
.                সংহরি বাসনারে?
মদিরা-আধীর, ঘন রঞ্জিত,
চুম্বন তরে মণ্ডলীকৃত,
কাহার মত্ত অধর-ওষ্ঠ
.                মথিছে,---কুসুমাকারে?

অ-সুরভি, শুধু বর্ণে শেষ,---
এ বিলাসে নাহি প্রেম-লেশ,---
কাহার ব্যঙ্গ-নিঠুর রঙ্গে
.                সঁপিয়াছ আপনারে?
একি উর্ব্বশী, মদন-গরবে,
জ্বালি আলিঙ্গনে বাসনা-বাড়বে,
দহিছে শান্তি সমাধি, শতেক
.                অনল-প্রতিম মারে?

.              ********************             

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*