কলিটিতে ঢুকলে বেআদব বুড়ো ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস্ মাপে চোখ দিয়ে ট্রামের মেয়েরা, বসন্ত কেবিনের ছোকরারা সিঁথিটা দেখে নেয় প্রথমেই (আমি তো সেই চোদ্দ বছর আগে যেমন ছিলাম) ফাটাপায়ে আলতা, পাকাচুলে সিঁদুর-পরা বুড়ি চোখ দিয়ে বলে, আমাকে দেখ্ | দেখলাম | বুবু, তোমার কালোজামের মত মুখও হঠাৎ লাল হয়ে উঠত আমি কি লক্ষ করি নি ? কিন্তু ভালোবাসা যে এক দুরূহ তত্ত্বের বিষয়--- দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি, জুডাইসম্ বা কোয়ান্টাম থিয়োরির মতো তদুপরি ভালোবাসার ত্বকে সহজিয়া মলম থাকায় দুরূহতা মালুম হয় পরে, . যখন খুব দেরি হয়ে গেছে | আমার দোষ ছিল না |
যার ওপরে পতাকা উড়ছে ওটাই মেরী টেইলরের পাহাড়, এই রোয়াম বলতে বলতে বিল্লু সিং ঘুরিয়ে নেয়, মাটাডোর--- ওই রাখামাইন্ সের পথ | চাইবাসা, মুসাবনি না ধলভূমগড় কি ধারাগিরিও না এখন শুধু রোয়াম, সবুজ পাহাড় এখন শুধুই জাদুঘোড়ার রুঙ্কিনী দেবীর মন্দির | নিচে জলাধার--- পাহাড়ের ঊর্ধ্বমুখী পথ---নির্জনতা--- চড়া রোদ--- পায়ে আল্ গা পাথরের টান নিশানচিহ্নিত ওই শীর্ষে গুহা গুহামধ্যে রঙ্কিনীর অভ্রবর্ণ হাসি | না | আমরা কেউ কেউ অর্ধেকের বেশি ওই পথে উঠতে পারি নি মাথা নিচু করে ফিরে এসেছি |
সন্ধিনীর বাগানে যখন পাতাপোড়ানোর গন্ধ--- অন্ধকার সপ্তর্ষিমন্ডলের দিকে চোখ রেখে বলেছি--- এবারেও আমাদের মুঠোয় রইল রাত মোহনা আর সুবর্ণরেখার বালি |
দূর থেকে একাকার বোধ হয় অথচ ভেতরে ঢুকলে প্রত্যেক মানুষ ভিন্ন অরন্যের মহীরুহ যেমন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ, পরস্পরকে চেনে না দমবন্ধ সান্নিধ্যের গা ঘেঁষে থাকে বাঁশপাতা প্রমাণ ফাঁক চিরে ঢুকে আসে আলোর ছুরি, বলী বাতাস পোকামাকড়ের হতবুদ্ধি ছয়লাপ গাছের, মানুষের নির্বিকার টাল খায় না
দূর থেকে মানচিত্রের মত ভেতরে ঢুকলে উচ্চাবচ, অজ্ঞান, গা-শিরশির মানুষ মহীরুহ প্রতীয়মান হয়ে ওঠে
২
মেযে কলেজের গায়ে সতীর পোস্টার আনকোরা কাগজে খবর কম, সাহিত্যের কোটা তাই বেশি অবজ্ঞার হাই তুলে বুদ্ধিজীবী আলজিভ দেখায় অশালীন এইসব দৃশ্য বুঝে নিয়ে হেঁটে যায় মাইওপিক গম্ভীর বালক পিঠে পাথরের মত সাঁটা নাছোড় ঐতিহ্যসূত্র ঠান্ডা মুগ্ধবোধ
৩
সারারাত তিনটে শাদা দেয়াল দেখতে দেখতে জেগে ওঠে অনুচিত রিরংসা সমস্ত দেয়াল আমি ঢেকে দেব রঙিন পোস্টারে শিল্পের উচ্ছিষ্টে যদি ঘুম
আদি পশুপালকের সংগীত ছিল না কোন ধী ছিল প্রভুত্বে চালনায় গান ছিল কৃষকের প্রাণে, বীজশস্যে বসন্তশরৎনৃত্যে, রাসে
পশু চারণের মেধা গণিতের হাত ধরে আসে তুলে নেয় কর্ষণসংগীত জ্যামিতির ছন্দ ও নিয়মে সংগীতআবহে যজ্ঞে পশুহুতি হয় | সে কি ভ্রম?
ওগো অন্তোবাসী যে সন্ধিপ্রকাশ রাগ মুহূর্ত অম্বিত করে প্রদোষপ্রত্যুষে সে তোমার নিজস্ব গণিত শীর্ষে রাখ তাকে
আর এই তারপরম্পরা একে দাও প্রসিদ্ধ প্রস্থান এ পিঙ্গল ধুমকুন্ড থেকে স্বচ্ছতার একুশ শতকে পৌঁছে দাও স্বরস্থান চিনে নিতে প্রজন্মের অনভ্যস্ত হাত খুঁজে নেবে বাঁধা তীর্থকুশ |
কবিতা কীভাবে হয়, নিছক কবিতা চেহারায়, ছন্দে, অবস্থানে ? শব্দে পিরামিড করো অথবা মন্দির, তার মানে একটি একটি শব্দ প্রতিটি লাইনে বেশি দাও ঋজুদেহ অথবা কৌণিক শব্দ ভেঙে অক্ষর বসাও পরপর পংক্তি বাড়ে---দীর্ঘকাব্যে চাই পরিসর | যদি বদলাতে চাও দিক দৈর্ঘ্য ছেঁটে প্রস্থের প্রসারে রাখো হাত চতুষ্কোণ ঘরের আঙ্গিক আনো নিম্নরেখ শব্দে টানো গাঢ়তর কালি | হয় না কবিতা---শুধু কথা চালাচালি ? . তাহলে বিচারে রাখো বক্তব্য বিষয় | কী বিষয় কবিতার প্রিয় ? কিছুই অচ্ছুৎ নয় জেনেছ যদিও তবু, তবু----স্বীকারোক্তি, জীবনযন্ত্রণা ? গীতধর্মী রসাপ্লুত লিরিকের টান কিংবা কিছু সমুচ্চ শ্লোগান আত্মরতি, অনন্বয় অথবা যৌনতা অথবা কবিতা কিছু বস্তু-অভিজ্ঞতা ?
কবিতা কাহাকে বলে---কীতাহার মাপ আগামী সাক্ষাতে চাই তোমার জবাব |
কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ায় সোমবার কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়
আলো ফুটতে-না-ফুটতে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ায় সোমবার | একটু পরেই শুরু হবে মানুষজনের ছোটাছুটি মিলেমিশে যাবে ঘাম, পারফিউম আর ঘাড়ির নির্বিকল্প আওয়াজ অথচ সোমবারের কোনও উপলক্ষ নেই শ্যাওলা-কর্ডুরয় আর জারুলশার্টের ওপরে . দৃঢ় চোখে একটু বা ছায়া, চুপচাপ | তিরস্কারের ছলে কিছু বলতে গেলেই ঠোঁটে আঙুল রাখে সে আর তখনই ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে থাকে . তর্জনী-চাপা ঠোঁট যেন লালমাটির মৃদঙ্গ যেন ফেটে-যাওয়া নির্মিত বেদানা | এবারে চোরকাঁটা বাছবার ছলে মুখ নামিয়ে বলি--- উপগ্রহশাসিত ভূগোলের ওপর ব্যস্তসমস্ত . ঘুরে বেড়াছ্ছি আমরা যেন জনাকয়েক পিগ্ মি কাজ নয়, সন্ত্রাসও নয় সোমবার, আমাদের চরাচরের পাসপোর্ট আমাদের প্রবহমানতা--- শেষ করবার আগেই বেসমেন্ট থেকে ভুশ্ করে উঠে আসে অন্ধকার সোমবার চলে যায় কোন পরম্পরা না-রেখে |
পুরুষের রৌদ্রছায়া ছুঁতেই পারে না ওরা, মানে মেয়েমানুষেরা ঈষত্গর্বিত যুবা বলেছিল এক দশক আগে আজ দেখে চমকে উঠি | বলতে চাই এ-ও ব্যবহার ভঙ্গি, শাসকশোষিত শ্রেণীরেখা পরিকাঠামোর প্রশ্নে পুরুষ অহং রোমশ ত্বকের মতো লেগে আছে বুকে | সম্নানপূর্বক তাকে ডেকে আমি বলি, রমনীর রৌদ্র বাঁধা ইস্পাতশিকলে ছায়া জড়িবুটি কার হাতে মীমাংসার ভার, অধিকার সে পুরুষ ?
আমি শুধু বলতে পারি নির্ণয় চেষ্টার কথা বলতে চাই অশীতোষ্ণস্বভাবী মানুষ সামাজিক, কর্তৃত্বে প্রথম | ভিন্ন দু-চারজন শুধু জানে সূর্যতাপ, জানে ছায়া ভারবেনা গাছের বন্য জাদু | ওদের দেবে কি চিহ্ন মেয়েমানুষের, পুরুষের ? অনির্দিষ্টযোনি ওই কজন বেঁচে থাক ডাইনিতুল্য প্রত্ন কলকাতায় |
সব কবিতাই পুনর্লিখিত কবিতা পুরোনো বোতলে নয়া মদ ভাঙা বাতিদানে নতুন মোমবাতি জ্বেলে দেওয়া জেনে গেছি, একথাগুলিও জীর্ণ, নিতান্ত পুরোনো আমাদের বক্তব্য পরোনো, দ্বিধাগ্রস্ত দান ও গ্রহণ | যেহেতু নতুন মানে মগজের মধ্যে প্রতিক্রিয়া অভ্যাস বদল, তাই নতুনে আসন্ন ভয়, বিপ্লবে সন্ত্রাস | বিপ্লবের অর্থ ভেঙে দেওয়া---হুঁকো পালকি . বৈঠকী মৌতাত ?
বিপ্লবের অর্থঢেলে সাজা পুরোনো আদল, . একের বদলে অন্য ? তবে কেন অযথা ঝঞ্ঝাট ? যা আছে তা থাক, তার ছকটুকু থাক শুধু ঘুঁটি পাল্টে পাল্টে খেলা--- শব্দনিয়ে, . রঙিন মোমবাতি নিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা, খোলা কান কোথায় কী পুড়ছে জানি না, বাজনাটা বাজুক |
১ নির্যাতনে কে দিয়েছে ভাষা ? কবিতা, কবিতা | কে পেয়েছে এত ভালোবাসা ? সেও তো কবিতা | তাহলে স্বাধীন রেখো তাকে সে যেন স্বেচ্ছাধৃত থাকে |
২
যে আগুনে ভেতর থেকে শরীর পোড়ে তা কি তোমার আছে ? তাহলে তুমি দুঃখী |
যে আগুনে ভেতর থেকে শরীর পোড়ে তা কি তোমার নেই ? তাহলে তুমিই দুঃখী |
৩ দু’বার পোষাক পরার মধ্যে একবার নগ্নতা আসে, দু’টি দিনের মাঝখানে একবার রাত | মানুষ সে সময় নিজেকে আবিষ্কার করে আর এভাবে বাড়তে থাকে অভিজ্ঞতা নগ্নতা ও রাত্রি |
৪
গেলে সব কেড়ে নিয়ে যায় শূন্য হাতে ফেরে অথবা ছোঁয় না কিছু, নিঃশব্দে হারায় ফেরে না আখেরে ধুলো ছোঁড়ে চৈত্রের বাতাস পৃথিবী জর্জর সে দেখে না বূপ কিংবা শোনে না সুস্বর হাসে অট্টহাস |
শর্তাধীন না সে কেন তবু ফিরে ফিরে আসে ?
৫
যে পারে আপনি পারে . যে পারে না কখনো পারে না যে হারে এসেই হারে . যে হারে না কখনও হারে না |
. তবু কেউ ঘুরে ঘুরে আসে . ধরা পরে লজ্জা ও সন্ত্রাসে . মরে, কবিতাকে ভালোবাসে . তবু তার প্রণয় কাড়ে না |
৬
বকুলবৃক্ষ ঝাঁকিয়ে দিলে মাটিতে ফুল পড়ে আমিও কিছু কুড়িয়েছিলাম প্রকান্ড এক ঝড়ে |
আমার কিছু ঝ’রে পড়ুক আপনি আসুন, কাঁপান একটি শিশু কুড়িয়ে নেবে আপনি যদি না পান |
৭
কিছুই কিছু না ----এই কথাটা বলেও মুখে তার কিছু বাকি থাকে যখন যাবার আগে আপাদমস্তক একবার শুধু ছোখ রাখে |