| কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের কবিতা |
| উইল কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ কাব্যমঞ্জুষা” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া | “স্বর্ণসন্ধ্যা” ( ১৯৪৮ ) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। শতেক বরষ পর— আমার ভিটায় আসবে যারা আমার বংশধর | আমাদিকে স্মরার মত কিছুই হেথা থাকবে না ত কোন রাখীতে বাঁধবো আমি ভবিষ্যতের কর ? গরিব গৃহস্থ— কি বিত্ত যে দিয়েই যাব করছি মনস্থ | জমিদারী মুক্তা মণি, স্বর্ণ কিম্বা কয়লা খনি— নাইক কিছুই, রইবে কদিন খড়ের ছাওয়া ঘর | এই শেফালী হায়, থাকবে কদিন ? সন্দেহ ঘোর, তা’রা রঙিন টবের সারি রাখবে থরে থর | এই তুলসী তল, মর্মরেতে পড়বে বাঁধা স্থানটি নিরমল | আমরা যাহা নয়ন লোরে করে গেলাম সিক্ত ওরে, পাথর চাপা থাকবে তাহা হয়ত অতঃপর | এই পাপিয়া পিক এত আপন থাকবে না ত থাকবে না নির্ভীক | তাদের খাঁচার ময়না টিয়া করবে মুখর ঝঙ্কারিয়া, নূতন গড়া সুসজ্জিত হর্ম্য মনোহর | সম্মুখে অজয় দেবে কি এ ভালবাসার কতক পরিচয় ? তাহার তীরে এই যে বসি হেরি উজল পূর্ণ শশী, ধূসর বেলা আকুল করে জলচরের স্বর | চণ্ডীর এ মন্দির চিরদিবস থাকবে জানি উচ্চ করি শির | আরতির এ আলোক মাঝে এই যে হিয়ার পুলক রাজে কেমন করে রাখবো ধরে বুঝবে কে তার দর ? যায় রেখে কবি শুষ্ক কালির আঁখরে তার বুকের সুরভি | যায় রেখে যায় ভালবাসি খোঁকার এবং ফুলের হাসি, বনবিহগের এই কাকলী, উদার নীলাম্বর | জলের কলকল বাদল দিনের সজল স্মৃতি, মালতী চঞ্চল | যাই রেখে যাই মধুর স্মৃতি, শুষ্ক ফুলের অথই প্রীতি, যাই রেখে যাই জমাট করে বুকের পরিমল | কোথায় পাব ধন ? বুক চেরা এই রত্ন হীরা করছি সমর্পণ | ক্ষুদ্র সুখের দুখের কথা হাঁটার আমোদ কাঁটার ব্যথা, ভূর্জ্জপত্রে কস্তূরীর এই রইলো আলিঙ্গন | . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| অজয়ের প্রতি কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ কাব্যমঞ্জুষা” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া | কাব্যগ্রন্থ – কাব্যসম্ভার ( ১৯৬৭ ) | কান্ত কোমল গীত গোবিন্দ দেশের আমরা লোক, তোমার কন্ঠে সাজে কি অজয় ‘মোহমুদগর’ শ্লোক ? সহসা হইলে প্রলয় পয়োধি ঋণ করা ভিন্ জলে, দুকুল ভাসায়ে ছুটিতে লাগিলে ভীম কল-কল্লোলে | তোমার এ বারি নয় তো অজয়—এ বারি গরল ভরা, তোমার স্নেহের কণা নাই এতে, এ শুধু বিষের ছড়া | ২ ভালবাসি আমি মাটির কুটির তোমার শ্যামল তীর— প্রতিমার মত সজ্জিত গৃহ, তরু ও লতার ভিড় \ মথুরেশে মোরা মানি না, আমরা রাখাল-রাজারে ডাকি | ‘ধীর সমীরের কুঞ্জের’ লাগি উত্সুক হয়ে থাকি | মালতী মাধবী ঘেরা কুটিরেতে নিবিড় আকর্ষণ— পাকা ঘরে বাস চাহে না অজয় সুদামা এ ব্রাহ্মণ | ৩ কত বার বাড়ী ভাঙিলে তুমি হে—গড়ি বা আমি কত ? বিপদ যে তোমার দুর্দমনীয় --- বড়ই অসঙ্গত | কাটালাম দিন শ্রীবত্স রাজ চিন্তাদেবীর সাথে— আনন্দ আর অভাব আমার বন্ধু দিবস রাতে | মাটিতে যে পাই স্নেহের পরশ—পদ্ম হস্ত মার এইবার বুঝি মানিতে হইল তোমার নিকটে হার | ৪ শ্রীমন্ত গেল যেখান হইতে সাত ডিঙা সাজাইয়া আমি যে সেখানে রচেছিনু বাস মাটি খড় কাঠ দিয়া | গলে গেল আহা সুন্দর বাড়ী লাগালো বড়ই ত্রাস এবার দেখছি পাকা ঘরে তুমি করাবে আমারে বাস ! এ মাটির সাথে সংযোগ মোর অল্প দিনের নয়, বন্য হরিণ রাজ-পিঞ্জরে থাকিতে করে যে ভয় | ৫ শ্রীমন্তের যে মধুকর ডিঙা লয়ে গেলে সিংহলে রাজৈশ্বর্য দিলে তুমি তারে নানাবিধ কৌশলে | দেখাইলে তারে ‘কমলে কামিনী’ সাগরে কমলবন, সেরূপ দেখিতে হয় মোর মন সতত যে উচাটন | উজানীর দীন সন্তান আমি—নই বটে সদাগর সুদূরের সেই রূপের পিয়াসী, চাহিনাকো পাকাঘর | ৬ ইট ও কাঠের ঘরে যদি মোরে করাতেই চাহ বাস, ভাঙন বন্ধ কর, আনো নীতি আনন্দ উচ্ছ্বাস | সুখের এবং শান্তির নীড় কর তুমি প্রতি গৃহ – শক্তি শ্রদ্ধা ভক্তি ও প্রেম সঙ্গী আমার দিয়ো | অটুট রাখিয়ো দেব ও দেবীর করুণার নির্ঝর হোক অক্ষয় বটের বেদিকা তব দেওয়া পাকাঘর | . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| অজয়ের বন্যা ১৯৫৯ কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক শ্রীজ্যোত্স্নানাথ মল্লিক, শ্রীকৌশাম্বীনাথ মল্লিক ও শ্রীসুধেন্দু মল্লিক সম্পাদিত “কুমুদ কাব্যমঞ্জুষা” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া | বিপন্ন মোরা --- অবসন্ন ও বিষণ্ণ দেহ মন এই কি বন্যা নিয়ন্ত্রণ না বন্যা বিবর্দ্ধন ? বন্যা হয়েছে হতেছে এবং প্রতিকার নাই যবে— ফারায় ব্রিগেড সঙ্গে বন্যা ব্রিগেড গড়িতে হবে | গেছে সব বাড়ি, ভাঙ্গা দেহ মন, ধুয়ে মুছে গেছে ধান পল্লী হতেছে অ-বাসযোগ্য রক্ষ হে ভগবান | ‘ফারাক্ কা’ বাঁধ বাঁধা চাই আগে তার তোড়জোড় কর কিম্বা সকলে নিরুপায় হয়ে নোয়ার আর্কই গড় | মর্ম্মন্ত্তদ যাতনা পেয়েছি যা অবিস্মরণীয় শহর বাঁচুক সঙ্গে তাহার পল্লীকে বাঁচাইয়ো | সাপের সঙ্গে এক সাথে থাকি স্রোতের সঙ্গে লড়ি বছর বছর কেমন করিয়া এমন জীবন ধরি ? কেহ গাছে ঝুলে, কেহ চালে চেপে, রক্ষা করিছে প্রাণ ভেসে গেলে বেশি ক্লেশ ত হত না, সব জ্বালা অবসান | খড় কুটা দিয়ে দুবছর ধরে যে বাসা হইল গড়া নিমেষে কোথায় সব ভেসে গেল অধিক যাবে কি করা ? এমন অগৌরবের জীবন ধারণ করাও পাপ, সভ্য স্বাধীন পুণ্য দেশেতে বিধাতার অভিশাপ | সময় থাকিতে উপায় না করা সে কি নয় অপরাধ ? স্বেচ্ছায় এ যে কাছে ডেকে আনা জাতির অর্তনাদ | গোহাল পড়িছে ঘরে হাঁটু জল, উপায় খুঁজে না পাই যোজন খুঁজিয়া ‘অজয়’ ‘কুনুরে’ সবল নৌকা নাই | মিলিটারী বোট্ আসিল ক’খনা বন্যা সরিয়া গেলে, কত যে শক্তি সান্ত্বনা দিত দুই দিন আগে এলে | আঁধার কাটিল ‘আলো’ ‘আলো’ করি বিভীষিকা ভরা রাত, প্রভাতে পাঁচটা পেট্রোম্যাক্সে জানালো সুপ্রভাত | রিলিফ আসিছে ভিক্ষা আলিছে কম্বল পিছু পিছু | বন্যায় শুধু প্রাণ রক্ষার উপায় ছিল না কিছু দোষ দিব কারে ? কষ্টে কাটানু শব সাধনার রাতি শবাসনা ভালে দেখিলাম কই, খণ্ড চন্দ্র ভাতি ? . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |