কবি লবঙ্গলতা দেবীর কবিতা
*
চুরির কিনারা
কবি লবঙ্গলতা দেবী
নারায়ণচন্দ্র বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত স্বদেশী পত্রিকার মাঘ ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ( জানুয়ারী ১৯০৮) সংখ্যায়
প্রকাশিত ।

বাগ্দীর ছেলে রামা নাম তার,
গ্রামের একটি ধারে।
ছিল না তাহার এ জগতে কেউ
আপনার বলিবারে।
শুধু ছিল তার সুস্থ সবল
অসুরের মত কায় ;
বাসনা শূন্য সরল হৃদয়
ছিল না অভাব তায়।
পাতা দিয়া ঢাকা ছোট কুঁড়েখানি,
হেলা তার এক পাশ ;
চাল ছিদ্র দিয়া দেখা যেত রেতে
তারাভরা নীলাকাশ।
সারাদিন খাটি পরের মজুরী
সন্ধ্যায় কুটীরে আসি,
মলিন বিছানা পাতি’ অকাতরে
ঘুমা’ত সে সারানিশি।
সিত চন্দ্রকর রন্ধ্রপথে আসি
পড়িত তাহার মুখে ;
বীজনিত বায়ু ক্লান্ত দেহ তার,
ঘুমাইত রামা সুখে।
আপনি আনিত আপনি খাইত,
খাওয়াতে ছিল না কেউ ;
আপনার মনে দিন চলে যেত,
গণিত না রামা ঢেউ।

*        *        *

একদিন রামা সকালেতে উঠি
কুঁড়ের বাহিরে আসি,
দেখিল দাঁড়ায়ে লালপাগ বাঁধা
উত্তর-পশ্চিমবাসী।
একজন নয়, সারি সারি সারি,
পিছনেতে জমাদার ;
সবিস্ময়ে রামা চাহে একবার
মুখপানে সবাকার।
কথা না বাহির হ’তে মুখে তার,
হাতকড়ি পড়ে হাতে ;
টানিয়া তাহারে চৌকীদারদল
লইয়া চলিল সাথে।
পরে একদিন হাকিমের কাছে
বিচার হইল তার ;
দেখে বিচারক, ডাকাত বলিয়া
আসামী গেছে স্বীকার।
পাতার কুঁড়েতে ছাউনী ভিতরে
পাওয়া গেছে চোরা মাল,---
অবাক হইয়া সাক্ষীদের পানে
চাহে রামা ফ্যাল ফ্যাল।
তারপর রামা চলিল শ্রীঘরে,
সাতটি বছর তরে ;
প্রেমেশন হ’ল দারোগা বাবুর
চুরির কিনারা ক’রে।

*        *        *

সাতটী বছর গত হলে রামা
ফিরিয়া আসিল দেশে ;
দেখিল তাহার কুঁড়েখানি নাই,
( সেথা ) চাষীরা লাঙ্গল চষে।
এ জগতে তার আপন বলিতে
ছিল শুধু কুঁড়ে খানি ;
মূর্খ রামা ভাবে,---কি করম দোষে,
কে হরিল তা’ না জানি।
ছল ছল চেখে চাহে চারিভিতে
শুধু এক ফোঁটা জল ---
পড়িল গড়ায়ে, একটী নিশ্বাস
বহে ভেদি অন্তস্তল।
তারপর রামা কোথা চলে গেল,
কেবা তার খোঁজ রাখে ?
দারোগা বাবুটী পেনসন ভোগ
করিতেছে আজো সুখে।

.                   ****************     
              
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটী চিত্র
কবি লবঙ্গলতা দেবী
নারায়ণচন্দ্র বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত স্বদেশী পত্রিকার আষাঢ় ১৩১৫ বঙ্গাব্দের (জুন ১৯০৮)
সংখ্যায় প্রকাশিত ।

চাষার ছেলে হানিফ আলি --- পুর গাঁয়ে বাস।
সুখে দুখে চলতো সংসার দশ বিঘে ভুঁই চাষ।
দুই বছরের একটী ছেলে পাঁচ বছরের মেয়ে,
যুবতী স্ত্রী---তিনটি প্রাণী ছিল তার মুখ চেয়ে।
হাল ছিল তার বলদ ছিল, সাহস ছিল বুকে,
সুখ ছিল তার শান্তি ছিল, হাসি ছিল মুখে।
খাটতে তার ডর ছিল না, খাটতো দিন রাত,
রোদ বৃষ্টি শীত গ্রীষ্মে ছিল না দৃক্পাত।
সারা দিন খেটে সাঁঝে আসতো যখন ঘরে,
ভুলে যেত সকল কষ্ট খোকার মুখটী হেরে।
আধ আধ স্বরে খোকা ডাকতো বাবা ব’লে ;
ভাবতো হানিফ, স্বরগ কোথা---স্বরগ তো তার কোলে।
পৌষ মাসে উঠতো যখন গোলাভরা ধান,
বলতো হানিফ আমার মত কেবা ভাগ্যবান্!

দুইটী বছর হাজা শুকা উঠলো হাহাকার ;
একে একে দেশের লোক সব যাচ্চে যমের দ্বার।
অর্দ্ধাশনে কাটায় দিন, তাও শেষে না পায়,
অনশন ব্রত করি’ মুক্ত-পথে ধায়।
ঋণের দায়ে ঘটি বাটী হাল গরু সব গেছে,
এক মুঠা চাল নাইক ঘরে কি খেয়ে প্রাণ বাঁচে ?
মহাজন দেয় না ধার আর, ভিক্ষা নাহি মিলে।
ভাবে হানিফ---হায় খোদা একি কষ্ট দিলে ?
জমিদারের খাজনা বাকী, নায়েব জুলুম করে,
পঞ্চায়েত চালের খড় টানে ট্যাক্সের তর।
জ্বরবিকারে শুষ্ ছে মেয়ে ঘরের মাঝে পড়ে ;
পত্নী তার পাশে ব’সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
দুধের ছেলে খোকা আমার, মুখের পানে চায়,
হায় গো খোদা, এতদিনে ফেল্ লে একি দায় ?

ছুটে এসে খোকা বলে বাপের গলা ধরি’---
‘খেতে দাও বাবাগো পেটের জ্বালায় মরি।’
একটী থালা একটী ঘটী শেষের সম্বল আছে ;
তাই নিয়ে ছুটল হানিফ মহাজনের কাছে।
চারটী আনা পেয়ে ফেরে উলসভরা বুকে,
তবু কিছু দিতে পারবে খোকার বাসি মুখে।
কিন্তু হায় গরীব যে তার কোথায় সুখ আছে ?
জমিদারের পাইক এসে ধরলে পথের মাঝে।
দু’ বছরের খাজনা বাকী, অগ্নিমূর্ত্তি হ’য়ে,
হুকুম দিলেন নায়েব---সিধে কর পয়জার দিয়ে।
ছেড়ে দিলে প্রহার দিয়ে, পয়সা নিয়ে কেড়ে ;
পথে এসে হানিফ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে।
তখন কাণের কাছে বাজছে হা হা করি,---
‘খেতে দাও বাবাগো পেটের জ্বালায় মরি!’
দুপুর রোদে উদাস বায়ু হু হু ছুটে যায়।
ছুটলো হানিফ দিশে হারা পাগলের প্রায়।

যাচ্ছিল এক ‘স্বদেশ-সেবক’ চাল পয়সা নিয়ে,
আছাড় খেয়ে পায়ে তার পড়লো হানিফ গিয়ে।
স্বদেশ-সেবক যুবা তার দুঃখের কথা শুনে,
দুই সের চাল আট্টি পয়সা দিল তারে গুণে।
সূয্যিমামা ডুবু ডুবু মাঠের পর পারে।
ছুটে এল খোকা অমনি বাবা বাবা ব’লে,
শুকনো চালই এক মুঠা দিতে গেল গালে।
এমন সময় যমদূতের মত কোথা হ’তে,
উপস্থিত পঞ্চায়েত, চৌকিদার সাথে।
দেখে তাদের হানিফের উড়ে গেল প্রাণ ;
কাপড়ের চাল ধরে চৌকিদার দিল টান।
খোকার হাতের চালগুলিও দিল না সে ছেড়ে,
পঞ্চায়েত তার পয়সা ক’টী নিল জোরে কেড়ে।
পায়ে প’ড়ে বলে হানিফ, ওগো ফিরে চাও,
এক মুঠা চাল দিয়ে আমার খোকার প্রাণ বাঁচাও।
সে কথায় কি গলে সভ্য পঞ্চায়েতের প্রাণ ?
চাল পয়সা নিয়ে হেসে করিল প্রস্থান।
ভাবে হানিফ, হায় খোদা, এরা কি মানুষ নয় ?
এমনি ক’রে মুখের গরাস কেড়ে নিতে হয় ?
হায় হানিফ! কি বুঝবে তুমি সভ্যতার লীলা ?
মানুষ যে হয়, সভ্য সে নয়, এ এক নূতন খেলা।

তার পর কি হ’লো আর শুনতে যদি চাও,
সভ্য যদি না হও, আগো কাণে আঙুল দাও।

সকাল বেলা উঠে দেখে যত প্রতিবাসী,
গাছের ডালে ঝুলছে হানিফ গলায় দিয়ে ফাঁসি।
মুণ্ডকাটা খোকা ঐ উঠানে আছে প’ড়ে ;
স্ত্রী কাঁদছে মেয়ের মরা দেহ কোলে করে।
পুলিস এল, ছুটলো রিপোর্ট হাকিমের সদরে,
সব গোলমাল চুকে গেল তিন দিনের ভিতরে।

*        *        *        *        *        *

এমনি ধারা কত হানিফ বাঙলার ঘরে ঘরে,
গাছের ডালে নিত্য ঝুলে, কে তার খোঁজ করে ?

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অমরতা
কবি লবঙ্গলতা দেবী
নারায়ণচন্দ্র বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত স্বদেশী পত্রিকার ভাদ্র ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ( অগাস্ট ১৯০৮)
সংখ্যায় প্রকাশিত।


হে মরণ! তব দীপ্ত রুদ্র মূর্ত্তি স্মরি,
.                সদা ভয়ে কাঁপিত পরাণ ;
কল্পনায় তব ভীম ভ্রুকুটী নেহারি,
.                হ’তো বিশ্ব শূন্যময় জ্ঞান।
মনে হ’তো বিশ্ব তব ক্রীড়ার কন্দুক,
.                ধ্বংসমাত্র নিয়ম তোমার ;
ভাবিতাম তুমি মৃত্যু! সুখে মহাদুখ ;
.                ছবি তুমি নিরমমতার।

কিন্তু আজি একি হেরি স্বপনের প্রায়,
.                শেষ নহে তব আলিঙ্গন।
জীবনে দুর্লভ যাহা---তুমি দাও তায়,
.                ধ্বংস মানে নবীন গঠন।
তব ভয়ে ভীত যেই রোগে শোকে মরে,
.                সেই শুধু হারায় জীবন ;
কিন্তু যে জীবন দেয় অপরের তরে,
.                মৃত্যু তার সুখনিকেতন।
কাঁদিয়া যে মরে তার বিফল মরণ,
.                তারই রহে জীবনের মমতা ;
হাসিমুখে যে তোমারে করে আলিঙ্গন,
.                মরণে সে পায় অমরতা।

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্বদেশী ভুত
কবি লবঙ্গলতা দেবী
নারায়ণচন্দ্র বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত স্বদেশী পত্রিকার কার্তিক ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ( অকেটোবর
১৯০৮) সংখ্যায় প্রকাশিত ।


সে ছিল বিদেশী ভক্ত, নামটী তার রঘু ;
স্বদেশীর ভিটেয় সে চরিয়ে বেড়ায় ঘুঘু।
খাওয়া পরা শোওয়া বসা সবই তার বিলাতি,
যা’ বিলাতি তা’ মিষ্ট তার---মায় বিলাতি লাথি।
গ্রামের ভিতর ছেলেগুলা ‘পিকেটিং’ করে,
তাই দেখে রঘু যেন জ্বলে পুড়ে মরে।
গায় যখন তারা ‘বন্দেমাতরম্’ গান,
দুই হাতে রঘু নিজের ঢেকে রাখে কাণ।
ভাবে রঘু একি আপদ এল দেশের মাঝে,
ছেলে মেয়ে বুড়াবুড়ী স্বদেশী বাঁদর সাজে!
নেহাৎ যখন অসহ্য হয় ঘরে রইতে নারে,
ছুটে যায় রঘুনাথ থানা ঘরের দ্বারে।
মারপিট, নুণ ফেলা কাপড় পোড়ান আদি,
কত মামলায় সাক্ষী রঘু, কত মামলায় বাদী।
কত ছেলে জেলে গেল, কত বেত খায় ;
কি আপদ্, তবু তো এ পোড়া ভূত না যায় ?

তারপর কলিকাতায় বেরুল যখন বোমা,
তখন আর রঘুনাথের আনন্দের নাই সীমা।
দিনরাত থানায় রঘু আনাগোনা করে,
খানাতল্লাস বাকী আর রইল না কার(ও) ঘরে।
কত পটকা বোমা হ’য়ে হাতে দেয় দড়ি,
বন্দুকের টোটা হ’লো কবিরাজের বড়ি।
উনুন ফোঁকা চোঙা হ’লো রিভলবারের নল ;
আর্ম্ এ্যাক্টে, প’ড়ে লাঠী গেল রসাতল।
কিন্তু হায় বলতে গেলে দুঃখে বুক ফাটে ;
তবু তো স্বদেশী ভূত বেড়ায় মাঠে ঘাটে।

রাখীর দিনে বাঙলা জুড়ে উঠে গণ্ডগোল ;
ছেলে বুড়া রাখী বেঁধে পরস্পর দেয় কোল।
কেহ খায় গুড় চিঁড়া, কেহ পান্তা ভাত,
বন্দেমাতরম্ গান গায় দিন রাত।
রঘু বলে, হায় ইংরাজ ধিক্ ধিক্ তোমারে ;
ম্যাক্সিম্ গন্, গোরা ফৌজ আছে কিসের তরে ?
এমন সময় এক দল ছোট ছোট ছেলে,
ছুটে এসে রঘুর হাতে রাখী বেঁধে দিলে।
খড়ের গাদায় যেন কেউ ধরিয়ে দিলে আগুন,
রাগে কেঁপে রঘু তাদের কর্ তে যায় খুন।
যত মুখে আসে রঘু পাড়ে তাদের গালি,
দূরে থেকে ছেলেরা সব দেয় হাততালি।

‘বন্দেমাতরম্’ গেয়ে ছেলের দল ফিরে,
এমন সময় পুলিশ সাহেব দাঁড়ায় তাদের ঘিরে।
রঘুনাথকে ডেকে সাহেব বলে চড়াসুরে,---
কোন্ কোন্ আদমী তোমায় মারপীট করে ?
দশ বছরের একটী ছেলে এগিয়ে এসে বলে,---
আমিই েকা দোষী সাহেব, দিবে চল জেলে।
আর একটী ছেলে---বয়স হবে সাত,
আগু হ’য়ে বলে সাহেব, ঝুটা ওর বাত।
আমিই বেঁধে দিছি রাখী রঘুনাথের হাতে,
জেলে যেতে হয় আমি রাজি আছি তাতে।

ব্যাপার দেখে সাহেব হতভম্ব হয়ে দাঁড়ায়,
সবাই বলে আমিই দোষী কারে ধরা যায় ?
ধমক দিয়ে রঘুকে বলে, আসামী কোন্ হ্যায় ?
রঘুর মুখে কথা নাই শুধু ফ্যাল ফ্যালে চায়।
ক্রমে তার চক্ষুদু’টা সজল হ’য়ে আসে ;
চোখের জলে রঘুনাথের পাষাণ বুকটা ভাসে।

“ওগো সাহেব মিছা কথা” কেঁদে রঘু বলে,
কেউ আমায় মারেনি, এরা শান্তশিষ্ট ছেলে।
‘ড্যাম্ আদমী’ ব’লে সাহেব চেয়ে রাঙ্গা চোখে,
শীকারভ্রষ্ট বাঘের মত ফিরে মনের দুঃখে।
চারিদিকে উঠে ‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনি ;
ডুকরে কেঁদে রঘু বলে, “হায় কি পাপী আমি।”

*        *        *        *        *        *

এমনি ধারা কত রঘু ভূতের ভয়ে ছুটে,
ভুত তাড়াতে গিয়ে শেষে ভূতের পায়ে লুটে।

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর