কবি গৌরকিশোর ঘোষের কবিতা
*
ভাবিযুগের মহাকাব্যের নায়কেরা
কবি গৌর ঘোষ
সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “পূর্ব্বাশা” পত্রিকার আষাঢ় ১৩৫৩ (জুন ১৯৪৬) সংখ্যায়
প্রকাশিত।


নিরঙ্কুশ,
নিস্পৃহ দুটো থাম
কংক্রীটের গাথুনী পোরা থাম
কাঁটা তারের হিংস্রতা ঘিরে আছে।
রৌদ্র পক্ক সর্পীল পথটা পাক থেকে
মুচড়ে ঢুকেছে ভেতরে।
( ‘কাজ ছাড়া ভেতরে ঢোকাবার হুকুম নেই’ )
গেটের নীরস প্লেটটা একটা সতর্ক ‘ফুলস্টপ্’।
নৈর্ব্যক্তিক ধূসর যান্ত্রিক
অজস্র শব্দের অবিরাম আনাগোনা।
ভেতরে অজস্র কাজ, অজস্র ক্ষিপ্রতা।
বাইরে নির্বাক স্থানু থাম।
রৌদ্র ফাটা ওপর আকাশে
শুধু ধূমেল পরিবেশ।
ঘুম-নামা সুনীল আকাশে
কলংকিত কালোর কুহেলী।
পাক খেয়ে ওঠে কালো
চিল নয়, শকুনি নয়
ধূম।
যন্ত্র আর মানুষ,
যান্ত্রিক মানুষ
প্রেমে পড়া প্যান্ প্যানে নয়,
ধীর, স্থির, ক্ষপ্রতায় ভরা।
শ্রষ্টা এরা :
সৃষ্টির এরা সফল জনক।

যন্ত্রের কঠিনতার
‘সোনার কাঠি’র ছোঁয়া
পেতেছে যান্ত্রিক মানুষ।
আহামী কালের এগিয়ে থাকা মানুষ এরা।
‘পিষ্টনে’র পিছলানো প্যাঁচের কৌশল
এদের জানা।
তাই ঠোক্কর খেয়ে ও ঠিক্ রোবে না
ঠিক থাকবে।
এরা প্যাঁচ মেরে সামলে ওঠা
আহত ‘স্পিট্ ফায়ার’।

এদের মনটা ‘অক্সি-এসিটিলিনের ষ্টোভ্’।
ভেতরে পোরা জ্বালাধরা তরল অনুভূতি।
ইসারা পেলেই হুস্ করে
বেরিয়ে আসে
নরম আগুনের ইংগিত।
পোড়ায়,
কুয়াশায় ধরায় না
আহামী কালের স্রষ্টারা।
অজস্র সৃষ্টির সার্থক জনকেরা।

বাইরেটা এদের
ওই বাইরেরই মত
নিষ্প্রভ, নিস্পৃহ দুটো থাম
কংক্রীটের গাথুনী পোরা আছে,
কাঁটা তারের হিংস্রতা ঘোরা আছে।
( ‘কাজ ছাড়া ভেতরে ঢোকাবার হুকুম নেই’ )
ভেতরটা  ‘অক্সি-এসিটিলিনের ষ্টোভ্’।

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কোরাণের বাণী আর নবীর বচন
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের প্রথম
অধ্যায় থেকে নেওয়া।

. . . উকিল ছাহেব হবেন ইমানদার মানুষ। তার বিবি হওয়া কি চাড্ডিখানি কথা।
ফকিরের বচন শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে হয়ে গিয়েছে বিলকিসের। কথা সুর সব।

কোরাণের বাণী আর নবীর বচন।
মন প্রাণ দিয়া আরও শুন বিবিগণ॥
যে বিবি পতির মনে কষ্ট কভু দিবে।
কেঁদে কেঁদে দোজখেতে যাপন করিবে॥
শতশত সাপ বিচ্ছু কাটিবেক তথা।
দিবানিশি আগুনেতে জ্বলিবেক সেথা॥
আরও কত কষ্ট তার নাহিক শুমার।
সে সব কষ্টের কথা কি বলিব আর॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
হজরত জিবরিল তবে হুকুমে রব্বের
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের তৃতীয় অধ্যায়
থেকে নেওয়া।

. . . খালেক কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে সম্ভবত একটু মনঃসংযোগ করে নিলেন। তারপর
সুরেলা পয়ারে “কাসাসুলআম্বিয়া” পুঁথি থেকে অনায়াসে আবৃত্তি করে যেতে লাগলেন :

হজরত জিবরিল তবে হুকুমে রব্বের।
বলিলেন সাপ আর ময়ূর খাতের॥
নেকলিয়া যাও সবে জন্নত হইতে।
গোজরান কর গিয়া দুনিয়া বিচেতে॥
তারপরে বলিলেন আদম হাওয়ারে।
জন্নত হইতে যাও দুনিয়ার পরে॥
শুনিয়া আদম হাওয়া লাগিল কান্দিতে।
জন্নতের মায়া তারা না পারে ছাড়িতে॥
আফছোছ করিয়া ছফি কান্দে জারজার।
শোগেতে কলিজাচুর হইল তাহার।
জৈতুন গাছের ডাল পড়িয়া আছিল॥
হজরত আদম তায় আশা বানাইল।
সে আশার গুণ আমি না পারি লেখিতে।
আখেরেতে গেল আশা মুছার হাতেতে॥
জিবরিল ময়ূর আর সাপের তরেতে॥
দোঁহাকে ফেলিয়া দিল জঙ্গল বিচেতে।
সরন্দীপে ফেলে আদম ইবলিচের তরে।
হাওয়া বিবিকে ফেলে জেদ্দার শহরে॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সরন্দীপে কেন্দে ফিরে হজরত আদম
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের তৃতীয় অধ্যায়
থেকে নেওয়া।

সত্যিই খালেক মুছল্লি পুঁথি ভালো পড়ে। পাছে তার সুরেলা উঁচু নিচু ঢেউ ওঠা আবৃত্তিতে
কোনও রকম ব্যাঘাত ঘটে তাই হাজী সাহেব এমন আলতোভাব গড়গড়ার নলে টান
দিচ্ছিলেন যে তা থেকে কিছুমাত্র শব্দ উঠছিল না।

খালেক পড়ছিলেন,

সরন্দীপে কেন্দে ফিরে হজরত আদম।
হাওয়া বিবির কারণেতে বড় করে গম॥
আদম কান্দিয়া ফিরে দরিয়া ধারেতে।
আঁখি হইতে আঁছু যার পড়ে যেখানেতে॥
খোরমা লবঙ্গের গাছ যেখানেতে হইল।
যে আঁছু দরিয়ায় গিয়ে মতি হয়ে গেল॥
এইরূপে আদম ছফি কান্দিয়া বেড়ায়।
তিন সও সাল এয়ছা গোজারিয়া যায়॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শুন হে রসিক লোক বয়ান কেচ্ছার
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে
নেওয়া।

ফকির বার দুই গলা খাঁকারি দিয়ে গলা কাঁপিয়ে বলতে লাগল,

“শুন হে রসিক লোক বয়ান কেচ্ছার।
রোখাম সাহার লেড়কি ছিল এ প্রকার॥
চৌদ্দ পনের সাল বিবির বয়েস।
পাও পরে গিরিয়াছে মস্তকের কেশ॥
এয়ছা বাহারের কেশ না হয় বয়ান।
ছলেতে বান্দিয়া লেয় আসকের জান॥
যখন বান্ধেন খোপা কেশ বিনাইয়া।
ভ্রমর ভ্রমরী বৈসে আমোদিত হইয়া॥”

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মুছলমান ভাই যারা আল্লার পিয়ারা তারা
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে নেওয়া।

. . . ফকির আরও খানিকটা পানি খেয়ে হাজী সাহেবের দিকে রহস্যময়ভাবে চেয়ে মিটি মিটি হাসল
তারপর বলল “হাজী ছাহেব, হুজুর আপনারে কইনে, কই আপনার কড়িরি।
তা’লি অ্যাখন কড়িনামাই শোনেন :

মুছলমান ভাই যারা,                      আল্লার পিয়ারা তারা
কহি শোন কড়ির বয়ান।
আখেরী জমানা হইল,                       কড়িতে সকলি গেল
কড়ি হইল কুলপতি সার॥
কড়ি বুঝে কড়ি মান,                       কড়িতে হুরমত জান,
কড়ি হৈলে রণের ছিপাই।
কড়িয়ে সকলই করে                     বেটা দিয়া বাপ মারে,
ভাই দিয়া ভাইরে লড়ায়॥
কড়ি হৈলে ভালা নাড়ী,                     কড়িয়ে রহাব জারি,
কড়ি হৈলে ইজ্জত বেকার।
কড়ি নাই বিছানা জুদা,                কড়ি হৈলে ছাহেবজাদা,
কড়ি হৈলে হস্তীর আম্বার॥
হীন জনের হয় কড়ি,                    সবে ডাকে মিঞা বলি,
নাম তার খন্ কার বাহাদুর।
যাহার সভাতে যায়,                   বিছানা ছেড়ে তারে দ্যায়
ছালামের শুরু ঠাঁই গোল॥
হাজী হাজী করে সবে,                 জোনাব আসিলা কবে,
আমরা সবের আজব নছিব।
হেলানদার চৌকী আন,                   মিয়া বড় পেরেশান,
পাংখা লইয়া করয় তদবির॥
#        #          #
আজিদিন কড়ি যার,                        বহুত বড়াই তার,
পায়ের নাম জুনাব শরীফ।
সে যদি মরিয়া যায়,                 লোকে বলে ওফাত পায়,
মরে বান্দা কড়ি নাই গরীব॥
কড়ি নাই পুরুষ যারা                  ভবে সে থাকিয়া মরা,
জাতে কিবা সকলের হীন।
ঘরে গেলে কত জ্বালা,            তিরিয়ে তারে ডাকে শালা,
নিরবধি ক্রন্দনে যায় দিন॥”

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কি যে লীলা তব, তুমি জান রহমান
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে
নেওয়া।

. . . ফকির বলল, “আল্লার কি কুদরত। ফটিকির বাপ আর হাজী সাহেব, এই দু ইমানদার
বান্দার একজনের ঘরে দেলেন দৌলত আর একজনের ঘরে দেলেন এলেম, এখেনেই খেলা
শেষ হল না আবার দ্যাহ দৌলতের সঙ্গে এলেমের ক্যামন জোড়উ বাঁ’ধে দেলেন, হায় হায়
কী খোদকারী !

কি যে লীলা তব, তুমি জান রহমান
এসব বুঝার সাধ্য সবার কি সমান ?
এ বান্দা এই সব বুঝিবে কি করে
বুঝিবার শক্তি তুমি দিয়াছ কি তারে ?
এলাহি আলামিন আল্লা কুদরত কামাল
জলিল জব্বার তুমি আল্লাহ্ জালাল॥
দুনিয়ার মালেক তুমি অগতির গতি
তোমার বান্দার তুমি লা-শরিক পতি॥
প্রভু হে, রহমত তব এন্তেহা অবধি
নিশ্চয়ই পাইব আশা রাখি নিরবধি।”

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কান্দেন জহুরা বিবি এলাহি আলমিন ভাবি
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের দশম অধ্যায় থেকে নেওয়া।

. . . ফকির বলল, “আজ তিন বছর ধরে জহুরাবিবির কেচ্ছা শুনতিছ বিবি, আজউ খায়েশ মিটল না।
মালেক যখন তুমার মুখ দিয়ে হুকুম পাঠায়েছেন, বান্দারে তা তামিল করতিই হবে। তালি শোন---”

কান্দেন জহুরা বিবি                   এলাহি আলমিন ভাবি
ঘোড়া হইতে জমিনে নামিয়া।
দুনু আংখে আছু জারি                  বুকেতে পাথর মারি
দম ঢালে বারাম বলিয়া॥
কহে কি করিমু হায়                          এখন হইল দায়
জান মেরা না হয় করার।
কি করিলে আল্লাতালা                 নেকি বদি বুরা ভালা
সব করা তেরা এক্তিয়ার॥
আমি অধমের তরে                      বাঁচাইবে পরওয়ারে
তেরা নাম গফুরর রহিম।
পেগাম্বর খলিলেরে                      আতস হইতে বাঁচাইলে
সবইতি তেরা এক্তিয়ার॥
পেগাম্বর ইউছুফেরে                    ভাই সবে কুয়ায় ফেলে
তারে তুমি করিলে আছান।
পেগাম্বর রছুলেরে                       মেহেরাজে যবে নিলে
সাথী দিলে ছিন্দিক-আকবর॥
কলিম মুছার তরে                       আশাতে দুছুর দিলে
তুমি আল্লা করিম রহিম।
আমি নাপাকের তরে                   কৃপা কর নৈরাকারে
তবে মোর বাঁচেত হুরমত॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শা’শোড়ি অতি যতন ক’রে কয়
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের দশম অধ্যায় থেকে
নেওয়া।

. . . ফকির বলল, “দুঃখির কেচ্ছা আর শুনে কাজ নেই। তার চাইতি কলিকালের
বিবি আর তার শাউড়ির কেচ্ছা কই, সিডা শোনো।”
ফকির সুর পালটে বলতে লাগল,

শা’শোড়ি অতি যতন ক’রে কয়
.                দ্যা’লো বউ উ’ঠে দুটো ভা-ত খা  না।
বিবি কয় দ্যাখ্ বুড়ি ফের যদি কো’স কথা
.                তোর মাথার চুল থোবো না
শা’শোড়ি অতি যতন করে কয়
.                ওলো বউ উঠে একটা পা-ন খা  না
বিবি কয় দ্যাখ্ বুড়ি ফের যদি কো’স্ কথা
.                তোর মুখি দাঁ-ত থোবো না
কলিকালের বউ-ঝিরি কোনো কথা বলা যাবে না
ফুলির ঘায় মুচ্ছো যায় বিবি বেড়িয়ে ব্যাড়ান পাড়া
শাউড়ি হ’লো কিনা বাঁদী সুয়ামি হ’লো ভ্যাড়া
কথায় কথায় অ্যালায়ে পড়েন বিবির জুড়া খাটে গা
দোড়োয়ে আ’সে খছম মিঞা টিপে দিচ্ছে পা
হায়রে কলি কি আর বলি
কলিকালের বউ-ঝিগেরে কোনো কথা বলা যাবে না।”

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জৈগুন নামে এরেমের শাহার এক বেটী
কবি গৌরকিশোর ঘোষ
গৌরকিশোর ঘোষের “প্রেম নেই” উপন্যাসের ‘আওরতে হাসিনা’ পর্বের দ্বাদশ
অধ্যায় থেকে নেওয়া।

. . . . তারপর ফকিরের শিশু শাগরেদ বাঁশির মত গলায় জৈগুন বিবির কেচ্ছা শোনাতে
বসল।

জৈগুন নামে এরেমের শাহার এক বেটী।
শুন সেই বিবির রূপের পরিপাটি॥
যখন জন্মিল বিবি এরেমের ঘরে।
আইল রূপের বান ছুরত বন্দরে॥
হুর পরী মোহ তার ছুরত দেখিয়া।
না যায় তাহার কাছে সরম লাগিয়া॥
এয়ছাই ছুরত আল্লা দিয়াছিল তায়।
রূপের জোয়ার যেন বহে তার গায়॥
মা বাপ পালন করে জৈগুন খাতির।
বান্দি লেউন্ডি দাই কত খেদামতে হাজির॥
কতদিন যায় তার পালন করিতে।
সেয়ানা হইল বিবি দেখিতে দেখিতে॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর