কবি দীনবন্ধু মিত্রের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
পদ্য
মেয়েলী ছন্দঃ।

এমন সুখের দিন কবে হবে বল, দিদী কবে হবে বল লো, কবে হবে বল।
এতদিনে যাবে যত বিপক্ষের বল, জিদী বিপক্ষের বল লো, বিপক্ষের বল॥
বিধবার বিয়ে হবে এত বড় কল, দিদী এত বড় কল লো, অধর্ম্মের ফল॥
বিবাদি হয়েছে এবে যত সব খল, দিদী যত সব খল লো, যত সব খল।
ঈশ্বরের লেখনীতে সব যাবে তল, দিদী সব যাবে তল লো, সব যাবে তল॥
পরামর্শ করিয়াছে যত যুবা দল, দিদী যত যুবা দল লো, যত যুবা দল।
ঘুচাইবে আমাদের নয়নের জল, দুটি নয়নের জল লো, নয়নের জল॥
বিধবার নাহি আর জুড়াবার স্থল, দিদী জুড়াবার স্থল লো, জুড়াবার স্থল।
কতই হইব সুখি বিয়ে হোলে চল, দিদী বিয়ে হোলে চল লো, বিয়ে হোলে চল॥
অঙ্গে দিলে অলঙ্কার লোকে ধরে ছল, পোড়া লোকে ধরে ছল লো, লোকে ধরে ছল।
এভয়ে পরিব পায়ে চারিগাছা মল, দিদী চারি গাছা মল লো, চারি গাছা মল॥
এবলা সরলা অতি নাহি কোন বল, দিদী নাহি কোন বল লো, নাহি কোন বল।
পতিরে পড়িলে মনে আঁখি ছল ছল, করে আঁখি ছল ছল লো, আঁখি ছল ছল॥
কেন আর মন দুঃখে গৃহে চল চল, দিদী গৃহে চল চল লো, গৃহে চল চল।
ঈশ্বরের পরামর্শ জানিবে অটল, দিদী জানিবে অটল লো, জানিবে অটল॥
ধক ধক করে মনে সদা দুখানল, দিদী সদা দুখানল লো, সদা দুখানল।
শীতল হইবে পেলে বিবাহের জল, দিদী বিবাহের জল লো, বিবাহের জল॥
১০ ফাল্গুণ                                                অহং
সন ১২৬২।                                                শ্রীদী, * * *

.             ********************              
                                                             
                                সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
বিধবার বিবাহ
কবি দীনবন্ধু মিত্র
কবিতাটি ঈশ্বর গুপ্তের “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকার ২২ ও ২৫ ফেব্রুয়ারী ১৮৫৬ তারিখের
সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রথম অংশ গদ্যে এবং দ্বিতীয় অংশ পদ্যে। সংবাদ প্রভাকরের
যে পাতায় প্রথম (গদ্য) অংশটি ছাপা হয়েছিল তা আমাদের কাছে নেই, তাই সেই অংশ
আমরা ১৯৬৭ সালে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্ষেত্র গুপ্ত দ্বারা প্রকাশিত “দীনবন্ধু
রচনাবলী”-র নানা কবিতার, গদ্য-পদ্য, থেকে তুলে দিয়েছি। দ্বিতীয় (কিছুটা গদ্য এবং
 
পদ্য) অংশটির সংবাদ প্রভাকরের পাতা আমরা পেয়েছি এবং সেখানে যেভাবে প্রকাশিত
হয়েছিল ঠিক সেভাবেই এখানে তুলে দিয়েছি।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২২.০৯.২০১৮।


মান্যবর শ্রীযুত প্রভাকর সম্পাদক মহাশয় সমীপেষু।


.        একদা পল্লীগ্রামবাসিনী চারুহাসিনী
কতকগুলিন কামিনী একত্রে বসিয়া হাস্য
কৌতুকে সময় সম্বরণ করিতেছিলেন, এমত
সময়ে এক নবীনা পতিহীনা অনুপমা নামা
তথায় আসিয়া ম্লানভাবে অবনতমুখী হইয়া
এক পার্শ্বে বসিলেন, তাঁহার এরূপ ভাবভঙ্গি
ও অসৌন্দর্য্য নিরিক্ষণ করিয়া নিস্তারিণী
নাম্নী কোন এক কামিনী মধুর সম্ভাষণে
জিজ্ঞাসা করিলেন, অনুপমা! আজি বোন
তোমার সুধাংশুদৃশ সুচারু লাবণ্যের এরূপ
কৃশতা ও বিবর্ণতা কি জন্য ঘটিয়াছে ও বিমল
বদন হইতে পীযূষমাখা বাক্য সকল কেনই বা
বিনির্গত না হইতেছে, ভগিনী! একটিবার
বিধুমুখে মধুমাখা বাক্য কহিয়া আমারদিগের
কর্ণযুগলকে সুশীতল ও নেত্রদ্বয়কে হাস্য
করত চরিতার্থ কর, আমরা কি তোমার বিমনা
ও এরূপ ভাবভঙ্গি দেখিয়া স্বচ্ছন্দ শরীরে
সুস্থির হইয়া রহিয়াছি? ও তোমার নীরপূর্ণ
নেত্র নিরখিয়া কি আহ্লাদিতা হইয়াছি?
কখনই নয়, তোমার দুঃখানলে আমাদিগের
অন্তঃকরণ অহরহই দগ্ধ হইতেছে, ভগিনী!
সহাস্যবদনে বাক্য কও, মনানুগ সম্বরণ
সলিলে নির্ব্বাণ কর। অনুপমা সঙ্গিণীর
এরূপ সম্ভাষণ শ্রবণান্তর অন্তরে আরো
খেদান্বিতা হইয়া বলিলেন, বোন! পতিহীনা
নারীর মলিনতা ও বন-দগ্ধা হরিণীর চাঞ্চল্য
হইবার কারণ কেন অন্বেষণ করিতেছ?
তাহাদের মনোদুঃখ অপরে কি প্রকারে
বুঝিতে পারিবে, ভগিনী! আমি পতিরত্ন
হারাইয়া যেরূপ দুঃখিতা আছি ও আমার
অন্তর যে তাহার নীরজ ন্যায় নেত্র-যুগলের
পীযূষময় দৃষ্টি অন্তর হওয়ায় কি পর্য্যন্ত
বিষাদাগ্নিতে দগ্ধ হইতেছে তাহা বর্ণনা
করিতে কাহার হৃদয় না বিদীর্ণ ও শ্রবণ
করিতে কাহার মন মলিন না হয়? আহা!
পতিবিচ্ছেদ কি পরিতাপ, যাহা স্মরণ করিলে
মরণকেও শতগুণে শ্রেয়কর মঙ্গলদায়ক ও
কল্যাণপ্রদ বোধ হয়, আমি কি এরূপ প্রিয়ম্বদ
প্রিয় মিত্রের নেত্রের বাহির হইয়া স্থিরচিত্তে
দিন যামিনী যাপন করিতেছি? ও আমার নয়ন
কি তাহার মোহন মূর্ত্তি পরিহারপূর্ব্বক
অপরের অসামান্য ও অকিঞ্চিত্কর সৌন্দর্য্যে
মুগ্ধ হইয়া রহিয়াছে? ও আমার শ্রবণ কি
প্রিয়তমের প্রিয় সম্ভাষণ ও সুললিত শব্দ-
বিন্যাস শ্রবণে প্রয়াস না করিয়া অপরের
লালিত্যরহিত যত্সামান্য বক্তৃতা-রসে সুশীতল
হইতেছে কোথায়? তাহারা সততই সন্তোষ-
বিহীন হইয়া স্বীয় ২ কার্য্য সম্পাদনে সঙ্কট
ভাবিতেছে, চিত্ত ভগ্ন, নেত্র নীরে মগ্ন, শ্রবণ
বধির ন্যায় রহিয়াছে, একে বিধবা হইয়া পতিৃ
বিরহে দেহে সুখশূন্য হইয়া ক্ষুণ্ণ মনে সময়
সম্বরণ করিতেছি, তায় আবার আজি নিদারুণ
একাদশী উপবাস-রূপ অসি দেখাইয়া শরীর
শুষ্ক করিতেছে, আমি কি বোন জীবন-
বিহীনে জীবন ধারণ ও আহার না করিয়া
ক্ষুধা সম্বরণ করিতে সমর্থা হইতে পারি?
আমার শীরে কি এ কঠোরকূপ একাদশীর
উপবাস সহ্য হয়? প্রাণ যায় যায় আর বাঁচি
না, শরীর শুষ্ক ও কম্পিত হইতেছে, ক্ষণে২
যেন চারি দিক্ শূন্য দেখিতেছি, এ
অভাগিনীকে আর কত কাল এরূপ বৈধব্য
যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবেক, ও একাদশীর
উপবাসে কলেবর জীর্ণ শীর্ণ করিয়া বাঁচিয়া
থাকিতে হইবেক, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি
না, আমার চতুর্দ্দশবর্ষ বয়ঃক্রম সময়ে কি
দুর্দ্দশা না ঘটিল? বসন ভূষণে বর্জ্জিত
হইয়াছি, বেশ ঘুচিয়াছে, কেশ গিয়াছে,
অবশেষ শেষ হইলেই বোন অশেষ ক্লেশ হইতে
পরিত্রাণ পাইতে পারি, আর জীবিত থাকিতে
ইচ্ছা নাই, জনক জননী যাঁহারা প্রাণতুল্য
প্রিয়পাত্রি করিয়া অপর্য্যাপ্ত প্রীতি ও স্নেহ
প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাঁহারা এক্ষণে হতৃ
ভাগ্য ও পাপীয়সী ভিন্ন আর কোন সম্ভাষণই
করেন না, শ্বশুর শাশুড়ী যাঁহাদের যতনের
ধন ও কণ্ঠের হার আনন্দের আধারস্বরূপ
হইয়া অসীম সুখ সম্ভোগ করিয়াছিলাম,
তাঁহাদেরও এক্ষণে বিষদৃষ্টি হইয়াছি ও
তাঁহারা রাক্ষসী বলিয়া আর মুখাবলোকনও
করেন না, আহা! আর কতকাল এরূপ যন্ত্রণা
ভোগ করিব, প্রাণ পরিত্যাগ করিবারও তো
কোন উপায় দেখিতেছি না, লার্ড বেন্টিঙ্ক ও
মহাত্মা রামমোহন রায় সহমরণ নিবারণ
করিয়া কি যোষিত্গণের বিহিত উপকার
করিয়াছেন, না না আমার বিচারে তো
তাঁহাদিগের এরূপ চিরস্মরণীয় মহৎ
পুণ্যকে অশেষ ক্লেষকর ও দূষণাবহ বলিয়া
বোধ হইতেছে, যদিস্যাৎ পতির লোকান্তে
নারীগণের পক্ষে পতি পাইবার কোন
উপয়ান্তর থাকিত তা হইলে উক্ত মহাত্মা-
গণের এই অনির্ব্বচনীয় করুণা ও কীর্ত্তির
কতই শোভা প্রকাশ পাইত, পতির মৃত্যু হইলে
বিধবা হইয়া এশেষ ক্লেষ ভোগ করা অপেক্ষা
সহমরণকে শতগুণে স্রেয়কর বলিলে সম্ভব
হইতে পারে ; পতির সহিত সন্দর্শন হউক বা
না হউক তাহাকে পাই বা না পাই যাহজ্জীবন
দুঃখানলে দগ্ধ হওয়া অপেক্ষা এক দিবস দগ্ধ
হইয়া প্রাণ বিনাশ করা কতই ক্লেশকর বল?
.        অনুপমার এরূপ আক্ষেপ শুনিয়া
গিরিজা নাম্নী কোন গুণবতী কহিলেন,
অয়ি, সুশীলে! স্থির হো আর উতলা হইও
না, বোধ করি এতদিনে আমাদিগের দুঃখের
নিশি অবসান হইবার উপক্রম হইয়াছে, সুখ-
রূপ সূর্য্য আমাদিগের সৌভাগ্যরূপ
গগনমণ্ডলে অচিরাৎ উদয় হইবেক, নগর পল্লী
সকল স্থানে ও ঘরে ঘরে সর্বত্রই এইরূপ
জনরব হইতেছে, পতিহীনা মলিনা বিধবা-
গণের যন্ত্রণা নিবারণার্থে পরম করুণাকর
শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবা
বিবাহ প্রচলিত করিবার ব্যবস্থা প্রস্তুত
করিয়াছেন, বোধ করি অবিলম্বেই গবর্ণমেন্ট
সহমরণ রহিত করণের ন্যায় বিধবা বিবাহ
প্রচলিত করিবার অনুমতি প্রদান করিবেন।


এর পরের অংশ, “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকা থেকে হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে . . .

মান্যবর শ্রীযুত প্রভাকর সম্পাদক
মহাশয় সমীপেষু।


[ গত শুক্রবারের শেষ ]

.        ভগিনী! আর ভাবিওনা আমার
দিগের পক্ষে এবড় কম পড়তা নয়,
একথা শুনিয়া আর একটী স্ত্রীলোক
বলিল ঠিক লো ঠিক এজন্যই বুঝি
বোন কাল আমার কর্ত্তাটি এরূপ
কৌতুক করিয়াছিলেন, “প্রিয়সী
মনে রেখো, তোমাদের আর বার
পায় কে? আজ কাল তোমাদের
কচেবারো আর যুগ ভাঙ্গিতে হবে
না বিধবাগণের বিবাহ হইবেক,
বিদ্যাসাগর মহাশয়কে আশীর্ব্বাদ
কর তিনি তোমাদের সহজ উপকা
রক নন, এতদিনে তোমাদের সিঁ
তের সিন্দূর ও হাতের লোহা অক্ষয়
হইল” পতি মুখে এইরূপ কৌতুক
শুনিয়া প্রথমতঃ তাঁহার মনোরঞ্জন
ও সুশীলা স্বভাব প্রদর্শন জন্য বলি
লাম ওমা কি ঘৃণা এ কেমন করিয়া
হবে, আবার আমরা অন্য পুরুষের
নিকট কি প্রকারে ঘোমটা খুলিয়া
মুখ তুলিয়া কথা কহিব, কি লজ্জা
মেয়ে হোয়ে কি এত বেহায়া কেউ
হইতে পারে, পরে মনে২ করিলাম
হে জগদীশ্বর! বিদ্যাসগর মহাশয়
কে শত হস্তে লেখনী সঞ্চালনে ক্ষ
মতাবান করুণ, তিনি যেন সহস্র
লোচন হইয়া একেবারে সহস্র গ্রন্থ
অবলোকন করিয়া সৎযুক্তি সকল
সঙ্কলন করিতে পারেন, তিনি দীর্ঘ
জীবী ও বৃহস্পতি তুল্য বুদ্ধিমান
হউন। পরে মতি নাম্নী একটি বিধ
বা বলিলেন যথার্থ বোন আমিও
অনেক দিন শুনিয়াছি সে আমার
দিগের শাকে বালী ঘুচিয়া দুগ্ধে
চিনি হইবেক, কেবল লোকলজ্জায়
এতদিন প্রকাশ করিতে পারি নাই
প্রতিদিনই কপালে করাঘাৎ-চ্ছলে
বিদ্যাসাগর মহাশয়কে যথাযোগ্য
নমস্কার করিয়া থাকি ও হে ঈশ্বর!
আমাকে বৈধব্য যন্ত্রণা হইতে পরি
ত্রাণ কর বলিবার-ছলে উক্ত ঈশ্বর
কেই স্মরণ মনন করিয়া থাকি, কিন্তু
বোন পা ফাটা মাথা চাঁচা রোড়া
কপালে ভট্টাচার্য্য ও গোঁসাঞি আ
টকুড়রা যে পেছু ডাকিতেছে বিদ্যা
সাগরকে বোসে যেতে হোলেই তো
বোন বিলম্ব হইয়া পড়িবে। নিস্তারি
ণী বলিলেন না বোন ভট্টাচার্য্য ও
গোসাঞি সর্ব্বনেশেদের যে শ্রী ও
বিদ্যা বুদ্ধি তাহারা কি বিদ্যাসগরে
র সহিত বিচার করিতে পারে, তাহা
রদিগের শরীর দেখিলেই বোন ঘৃণা
ও অশ্রদ্ধা হয় পণ্ডিত পোডারমুখো
রা পা ফাটা মাথা চাঁচা গায়ে কতক
গুলা গঙ্গামৃত্তিকা মাখিয়া ঠিক
কুমারটুলির একমেটে ঠাকুর, আ
মরি! গোসাঞিদের বা কি ঢং
ঠিক যেন অক্রূর দত্তের রাসের সং,
গাময় তিলক ছাব দিয়া বেযেন সদর
দেওয়ানী আদালতের ফয়সালা বে
রুলেন, তাঁহাদিগের কর্ম্ম কি বোন
বিদ্যাসাগরের সহিত বিচার করিয়া
বিজয়ী হইতে পারে, বিবেচনা করি
লে বোন আমারদিগের বড়ই সুখে
র সময় উপস্থিত।