ডাক-হরকরা
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-৮৫), দ্বিতীয় কাণ্ড। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”,
৪৫০-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

(১)
দ্বিপদ বলদ তুমি ডাক-হরকরা!
না দিলা বিধি পাষাণ,
সেই হেতু শিরস্ত্রাণ,
পাগড়ীর রূপ ধরি ভ্রমিতেছ ধরা।
নরবেশে পশু তুমি ডাক-হরকরা।

(২)
অল্পলোম তনু দেখি ভ্রম পাছে হয়,
তাই এত জামা জোড়া
দিয়া ও অঙ্গ মোড়া ;
পুচ্ছভাব তুচ্ছ, যা’র চাপকান রয়।
জুতায় খুরের কাজ কিবা নাহি হয়?

(৩)
নিয়মিত চক্রে নিত্য ঘুরে ঘুরে মরো ;
নাই বটে চক্ষে ঠুলি,
কিন্তু কভু চক্ষু খুলি
না দেখিলে এক দিন কার কাজ করো ;
তেল খোল তুল্য জ্ঞানে শুধু ঘুরে মরো।

(৪)
পশু তুমি, তাই এত বিশ্বাসভাজন ;
রাজদ্রোহী রাজভক্ত
সমভাবে অনুরক্ত
তোমা প্রতি, অবিশ্বাসী নহো কোন জন।
মানুযে মানুযে এত নাহি প্রিয়জন।

(৫)
তব তুল্য ভারসহ কে আছে জগতে!
জগতের বার্ত্তা যত
তব পৃষ্ঠে অবিরত,
তবু কিন্তু তুমি শ্রান্ত নহ কোন মতে।
অকাতরে লও ভার, যা’র যা’ জগতে।

(৬)
জানো না কি ভার তুমি বেড়াও বহিয়া
কত বিরহিণী-ব্যথা,
কতই স্নেহের কথা,
কত আশালতা ছিন্ন করো, না জানিয়া,
কি আশীষ, কিবা গালি, সমানে টানিয়া।

(৭)
ঘৃণা নাই, নাই লজ্জা, যাও ধীরে ধীরে ;
যে লাজে বাঙ্গালা মরা
মাটী হ’ল বসুন্ধরা
সেই সে বঙ্গের কাব্য কুলকামিনীরে,
দাও, পশু, নিতি নিতি, নাহি যাও ফিরে।

(৮)
চাকরির দরখাস্ত, বরখাস্ত আদি,
যার তরে এই বঙ্গে
নাচে সবে নানা রঙ্গে
দিয়া যাও, নিয়া এস, তুমি নির্ব্বিবাদী ;
আপদ্, সম্পদ্ যত, তুমি তার আদি।

(৯)
কিন্তু নাহি দোষ তব, হে বাহনবর,
পর-সেবা যার কর্ম্ম,
এমনি তাহার ধর্ম্ম,
পশুর অধম সেই, হইলেও নর।
সুখে থাকো শুভ হউক দিতেছি এ বর।

(১০)
এক অনুরোধ রাখি, রাখিবে হে মান,
যা’র বাড়ী যবে যাবে
সুধাবে কোমলভাবে,
পঞ্চানন্দ সেথা পূজা পান কি না পান?
নহিলে, চাপাবে ঘাড়ে, বিতরিতে জ্ঞান।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
---র কেত্তন
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-৮৫), দ্বিতীয় কাণ্ড। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ
গ্রন্থাবলী”, ৪৫৫-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

[ এটুকু ঠাট্টা নয় ]

রাম নাচে, লক্ষ্মণ নাচে, নাচে হনুমান।
তার চারিদিকে নাচে হিন্দু মুসলমান॥
বাবু নাচে, বিবি নাচে, নাচে নেড়া নেড়ী।
খোশখেয়ালী খেমটাওয়ালী নাচে বাড়ী বাড়ী॥
ঈশা নাচে, মুসা নাচে, নাচে পেগম্বর।
তাই দেখে স্বর্গে থেকে নাচে হরিহর॥
কেশব নাচে, প্রতাপ নাচে, নাচে ধর্ম্মতত্ত্ব।
দেখাদেখি, ‘মিরার’ নাচে হইয়া উন্মত্ত॥
চল্ গো যারা প্রেমের গোঁড়া নাচ দেখ্ বি চল্।
পঞ্চানন্দ নেচে বলে,---হরি হরি বল্॥

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পঞ্চানন্দের গান
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-৮৫), দ্বিতীয় কাণ্ড। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”,
৪৬০-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।


দে গো তোরা দো, আমায় দে, বিলাত পাঠা’য়ে।
রাজনগরে কর্ ব ভিক্ষে গলাবাজি করিয়ে।
কোটে দে গো অঙ্গ ঢাকি,                   কা’লো বরণ লুকিয়ে রাখি,
হাতে মুখে সাবান মাখি
রালো জনম ভুলিয়ে।
নে গো ঢিলে ধূতি খুলে,                     নোটিব আর র’ব না মূলে,
ভর্ণাকুলার যাব ভুলে
চেয়ারে পা ঝুলিয়ে।
মিসেস পাঁচী গাউন-পরা,                          ধরাকে দেখিয়ে শরা,
( ও সে ) হ’ল হ’লই উল্ কী পরা,
নেবেত বিবী হ’য়ে।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিলাতী বিধবা
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-৮৫), দ্বিতীয় কাণ্ড। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”,
৪৬৪-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।


বঙ্গের বিধবাকে পদ্যের কলে ফেলিয়া অনেক ব্যক্তি কবির দলে নাম লিখাইয়াছেন (১)। কিন্তু বিলাতী
বিধবা এখন পর্য্যন্ত অদলিত ক্ষেত্র ; সেই জন্য একবার লেখনী ধারণ করিলাম, যশস্বী হইতে পারিব না কি?
[ কবির দলের বাঞ্ছারাম ]

[ ১ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে (২)!
দুখিনী উহার মত দুনিয়াতে কই রে!
হারায়ে তৃতীয় পতি,                বিরহে কাতরা অতি,
পোড়া চিন্তা দিবা রাতি---পাইব কি আর?
ললনা ছলনা বিধি, কেন বারবার।

[ ২ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
একপ্রাণে পতিশোক কতবার সই রে!
যেখানে চরণ চলে,                পতি আছে ক্ষিতি তলে,
বুঝি বা করম-ফলে,---এই দশা হয়!
যত গোর, তত পতি, তবু পতি নয়!


[ ৩ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
কি হবে উহার দশা ভেবে সারা হই রে!
আভরণে নাই আশ,                কালির বরণ বাস,
মুখে মুখে ছাই পাশ, পাইডার ব’লে,
পতি-সুখ, পতি-শোক মিটিবে না ব’লে!

[ ৪ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
বিষাদে চৌচির হিয়া, যেন তাজা খই রে!
মুখ চোখ নাক কাণ,                সকলি আছে সমান,
যায় যেন দিনমান, কিসে যায় রাতি?
পোড়ায়, পোড়ে না হায় জীবনের বাতি!

[ ৫ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
তপত তেলের কড়া তাহে যেন কই রে!
প্রাণ করে আই ঢাই,                শয়নেতে সুখ নাই,
তন্দ্রা যদি আসে ছিই, তাতেও স্বপন!
রমণী মরমে মরে, একি জ্বালাতন!

[ ৬ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
উহু উহি, মরি মরি, কাঁদিব কতই রে!
আছে দাঁড়, আছে হাল,                আছে গুণ আছে পাল,
তবু কেন আল থাল, মাঝির অভাবে।
বানচাল হয়ে’ কি রে ভরা ডুবে যাবে?

[ ৭ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
নহে দুধ, নহে ক্ষীর, হায় শুধু দই রে।
বহে সদা দীর্ঘ স্বাস,                নবেলে মেটে না আশ,
হেন ভাবে বার মাস কাটান কি যায়?
নারীর জীবনে, বিধি, এত কেন দায়?

[ ৮ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
করুণ-রসেতে লেখা স্বভাবের বই রে!
সুখে দুখে একটানা,                যা হোক করি নে মানা
মনে তবু থাকে জানি---ফিরিবার নয়।
এ যে ভয়, বড় দায়, কি কখন হয়।

[ ৯ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
পথি পথি ভ্রমে, তবি পতি না মিলই রে!
ঘোর নিশি ঝড় বয়,                চারি দিকে চৌর ভয়,
সতীপনা-মণিময় বিধবার হিয়া,
কেহ নাই, রাখে দ্বার পাহারা বসিয়া।

[ ১০ ]
বিলাতী বিধবা বুঝি অই রে!
ভেঙেছে আবার তার স্বরগের মই রে!
নাই আর কারিকুরি,                করিতে বয়স চুরি,
কৃতান্তেরে করে ধরি, রাখি কোন ছলে?
চল্লিশে চব্বিশ করা কত বার চলে? @


(১) - হেম বাবুর “বিধরা রমণী” দেখ।
(২) - ভারতের পতিহীনা নারী বুঝি ওই রে। না হ’লে এমন দশা নারী আর কই রে!
@ - বাঞ্ছারাম উপহার দিলেন---পঞ্চানন্দকে ; পঞ্চানন্দ দিচ্ছেন---বঙ্গ-রমণী এবং রমণীবন্ধুকে : ভরসা যে
ভক্তগণ প্রসাদে পরিতুষ্ট হইবে।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দুর্গোত্সব
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-৮৫), তৃতীয় কাণ্ড। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ
গ্রন্থাবলী”, ৪৯৬-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

পহেলা পর্ব্ব - নিমন্ত্রণ-পত্র।

বর্ষা গেল ফর্শা হোয়ে, নদীতে নাই বান।
কোদের চোটে, মাটী ফাটে, মাঠে নাইকো ধান॥
সকাল বিকাল, শুকো অকাল, চাষা ভেবে মলো।
হেসে হেসে, শরৎ এসে, দেশে উদয় হোলো॥
বাবু ভেয়ে, ছুটি পেয়ে, দুগ্গো মায়ের গুণে।
নতুন শাড়ী, নিয়ে বাড়ী, যাচ্ছে রেতে দিনে॥
দুগ্গো পরব, দেশের গরব, বজায় থাকা ভালো।
লায়েক মূক্ষু, ভোলে দুক্ষু, পেয়ে সুখের আলো॥

কিন্তু হেখা, খেদের কথা, পুতুল খেলা নিয়ে।
ঘরে ঘরে বিবাদ কোরে, ফাটায় দেশের হিয়ে॥
পরব করো, মজা মারো, দেশের পানে চাও।
বেদ কোরাণে, বিবাদ কেনে, এককাট্টা হও॥
ছিষ্টি ছাড়া, ঠাকুর গড়া, তিন-চোকো দশহেতে।
সবাই যখন, সভ্য এখন, কল্কে পায় কি এতে?
ছেড়ে ছুড়ে, মুলুক যুড়ে, এমন তরো করো।
সবাই যাতে, হাতে হাতে, সগ্গ পেতে পারো॥
আসল শক্তি, যারে ভক্তি, সকল লোকে করে।
তার চেহারা, দেখ খাড়া, ঐ আছে উপরে॥
সকল ধর্ম্ম, হিদুঁ, বেহ্ম, নেড়ে কেরেস্তান।
ওই মূর্ত্তি, পূজে ফুর্ত্তি, সবাই এখন পান॥
মোরা কজন, ওনার ভজন, কোরে পেয়েছি পদ।
বিমুখ যারা, ঠকে তারা, তাদেরি বিপদ॥
শক্তিসেবা, কোত্তে যেবা, আছ অভিলাষী।
চিন কি অচিন, পূজোর কদিন, মোদের বাড়ী আসি॥
হাজির হবা, সবান্ধবা, আরোজ রাশি রাশি॥

ইতি তারিখ ২০শে         শ্রীআরে-দুর-রহ-মান @।
শ্বেতাম্বর, হিজরী           শ্রীকায়েম-বানরজী #।
সন ১৩০২ সাল।           শ্রীমহিস-নয়-রত্ন $।
.                                        সর্ব্ব মোকাম পূজোর দালান।

@ - তাত্কালিক আমীর আব্দুর রহমান।
# - বৃদ্ধ কে এম বাঁড়ুয্যে।
$ - পণ্ডিত মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভারত ভক্তের গান
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-৮৫), তৃতীয় কাণ্ড। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ
গ্রন্থাবলী”, ৪৯৩-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।


আমি অনুরক্ত ভারত-ভক্ত,
ভারত-মাতার সুসন্তান।
.        (আমার) জাও তুলে নিশান। ( ধ্রু )

.                (১)
বীরত্ব আমার যত,
মপখ ফুটে বোলবো কত,
ভারত-উদ্ধারের মত,
.        নিয়ে, থাকি দিনমান।
শুধু রাত্রিকালে, ইয়ার পেলে,
.        গড়ের মাঠে সখের প্রাণ!

.                (২)
পোড়া ভারতের তরে,
যখন আমায় শোকে ধরে,
ডেকে ডুকে সভা কোরে,
.        ইংরেজীতে ছাড়ি তাম।
ও ছার মা যা, কর্ম্মনাশা,
.        সভা@@   অপমান!

.                (৩)
যুটিয়ে হাটের নেড়া,
ছেলেদের বানিয়ে ভেড়া,
ভারতে ভারত-ছাড়া,
.        কোত্তে আমি যত্নবান।
আমার পেট্রিয়টি, নেহাত খাঁটি,
.        গোটা ভারত লবেজান!

.                (৪)
এখন আমার কাঁধে ঝুলি,
মুখে ভারত ভারত বুলি,
দিয়েছি জলাঞ্জলি,
.        ভারত-মাতার কুল-মান।
এমন খোদ-বিরাগী স্বার্থত্যাগী
.        কে আছে আমার সমান?

.                (৫)
“জেনানা” কারাগারে,
রমণী কি থাকতে পারে?
কুলে থেকে বাহির কোরে,
.        স্বাধিনতা করি দান।
আমি আপনি গোলাম, গেলাম গেলাম,
.        ভাবি নে তার অপমান!

.                (৬)
লেখা পড়া ষোলো কলা,
বোধোদয় বানান ফলা,
নবেলের প্রেমের পালা,
.        কুলবালার ব্রহ্ম-জ্ঞান।
হের, নাচে গানে, তানে মানে,
.        ঘরে পাই এলাহীজান!

.                (৭)
আমার খুব ভাল রুচি,
বিধবা পেলে কচি,
বাদ দিয়ে খেঁদি পেঁচী,
.        মারি চোরা গোপ্তা টান!
তখন, মায়ের কান্না, বাপের ধন্না,
.        সকল করি তুচ্ছ জ্ঞান!

.                (৮)
ধোরেচি ধর্ম্ম-ধ্বজা,
মানিনে পরব্ পূজা,
লার কোরে চক্ষু-বোজা,
.        একটি লাফে ব্রহ্মজ্ঞান।
সাদা অনুতাপে, সকল পাপে,
.        হেলায় করি পিণ্ডদান!

.                (৯)
ঘরে বাহিরে জুতো,
রেলের গাড়ীতে গুঁতো,---
খেয়ে দেয়ে পেয়ে ছুতো,
.        মন রোরেছে অভিমান।
এখন সেই রাগে, দেশ-অনুরাগে,
.        ধুতি ছেড়ে পেন্টুলান।

@ - অপাঠ্য অথবা অমুদ্রিত।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
উত্কৃষ্ট-কাব্যম্, প্রথম উদ্গার
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“উত্কৃষ্ট-কাব্যম্” (১৮৭০)। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”, ৫-পৃষ্ঠায়
এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

প্রথম উদ্গার।
অমিত্রাক্ষর ছন্দঃ।

কেন বঙ্গভাষে! ভাস নয়নের জলে আর ;
যবে দেখিতেছি, সদ্যঃ জনমিলা, অমনি
কবিতাইলা, কত কবি-সুত তব ; তীক্ষ্ণবুদ্ধি-রূপ
সূতা যোগে যারা গাঁথিয়া গৌড়ীয়া গড়্যা
( যার অর্থ মালা ) ( বেলফুল দলে যেন
নূতন বাজারে কত মালী ) পরাইলা তব গলে,
বালে! বয়স এখন তোর কাঁচা, ও লো ধনি!
এর মধ্যে দত্ত-দত্ত অমিত্রে, তোমার কণ্টক
পদ্যের মিল দেখ পরিষ্কৃত ;---মিউনিসিপালিটির
গুণে দেখ যথা জঙ্গল।---মুচিয়া দেখ আঁখির
সলিল, অদূরে সুকাব্য-রবি উদি, আলোকিবে
ভাল তব ; দূরাইবে মিলের বারিদে!
এই নাও! আমিও দি একগাছী মালা ;
সস্তা বলি ঠেলি ফেলি দিওনা লাথিয়া।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
উত্কৃষ্ট-কাব্যম্, দ্বিতীয় উদ্গার
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“উত্কৃষ্ট-কাব্যম্” (১৮৭০)। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”, ৫-পৃষ্ঠায়
এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

দ্বিতীয় উদ্গার।
মিত্রাক্ষর ছন্দঃ।

.        স্বাধীনতা কাল হ’ল,
.        কত রঙ্গ দেখাইল,
আর। প্রেয়সীর হাত
যে সে এসে ধরে রে।
.        কবিতা কোমল বধু,
.        ছিল তো আমার শুধু,
শত্রু @ তারে করে ধরে,
দেখে ভয় করে রে।
.        অসাজে সাজায় তারে,
.        যতন কতেক করে,
নবাদলে, দেশ ছাড়া
করিবারে মোরে রে।
.        গিয়াছে সুখের দিন,
.        সহায় সম্পত্তি হীন,
ভ্রমিতেছি এবে আমি
কাঁদিয়া কাতর রে।
.        ভারতের ভাগ্য পোড়া,
.        নহিলে ভারত ছাড়া,
ভারতের কাল, বল
কখন কি করে রে?
.        মদন-মোহন ধন,
.        গেল আঁধারি ভুবন,
মানস কমলে শোক-
কীট জরজরে রে।
.        প্রাণের ঈশ্বর গুপ্ত,
.        জনমের মত সূপ্ত,
ভাসায়েছে বাছা মোরে
দুঃখের সাগরে রে।
.        বালক দ্বারকানাথ,
.        হ’লি রে সবার সাথ,
বল এবে স্থবিরের
হাতে কেবা ধরে রে!

@ - অমিত্র।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
উত্কৃষ্ট-কাব্যম্, তৃতীয় উদ্গার
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“উত্কৃষ্ট-কাব্যম্” (১৮৭০)। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”, ৭-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া
রয়েছে।

তৃতীয় উদ্গার।
বই লেখা।

মানস গোলাপ ফুলে, “বইলেখা” পোকা
কি কুক্ষণে পশিয়াছে, তাই ভেবে বোকা
হইলেন বঙ্গদেশ, আমি একা নই।
এ ভাল জঞ্জাল হতে কিসে মুক্ত হই?
বাছিয়া ফেলিব কীটে যদি মনে করি,
পাপড়ি ছিঁড়িবে পাছে, এই ভেবে ডরি।
বঙ্কিমের মত নাই কলমের জোর,
নবাখ্যা @ লেখা হ’ল না, এ রাতি ত’ ভোর।
ওই দেখ দীনবন্ধু! তোমায় দেখিয়া,
নাটক লিখিতে যান কত কত মিয়া!
শিকায় তুলিয়া মান, কাণ কাটা যত
দুই গালে চূণ কালি লেপি অবিরত,
লেখনী সিঁধের কাটি হাতে, চুরি করি,
বই না বাহির হ’তে হয় ধরা ধরি!
নাটক লিখিয়া কেন খাটিব ফাটক?
মজা করে কাব্য # করি, নাহিক আটক।
কোন বর্ণ যদি মিলে, বটতলা আছে।
না মিলিল, বয়ে গেল, বসুজার $ কাছে।
বড় পরিচয় দিতে সাধ যদি চিতে,
গোল কর, কেশব হইবে আচম্বিতে।
শুধু যদি বই লিখে বড় হতে চাও,
ছোট আড়া কাগজেতে চৌদ্দ আঁক দাও।


@ - Novel.
# - শ্রধ্য (পদ্য) কাব্য।
$ - বসুজা - I.C. Bose. ঈশ্বরচন্দ্র বসু। কলিকাতা বহুবাজারে ষ্টানহোপ নামক
XXXX (কোম্পানী হইতে) মাইকেল মধুসূদনের যাবতীয় পুস্তক ছাপা হইত। সে কালে বটতলা হইতে ”কি মজার
XXXX (রবিবার” অথবা “) কি দুঃখের সোমবার” ইত্যাদি নানাবিধ রঙ্গরসের ছোট পুস্তক বাহির হইত। সে
XXXX (সব কাব্য হইতো) মজার ছন্দে। “উত্কৃষ্ট কাব্যে”র কবি ভাবিতেছেন, তাঁহার হাত দিয়া মিত্রাক্ষর বাহির
XXXX (হইবেনা অথবা) মিত্রাক্ষর বাহির হইবে, তাহার স্থিরতা নাই, যদি মিত্রাক্ষর হয়, তাহা হইলে ছাপিবার
XXXXই, (কোনো ভয় নাই) বটতলা আছে ; আর যদিই বা অমিত্রাক্ষর বাহির হইয়া পড়ে, তাহা হইলেও ভয়
XXXXলের (নাই, মাইকেলের) অমিত্র-ছন্দী কাব্যাদি যিনি ছাপিয়াছে, সেই ঈশ্বরচন্দ্র বসু আছেন।  

XXXX - গ্রন্থের এই পাতার পাদটীকার অপাঠ্য অক্ষর। পাতাটি স্ক্যান করার সময়ে এই লেখাগুলি ধারে
ছিলো ব’লে বাদ পড়ে গেছে। লাল রঙের
( )বন্ধনীতে, XXXX অর্থাৎ সেই সব অপাঠ্য অক্ষরের সম্ভাব্য
উদ্ধরণ! তবে তা যে হুবহু মিলবে সে দাবী আমরা করছি না। আসল মুদ্রিত গ্রন্থটি আমাদের দেখার
সৌভাগ্য হয়নি।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
উত্কৃষ্ট-কাব্যম্, চতুর্থ উদ্গার
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
“উত্কৃষ্ট-কাব্যম্” (১৮৭০)। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”, ৯-পৃষ্ঠায়
এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

তৃতীয় উদ্গার।
আমার কত ক্ষমতা।

প্রস্তাবের প্রারম্ভেতে বলিতে উচিত,
গ্রন্থকার-উক্তি, যাহা নিম্নে সুরচিত।
প্রয়োজন মতে, লোকে কেহ পঞ্চমুখ,
কেহ দশ, কেহ শত মুখে পায় সুখ।
প্রমাণ তাহার চাহ? আমি দিতে পারি
( কেনই বা বলি হেন, কথাও ত ভারি,
প্রমাণ বিহনে কেবা আদালতে যায়? )
মহাদেব গাইলেন পঞ্চ রসনায়
ধরণীর কথা ; আহা! সেই মহাদেব,
যিনি শূলপাণি শিব, ভুত-মোসাহেব,
শ্মশাননিবাসী--- (হেন কত বিশেষণ
আছে, তাহা দিয়া ফল বল কি এখন? )
যাউক সে কথা---আর দেখ অনন্ত
কতেক ধরিলা ফণা, মখে কত দম্ভ।
---( পদ্য অনুরোধে মাত্র এ কথাটী বলা। )
আরো দেখ, গগনের চাঁদ ষোলকলা।
ইত্যাদি ইত্যাদি নানা সদুদাহরণ ;
সবগুলা বলিবারে কিবা প্রয়োজন?
দেড় পাতা পুস্তকে ভূমিকা তের পাত
বিস্তর থাকিতে বল, “কিস্তি” মাত্রে “মাত”
যথা শতরঞ্চ খেলে ; ---সেইরূপ মম
এ সমস্ত কথা বলা, কর্কশ বিষম।
কিন্তু নিবেদন এই, কি সাধ্য আমার?
“অদৃষ্টে”র ফল সব, আমি ত নাচার।
বলে দিই, এ অদৃষ্ট পাঠকের। নহে
হ্রন্থ-করতার ; যার তরে এত সহে
ভেঁড়ার সদৃশ শান্ত পাঠকের পাল।
ক্ষমতা শুন রে এবে সামাল! সামাল!
আমার যতেক বিদ্যা একে একে বলি ;
মন দিয়া শুন, যত কাব্য-মধু-অলি।
মম বিদ্যা দুই মতা---সকলেরই তাই।
স্বাভাবিকী, উপার্জ্জিতা, বুঝে দেখ ভাই।
উপার্জ্জিতা বিদ্যালতা করে ঝক্ মক্ ;
ইঙ্গরাজী, সঙস্কৃত, বাঙ্গালা ; কতক
উরুদু মিশাল তাহে ; ---দেখ সহৃদয়।
স্বাভাবিকী বিভাজিতা দুই উপভাগে,
সহদা চ অলৌকিকী---যাহে মজা লাগে।
সহজা বিশেষ সবে জানে সবিশেষ,
ভোজন, শয়ন, আদি, ভ্রমণ অশেষ।
অলৌকিকী কথা অতি বিচিত্রা শ্রবণে,
যে দেখেছে সেই ভাবে---“ভুলিব কেমনে?”
পেট ফুলাতেই পারি, বুকে গর্ত্ত করি,
উদরে লারঙ্গ কিবা আহা মরি মরি।
চক্ষু দুটী টেরা হয়, গাড়ে ওঠে পদ
গলার দেখিতে শিরা, অদ্ভুত-আস্পদ।
সকলে দেখেছে মোরে, কেহ নাহি চিনে,
বয়সের সঙ্গে বিদ্যা বাড়ে দিনে দিনে।
গ্রন্থ লিখিবারে পারি, সেখাও হয়েছে,
কিন্তু না বিকায় কভু, দোকানে রয়েছে ;
তাই এইবার পুনঃ লিখিলাম বই।
কর্ণরূপ মুখে খাব যশোরূপ দই।

শ্রীশ্রীমহামতি উপাধ্যায়।

মুখবন্ধের পরিশিষ্ট।
এই গ্রন্থখানি যে যন্ত্রে মুদ্রিত হইল, তাহার নাম যদি গুপ্ত না হইত, তাহা হইলে অবশ্যই
প্রকাশ করিতাম।

.                  ******************                 
.                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*