গৌরকিশোর ঘোষ - এর ছদ্মনামের মধ্যে রয়েছে “গৌড়ানন্দ কবি”, “রূপদর্শী” ও “বেতালভট্ট”। জন্মগ্রহণ
করেন যশোহর জেলার ঝিনাইদহের হাটগোপালপুরে। পিতা ডঃ গিরিজাভূষণ ঘোষ ও মাতা সাধনা দেবী।

তাঁর হাতেখড়ি হয় অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্ট জেলার এক চা বাগানে। স্কুলের পড়া শেষ করেন নদীয়া জেলার
নবদ্বীপ থেকে ১৯৪১ সালে। নবদ্বীপ ও কলকাতা কলেজে পড়ে তিনি ১৯৪৫ সালে আই.এস.সি. পাশ করেন
(ইন্টারমিডিয়েট অফ সায়েন্স)।

১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি বহু পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবন শুরু করেন প্রাইভেট টিউটরী,
ইলেকট্রিক মিস্ত্রিগিরি ও ফিটারের কাজ দিয়ে! এরপর এ.আর.পি. রেস্কিউ সার্ভিসের খালাসি, রেস্তোরাঁর বয়,
কাঠের কনট্রাক্টর, রোড সরকার, বিমান জাহাজের ফিটার, ট্রেড ইউনিয়ন অর্গানাইজার, রেশন দোকানের
কেরানি, ইস্কুল মাস্টার, ওষুধ কোম্পানির এজেন্ট, কার্ডবোর্ড ও বিমা কোম্পানির দালাল,  বালতির  
কারখানার এজেন্ট, ভ্রাম্যমাণ নৃত্য-সম্প্রদায়ের ম্যানেজার, ল্যান্ডকাস্টমস ক্লিয়ারিং কেরানি, প্রুফ রিডার,  
সর্বোপরি মোসাহেব-এর কাজেও তিনি হাত পাকিয়েছিলেন!

১৯৪৭ সালে তিনি "নববাণী" সাহিত্য পত্রিকার প্রুফরীডার ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি "সত্যযুগ" পত্রিকার  
সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৫২ সালে যোগ দেন "আনন্দবাজার পত্রিকা"-তে জুনিয়ার  
রিপোর্টার হিসেবে। মুখের ভাষাকে সরাসরি প্রতিবেদনে তুলে আনার কৃতিত্ব তাঁকেই দেওয়া হয়। এরপর  
তিনি "আনন্দবাজার পত্রিকা"-র সঙ্গেই যুক্ত থেকেছেন শেষ পর্যন্ত, মাঝে ১৯৮১ সালে কিছুদিনের জন্য
"আজকাল" পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক থাকার সময়টুকু বাদ দিয়ে।

ষাটের দশকের গোড়ার দিকে “নন্দাঘুন্টি” অভিযানে তিনি প্রথম এক বাঙালি পর্বতারোহী দলের সঙ্গে
রিপোর্টিং করতে গিয়েছিলেন। “আনন্দবাজার পত্রিকায়” সেই রিপোর্ট ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে সাড়া
জাগায়। পরে তা “নন্দকান্ত নন্দাঘুন্টি” নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ঔপন্যাসিক। তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে উপন্যাস ট্রিলজী হিন্দু-
মুসলমান সম্পর্কের আলো-আঁধারি নিয়ে “জল পড়ে পাতা নড়ে” (১৯৭৮), “প্রেম নেই” (১৯৮১) ও “প্রতিবেশী”
(১৯৮১)। এই ট্রিলজীর নাম তিনি পরে দিয়েছিলেন “মা, মাটি, মানুষ”। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে
“লোকটা”, “গড়িয়াহাট ব্রীজের উপর থেকে দুজনে”, “কমলা কেমন আছে” প্রভৃতি। তিনি হিন্দু-মুসলমান
সম্পর্কের উন্নতিকল্পে তাঁর লেখনীকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহার করেছিলেন।

"সত্যযুগ" পত্রিকায় কাজ করার সময়ে তিনি ছোটদের জন্য রূপকথা লেখেন য়া পরে “ময়নামতী” নামে বই
আকারে প্রকাশিত হয়। এই সময় তিনি "বেতালভট্ট" ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন।

১৯৭৫ সালে লাগু হওয়া আভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা বা ইন্টারনাল এমারজেন্সীর সময়ে
MISA অর্থাৎ  
আভ্যন্তরীণ জন-নিরাপত্তা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা এক বছর প্রেসিডেন্সী জেলে বন্দী করে রাখা হয়। তাঁর
রাজনৈতিক জীবনের এক সহকর্মীর উপর লেখা গল্প "সাগিনা মাহাতো"
কবি তপন সিংহের পরিচালনায়
দিলীপ কুমার ও সায়রা বানু অভিনীত হিন্দী এবং বাংলা ভাষায় সফল ছায়াছবি রূপে প্রদর্শিত হয়। তাঁর
অন্যান্য ছোট গল্পের মধ্যে রয়েছে “তলিয়ে যাবার আগে”, “পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী”, “বাঘবন্দী” প্রভৃতি।

তাঁর প্রাপ্ত সম্মাননার মধ্যে রেয়ছে ১৯৭০ সালে "আনন্দ পুরস্কার"। সাংবাদিকের অধিকার এবং মত
প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখবার নিরন্তর সংগ্রামের জন্য, ১৯৭৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার “ডং অ ইল্ বো”
সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের নামে উত্সর্গীকৃত “কো জয় উক” স্মৃতি পুরস্কার সর্বপ্রথম তাঁকেই প্রদান
করা হয়। ১৯৮১ সালে সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সৃষ্টিশীল যোগাযোগ শিল্পের জন্য তাঁকে "ম্যাগসেসে  
পুরস্কারে" ভূষিত করা হয়। ১৯৮১ সালেই তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের পুরষ্কার পান। ১৯৮২ সালে তিনি ভূষিত
হন বঙ্কিম পুরস্কারে। ১৯৯৩ সালে পান হার্দয়াল হারমনি অ্যাওয়ার্ড এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ  
পুরস্কার।

তাঁর কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ গৌর ঘোষ নামে,
কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “পূর্ব্বাশা” পত্রিকায় ১৯৪৬-
৪৭ সাল নাগাদ। আনন্দবাজার পত্রিকায় তিনি একটি জনপ্রিয় কলাম লিখতেন যার নাম ছিল “গৌড়ানন্দ কবি
ভণে”। নিজের ছদ্মনামেই যার "কবি" শব্দ ছিল, “গৌড়ানন্দ কবি”, তাঁর কবিতা মিলনসাগরে না রাখা খুবই
অনুচিত কাজ হোতো! তাই আমরা মিলনসাগরে গৌরকিশোর ঘোষ ওরফে গৌড়ানন্দ কবির "প্রেম নেই"
উপন্যাস থেকে কয়েকটি কবিতা এবং সৌভাগ্যবশত, "পূর্ব্বাশা" পত্রিকার পুরানো সংস্করণ ঘেঁটে সেই সময়
প্রকাশিত তাঁর একটি কবিতা এখানে তুলে এই কবিকে মিলনসাগরের কবিদের সভায় স্থান দিতে পেরে এবং
তাঁর রচিত কবিতা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টাকে সার্থক মনে করবো।

দেশভাগে অভিশপ্ত হতভাগ্য বাঙালী জাতির একটি অন্তত সৌভাগ্যের দিক আছে! তাঁদের প্রায় সব  
ঐতিহাসিক চরিত্ররাই হয় কবি ছিলেন  নয় তো কবিতার মতো লেখা লিখে গিয়েছেন। এই মানুষগুলির  
জীবন ছুঁয়ে এলেই আমরা বাঙালীর ইতিহাসের একটা সাম্যক ধারণা করে নিতে পারি। কি হিন্দু  কি  
মুসলমান, ধর্মিয় নারী-পুরুষ, সমাজ সংস্কারক, রাজা-মহারাজা-নবাব-বাদশাহ, রাজনেতা-নেত্রী, আইনজ্ঞ-জজ-
উকিল-ব্যারিস্টর, উদ্যোগপতি-ব্যাবসাদার, খেলোয়াড়, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বৈজ্ঞানিক, নাবিক,  
প্রযুক্তিবীদ, চিকিত্সক, সৈনিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, অটোচালক-রিক্সাচালক, এমন কি নানা অপরাধে
অভিযুক্ত এবং যাঁরা প্রধাণত কবি, বাঙালী  জীবনের সব দিকের মানুষেরাই কবিতা লিখে গিয়েছেন এবং
লিখে চলেছেন! মিলনসাগর তাই কবিতার মধ্য দিয়ে কবিদের ধরে এবং তাঁদের জীবনীর মধ্যে দিয়ে
বাঙালীর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজ করে চলেছে।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি গৌরকিশোর ঘোষের "প্রেম নেই" উপন্যাস থেকে কয়েকটি কবিতা এখানে
তুলে এই কবিকে মিলনসাগরের কবিদের সভায় স্থান দিতে পেরে এবং তাঁর রচিত কবিতা আগামী প্রজন্মের
কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টাকে সার্থক মনে করবো।


উত্স - শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩।
.          অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, ২য় খণ্ড, ২০১৫।
.          গৌরকিশোর ঘোষ, “প্রেম নেই”, ১৯৮১।


কবি গৌরকিশোর ঘোষের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।      


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২৮.১১.২০১৭



...