কবি জয়া ভট্টাচার্যর কবিতা
*
বৃষ্টি ও সন্ধ্যা
কবি জয়া ভট্টাচার্য

কতদিন দেখিনি তোমায় ;
সেই তুমি ,
-যে আমায় দিয়েছিলে বৃষ্টির জলে ভেজা একপাতা বকুল সুবাস :
মল্লার ঢেলেছিলে বৃষ্টি ভেজা বাদলের গানে,
এল বরষা ঐ ভরসা হয়ে ; ব্যাকুল বিরহ ধুয়ে ,
দোলাল প্রেমের ছবি তমালের বনে......
শ্যামল পরশে ঘুম সোহাগে আবেগে , ভাঙাতে রইবে জেগে ;
দিয়েছিলে মধুর আশ্বাস ।
তাই আমি -
আজ এই পরবাসে, প্রকৃতির ইচ্ছেমত চলা- বাদলের ছদ্মবেশে।
বারেবারে ভুল করি -
রক্তিমে অথবা সবুজ মরমে , মর্মরিত উদ্যানে তোমাকেই খুঁজে ফিরি।
পাইনাতো হায় ! মনে হয় কতদিন দেখিনি তোমায়!

মনে হয় কতদিন দেখিনি তোমায় ;
সেই তুমি -
প্রতি সন্ধ্যায় যাওয়া , হয়তো বাদলা হাওয়া ;
তবুও ফুলের হাটে ,
মেঘে ঢাকা সন্ধ্যাতারা , চকিত উদ্ভাসিত গগনের পটে।
সন্ধ্যামালতীর পাপড়ি ছড়ানো , সুরভিত পরাগের আরাম জড়ানো ;
আমায় দিয়েছ তুমি একগুচ্ছ মল্লিকার দীর্ঘনিঃশ্বাস :
লাজবন্তীর সুরে, কখোন ডেকেছ দূরে ;
কখনো বা ইমনেকল্যানে কাছে, ভেবেছ হারাই পাছে ;
নিয়ে গেছ হৃদয়ের অতল গভীরে।
কোমল উল্লাস ভরা, পুলকিত কাহিনীরা ,
আমায় পৌঁছে দিয়ে গেছে- উচ্ছ্বসিত বিশুদ্ধ বাতাস!
তাই আমি -
আজ এই পরবাসে , বিষণ্ণ অবকাশে ,
সূর্য্য ওঠা সকালের সন্ধানে ফিরি।
নীল নীলিমার নির্দ্দেশে,হতে পারে প্রজাপতি অশ্রুজলে ভেসে ,
হারিয়ে ফেলেছে তার রঙে ভরা হোলির ইশারা পিচকারি।
এখানে ঋতুরা গম্ভীর ; বরফের মত সব স্থির :
আছ তুমি কেমন কোথায় ? বলে নাতো কেউ হায় :
মনে হয় কতদিন দেখিনি তোমায়!

উপসাগরের সীমানায় ,সুদীর্ঘ গোধূলির ছত্রছায়ায় ;
অন্যমনে ভাবি বসে, হয়তো এ অবসরে তুমি কোন সরোবর তীরে ,
বসে আছ সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায় :
ফুলের পসরা সেজে ওঠেনি এখনো ,
আমার অপেক্ষা তুমি , ততক্ষন জেনো ;
অন্ধকার রাত্রি ক্রমে,যখন আসবে নেমে ,
যখন সাগর বক্ষে নিঃশব্দে তরঙ্গেরা,হৃদয়ের বেদনায় দিবে জানি সাড়া,
আমার স্বপ্ন নিয়ে প্রকৃতির রঙে রসে তুলিকা ডুবিয়ে :
এবং বাসনার তৃপ্তি মিটিয়ে -
মনেপ্রাণে মেত ওঠে সত্য শিব সুন্দরের খেলায় ;
জলছবি এঁকে যায় পরম নিষ্ঠায় :
ভুলে যাব তৎক্ষনাৎ কতদিন দেখিনি তোমায়!

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সোনার পাহাড়
কবি জয়া ভট্টাচার্য

আকাশটা ছুঁতে চেয়েছিল কোন কিশোর বালক ;
সোনার পাহাড় ঘেরা সুনীল আকাশ!
ফ্যাট হিং চিন নামে পরিচয় তার , মাইল ফলকের গায় গাঁথা হল যতবার -
সূর্য্যকে সাক্ষি রেখে, আলোক বর্ষের ছায়া মেখে ,
সুদীর্ঘ যাত্রা অবশেষ ; মায়াচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েছিল তৃপ্তির মুক্ত নিঃশ্বাস !
চিরস্থায়ী বন্দোব্যস্ত তার করে দিল নক্ষত্রালোক।

বেটি লী সাং সেই নারী - কাহিনীর দুর্গমপথে দিয়েছিল পাড়ি ;
কিশোর বালক ডিঙি বেয়ে , মাছ ধরে সাথিদের নিয়ে।
দুঃখের নদীতীরে , দুঃসাহসি কিশোরর উৎসাহ প্রকৃতির খেয়ালি সাঁতারে ,
বানভাসি হাহাকারে কখনো দিয়েছে ডিঙি ছেড়ে , কখনোতো ভেসেওছে বসন্তের
মলয়সমীরে !
অজানার সন্ধানে গোপনে গোপনে ,সুদূরে ওড়াত ইচ্ছেমত স্বপ্নের ঢাউস মনঘুড়ি।

সহসা কাল্পনিক ভাবনার জালে , সাগরের তীরে খাড়া সোনার পাহাড় দিল উঁকি ;
বিপদসংকুল চারিধার ; তরুন কিশোর তবু নিয়েছিল ঝুঁকি :
পুরুষানুক্রমে যত সঞ্চয় তার , জাহাজ ক্রয়ের বিনিময়ে হল ছারখার।
স্বদেশের সঙ্গীরা সাড়া দিয়েছিল যদি সমুদ্রযাত্রার কঠিন সংকেতে ;
মাঝপথে একসাথে অসংখ্য পথিক যারা , থেমেছিল চিরতরে মরণের অভিসম্পাতে :
তারাই এগিয়ে দিল জীবিতের উচ্ছ্বল মিছিল ; কেউ আর রইল না বাকি ।
তরুনবালক দিগ্বিজয়ী ; প্রসারিত আলিঙ্গনে ছিল অপেক্ষায়- সানন্দ প্রত্যাশায় ,
মাথার উপর যেন সূর্য্যের টাঙানো সামিয়ানা , সোনার পাহাড়।

বন্ধুর পথে চলাচল ;
কাঁটায় কাঁটায় বিদ্ধ বিক্ষত পায় , বন্ধ হল অগ্রসর নিস্তেজ স্বনির্ভর ;
শ্বাপদের হুঙ্কার , ঘনাল অন্ধকার- শোনা গেল শুধু মাত্র নগ্ন কোলাহল :
তবুও উনিশ ; সম্রাট ফ্যাট হিং বসতির স্থপতি গড়ে সম্মানিত করেছে তার রাজ উষ্নীষ ;
অভিবাসি সঙ্গীদল প্রজার মতই সংগ্রহ করেছিল উল্লসিত সুখবর।

সোনার পাহাড় ; ফ্যাট হিং চিনের আবিষ্কার :
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবাদ- অমর্ত্ত্যর আশীর্ব্বাদ ,
চিহ্নিত সানফ্রান্সিসকোয় রেখে গেছে ইতিহাস, অনন্ত কালের উপহার -
পরম ঈশ্বরের আলোক প্রসাদ!

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভাললাগা স্বর্গের সংবাদ
কবি জয়া ভট্টাচার্য

না ভাল লাগা যত, সারা দিবসের সঞ্চয় ;
বাথানেরা খুরে খুরে ধূলা ওড়া বাতাসকে ঢেকে দিতে বলে :
বাতাসের ভাষা যদি বয়ে ফিরে কুসুমের জন্মপরিচয় ,
তোমার আমার শুধু ভাল লাগা গুলো , দিবসের মেঘ ছেঁড়া সূর্য্যের আলো ,
রাতের আঁধারবক্ষে, চাঁদনি বা নক্ষত্রের সারি সারি গবাক্ষে ,
দীপাবলী রাত্রির প্রদীপের মত বাতাস সাজিয়ে রাখে তাই ,সন্ধ্যায় আলো ওঠে জ্বলে।

জীবনের পথে চলাচলে ,
কখনো কি মানচিত্র নির্দ্দেশ দিতে পারে নিয়মের কৌশলে ?
কত মরুপ্রান্তর, দুর্গম কান্তার , গিরি নদী সাগরের নিঃশ্বাসে মিলিয়ে নিঃশ্বাস ;
কালের যাত্রার ধ্বনি মুখরিত করে চারিপাশ :

কোথাও কুঞ্জবনে জ্যোৎস্নার ভ্রুবিলাসে, পথভোলা পথিকের স্মরণিক কোমল বল্লরী -
বেদনার চতুর্দিক লতার আচ্ছাদনে চিরতরে দেয় রুদ্ধ করি।
শুক্লারজনী স্রোতে চাঁদের ময়ূরপঙ্খী অপরূপ তরণীতে ,
শুধু ঠাঁই দু চোখের মধু মাখা চাওয়া ;
আবর্জণা অনাদরে ক্ষনিকের অবসাদ বাকি কথা যত, সব ভুলে যাওয়া!

থাক তবে থাক পড়ে, ভাল না লাগার ভীড়ে- দেয়া নেয়া হিসেবের খাতা ;
বৃশ্চিকলী উদ্ভিদের আর্ত্তনাদ ঝলসে দেয় ভয়ঙ্কর দাবানল , চেয়েও দেখেনা নির্মাতা।
পাহাড়ের নির্জণ গুহায়, সরীসৃপ যেমন ঘুমায় ;
যেমন বৃদ্ধবটশাখে , অনাহুত অসংখ্য বিহগ তাদের- ছানাদের নিরাপদে রাখে ;
যেমন পতঙ্গের ঠিকানার নাই সম্মান ;
যেমন সাগরের নির্জণ দ্বীপে , নির্বাসিত শিল্পীর ম্লান হয়ে আসে ক্রমে রঙের সন্ধান :
তেমনি নিস্তব্ধ থাক না ভাল লাগার স্মৃতি, রূপকথা গল্পের আরামের তীরে ;
ভাল লাগাটুকু নিয়ে,হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনখানে গিয়ে ,
হারিয়ে যাওয়াই যায় ধরিত্রীর মলয়সমীরে!

অমনি হারিয়ে যেন যাই ;
জীবন নাটকের যবনিকা অন্তরালে যে মাঝি অপেক্ষায় শুনি তার ডাক :
ভাল না লাগার সব মুহূর্ত্তগুলো,খুঁজে দেখি নাই।
গোধূলির ধূলার বাতাস উড়িয়ে দিয়েছে নিঃশেষে নিঃস্ব বিষাদ ;
অবিরাম ঝরেছে তখনই অনিন্দ্য চিত্তাকাশে স্বর্গের আশীর্ব্বাদ :
ভরে গেছে আনন্দের স্বাদে সকল'না' এর এক সুবৃহৎ ফাঁক!

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সুন্দর অবিনশ্বর
কবি জয়া ভট্টাচার্য

এখন অনেক রাতে,কাঁচের বন্ধ জানালাতে -
থেমে আছে অন্ধকার ঘন ঘন নিঃশ্বাসে তার ,
মনে হয় ঝাপসা হয়ে পড়া শব্দগুলো , চাইছে স্পষ্ট করে দিতে :
এ পৃথিবী নাট্যমঞ্চ হোক ;
তৃতীয় অঙ্কের পর অসংখ্য কৌতুহল সহসা থামুক ;
নটনটী সাজ মুছে ফেলে, ভোলে না সাজানো সংসার।

এখন অনেক রাতে , কাঁচের বন্ধ জানালাতে
থেমে আছে অন্ধকার শোনেনি নিষেধ তারার ,
মনে হয় জীবনের ধোঁয়া ধোঁয়া ইচ্ছেগুলো ; চাইছে তারার গায় খচিত করে যেতে :
এ পৃথিবী প্রপঞ্চ হোক ;
স্বপ্নের সুরধুনী তীরে ক্লা্ন্তিহীন অপেক্ষা করুক :
তবুও সুরক্ষিত করে যেতে হবে চেতনার স্বর ;
আমি জানি আমার আত্মা চিরকাল রইবেই অবিনশ্বর।

এখন অনেক রাতে, কাঁচের বন্ধ জানালাতে ;
থেমে আছে অন্ধকার- দেয়ালে টাঙিয়ে বাণী শেষ মীমাংসার ;
মনে হয় খাঁচাবন্দী জিজ্ঞাসা গুলো , চাইছে মুক্তি সন্ধানে ভেসে যাক দুর্বার স্রোতে :
এ পৃথিবী আলেয়ার দূত হয় হোক ;
কাঁটাতার বেড়ার ওপারে,সুকঠিন অচলায়তন ভাঙে তো ভাঙুক ;
নিখুঁত স্থাপন করে যাবে সত্যের শব্দ বিন্যাস :
অমলিন মহিমায় বইবে অনন্তকাল বসন্তের মলয় বাতাস!

আমার মুক্তি নয় মৃত্যুর মায়ার কাননে ,
আমার মুক্তি নয় ভীরুর ভীষণ কম্পনে ,
আমার মুক্তি নয় নিষ্কাম পূজার আসনে ,
আমার মুক্তি নয় পুতুল নাচের ইতিকথনে।
আমি পাই মুক্তির সাড়া -
যেখানে অন্ধকার শূন্য করে অন্তঃসার ,
আলোর সম্পদে দেয় অতন্দ্র পাহারা :
আমি পাই মুক্তির স্বাদ -
যেখানে অন্ধকার বাজায় বীনার তার ,
সুরলোকে সংগীতে শোনায় মিথ্যে জেনো আলোর বিষাদ :
আমি পাই মুক্তির বিশেষ আমন্ত্রণ -
যেখানে অন্ধকার সৌরভী খেয়ালের করে ব্যবহার .
উৎসবে কলরবে মাতায় ত্রিভূবন :

তখন অনেক রাতে কাঁচের বন্ধ জানালাতে ,
অন্ধকার মুছে দিয়ে বেদনার রাশি , ছড়িয়ে আলোর হাসি ,
আল্পনা এঁকে রেখে যায় বিশুদ্ধ হাওয়ায় ;
দোলে আর বলে-তোমাকেই চাই আমি তোমাকেই শুধু ভালবাসি !

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সহযাত্রী প্রকৃতি
কবি জয়া ভট্টাচার্য


পূবের অম্বর পারাবার ,তখনও অন্ধকার :
তখনও মাথার উপরে, ঝিকিমিকি তারাদের লুকোচুরি খেলা ।
মৌপিয়া নামে যদি ডেকেছি কখনো কোন তারাকে নিকটে;
অকস্মাৎ মনে হল রূপলেখা হতে পারে হয়তো বা কোন অপ্সরা,
নীলিমার গৌরব উজ্জ্বল তারা -
আঁধারের সোহাগ ছড়িয়ে, গগনের পথ চেয়ে বসে আছে তমসার তটে ;
দিগন্তের অঙ্গনে নিশিথীনি সঙ্গোপনে অভিসারে চলেছে একেলা ।
আমি এসে পৌঁছেছি উন্মত্তা অভিসারিকার চঞ্চল পদচারণায় ,
তবুও দিয়েছি পেতে নিঃশেষ প্রণাম , অসীমের আঙিনায় ;
এবং ভেসেছে পারাবারে আমার অতুল অহংকার !

উড়াণের আয়েল আসনে ,আমি বসে একমনে ,
দেখেছি নিষেধে ঘিরে রাতের বাগান , নিস্তব্ধ জোনাকির গুঞ্জনতান ;
মালি জেগে প্রহরায়-
আমি পাছে আশ্রয় করে নিই কবিতার কুঞ্জছায়ায় ;
সন্তর্পণে , নিরন্তর পায়চারি অবিশ্রাম জাগরণে -কবিতারই কুঞ্জবনে ।

হঠাৎ পাখির স্তুতিগানে,
গবাক্ষে মেলি আঁখি - আঁখিজলে ভেসে যাই পশ্চিমের সুনীল গগনে ;
বালার্কের শিশিরের মত অশ্রুনীরে ,
ঊষার কিরণচ্ছটা, পান্না চুনি গেঁথে হীরের পুষ্পপাত্র মুক্তো দিয়ে ভরে
সাজায় অর্ঘ্যের থালি : নৈবেদ্য ঢেলে দেয় নবজাতকের অন্তরে !
মাথার উপরে মহাকাশ: নীচে তার উষ্ণ নিঃশ্বাস :
আমার উড়াণ মাঝখানে ।

সাবালক সূর্য্যের বিশাল প্রাসাদ- সাগরের উপত্যকায় ;
আমি ক্রমে আসি নেমে ভূবনডাঙায় :
সাগর বিহঙ্গেরা নিয়ে গেল ডেকে সেইখানে ,
প্রকৃতির আঁচলের তলে , আনন্দ বিছানো জলে স্থলে ;
সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বাহারি পাতার বেড়া ,
ফলের স্বাদের গন্ধে বারেবারে দিশেহারা ,
যেন কল্পতরু মূলে পংক্তি ভোজনে -
এসেছি ছুটির হাতে পত্রখানি পেয়ে , প্রকৃতির আকুল আমন্ত্রণে :
পূব হতে পশ্চিমে অস্তাচল অনায়াসে , হয়ে গেছি পার ;
নীরব নীলিমায় ধরেছে আমার হাত ,পথিক অন্ধকার ।
সূর্য্যোদয়ে আলোর উৎসবে, নিসর্গের জনরবে-
আমি যাযাবর এক,পেয়েছি সংবাদ শুধু গরিমায় ভরা ;
সুন্দরের পাদপীঠতলে জাগ্রত কল্যানের মুগ্ধ মহিমায় হই আত্মহারা !

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নন্দিনীঘাটপাড়ের ইতিকথা
কবি জয়া ভট্টাচার্য


আজ সকালে প্রথম আমি অবাক হয়েছিলেম :
কেমন করে ঢুকেছিলে দুয়ার দেওয়া আমার বন্ধ ঘরে !
বসেছিলে নয়ন মেলে , স্নিগ্ধ পরশ দিয়ে ঢেলে আমার শিয়রে ।
পূবের এবং দখিন দিকের জানালা খুলে দিলেম ;
তখন আমি বুঝতে পেরেছিলেম :
তোমার ইচ্ছাতরী তোমায় পৌঁছে দিয়ে গেছে ,আমার ভীষণ কাছে :
ইচ্ছনদীর নন্দিনী ঘাট পাড়ে ।

নারিকেলের বৃক্ষ শাখায়, হাওয়া যখন দমক মাখায় ,
তোমায় দেখি তুমি বসে প্রভাতি জলসায় ।
আমার আসন তোমার পাশে- ধরে আছ মাতাল ভ্রমর আত্মহারা এমনি মধুরসে ;
ময়না কোকিল বউ কথা কও কাকাতুয়া ওরা- থাকে পাহারায় ।

আজকে গানের আসর শেষে ,শুধু তোমায় ভালবেসে শোনাব সেই গান ;
জন্মান্তর ছাড়িয়ে দুজন ,পরস্পরে ছিলাম আপন :
স্মৃতিগুলো ঘুরে ফিরে , সতেজ আজো আমাদেরে রয়ে ঘিরে ,
দিনে রাতে ব্যস্ত নিতে- শুদ্ধ প্রেমের ঘ্রাণ :
কথায় এবং কাহিনীতে , তোমায় আমি শোনাব সেই গান ।

শোনাব সেই গান প্রিয় ছড়িয়ে উদার প্রাণ ;
শোনাব সেই গান প্রিয়, বনষ্পতির ছায়ার মত আমায় তুমি দিয়েছ সম্মান !
শোনাব সেই গান প্রিয়, পাহারতলীর তৃণ বীথিকা্‌য় , ডেকে যেতে সকাল ওসন্ধ্যায় :
সাজিয়ে দিতে মনের মত আনন্দেতে , কুর্চি দিয়ে গাঁথা তোমার সুদীর্ঘ মালায় !
শোনাব সেই গান ;
যেথায় তোমার ললিতকলা , স্থাপন করে সকল বলা ।
মহান করে গেছে আমার ভালবাসার দান !

কেমন করে আমার বন্ধ ঘরে ,
প্রবেশ করেছিলে তুমি ,আমার প্রাণের খিড়কি দুয়ার ধরে :
দাঁড়িয়ে ছিলে শিয়র পরে -এবার সবই বুঝে নিলেম আমি ;
জানি তুমি ওগো অন্তর্যামি !

তোমার আমি শ্রেষ্ঠ স্থপতি ; যেমন জলে অব্যাহত চলে- জীবন পথের গতি :
তেমনি তোমার শ্রেয়সিনী প্রেমি আমি অসামান্যা দামি ;
পঞ্চভূতের কর্মশালায় ,আমার প্রেমের কুসুম দোলায় ,
ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ও ব্যোম, সবাই দোলে, খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে ,;
কেউ রয় না থামি ।
তুমিই দোলাও জানি আমি- ওগো অন্তর্যামি !

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নাগরদোলা
কবি জয়া ভট্টাচার্য


আকাশ হতে মাটি, আবার মাটি হতে আকাশ ,
নাগরদোলায় দোলার বেলায় , আসে অবকাশ :
উচ্চ নীচে কোথায় ভেদাভেদ ?
বুঝি তখন, দুই প্রয়োজন- জানায় আমার গভীর সংবেদ :

মাটি ছুঁয়ে ওঠে নাগরদোলা ;
আকাশ ভরে রূপসাগরে যতই ভাসাই স্বপ্নতরী, নাহয় পাল তোলা ।
গো চারণের মাঠে আমার রাখাল তমাল ছায়ে , বাঁশির সুরে ডাকে যখন ভুঁয়ে -
স্বর্গ জানি থেমে আছে মাটির আঙিনায় ,
আকাশ হতে নামতে থাকি আবার নাগরদোলায় ।

নাগরদোলার গতিরসে আকাশ মাটি আছে মিশে
উচ্চ নীচে থাকে বেঁচে দুজন দুজনায়,
বৃত্ত সম্পূর্ণ হলে , দুজন মনের সুখে দোলে , খুশির নাগরদোলায় :
ঐ দোলনা দোলায় জেনো শুধুই ভালবেসে আকাশ মাটি মিশে !

তেমনি আমার ভালবাসা রাখাল ছেলের বাঁশি ,
সকাল সন্ধ্যে ইচ্ছে করে তমাল তলে বসি ।
শুনি সুরে বাঁশি পুরে ,আমার প্রাণের সাড়া ;
হৃদয়ে নিই মাটির সুবাস ,নাগরদোলায় ছুঁয়ে আকাশ ,
কেবল দেখি সব একাকার ,প্রেম যমুনায় যাদের সাঁতার ;
তাদের সাথে থাকি বিভোর , হয়ে আত্মহারা !

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বন্ধনহীন নিয়ম
কবি জয়া ভট্টাচার্য


আমার পূবের দিকের ছোট্ট বারান্দায় -
বসি তখন সন্ধ্যা যখন রাত্রি পোশাক পড়ে ;
ঝিঁঝিঁর গুঞ্জরণে মুখর জঙ্গল পার হয়ে ,বাতাস আমায় সেখানে যায় নিয়ে -
হতে পারে হয়তো কোন অশ্বত্থ তলায় ;
ব্রজ ছেড়ে মথুরাতে যাবার বেলায় শ্যামের ,
রাইকিশোরী ধ্যানমগ্না কৃষ্ণগাথা নামের ,
গোপিনীদের কান্নার রোল ভেসে আসে সংকীর্ত্তণ সুরে ।

অঞ্জন নিই মেখে আমার অবাক দুটি চোখে :
মুগ্ধ হৃদয় যতই বিছাই দিগঙ্গনা দেখে ,
দিগঙ্গনা দেখে আমি প্রেমের কাছে ঋণি :
কৃষ্ণ রাধার মিলনমেলায় যেমন গোপিনী -
কুঞ্জ সাজায়, তরী ভাসায় ,পাড়ের কড়ি কন্ঠে দোলায় ;
রাধার তৃপ্তি না ফুরাতেই, লেনা দেনার শর্ত্ত থামায় , শেষের পারানি :
তেমনি আমার হৃদয় জুড়ে , ইচ্ছে নদীর তুফান ঝড়ে ,
বৃষ্টি কেবল শোনায় বাণী ভালবাসতেই জানি !

প্রকৃতি তার প্রতিদিনের নিয়ম কি আর ভাঙে ?
সূর্য্য ওঠে অস্তও যায় , চাঁদের বিলাস জোয়ার ভাঁটায় ,
কুসুমকলি সন্ধ্যে হতেই গুটি গুটি চলি ,
নিশিরাতে ,পূর্ণ সময় হয়ে যেতে -ভোরের আলোয় অনায়াসে আঁখি যে দেয় মেলি
জীবনপথের পথিক যত, চলার পথে ক্রমাগত, আপন আপন ঢঙে ,
নিয়ম শিকল নিজেই বাঁধে, দুর্ঘটনা কে আর সাধে ;
নির্ভাবনায় রাঙায় জীবন, স্বপ্ন রঙীন রঙে ।

ভালবাসার অমনি নিয়ম- অনিয়মের দেয়ানেয়া ঢেউ,;
প্রেমিক যুগল নিয়ম রচে, প্রত্যহাতীত খুশি যাঁচে ,
ওদের নিয়ম ওদের ম্‌ত , নাই বা মানুক কেউ :
সত্যি প্রেমের বিচিত্র সাজ, নানান সুতোর শিল্পের কাজ ;
নিসর্গের এই চিত্রশালায় শিল্প হয়েই বাঁচে :
অমনি সজীব মনে যেমন ছড়িয়ে সুধা মউ ,
নিত্য পালে দুলিয়ে হাওয়া, অবিরত তরী বাওয়া ,
সিঁদুর রঙিন লজ্জা মেলে, যেমন প্রাণে ছায়া ফেলে, শুচিস্মিতা বউ ।

আমার ছোট্ট বারান্দাতে , রাত্রি এবং সুপ্রভাতে ,
বসি আমি কৃষ্ণ প্রেমের পূজায় :
বৃক্ষশাখায় পাখি গেয়ে যায় , আকাশভরা সূর্য্য তারা ডাকে আমায় আয় :
ফুলের বনে লতা পাতায় , ছেয়ে থাকা গোপন কোনায় ,
মেতে ওঠে প্রজাপতি, সৌরভের ঐ মাতাল করা খেলায় ;
পাপড়ি গুলো ঝরে ঝরে , আমায় ধরে ঘিরে ;
বলে এবার দুঃখ তোমার সুদূরে দাও ছুঁড়ে ।
নির্ঝরিণীর ধারাপাতে, নেয়ে নিয়ে পূর্ণিমাতে -
প্রেমের পূজায় বস তুমি শুক্লা যামিনীতে ;
চেয়ে দেখ রাধাকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে তোমার প্রাণের আঙিনাতে !

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মাটির ছবি
কবি জয়া ভট্টাচার্য


লোকান্তরে আবছা মনে পড়ে ,
মউ পিয়াসির মউ জমেছে মহুয়া গাছ ভরে ;
সেদিন ছিলেম সাঁওতাল এক ছেলে :
নিশীথ রাতের তারার আসর , মুখর হয়ে উঠত আমার মত্ত মাদলে ।
মংলি এসে পৌঁছুতো ঠিক সময় ;
রাতটা কঠিন বেড়ায় ঘিরে দুজনে তন্ময় :
এক এক করে তারা গুনে যোগ অঙ্ক কষায়, দুজনেরই ধরে যেত নেশায় ;
ঘুম ভাঙাতো ঊষার শুকতারা ;পড়ে যেত মাটি কাটার তাড়া :
বেলচা কোদাল হাতে নিয়ে , ছুটে ছুটে চলতে গিয়ে, স্মৃতির সাড়ায় হতেম মোহময় ;
নিশীথ রাতের তারার সাথে , স্বপ্ন সুতোয় মালা গেঁথে ,
এমনি করেই হল আমার প্রথম পরিচয় !

সেই হতে কাল কেটে গেছে ,বারেবারেই মাটির কাছে ,
কখনো বা বকুলবনে , জুঁই চামেলির নিকেতনে ,
কখনো বা স্বর্ণচাঁপার , নাগকেশরের আন্দোলনে ,
হয়তো আবার হাস্নুহানার , দুরন্ত ডাক করে অবাক টেনেছে তার পিছে :
তারায় ভরা রাতে তবু ছিলেম মাটির কাছে ।

এই জন্মের পদন্নোতি অন্য রকম দায়ে , প্রতিশ্রুতি নিল আমার চেয়ে ;
নিশীথ রাতের তারার সঙ্গ নিষিদ্ধ প্রান্তরে ,
যখন যেমন প্রবল হবে , তখন তেমন ক্রুদ্ধ রবে প্রহর ব্যাপি রাখব আমি তীক্ষ্ণ নজরে
রাতের তারার মউ পিয়াসা থামিয়ে দিতে হবেই আমায় দৈববাণী মিথ্যে করে দিয়ে ।

চার দেয়ালে বন্দী রাতে , অন্ধকারের ভ্রুকুটিতে -
সঙ্গীবিহীন গোপন যন্ত্রণায় ,
আর্ত্তনাদের পাল উঁচিয়ে , ব্যথার হালে স্রোত কাটিয়ে ,
ভেসে গেছি নিঃসহায়ে গভীর নিশার খেয়ায় !

মনে মনে পৌঁছে যেতাম লোকান্তরেরে রাতে ; শুক্লা কেবল প্রদীপ হাতে-
তারার বানী বয়ে , আসত খবর নিয়ে ।
এ জন্মের কোন কিনারায় ,মংলি আজ হয়ত মোহন তবু পাহারায় ,
নিশীথ রাতে মউ জমা ঐ মহুয়া গাছ ভরে ,
ঝিকিমিকি তারার আলো তেমনি খেলা করে :
তেমনি ওঠে শুকতারাও ঘুম ভাঙাতে নিত্য শুভ প্রাতে :
যেতে যেতে প্রত্যাশাতে ভরিয়ে মন ভরিয়ে প্রাণ ,
যায় বলে যায়- জন্মান্তর হবেই মুখর তারায় ভরা আবার নিশীথ রাতে !

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রসন্ন কল্পবিহার
কবি জয়া ভট্টাচার্য


তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ?
যেমন ধরো ফুলের প্রসব ঘরে , প্রবেশ নিষেধ বিধাতারই রায় :
পুষ্পপাত্রে নবীন কুসুম সাজাই দিয়ে মন ;
রক্ত ও শ্বেত চন্দনে আর দুর্ব্বাদলে আতপচালে ,
পূর্ণ করি পূজার থালি -ধ্যানমগ্না হই , হৃদয় আমার বিছিয়ে দিই বিগ্রহ সেবায় ।

তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ?
যেমন ধরো মোহনাতে , পৌঁছে নদী অপেক্ষাতে ;
সাগর কখন গভীরে তার নিঃশেষে তলায় :
প্রকৃতি তার দুরন্ত কাম , ভাবতে পারে নয় অবিরাম ;
তবুও কি সত্যি কথা রয় কখনো গোপন ?
সময় যখন ধৈর্য্য ভেঙে দিয়ে , পরাক্রমে ঢোকে গিয়ে নদীর বেদনায় !

তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ?
যেমন ধরো পতঙ্গেরা বিদ্রোহি হয় , মাটির সাথে কঠিন বোঝাপড়ায় ;
মাটির আঁচল ছড়িয়ে আছে তবু সরাক্ষন :
বসুমাতার স্তন্য পানে , সজীব প্রাণ কি বিরাম মানে ?
পতঙ্গেরা মিছিল করুক সভা করুক যত , বসুন্ধরার মাতৃশক্তি তত ,
জীবন্ত তার সন্তানেদের রক্ষা করে ঘুচিয়ে বাধা সকল অন্তরায় !

তেমনি আমি তোমার ছবি আঁকি ।
না দেখা সুখ, দেয়না কোথাও ফাঁকি ।
ইচ্ছে মত রঙে ভরি ছবির কোনা কোনা , বাড়েনাতো দেনা :
ইচ্ছেমত তুলির টানে , যে রূপ ভাবি মনে মনে-
এঁকেই চলি দিন রাত্রি ধরে : যতক্ষন না ক্লান্তি বারণ করে :
চাইনাগো তাই দেখা মাত্রই , মিথ্যে হয়ে যাক আমার দীর্ঘ আয়োজন ;
ভাবি কেবল ঐ ভয়েতেই তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ?

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর