সহসা কাল্পনিক ভাবনার জালে , সাগরের তীরে খাড়া সোনার পাহাড় দিল উঁকি ; বিপদসংকুল চারিধার ; তরুন কিশোর তবু নিয়েছিল ঝুঁকি : পুরুষানুক্রমে যত সঞ্চয় তার , জাহাজ ক্রয়ের বিনিময়ে হল ছারখার। স্বদেশের সঙ্গীরা সাড়া দিয়েছিল যদি সমুদ্রযাত্রার কঠিন সংকেতে ; মাঝপথে একসাথে অসংখ্য পথিক যারা , থেমেছিল চিরতরে মরণের অভিসম্পাতে : তারাই এগিয়ে দিল জীবিতের উচ্ছ্বল মিছিল ; কেউ আর রইল না বাকি । তরুনবালক দিগ্বিজয়ী ; প্রসারিত আলিঙ্গনে ছিল অপেক্ষায়- সানন্দ প্রত্যাশায় , মাথার উপর যেন সূর্য্যের টাঙানো সামিয়ানা , সোনার পাহাড়।
বন্ধুর পথে চলাচল ; কাঁটায় কাঁটায় বিদ্ধ বিক্ষত পায় , বন্ধ হল অগ্রসর নিস্তেজ স্বনির্ভর ; শ্বাপদের হুঙ্কার , ঘনাল অন্ধকার- শোনা গেল শুধু মাত্র নগ্ন কোলাহল : তবুও উনিশ ; সম্রাট ফ্যাট হিং বসতির স্থপতি গড়ে সম্মানিত করেছে তার রাজ উষ্নীষ ; অভিবাসি সঙ্গীদল প্রজার মতই সংগ্রহ করেছিল উল্লসিত সুখবর।
সোনার পাহাড় ; ফ্যাট হিং চিনের আবিষ্কার : বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবাদ- অমর্ত্ত্যর আশীর্ব্বাদ , চিহ্নিত সানফ্রান্সিসকোয় রেখে গেছে ইতিহাস, অনন্ত কালের উপহার - পরম ঈশ্বরের আলোক প্রসাদ!
না ভাল লাগা যত, সারা দিবসের সঞ্চয় ; বাথানেরা খুরে খুরে ধূলা ওড়া বাতাসকে ঢেকে দিতে বলে : বাতাসের ভাষা যদি বয়ে ফিরে কুসুমের জন্মপরিচয় , তোমার আমার শুধু ভাল লাগা গুলো , দিবসের মেঘ ছেঁড়া সূর্য্যের আলো , রাতের আঁধারবক্ষে, চাঁদনি বা নক্ষত্রের সারি সারি গবাক্ষে , দীপাবলী রাত্রির প্রদীপের মত বাতাস সাজিয়ে রাখে তাই ,সন্ধ্যায় আলো ওঠে জ্বলে।
জীবনের পথে চলাচলে , কখনো কি মানচিত্র নির্দ্দেশ দিতে পারে নিয়মের কৌশলে ? কত মরুপ্রান্তর, দুর্গম কান্তার , গিরি নদী সাগরের নিঃশ্বাসে মিলিয়ে নিঃশ্বাস ; কালের যাত্রার ধ্বনি মুখরিত করে চারিপাশ :
এখন অনেক রাতে,কাঁচের বন্ধ জানালাতে - থেমে আছে অন্ধকার ঘন ঘন নিঃশ্বাসে তার , মনে হয় ঝাপসা হয়ে পড়া শব্দগুলো , চাইছে স্পষ্ট করে দিতে : এ পৃথিবী নাট্যমঞ্চ হোক ; তৃতীয় অঙ্কের পর অসংখ্য কৌতুহল সহসা থামুক ; নটনটী সাজ মুছে ফেলে, ভোলে না সাজানো সংসার।
এখন অনেক রাতে , কাঁচের বন্ধ জানালাতে থেমে আছে অন্ধকার শোনেনি নিষেধ তারার , মনে হয় জীবনের ধোঁয়া ধোঁয়া ইচ্ছেগুলো ; চাইছে তারার গায় খচিত করে যেতে : এ পৃথিবী প্রপঞ্চ হোক ; স্বপ্নের সুরধুনী তীরে ক্লা্ন্তিহীন অপেক্ষা করুক : তবুও সুরক্ষিত করে যেতে হবে চেতনার স্বর ; আমি জানি আমার আত্মা চিরকাল রইবেই অবিনশ্বর।
এখন অনেক রাতে, কাঁচের বন্ধ জানালাতে ; থেমে আছে অন্ধকার- দেয়ালে টাঙিয়ে বাণী শেষ মীমাংসার ; মনে হয় খাঁচাবন্দী জিজ্ঞাসা গুলো , চাইছে মুক্তি সন্ধানে ভেসে যাক দুর্বার স্রোতে : এ পৃথিবী আলেয়ার দূত হয় হোক ; কাঁটাতার বেড়ার ওপারে,সুকঠিন অচলায়তন ভাঙে তো ভাঙুক ; নিখুঁত স্থাপন করে যাবে সত্যের শব্দ বিন্যাস : অমলিন মহিমায় বইবে অনন্তকাল বসন্তের মলয় বাতাস!
আমার মুক্তি নয় মৃত্যুর মায়ার কাননে , আমার মুক্তি নয় ভীরুর ভীষণ কম্পনে , আমার মুক্তি নয় নিষ্কাম পূজার আসনে , আমার মুক্তি নয় পুতুল নাচের ইতিকথনে। আমি পাই মুক্তির সাড়া - যেখানে অন্ধকার শূন্য করে অন্তঃসার , আলোর সম্পদে দেয় অতন্দ্র পাহারা : আমি পাই মুক্তির স্বাদ - যেখানে অন্ধকার বাজায় বীনার তার , সুরলোকে সংগীতে শোনায় মিথ্যে জেনো আলোর বিষাদ : আমি পাই মুক্তির বিশেষ আমন্ত্রণ - যেখানে অন্ধকার সৌরভী খেয়ালের করে ব্যবহার . উৎসবে কলরবে মাতায় ত্রিভূবন :
তখন অনেক রাতে কাঁচের বন্ধ জানালাতে , অন্ধকার মুছে দিয়ে বেদনার রাশি , ছড়িয়ে আলোর হাসি , আল্পনা এঁকে রেখে যায় বিশুদ্ধ হাওয়ায় ; দোলে আর বলে-তোমাকেই চাই আমি তোমাকেই শুধু ভালবাসি !
পূবের অম্বর পারাবার ,তখনও অন্ধকার : তখনও মাথার উপরে, ঝিকিমিকি তারাদের লুকোচুরি খেলা । মৌপিয়া নামে যদি ডেকেছি কখনো কোন তারাকে নিকটে; অকস্মাৎ মনে হল রূপলেখা হতে পারে হয়তো বা কোন অপ্সরা, নীলিমার গৌরব উজ্জ্বল তারা - আঁধারের সোহাগ ছড়িয়ে, গগনের পথ চেয়ে বসে আছে তমসার তটে ; দিগন্তের অঙ্গনে নিশিথীনি সঙ্গোপনে অভিসারে চলেছে একেলা । আমি এসে পৌঁছেছি উন্মত্তা অভিসারিকার চঞ্চল পদচারণায় , তবুও দিয়েছি পেতে নিঃশেষ প্রণাম , অসীমের আঙিনায় ; এবং ভেসেছে পারাবারে আমার অতুল অহংকার !
আজ সকালে প্রথম আমি অবাক হয়েছিলেম : কেমন করে ঢুকেছিলে দুয়ার দেওয়া আমার বন্ধ ঘরে ! বসেছিলে নয়ন মেলে , স্নিগ্ধ পরশ দিয়ে ঢেলে আমার শিয়রে । পূবের এবং দখিন দিকের জানালা খুলে দিলেম ; তখন আমি বুঝতে পেরেছিলেম : তোমার ইচ্ছাতরী তোমায় পৌঁছে দিয়ে গেছে ,আমার ভীষণ কাছে : ইচ্ছনদীর নন্দিনী ঘাট পাড়ে ।
নারিকেলের বৃক্ষ শাখায়, হাওয়া যখন দমক মাখায় , তোমায় দেখি তুমি বসে প্রভাতি জলসায় । আমার আসন তোমার পাশে- ধরে আছ মাতাল ভ্রমর আত্মহারা এমনি মধুরসে ; ময়না কোকিল বউ কথা কও কাকাতুয়া ওরা- থাকে পাহারায় ।
আজকে গানের আসর শেষে ,শুধু তোমায় ভালবেসে শোনাব সেই গান ; জন্মান্তর ছাড়িয়ে দুজন ,পরস্পরে ছিলাম আপন : স্মৃতিগুলো ঘুরে ফিরে , সতেজ আজো আমাদেরে রয়ে ঘিরে , দিনে রাতে ব্যস্ত নিতে- শুদ্ধ প্রেমের ঘ্রাণ : কথায় এবং কাহিনীতে , তোমায় আমি শোনাব সেই গান ।
শোনাব সেই গান প্রিয় ছড়িয়ে উদার প্রাণ ; শোনাব সেই গান প্রিয়, বনষ্পতির ছায়ার মত আমায় তুমি দিয়েছ সম্মান ! শোনাব সেই গান প্রিয়, পাহারতলীর তৃণ বীথিকা্য় , ডেকে যেতে সকাল ওসন্ধ্যায় : সাজিয়ে দিতে মনের মত আনন্দেতে , কুর্চি দিয়ে গাঁথা তোমার সুদীর্ঘ মালায় ! শোনাব সেই গান ; যেথায় তোমার ললিতকলা , স্থাপন করে সকল বলা । মহান করে গেছে আমার ভালবাসার দান !
কেমন করে আমার বন্ধ ঘরে , প্রবেশ করেছিলে তুমি ,আমার প্রাণের খিড়কি দুয়ার ধরে : দাঁড়িয়ে ছিলে শিয়র পরে -এবার সবই বুঝে নিলেম আমি ; জানি তুমি ওগো অন্তর্যামি !
তোমার আমি শ্রেষ্ঠ স্থপতি ; যেমন জলে অব্যাহত চলে- জীবন পথের গতি : তেমনি তোমার শ্রেয়সিনী প্রেমি আমি অসামান্যা দামি ; পঞ্চভূতের কর্মশালায় ,আমার প্রেমের কুসুম দোলায় , ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ও ব্যোম, সবাই দোলে, খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে ,; কেউ রয় না থামি । তুমিই দোলাও জানি আমি- ওগো অন্তর্যামি !
লোকান্তরে আবছা মনে পড়ে , মউ পিয়াসির মউ জমেছে মহুয়া গাছ ভরে ; সেদিন ছিলেম সাঁওতাল এক ছেলে : নিশীথ রাতের তারার আসর , মুখর হয়ে উঠত আমার মত্ত মাদলে । মংলি এসে পৌঁছুতো ঠিক সময় ; রাতটা কঠিন বেড়ায় ঘিরে দুজনে তন্ময় : এক এক করে তারা গুনে যোগ অঙ্ক কষায়, দুজনেরই ধরে যেত নেশায় ; ঘুম ভাঙাতো ঊষার শুকতারা ;পড়ে যেত মাটি কাটার তাড়া : বেলচা কোদাল হাতে নিয়ে , ছুটে ছুটে চলতে গিয়ে, স্মৃতির সাড়ায় হতেম মোহময় ; নিশীথ রাতের তারার সাথে , স্বপ্ন সুতোয় মালা গেঁথে , এমনি করেই হল আমার প্রথম পরিচয় !
সেই হতে কাল কেটে গেছে ,বারেবারেই মাটির কাছে , কখনো বা বকুলবনে , জুঁই চামেলির নিকেতনে , কখনো বা স্বর্ণচাঁপার , নাগকেশরের আন্দোলনে , হয়তো আবার হাস্নুহানার , দুরন্ত ডাক করে অবাক টেনেছে তার পিছে : তারায় ভরা রাতে তবু ছিলেম মাটির কাছে ।
এই জন্মের পদন্নোতি অন্য রকম দায়ে , প্রতিশ্রুতি নিল আমার চেয়ে ; নিশীথ রাতের তারার সঙ্গ নিষিদ্ধ প্রান্তরে , যখন যেমন প্রবল হবে , তখন তেমন ক্রুদ্ধ রবে প্রহর ব্যাপি রাখব আমি তীক্ষ্ণ নজরে রাতের তারার মউ পিয়াসা থামিয়ে দিতে হবেই আমায় দৈববাণী মিথ্যে করে দিয়ে ।
তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ? যেমন ধরো ফুলের প্রসব ঘরে , প্রবেশ নিষেধ বিধাতারই রায় : পুষ্পপাত্রে নবীন কুসুম সাজাই দিয়ে মন ; রক্ত ও শ্বেত চন্দনে আর দুর্ব্বাদলে আতপচালে , পূর্ণ করি পূজার থালি -ধ্যানমগ্না হই , হৃদয় আমার বিছিয়ে দিই বিগ্রহ সেবায় ।
তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ? যেমন ধরো মোহনাতে , পৌঁছে নদী অপেক্ষাতে ; সাগর কখন গভীরে তার নিঃশেষে তলায় : প্রকৃতি তার দুরন্ত কাম , ভাবতে পারে নয় অবিরাম ; তবুও কি সত্যি কথা রয় কখনো গোপন ? সময় যখন ধৈর্য্য ভেঙে দিয়ে , পরাক্রমে ঢোকে গিয়ে নদীর বেদনায় !
তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ? যেমন ধরো পতঙ্গেরা বিদ্রোহি হয় , মাটির সাথে কঠিন বোঝাপড়ায় ; মাটির আঁচল ছড়িয়ে আছে তবু সরাক্ষন : বসুমাতার স্তন্য পানে , সজীব প্রাণ কি বিরাম মানে ? পতঙ্গেরা মিছিল করুক সভা করুক যত , বসুন্ধরার মাতৃশক্তি তত , জীবন্ত তার সন্তানেদের রক্ষা করে ঘুচিয়ে বাধা সকল অন্তরায় !
তেমনি আমি তোমার ছবি আঁকি । না দেখা সুখ, দেয়না কোথাও ফাঁকি । ইচ্ছে মত রঙে ভরি ছবির কোনা কোনা , বাড়েনাতো দেনা : ইচ্ছেমত তুলির টানে , যে রূপ ভাবি মনে মনে- এঁকেই চলি দিন রাত্রি ধরে : যতক্ষন না ক্লান্তি বারণ করে : চাইনাগো তাই দেখা মাত্রই , মিথ্যে হয়ে যাক আমার দীর্ঘ আয়োজন ; ভাবি কেবল ঐ ভয়েতেই তোমার সাথে দেখা হওয়ার খুব কি প্রয়োজন ?