কবি বিনায়ক সমাদ্দার চৌধুরীর কবিতা
আশা
কবি বিনায়ক সমাদ্দার চৌধুরী


যে পথ হারিয়েছিলো সাগরের কূল খুঁজে ফিরে
নীলে নীল অন্তহীন সমুদ্রের জলে
দিশাহীণ নাবিকের দল পালতোলা সমুদ্র জাহাজে
জলেভেজা পাখা নিয়ে উড়ে আসা নীলকণ্ঠ পাখি
দিয়ে গেছে ক্ষণিকের আশার আভাস।
এমন সমুদ্রে বুঝি উঠেছিলো চাঁদ
রাতের আকাশে
যতোখানি আলো ছিলো চাঁদের গহ্বরে
সবটুকু আলো
মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে সমুদ্রের জলে
মৃদু কুয়াশার ঢাকা মায়াময় সেই মধ্যরাতে
হঠাৎ উঠেছে ভেসে
দূর দ্বীপবাসিনীর শিয়রের জ্বলে থাকা আলোর আভাস
অজানা দ্বীপের ছায়া
সারারাত জেগে থাকা প্রদীপের আলো।
এমন আশার আলো
কোনোদিন কেউ বুঝি দেখেনি কখনো
একি মতিভ্রম নাকি মায়ার কুহেলী
নাকি রাত্রিশেষ হলে নতুন প্রভাতে
প্রখর সূর্য্যের আলো শত শত সূর্য্য হয়ে
প্রতিসৃত হয়ে যাবে সমুদ্রের জলে
কেটে যাবে মায়া
আবার কখনো বুঝি অসহায় নাবিকের চোখে
এই সমুদ্রের বুকে অপর্যাপ্ত চাঁদের আলোয়
আজকের রাতের মতন
আশার ছলনা হয়ে দেখা দেবে দেবী
এমনি মায়ার রাতে আবার সেদিন
চাঁদের গভীর থেকে সবটুকু আলো
মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে সমুদ্রের জলে।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মরুগ্রাস
কবি বিনায়ক সমাদ্দার চৌধুরী


চাতক পাখির মতো দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে ধু ধু মরু
নীলে নীল আকাশের দিকে
যেখানে মেঘের কোনো দেখা নেই।
দিন থেকে রাত হয়
উত্তপ্ত বালির কণা
বিকিরণ করে করে শান্ত হয়
অন্ধকারে ছায়া নামে নীরব ঘুমের।
সবুজের সমারোহ এখানে ছিলো একদিন
নানাবিধ উদ্ভিদের প্রচুর উল্লাস
তখনো মানুষ নেই সেই পৃথিবীতে।
ছিলো কিছু পতঙ্গের আনাগোনা
ফুল থেকে ফুলে
গাছের পাতার থেকে অন্য কোনো গাছের পাতায়।
তারা সব চলে গেছে বালি ঢাকা মাটির গভীরে
তাদের জীবাশ্মগুলি
উজ্জ্বল সুষুপ্তি নিয়ে ঘুমোয় অঘোরে
কোটি কোটি বছরের ঘুম।
তার পরে একদিন যান্ত্রিক খননে
ভেঙে যায় ঘুম
অঙ্গারের জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল আলোয়
ভেসে যায় অন্ধকার
নগরীর রাজপথে জ্বলে ওঠে বিদ্যুৎ প্রদীপ।
প্রবল ঝড়ের শব্দে হঠাৎ কখন
সণ্‌ সণ্‌ বেগে
এপাশ ওপাশ থেকে চারিদিক ঘিরে
বিদ্যুৎ মশালে দীপ্ত নগরীর শূন্য পথে পথে
হাহাকার করে ছোটে বাতাসের সঘন নিঃশ্বাস
ভবিষ্যৎ জীবনের বার্তাবহ হয়ে।
মরুর প্রান্তর থেকে উঠে আসা
বালুকণা সেদিন যেমন
ঢেকেছে অশান্ত সেই সবুজ প্রবাহ
যেমন ঢেকেছে জলে দ্বারকার অপূর্ব্ব প্রাচীর।
হায়কি এখানে
আবার হারাবে নাকি এই নগরীর
এই সভ্যতার যতো উজ্জ্বল উচ্ছ্বাস।
আমাদের জীবাশ্মের অবশেষগুলি
উড়াল পথের রেখা নগরীর বুকে
সবকিছু হারাবে কি
অন্তহীন বালির রেখায়
মিলাবে চোখের দৃষ্টি
তৃষ্ণায় আতুর চোখে চেয়ে চেয়ে আকাশের দিকে।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
পরিত্রাণ
কবি বিনায়ক সমাদ্দার চৌধুরী


সন্ধ্যার আকাশ জুড়ে ঝিক্‌মিক্‌ করে ওঠে
কোটি কোটি তারাদের চোখ
অসীম কৌতুক নিয়ে চেয়ে থাকে পৃথিবীর দিকে
বিদ্যুৎ মশালে ঘেরা নগরীর প্রমোদ উদ্যান
নানা রকমের সাজে সুসজ্জিত বিপণন শ্রেণী
বৈদ্যুতিন পর্দার ওপর
ফুটে ওঠে নানা ছবি অনেক রঙের
এতো রঙ নেই বুঝি তারাদের দেশে
মানবীর চোখে মুখে সুখের উচ্ছ্বাসে
ফুটে ওঠে কিসের আভাস
স্বর্গের অপ্সরী ছিলো শোনা যায় ইন্দ্রের সভায়
মায়ার বাঁধন নেই অশ্রুহীন তাদের দৃষ্টিতে
এই নগরীর পথে চলে চলে
ক্লান্ত পায়ে পায়ে
জানিনা কিসের টানে
জীবনের শেষ শক্তি নিঃশেষিত করে
রঙের বাহারে ডুবে
মৃত্যু থেকে পরিত্রাণ চেয়ে প্রাণপণে
দুহাত বাড়িয়ে আমি দিয়েছি আকাশে
কোথাওতো কেউ নেই মহাশূন্য অনন্ত জগতে
একাকী মানব আমি
আমার অস্তিত্ব বুঝি  ডুবে যাবে রঙের সাগরে
কাঁচের গোলক থেকে প্রতিসৃত বর্ণালীর ছটার ভিতরে
নাকি কোনো জাদুমন্ত্রবলে
আমার সমস্ত সত্ত্বা
আবার অস্তিত্ব তার খুঁজে পাবে দূর কোনো নক্ষত্রমণ্ডলে
অন্য কোনো গ্রহের আশ্রয়ে
অন্য এক সূর্য্যের দীপ্তিতে।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
সবুজ উল্লাস
কবি বিনায়ক সমাদ্দার চৌধুরী


প্রাণ অভিষিক্ত হয় নরম বর্ষায়
যে প্রাণ ঘুমিয়েছিলে বীজের ভিতরে
শেওলার হাত ধরে বন্ধুত্বের অটুট প্রত্যয়ে
ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীর বুকে।
জীবনের যতো জ্বালা
রোদে পুড়ে খাক হয় আকাশের নীল রঙ
তার থেকে আরো বেশী জ্বালার দহন
আমাদের ইতিহাসে
রক্ত দিয়ে লেখা নানা কথা ও কাহিনী
রক্তের নির্মম দাগ
ধুয়ে যায় মুছে যায় অঝোর বর্ষণে।
পরিত্যক্ত প্রাসাদের ভাঙাচোরা সিঁড়িপথ বেয়ে
শেওলার স্রোত নামে সবুজ উল্লাসে
ঘাসে ঢাকা পরিচিত পথের দুপাশে
সবুজ উল্লাসে
হাজার ধানের শীষে
জলেভেজা বাতাসের উন্মত্ত খেলায়।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*