কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের কবিতা
*
উইল
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ কাব্যমঞ্জুষা”  
কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  “স্বর্ণসন্ধ্যা” ( ১৯৪৮ ) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

শতেক বরষ পর—
আমার ভিটায় আসবে যারা আমার বংশধর |
আমাদিকে স্মরার মত
কিছুই হেথা থাকবে না ত
কোন রাখীতে বাঁধবো আমি ভবিষ্যতের কর ?
গরিব গৃহস্থ—
কি বিত্ত যে দিয়েই যাব করছি মনস্থ |
জমিদারী মুক্তা মণি,
স্বর্ণ কিম্বা কয়লা খনি—
নাইক কিছুই, রইবে কদিন খড়ের ছাওয়া ঘর |
এই শেফালী হায়,
থাকবে কদিন ?  সন্দেহ ঘোর,
তা’রা রঙিন টবের সারি রাখবে থরে থর |
এই তুলসী তল,
মর্মরেতে পড়বে বাঁধা স্থানটি নিরমল |
আমরা যাহা নয়ন লোরে
করে গেলাম সিক্ত ওরে,
পাথর চাপা থাকবে তাহা হয়ত অতঃপর |
এই পাপিয়া পিক
এত আপন থাকবে না ত থাকবে না নির্ভীক |
তাদের খাঁচার ময়না টিয়া
করবে মুখর ঝঙ্কারিয়া,
নূতন গড়া সুসজ্জিত হর্ম্য মনোহর |
সম্মুখে অজয়
দেবে কি এ ভালবাসার কতক পরিচয় ?
তাহার তীরে এই যে বসি
হেরি উজল পূর্ণ শশী,
ধূসর বেলা আকুল করে জলচরের স্বর |
চণ্ডীর এ মন্দির
চিরদিবস থাকবে জানি উচ্চ করি শির |
আরতির এ আলোক মাঝে
এই যে হিয়ার পুলক রাজে
কেমন করে রাখবো ধরে বুঝবে কে তার দর ?
যায় রেখে কবি
শুষ্ক কালির আঁখরে তার বুকের সুরভি |
যায় রেখে যায় ভালবাসি
খোঁকার এবং ফুলের হাসি,
বনবিহগের এই কাকলী, উদার নীলাম্বর |
জলের কলকল
বাদল দিনের সজল স্মৃতি, মালতী চঞ্চল |
যাই রেখে যাই মধুর স্মৃতি,
শুষ্ক ফুলের অথই প্রীতি,
যাই রেখে যাই জমাট করে বুকের পরিমল |
কোথায় পাব ধন ?
বুক চেরা এই রত্ন হীরা করছি সমর্পণ |
ক্ষুদ্র সুখের দুখের কথা
হাঁটার আমোদ কাঁটার ব্যথা,
ভূর্জ্জপত্রে কস্তূরীর এই রইলো আলিঙ্গন |

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বাঙ্গালী
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ
কাব্যমঞ্জুষা”  কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  “শ্রেষ্ঠ কবিতা” ( ১৯৫৭ ) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


আমরা বাঙ্গালী হয়তো বা বটি দূষী,
মোদের নিন্দা করে যার যত খুশী |
‘মেকলে’ করিয়া বিষের কুম্ভ খালি
সাধ মিটাইয়া আমাদের দিল গালি |
‘কার্জ্জন’ হতে মার্কিনী ‘মিস মেয়ো’
গালাগালি দিতে কসুর করেনি কেহ |
ডাকুক মশক, লাগুক যতই মাছি—
যেমন ছিলাম, তেমনি আমরা আছি |

কটা সেনা নিয়ে খিলজি বক্তিয়ার
শুনেছি এদেশ করেছিল অধিকার |
ক্লাইভ কয়টা ফাঁকা গোলা-গুলি ছাড়ি
হেলায় নবাবী মসনদ নিল কাড়ি |
নবাবে বধিতে অবাধ করিতে গদী
সবেগে হাজির হইল মহম্মদী |
মির্জাফরের উঠিল নামিল দর,
ছিয়াত্তরের এলো মন্বন্তর |

শিবাজী শাসনে বাঙ্গালী হইয়া দেক্
ইংরেজ রাজে ক’রে নিল অভিষেক |
ভারত-বিজয় করিতে হ’ল না দেরী,
বাঙ্গালী বাজালো বৃটিশের জয়ভেরী |
পাশ্চাত্ত্যের সর্ব্ব শ্রেষ্ঠ দান,
লয়েছে বাঙ্গালী আগে হয়ে আগুয়ান |
বাঙ্গালী মনীষা অপ্রতিহত গতি—
সতত সেধেছে ভারতের উন্নতি |

ইংরেজ যবে ত্যজিল ন্যায়ের পথ,
নিরেপেক্ষতা লুকালো স্বপ্নবৎ |
দিলো সত্যও যুক্তকে উপহাসি
কুবিচারে যবে নন্দকুমারে ফাঁসি,
স্বেচ্ছাচারের সাথে যবে নিপীড়ন
রাজলক্ষ্মীরে করিল আলিঙ্গন,
জানালো বাঙ্গালী স্পষ্ট সত্য ভাষে---
ঘুন লাগিয়াছে তোমাদের কাঁচা বাঁশে |

এলো দুর্দ্দিন, এলো সন্ত্রাসবাদ,
বিকটদণ্ড, উদ্ভট অপরাধ |
যুধিষ্ঠিরের উষ্ণ শোণিতবৎ
বাঙ্গালী রক্তে রঞ্জিল এ ভারত |
বাঙ্গালী তরুণ ঝাঁকে ঝাঁকে দিল প্রাণ,
আকাশ বাতাস মাতানো তাদের গান |
বাঙ্গালী দেখিল সজল-উজল আঁখি—
তিমিরে ডুবিছে ব্রিটিশের রাঙা চাকি |

নামিল বাঙ্গালী কল্পনালোক থেকে,
জ্যোতির্ম্ময়ের আলোক-আবীর মেখে |
দুর্দ্দমনীয়, মানে না সে আর মানা—
হানাদার ঘরে দেবেই দেবে সে হানা |
যাহারা হেরেছে, করেছে অত্যাচার,
প্রায়শ্চিত্ত হ’ল আরদ্ধ তার |
যে যেথায় আছে কীচক দুঃশাষণ,
এলো তাহাদের শোণিতের তর্পণ |
বাঙ্গালী কপিল সগরবংশ দহি
সুন্দর ক’রে গাড়িতে চাহে এ মহী |
সাগর তাহারি, গঙ্গা-সাগর তারি
পরশুরামের তীক্ষ্ণপরশুধারী |
তার করতোয়া, তাহার চন্দ্রনাথ,
হয়েছে তাহার কামাখ্যা সাক্ষাৎ
ভগীরথ তারে দিয়াছেন তপোবল,
নব গঙ্গারে টানিছে সে অবিরল |

বাঙ্গালী দিয়েছে ভারতকে সেরা কবি,
বাঙ্গালী দিয়েছে ভারতকে সেরা ছবি |
বাঙ্গালী দিয়াছে দরদী বৈজ্ঞানিক,
বীরসন্ন্যাসী বাগ্মী অলৌকিক |
দেছে অনশনে দৃঢ়পণে তনুত্যাগী
দেশবন্ধু ও জেতা নেতা অনুরাগী |
বাঙ্গালী ঘটালো অঘটন দুনিয়ায়,
অদল-বদল পূজারী ও দেবতায় |

সোনার বাংলা ঘেরা মহাপীঠ দিয়ে,
বেড়েছে বাঙ্গালী সতীর স্তন্য পিয়ে |
শবসাধনায় করেছে সিদ্ধিলাভ,
হেরেছে ‘কমলে কামিনী’ আবির্ভাব |
বাঙ্গালী প্রেমিক রসের ব্যবসা ক’রে
গৌর করেছে সে-ই শ্যামসুন্দরে |
তাহার জ্ঞানের কজন নাগাল পাবে ,
কাঁদিয়া আকুল পুরুষ-প্রকৃতি ভাবে |

পৃথক ধাতুতে গঠিত এদের হিয়া,
বজ্র এবং ব্রজের নবনী দিয়া |
বিজয়ায় এরা কাঁদিয়া ফুলায় আঁখি,
করুণা-কোমল হেন জাতি আছে নাকি
জগৎকে এরা আপন করিতে চায়,
মুখের অন্ন পরকে বিলায়ে খায় |
করিবে বাঙ্গালী ভুবন কান্তিমৎ
শুচি-সুন্দর শুদ্ধ শান্ত সৎ |

‘এটম বম’ কি লয়ে ‘কসমিকরে’
সৃষ্টির নাশ করিতে আসেনি সে |
দেশকালজয়ী তাহার আবিষ্কার,
ঘুচাইয়া দিবে বিশ্বের জরাভার |
বাঙ্গালীর ভাষা মুগ্ধ করিবে ধরা,
জীবনীশক্তিভরা তা মধুক্ষরা |
সুসভ্যতর হইবে জগৎ যবে
বাংলা ভাষায় মন্ত্র রচিত হবে |
শ্রীগৌরাঙ্গ গঙ্গার এই দেশ
নব চেতনার করিয়াছে উন্মেষ |
বাঙ্গালী জাতিই বাঁচাইবে এ ভুবন,
রণমুখী নয়, হরিমুখী করি মন |
সুধাসত্রের সেই অধিকারী ভাবী,
সারা ধরণীর গুরুপদে তার দাবী |
ভালে দাও তার প্রথম হোমের টিকা,
গালে উষ্ণতা, সন্ধ্যাদীপের শিখা ||

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কবির সুখ
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ
কাব্যমঞ্জুষা”  কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  “শ্রেষ্ঠ কবিতা” ( ১৯৫৭ ) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


কবিতা লিখিয়া পাইনি অর্থ, পাই নাই কোন খ্যাতি ভাই—
হয়েছি স্বপ্ন বিলাসী, অলস—অনিযোগ দিবারাতি তাই |
হিসাবী বন্ধু, ভুল করিয়াছ, ভুল বুঝিয়াছ আমাকে,
ধন-মান লাগি কবিতা লিখিনা, মরি আমি সেই দেমাকে |
ফল পেতে হলে চাষ করিতাম, ব্যবসা চাহিলে অর্থ,
মত্স্য ধরিতে জাল ফেলা চাই, আকাশে চাওয়া যে ব্যর্থ !

অনটন দেয় আঘাত নিত্য, মচকাই, তবু ভাঙি না,
সাঁজের প্রদীপে তেল নাই মোর, ফুলে আলো করে আঙিনা |
আঁধারে যখন কাটীতে চায় না একা বসে বড় ভাবি রে,
অরুণ আমায় এসে উঁকি দেয়, আকাশ ভরে যে আবীরে |
ধিক্কার পাই নিন্দাও পাই নানা মুখে নানা ভাষাতে,
সব শুঁয়াপোকা প্রজাপতি হবে আমি থাকি সেই আশাতে |

কোন্ ধন-মান পাইবার লাগি ঝঙ্কারে পিক পাপিয়া ?
কী পায় সাধুরা গিরি-গহ্বরে কঠোর জীবন যাপিয়া ?
চিন্তামণির ধনে ধনী যারা তারা কি মুক্তামণি চায় ?
বিস্ময়ে দেখে বিশ্বরূপ যে নিতি প্রতি অনু-কণিকায় |
আমি সে সুখের সেই তৃপ্তির আর সে প্রেমের ভিখারী
আলোক মাগি যে আতপ মাগি যে সেই হোমানল শিখারই |

ভুবন আমার অমৃতসিক্ত শুধু আনন্দ আলোকের,
ক্ষীর নবনীর অবনী সে মোর, আমার ধরণী বালকের
সোনার নূপুর গুঞ্জরে যেথা, বাজে রয়ে রয়ে বাঁশরী,
লিখি হিজিবিজি, কী পাই তাহাতে ?  বন্ধু কহিব কিবা আর
সেই সুখ পাই, রামধনু আঁকি উপজে যে সুখ বিধাতার |

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কবিতার দুঃখ
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ
কাব্যমঞ্জুষা”  কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  “শ্রেষ্ঠ কবিতা” ( ১৯৫৭ ) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


বটি মানুষের সুখ-দুখ-ভাগী, বাস করি এক ঘরে,
কিন্তু আমি তো ভুগিতে পারিনে প্লীহা ও কম্পজ্বরে ?
দেখি তাহাদের অন্নকষ্ট—নানা দিকে ক্ষতি-ক্ষয়—
কিন্তু তাদের দৈনন্দিন দিই না তো পরিচয় |
.                তা’তে কী সার্থকতা—
হাঁপাইয়া আমি যদি তাহাদের কহি হাঁপানির কথা ?

.                     ২
দাবানলে মৃগ-মড়কের কথা বলে নাকো মৃগনাভি,
মুক্তা করে না লবণ জলের প্রতিনিধিত্ব দাবী ;
রৌদ্রও আছে, জলকণা আছে, সন্দেহ নাই অণু—
তবু মেঘ নয়, রৌদ্রও নয়, রামধনু--- রামধনু |
.                পঙ্কেতে রহে বোঁটা—
কী দোষ যদি না রহে পঙ্কজে পঙ্কের ছিটা-ফোঁটা ?

.                      ৩
হীরক রাখে না আবেষ্টনীর কয়লা-কালিমা লেশ,
অলখিত থাকে খনির আঁধার খনি-শ্রমিকের ক্লেশ ;
সাপের মাথায় মাণিক, তাহারও আনন্দ দিতে সাধ,
সেও দেয় নাকো বিষদংষ্ট্রার গরলের সংবাদ |
.                শুভ শঙ্খ-স্বন—
শম্বুকদের শুঁড়ের কাহিনী করে না তো নিবেদন |

.                        ৪
‘চোখ গেল’ ব’লে পাপিয়া ফুকারে,  সেটি হয় সঙ্গীত ;
ক্ষুধিত ব্যাঘ্র গর্জন করে,  সেটা তার বিপরীত |
অতিক্রম যে করে সঙ্গীত সব যাতনার সীমা
ছন্দে ও সুরে বাজে তার চির-বাসন্তী পূর্ণিমা |
.                তিক্ততা রহে দূর—
গীত যে সাগর-উথ্বিত সুধা সব তার সুমধুর |

.                         ৫
এসেছে দারুণ মন্বন্তর, মানুষ করিবে কি ?
লাভ তো কিছুই হবে না করিয়া মনকে হতশ্রী |
সুধাকর নাম না দিয়া চাঁদকে যদি বলা হয় ‘খেটে’,
পড়িবে কি একমুঠা বেশী ভাত তাতে ক্ষুধিতের পেটে ?
            কে হবে তাহাতে ধনী—
খুলে লও যদি ধরা-গাত্রের সুষমার  আবরণী ?

.                      ৬
অধিকারী–ভেদ সবেতেই আছে—কী বলিবে মহাজনে
কাশ্মীরী শাল না বুনে শিল্পী ‘গামছা’ই যদি বোনে ?
যারা ‘অজন্তা’ ‘মাদুরা’ গড়েছে খ্যাত যারা চরাচরে—
কলা-লক্ষ্মীই কাঁদিবে. তাহারা যদি শুধু ঢেঁকি গড়ে |
.                বাড়িবে বিড়ম্বন ---
সকল লেখনী লাঙল হইলে উপবাসী রবে মন |

.                      ৭
ভোবো না নেহাৎ উদাসীন আমি, নাইকো সহানুভূতি,
যদি না ফসল ফলাইতে পারি, জোগাতে না পারি ধুতি |
আমি তোমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বেদনার কথা কই,
সুরপূরে তাহা পাঠাবার শুধু যোগ্য করিয়া লই |
.                    বুঝিতে ক’রো না ভুল—
বাণী-অর্চ্চনা হয় নাকো দিয়ে গোবরের বর্তুল |

.                     ৮
যুগ-উপযোগী হতে কহ মোরে, তাতে মোর রুচি নাই,
সব দেশ কাল জাতির আমি যে মর্য্যাদা পেতে চাই |
ধনিক বণিক শ্রমিক ক্ষণিক কারও প্রীতিকামী নহি,
আমি জগতের যজ্ঞের হরি দেবতার তরে বহি |
.                  আর কিছু নাহি পারি—
আমি তোমাদিকে করি আনন্দ অমৃতের অধিকারী |

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কবিমানস
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ
কাব্যমঞ্জুষা”  কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  “কাব্যসম্ভার” ( ১৯৬৭ ) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


বন্ধুরা কন আমার কবিতা কেহই পড়ে না শুনি—
পড়িবার মত কি আছে তাহাতে, কেন পড়িবেন গুণী ?
পাষাণকে গান শোনাবার লোক আজও ফেরে কুতুহলে--
আমি তাহাদেরি একজন – আর, থাকি তাহাদেরি দলে |
.                 যাহারে শুনাই গান –
হয় সে পুতুল, নয় সে পুতুল |   নয় বা সে ভগবান |

রাখাল-বালক মাঠে গান গায়, ভাবে না শ্রোতার কথা,
তাহারে যে গান গাওয়ায় --- তাহার অন্তর ব্যাকুলতা |
যত দিন তার জীবন থাকিবে ফোটাবে পূজার ফুল –
কে পূজে কাহারে ?  জানে না, দেখে না, সিদ্ধ ওই বকুল |
.                   ঝঙ্কারে পিক বনে—
একবার সে তো ভেবেও দেখে না কেউ শোনে কি না শোনে ?

আলোকে ভুবন আলোকিত যার তাহারে আলোক দিতে,
অনুরাগী তোলে আকাশ-প্রদীপ প্রীতি-প্রসন্ন চিতে |
গিরি-গহ্বরে ইষ্টমন্ত্র জপিতেছে কত জনা—
কে শুনিছে তাহা ?  সেই শুধু জানে মনে পায় সান্ত্বনা |
.                   হয় না যে নিষ্ফল—
শুক্তি যে স্বাতী-নক্ষত্রের – মাগিছে বিন্দু জল |

অহঙ্কার তো কম নহে মোর, কতই দুরাশা আসে,
ভাবি অভিজিৎ নক্ষত্রই মোর গান ভালবাসে |
তার আলোটুকু বহুদিন পর মোর কাছে পঁহুছায়,
মোর নিবেদনও একদিন যাবে ঠিক তার ঠিকানায় |
.                    একা গান গাই বসি—
ভাবি শুনিতেছে গিরি নদী বন--- গ্রহ তারা রবি শশী |

স্বপ্নে যে দেখি পাষাণ দেবতা উঠিছে আমার ঘামি—
তাঁর করুণার সুরধুনীধারা এ বুকে আসিছে নামি |
আলোকি গহন অবজ্ঞায় ওই ঘোর অমাবস্যা--
আসিয়াছে দেবী সফল করিতে আমার তপস্যা |
.                    ষে যাহাই মনে কর—
বাস্তব চেয়ে স্বপ্ন আমার সত্য অনেক বড় |

আমার গোমুখী গঙ্গাসাগর স্মরি হয় চঞ্চল –
কতটুকু হায় ব্যবধান মোর এই কুঁড়ি হতে ফল ?
আমার আদর বাড়ায়---স্বতই আনাদর করে লোক,
বংশীধরের বংশীর গান মোর সাথে দেয় যোগ |
.                   যাহাকে শুনাই গান—
নয় সে পাথর,  নয় সে পুতুল--- সে আমার ভগবান |

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শীতের অজয়
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ
কাব্যমঞ্জুষা”  কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া | “স্বর্ণসন্ধ্যা” (১৯
৮) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


সিকতায় লীন শীর্ণ সলিল ধারা
আজ জননীর স্নেহ হতে যেন হারা !
.        কুলে কুলে তারি গড়া সবুজের ভিড় |
.        তীরে কাশ তৃণ করে উন্নত শির !
তারই সাড়া নাই, পায় সবাকার সাড়া |

ভুলে গিয়াছে সে উদ্দাম নর্ত্তন,
দুকুল ভাসান তুফানের আলোড়ন |
.        তৃণের মতন তরু ভেসে যায় বেগে,
.        বেণু নুয়ে পড়ে হিল্লোল তার লেগে
হেলায় ডুবানো গ্রাম প্রান্তর বন |

ভাঙিয়া চুরিয়া উর্ব্বর করি মাটি,
যাত্রা তাহার জয়যাত্রাই খাঁটি |
.        বক্ষে তাহার কত আবর্ত্ত ওঠে,
.        রবি শশী তারা সঙ্গে তাহার ছোটে
যৌবনের সে প্লাবন গিয়াছে কাটি |

নাহি গর্জ্জন বাচাল হয়েছে মূক
লভিছে আঘাত-না-দিয়া যাওয়ার সুখ |
.        বালির বাঁধেতে করে তার পথ রোধ
.        আজি যেন তার নাহি মর্য্যাদা বোধ,
আছে যেন কার আগমন উত্সুক |

ঘুচেছে তাহার ভারের অহঙ্কার
সমারোহ নাই এ তীর্থ যাত্রার |
.        জলটুকু ভরা একটি আকাঙ্ক্ষায়,
.        বাষ্প হইয়া ঊর্দ্ধে উঠিতে চায়,
ধরা চেয়ে তার মেঘ বেশী আপনার |

ক্ষীণ তোয়ে তার এখন করিছে বাস
কোন্ এক মহা মিলনের উল্লাস |
.        প্রেমাশ্রু যেন হয়েছে তাহার জল
.        ঢলঢল করে, নাহি আর কলকল
বুকে পায় মহাসাগরের নিঃশ্বাস |

সাঙ্গ তাহার জীবনের হার জিৎ
কত ক্ষতি আর কতই করেছে হিত,
.        খসিয়াছে তার দম্ভের নির্ম্মোক
.        ভিক্ষু হয়েছে আজিকে চণ্ডাশোক
কন্ঠে তাহার নির্ব্বাণ সঙ্গীত |

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অজয়ের প্রতি
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ কাব্যমঞ্জুষা”  
কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  কাব্যগ্রন্থ – কাব্যসম্ভার ( ১৯৬৭ ) |


কান্ত কোমল গীত গোবিন্দ দেশের আমরা লোক,
তোমার কন্ঠে সাজে কি অজয় ‘মোহমুদগর’ শ্লোক ?
সহসা হইলে প্রলয় পয়োধি ঋণ করা ভিন্ জলে,
দুকুল ভাসায়ে ছুটিতে লাগিলে ভীম কল-কল্লোলে |
তোমার এ বারি নয় তো অজয়—এ বারি গরল ভরা,
তোমার স্নেহের কণা নাই এতে, এ শুধু বিষের ছড়া |


ভালবাসি আমি মাটির কুটির তোমার শ্যামল তীর—
প্রতিমার মত সজ্জিত গৃহ, তরু ও লতার ভিড় \
মথুরেশে মোরা মানি না, আমরা রাখাল-রাজারে ডাকি |
‘ধীর সমীরের কুঞ্জের’ লাগি উত্সুক হয়ে থাকি |
মালতী মাধবী ঘেরা কুটিরেতে নিবিড় আকর্ষণ—
পাকা ঘরে বাস চাহে না অজয় সুদামা এ ব্রাহ্মণ |


কত বার বাড়ী ভাঙিলে তুমি হে—গড়ি বা আমি কত ?
বিপদ যে তোমার দুর্দমনীয় --- বড়ই অসঙ্গত |
কাটালাম দিন শ্রীবত্স রাজ চিন্তাদেবীর সাথে—
আনন্দ আর অভাব আমার বন্ধু দিবস রাতে |
মাটিতে যে পাই স্নেহের পরশ—পদ্ম হস্ত মার
এইবার বুঝি মানিতে হইল তোমার নিকটে হার |


শ্রীমন্ত গেল যেখান হইতে সাত ডিঙা সাজাইয়া
আমি যে সেখানে রচেছিনু বাস মাটি খড় কাঠ দিয়া |
গলে গেল আহা সুন্দর বাড়ী লাগালো বড়ই ত্রাস
এবার দেখছি পাকা ঘরে তুমি করাবে আমারে বাস !
এ মাটির সাথে সংযোগ মোর অল্প দিনের নয়,
বন্য হরিণ রাজ-পিঞ্জরে থাকিতে করে যে ভয় |


শ্রীমন্তের যে মধুকর ডিঙা লয়ে গেলে সিংহলে
রাজৈশ্বর্য দিলে তুমি তারে নানাবিধ কৌশলে |
দেখাইলে তারে ‘কমলে কামিনী’ সাগরে কমলবন,
সেরূপ দেখিতে হয় মোর মন সতত যে উচাটন |
উজানীর দীন সন্তান আমি—নই বটে সদাগর
সুদূরের সেই রূপের পিয়াসী, চাহিনাকো পাকাঘর |


ইট ও কাঠের ঘরে যদি মোরে করাতেই চাহ বাস,
ভাঙন বন্ধ কর, আনো নীতি আনন্দ উচ্ছ্বাস |
সুখের এবং শান্তির নীড় কর তুমি প্রতি গৃহ –
শক্তি শ্রদ্ধা ভক্তি ও প্রেম সঙ্গী আমার দিয়ো |
অটুট রাখিয়ো দেব ও দেবীর করুণার নির্ঝর
হোক অক্ষয় বটের বেদিকা তব দেওয়া পাকাঘর |

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অজয়ের বন্যা ১৯৫৯
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক
শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ কাব্যমঞ্জুষা”  
কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |  


বিপন্ন মোরা --- অবসন্ন ও বিষণ্ণ দেহ মন
এই কি বন্যা নিয়ন্ত্রণ না বন্যা বিবর্দ্ধন ?
বন্যা হয়েছে হতেছে এবং প্রতিকার নাই যবে—
ফারায় ব্রিগেড সঙ্গে বন্যা ব্রিগেড গড়িতে হবে |
গেছে সব বাড়ি, ভাঙ্গা দেহ মন, ধুয়ে মুছে গেছে ধান
পল্লী হতেছে অ-বাসযোগ্য রক্ষ হে ভগবান |
‘ফারাক্ কা’ বাঁধ বাঁধা চাই আগে তার তোড়জোড় কর
কিম্বা সকলে নিরুপায় হয়ে নোয়ার আর্কই গড় |
মর্ম্মন্ত্তদ যাতনা পেয়েছি যা অবিস্মরণীয়
শহর বাঁচুক সঙ্গে তাহার পল্লীকে বাঁচাইয়ো |

সাপের সঙ্গে এক সাথে থাকি স্রোতের সঙ্গে লড়ি
বছর বছর কেমন করিয়া এমন জীবন ধরি ?
কেহ গাছে ঝুলে, কেহ চালে চেপে, রক্ষা করিছে প্রাণ
ভেসে গেলে বেশি ক্লেশ ত হত না, সব জ্বালা অবসান |
খড় কুটা দিয়ে দুবছর ধরে যে বাসা হইল গড়া
নিমেষে কোথায় সব ভেসে গেল অধিক যাবে কি করা ?
এমন অগৌরবের জীবন ধারণ করাও পাপ,
সভ্য স্বাধীন পুণ্য দেশেতে বিধাতার অভিশাপ |
সময় থাকিতে উপায় না করা সে কি নয় অপরাধ ?
স্বেচ্ছায় এ যে কাছে ডেকে আনা জাতির অর্তনাদ |

গোহাল পড়িছে ঘরে হাঁটু জল, উপায় খুঁজে না পাই
যোজন খুঁজিয়া ‘অজয়’ ‘কুনুরে’ সবল নৌকা নাই |
মিলিটারী বোট্ আসিল ক’খনা বন্যা সরিয়া গেলে,
কত  যে শক্তি সান্ত্বনা দিত দুই দিন আগে এলে |
আঁধার কাটিল ‘আলো’ ‘আলো’ করি বিভীষিকা ভরা রাত,
প্রভাতে পাঁচটা পেট্রোম্যাক্সে জানালো সুপ্রভাত |
রিলিফ আসিছে ভিক্ষা আলিছে কম্বল পিছু পিছু |
বন্যায় শুধু প্রাণ রক্ষার উপায় ছিল না কিছু
দোষ দিব কারে ?  কষ্টে কাটানু শব সাধনার রাতি
শবাসনা ভালে দেখিলাম কই, খণ্ড চন্দ্র ভাতি ?

.              *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর