হৃদয়-মন্দিরে,          গেঁথেছি আদরে,
যত্নে তাঁর যত গুণ,
সে সব পাসরি',          থাকিব কি করি',
সর্ব গুণে সে নিপুণ |

লুব্ ধ, মুগ্ধ, প্রেমে,          হয়েছিনু ভ্রমে,
কত আশা ছিল মনে!
এতই কেন লো,         সই মন্দ হ'ল
অভাগীর ভাগ্যগুণে?

সাক্ষাতে সবার,               দুখের বিস্তার,
কিন্তু কারে'দুখ কই?
কা'র সাধ্য পারে,          সান্ত্বনিতে মোরে,
ইহার ঔষধ কই?

যে আমারে সুখী             করেছিল সখি,
সে যদি সমুদ্র-পারে,
এ দুখ অনল                  নিবাইবে বল,
কে বা আছে এ সংসারে?

কহিব কাহায়,               সহি য়ে একাই,
দুখ-শর-বরিষণ,
সুহৃদ কে আছে?      আনি তা'রে কাছে,
দিবে মোর প্রাণদান |

বধিতে এ প্রাণ,          হইয়াছে পণ
সুদৃঢ়, নিশ্চয় তাঁর,
সফল সে পণ          হ'ক নিবারণ
হবে মম দুখ-ভার |

*************************
                   ---"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া

.                                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
(৩)
স্হানান্তরে মুখশশী
তব, বিরলেতে বসি
ভাবিতাম, দিবা নিশি
সখি তুমি মম তরে
ভাবিতে কি সেই মত, দুখ-মগ্ন অন্তরে?
(৪)
কেন সখি, মনোমত
হয়েছিলে মম এত
বলনা ; নহিলে চিত
কভু এত ভাবিত না ;
একাধারে এত গুণ ধরে কত ললনা?
(৫)
মনে সদা ইচ্ছা করে
রাখি কণ্ঠহার কোরে,
দিবানিশি হেরি তোরে,
কিন্তু তাহা হইল না
ইহাতেই স্ত্রৈণ বলি', লোকে দেয় গঞ্জনা |
(৬)
রহিলে তোমার সনে,
কত সুখ শান্তি মনে,
আনন্দ-লহরী, ঘনে
ঘনে উঠে উথলিয়া
সব প্রলোভন হতে সুখ, কাছে থাকিয়া |
(৭)
যৌবনে আছিলে নারী,
এবে তুমি সর্বেশ্বরী,
মাতৃভাব অধিকারী
হইলে যে ক্রমে ক্রমে,
সহায় আমার তুমি, এই ধরণী-ধামে |
(৮)
গৃহলক্ষ্মী পূর্ণশশী,
কখন বা হও দাসী,
প্রকৃত বন্ধু প্রেয়সী
হও হে তুমি আমার,
পরামর্শে মন্ত্রী তুমি, জীবনের আধার |
(৯)
তোমারে ছাড়িয়া যাই,
এমন বাসনা নাই,
কি করি, যাইতে চাই
সংসার-তীব্র তাড়নে,
শ্রম দুঃখ বিনা অর্থ, নাহি মিলে ভূবনে |
(১০)
সখি! করমের তরে,
ছাড়ি যবে যাই দূরে,
রহ তুমি এ অন্তরে,
দিনে সে মুরতি দেখি,
তব বাক্য শুনিহে স্বপনে, অমিয়মুখি!

*************************
                      ---"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া

.                                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
আসি' গুণমণি,          প্রফুল্লিত মনে,
আর কি আমায় লবে?
সে হ'ল সাহেব,          আমি যে বাঙ্গালি,
আর কি লো আছে আশা?
লয়ে ইংরাজিনী,          করিবে সঙ্গিনী,
ভুলে যাবে ভালবাসা!
না ভুলেছে যদি,          দেখ সে অবধি,
না লয় সংবাদ কেন!
আমার বিরহে,          কাতর সে নহে,
মনে জ্ঞান হয় হেন |
তাঁহার বিচ্ছেদ,          হৃদি করে ভেদ,
জ্বালা আর সহি কত?
মনে ইচ্ছা হয়,          নদী-তীরে যাই,
গিয়া হই জলগত |
দেখিলে লো জল,          যাতনা অনল,
বাড়ায়ে দ্বিগুণ করে ;
জল যে জীবন,          জ্বালাতন কেন,
করে মম জীবন রে?
যার লাগি দুখ,          সেই জন মুখ,
পানে যদি নাহি চায়,
তবে কেন বল,          উন্মত্ত বিকল,
হ'য়ে মন তাঁরে চায়?
প্রেমপান আশে,          হৃদয় আকাশে,
রাখিনু যতনে শশী,
রাহু নানা ফাঁদে,          হরিল সে চাঁদে,
চাতুরি করিয়া পশি' |

*************************

.                                                                                            
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
*
*
ফুটন্ত গোলাপ ফুল হয় যে সময়,
যেন কত লজ্জা-ভরে,               মুখখানি হেঁট করে,
একটি একটি করে খোলে দলচয় ;
ভয়ে যেন ঘোমটা খোলে,     পাছে কেহ দেখে ফেলে,
লজ্জা-ভরে মৃদু হেসে আড়ে যেন চায়,
লজ্জা-মাখা মুখখানি নত করে রয় |

সকল ফুলের শ্রেষ্ঠ সৌরভ উহার,
এত যে সুগন্ধ ধরে,              তবু না ছড়ায় দূরে,
নিকটে রইলে ঘ্রাণ যেন সুধাধার,
সুশীতল সুমধুর গন্ধ কিবা তার!

শুখালেও নাহি যায় গোলাপের গন্ধ ;
মৃদু মৃদু কি শীতল,              সুগন্ধ গোলাপ জল,
গোলাপ আতরে কিবা বাস মৃদু মন্দ!
গোলাপ আতরে কত,          সৌরভ অপরিমিত,
ধুইলেও বহুকালে  না যায় সে গন্ধ,
সে আতরে মানবের কতই আনন্দ!

পুত্রবতী সাধ্বী সতী নারী যদি মরে,
মরিয়া সে নহে মৃতা,          সতত থাকে জীবিতা,
তার নাম চির কাল থাকয়ে সংসারে ;
সেইরূপ গোলাপের গুণে মুগ্ধ নরে |

এতেক সদগুণ যেবা ধরে একাধারে
তার (ও) এবে হায় হায়!         বয়সে আদর যায়,
বাসি হ'লে কেহ নাহি ছোঁয় গোলাপেরে ;
অভিমানে পাতাগুলি যায় সব ঝরে |

কেহ আর ফিরে নাহি করে দরশন,
যৌবন গিয়াছে হায়,         নিঃশব্দে  ঝরিয়া যায়,
এ সময় কেবা আর করে সম্ভাষণ?
যৌবন হয়েছে গত,              তবুও সৌন্দর্য কত!
ঝরে পড়ে তবু নাহি মলিন বদন ;
সুন্দর গোলাপ ফুল নয়ন-রঞ্জন |

*************************
                 ---"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া

.                                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিরাশা
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়
২০১০ সালে প্রকাশিত অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত "বাংলা গীতিকবিতা উনিশ
শতক" কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া।

"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া।


আশার বিষম শত্রু তুই রে নিরাশা।
মানুষের হৃদে আসি’ পশিলে সহসা,
বিপরীত গুণ ধর,                                    সকল (ই) বিনাশ কর,
মন ব্যাকুলিত কর, ভাঙ্গিয়া ভরসা,
আশার বিষম শত্রু তুই রে নিরাশা।
মনে কত আশা করে,                                বাঁচে লোক এ সংসারে,
তুমি শত্রুরূপ ধরে ঘটাও ঘটাও দুর্দশা,
মুহূর্তে ঘুচাও আশ, সকল পিপাসা ;
ক্ষীণপ্রাণে আশা হয়,                                     এ জগতে একাশ্রয়,
তুমি সমাগত হয়ে নাশ এ ভরসা,
কাঁপয়ে হৃদয় যন্ত্র শুনি’ তোর ভাষা ;
শুনিয়ে আশার বাক্য,                                রোপয়ে লোকেতে বৃক্ষ,
সে বৃক্ষ কচাক্ষে তব নাশে রে হতাশা,
কাঁপয়ে হৃদয় যন্ত্র শুনি’ তোর ভাষা।


তব কটুভাষ, শর সম অতি খর,
মানব-হৃদয় বিঁধি করে জর জর,
আশায় আকাশে তুলে,                                তুই যে ভাসাস জলে,
হেরিলে তোমায় সবে কাঁপে থর থর,
তব কটুভাষ, শর সম অতি খর।
হৃদয়ে আনন্দ দেখে,                                  উঁকি মার দূরে থেকে,
সদা ব্যস্ত কিসে সবে করিবে কাতর,
মনকে দুর্বল কর তুমি রে পামর।
আশার আলোকে যদি,                                আলোকিত হয় হৃদি,
তুমি যে হিংস্রক কভু, সহিতে না পার,
বিষম তিমিরে আনি কর অন্ধকার।
আশায় উচ্চেতে তুলে,                                ফেল তুমি অধস্তলে,
বল, বুদ্ধি রসাতলে দিস রে সত্বর,
সদা ব্যস্ত কিসে সবে করিবে কাতর॥


অতি নিরদয় তুই, নিরাশা দুরন্ত,
তোর ভয়ে বলহীন যত বলবন্ত ;
ফকীরের গৃহে যবে,                                    বঙ্গের শেষ নবাবে,
ধরিল, নাশিব বলি’ শেষ সৈনিক দুর্দান্ত ;
সবল সিরাজ হ’ল নিরাশায় ভ্রান্ত,
নবাবের হৃদি ’পরে,                                আঘাতিলি বারে বারে,
দহিবি তাহায় যেন অনল জ্বলন্ত
তুইরে নিষ্ঠুর অতি নিরাশা দুরন্ত।
যে সময়ে কারাগারে,                                বন্দী করি’ রাখে বীরে,
নিরাশ ঝটিকা করে তাহাদের ক্লান্ত,
কিছুতে তোমার বেগ নাহি হয় ক্ষান্ত।
লয়ে তীক্ষ্ণ তরবার,                                   সংঘাতক দুরাচার,
বধ করে লয়ে যায় বধ্যভূমি-প্রান্ত,
পূরাও তাদের প্রাণ নিরাশে নিতান্ত ;
বলহীন কর তুমি যত বলবন্ত।


নিরাশ পঙ্কেতে পড়ি’ হাবুডুবু খাই,
নিরাশ অপেক্ষা রিপু আর কিছু নাই ;
ভাবে লোকে আশাভরে,                                পরকাল আছে পরে,
সত্কার্য করিলে তথা সুখরাশি পাই,
নিরাশা সে আশে আসি’ চাপা দেয় ছাই ;
নিরাশা নীরবে বলে,                                   কেন ভাব পরকালে,
ধরা-ই নরক, স্বর্গ, পরকাল নাই ;
নিরাশে পড়িয়া তাই হাবুডুবু খাই।
যদি দংশে কালফণী,                                    বিষজরে ক্ষীণপ্রাণী,
যতন করিলে তারও ঔষধ বা পাই,
শমন আনন হতে, তাহারে বাঁচাই ;
কিন্তু যদি একবার,                                    দংশায় নিরাশা কাল,
কিছুতে তাহার বিশ্বে, আর রক্ষা নাই,
ফণীর অধিক ভয়, নিরাশাতে পাই।
উচ্চ হবে আশা করে,                                উঠি আশা খুঁটি ধরে,
নিরাশা প্রস্তরাঘাতে অমনি লুটাই,
নিরাশার চেয়ে শত্রু আর কেহ নাই।

*************************

.                                                                                             
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
১লা বৈশাখ ১৩৬৬ (১৫ই এপ্রিল ১৯৫৯) তে প্রকাশিত শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত "উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা সংকলন" কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া।
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়
১লা বৈশাখ ১৩৬৬ (১৫ই এপ্রিল ১৯৫৯) তে প্রকাশিত শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত "উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা সংকলন" কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া।
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়
১লা বৈশাখ ১৩৬৬ (১৫ই এপ্রিল ১৯৫৯) তে প্রকাশিত শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত "উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা সংকলন" কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া।
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়
১লা বৈশাখ ১৩৬৬ (১৫ই এপ্রিল ১৯৫৯) তে প্রকাশিত শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত "উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা সংকলন" কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া।
প্রিয়তমে!
মিলনে
*
বাঙ্গালির বাবু
কবি মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়
আমরা এই কবিতাটি পেয়েছি ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত, মন্মথনাথ ঘোষ সম্পাদিত
“হেমচন্দ্র” ২য় খণ্ড, পঞ্চম পরিচ্ছেদ, “কবিতাবলী” দ্বিতীয় ভাগ থেকে
। এই কবিতাটি কবি হেমচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায়ের
লেখা “বাঙ্গালীর মেয়ে” কবিতার পালটা জবাব! কবি হেমচন্দ্রের লেখা "বাঙ্গালীর মেয়ে"
কবিতাটি এর নীচেই দেওয়া হয়েছে।

১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত, মন্মথনাথ ঘোষ সম্পাদিত “হেমচন্দ্র” ২য় খণ্ড, পঞ্চম পরিচ্ছেদ,
“কবিতাবলী” দ্বিতীয় ভাগ থেকে নেওয়া, ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদক সঞ্জীচন্দ্রের সম্পাদকীয়ের
অংশবিশেষ :---
“সকলেই জানেন, বাঙ্গালায় সাহিত্যসংগ্রামক্ষেত্রে, বাবু হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অদ্বিতীয় মহারথী। তাঁহার
প্রতি শরসন্ধানে সাহস করে বাঙ্গালার পুরুষ লেখকদিগের মধ্যে এমন শূর বীর কেহ নাই। তাঁহার প্রণীত
‘বাঙ্গালীর মেয়ে’ নামক কবিতার জ্বালায়, অনেক ‘বাঙ্গালীর মেয়ে’ আজিও কাতর। আজি সেই আঘাতের
প্রতিশোধের জন্য এই কাব্যবীরাঙ্গনা বদ্ধপরিকর---ধৃতাস্ত্র। হেমচন্দ্রের ঐ (বাঙ্গালীর মেয়ে) কবিতার উত্তরে
মোক্ষদায়িনী বাঙ্গালির বাবু শিরোনামে একটি কবিতা লিখিয়াছেন। কবিতাটি বড় রঙদার---লেখিকার
লিপিশক্তিপরিচায়িকা---আদ্যোপান্ত পাঠের যোগ্য। আমকা এ কবিতাটী কিছু বাদ দিয়া প্রায় সমস্ত উদ্ধৃত
করিলাম --- গ্রন্থকর্ত্রী আমাদের এ অপরাধ মার্জ্জনা করিবেন :---”

বাঙ্গালির বাবু----

কে নায় কে খায় অই, করে দড়বড়ি,
বাঙ্গালীর বাবু! হায় বড় তাড়াতাড়ি ;
সাহেব করিবে রাগ, বেলা হলে যেতে,
তাই এত তাড়াতাড়ি নাইতে খাইতে।
চারকান পেন্টালুনে পোষাকের ঘটা,
শিরে শোভে শোলা পাক্ড়ী, শাল দিয়ে আঁটা ;
চেঙারির মত দৃশ্য কিবা চমত্কার!
দিতে কিছু দেরী হলে করেন চীত্কার ;
সে সময় ছেলে যদি বাবা বলে ডাকে
মারিতে উদ্যত হয়ে খিঁচয়ে যান তাকে।
তাড়াতাড়ি করে অন্য সব কর্ম্ম হয়,
তামাক টানিতে থাকে যথেষ্ট সময়,
টানিতে টানিতে ধূম, দয়া হলে মনে
শিশুরে সান্ত্বনা করা উচ্ছিষ্ট পানে।
গাড়ি ভাড়া পাঁচ পয়সা, চলতে হন কাবু,
হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু।

হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু!
দশটা হতে চারটাবধি দাস্যবৃত্তি করা
সারাদিন বইতে হয় দাসত্ব পশরা।
উকীল, ডেপুটী কেহ, কেহ বা মাস্টার,
সবজজ, কেরাণী কেহ, ওভারসিয়ার,
বড় কর্ম্ম বড় মান, অহঙ্কার কত
ধরারে দেখেন বাবু সরাখানা মত।
সারাদিন খেটে খেটে রক্ত উঠে মুখে
পেগের বড়াই হয় ঘরে এসে সুখে।
বড় কর্ম্ম করি ভেবে, দেমাকে অজ্ঞান,
এদিকে সাহেব দেখে, হৃদি কম্পমান,
সাহেব দেখে মান্য করা, ইংরাজি বুলি,
হদ্দ হলো নিজ ভাষে দেন তারে গালি ;
শিখিয়া ইংরাজি ভাষা বড় অহঙ্কার,
তাড়াতাড়ি যান দিতে ইংরাজি লেকচার,
কহিতে ইংরাজি বুলি খান হাবু ডুবু,
শুনে যা, ইংরেজি কয়, বাঙ্গালীর বাবু।

হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু!
খোলা হয় ধরাচুড়া গোলামির ভার,
ঘরে এলে খোলা গায়ে চটিতে বাহার ;
পরিধান থান ফাড়া চাকর কোঁচানে,
সিলিপার কারু পায়ে চটি ঠন্ ঠনে।
আয়েস তামাক পানে, তাকিয়া হেলন,
হুঁকা নল মুখে দিলে স্বর্গে আরোহণ।
বৈঠকখানা গুলজার, হাসির ধমকে ;
পাপোশেতে থুতু ফেলা, পিকদানি সম্মুখে।
নাহি কোন ধর্ম্মচর্চ্চা, শুয়ে গীত গান
মধ্যে মধ্যে হুঙ্কারেন ‘পান তামাক আন।’
সম্মুখের সেজের আলো, ভ্যারাণ্ডার তেলে
মর্দ্দানি ফলান হয় মূর্খ এলে।
ইয়ার এলে খেলা হয়, দাবা কিম্বা গ্রাবু,
হায় হায় অই বোসেয় বাঙ্গালির বাবু।

*        *        *        *        *

হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু!
ছড়ি হাতে, সুজ পায়ে, মুখেতে চুরোট,
কাহারো সাহেবি চাল পরা হ্যাট কোট,

*        *        *        *        *

ফরশা হতে বড় সাধ সাবাং মাখা কোসে,
উঠে যায় ছাল চামড়া, তোয়ালেতে ঘোসে।
সোজা সিঁতে কাটা চুল, আলবার্ট ফ্যাশান,
সেণ্ট মেখে গন্ধ গোকুল, হন মূর্ত্তিমান।

*        *        *        *        *

নাটক দেখিতে সাধ সখে ভরা প্রাণ,
মুচকে মুচকে হাসিটুকু, গালে ভরা পান ;
একসেণ্ট এনকোরে যেন ছাড়ে বৃষ নাদ,
ধুম টেনে দম রাখা দোকানি প্রসাদ।
ঋণে মাথা ডুবে আছে, সখে মত্ত তবু
হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর বাবু।

যিনি নাহি মদ খান তাঁর অহঙ্কার
বুঝি বা যে করিলাম ভারত উদ্ধার,
নাম লিখায়ে ব্রাহ্ম হন, ধর্ম্মগজে পেটে,
দোরানি পশারি তাক বক্তৃতার চোটে।
স্বাধীন করিতে নারী হন ব্রহ্মজ্ঞানী,
আনেন বাহির করি কুলের কামিনী ;
মদ্যপায়ী মদ খেয়ে খুলে দেয় মন
ভারত উদ্ধার হেতু হয় আস্ফালন।
কথা কন খই, মুড়কী, ইংরাজী, বাঙালী
মন খুলে ইংরেজেরে দেন গালাগালি।
লীলাখেলা বাবুদের যত রাত্রিকালে
মুখ বুজে ভদ্র হন সকাল হইলে।

.      *************************

.                                                                                             
সূচীতে . . .     

বাঙ্গালীর মেয়ে
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন শর্ম্মা সংকলিত ও সম্পাদিত “হেমচন্দ্র গ্রন্থাবলী” (১৮৬৪) অন্তর্গত “বিবিধ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। এই কবিতাটির উত্তরে মোক্ষদায়িনী দেবী "বাঙ্গালীর বাবু" কবিতাটি রচনা করেন।

কে যায় কে যায় অই উঁকি ঝুঁকি চেয়ে?
হাতে বালা, পায়ে মল, কাঁকালেতে গোট,
তাম্বুলে তামাকু রস---রাঙা রাঙা ঠোঁট,
@@লে টিপের ফোঁটা, খোঁপা বাধা চুল,
@@তে রসনা ভরা---গালে ভরা গুল,
@@@হারি কিবা সাটী দুকূলে বাহার,
@@পেড়ে শান্তিপুরে কল্মে চুড়িদার,
অহঙ্কারে ফেটে পড়ে, চলে যেন ধেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
মুখের সাপটে দড়, বিপদে অজ্ঞান,
কোঁদলে ঝড়ের আগে, কথায় তুফান,
বেহদ্দ সুখের সাধ---পা ছড়ায়ে বসা,
আঁচলের খুঁট্টি তুলে অমঙ্গলা ঘষা!

নমস্কার তাঁর পায়ে---পাড়ায় বেড়ানী
পেট্টিভরা কুঁজড়ো কথা, পরনিন্দা গ্লানি।
কথায় আকাশে তোলে, হাতে দেয় চাঁদ,
যার খায়, যার পরে, তারি নিন্দাবাদ,
রসনা কলের গাড়ি চলে রাত্রি দিন,
ঘাড়েতে পড়েন যার---বিপদ সঙ্গীন,
খেয়ে যান, নিয়ে যান, আর যান চেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
ধারাপাতে মূর্ত্তিমান, চারুপাঠ পড়া,
পেটের ভিতরে গজে দাসুরায়ী ছড়া!
চিত্রকাজে চিত্রগুপ্ত---পীঁড়িতে আল্পনা!
হদ্দ বাহাদুরি---“@রি”, বিচিত্র কারখানা!
অঙ্কশাস্ত্রে---বররুচি, গ্যালিলো নিউটান,
গণ্ডা কড়ি গুন্তে হ’লে জানের বাড়ি যান ;
পাত্তাড়ে পড়োর মত অক্ষরের ছাঁদ,
কলাপাতে না এগুতে গ্রন্থ লেখা সাধ!
ক্ষীরপুলি, পায়েস, পীঠা, মিষ্টান্নের সীমা
বলিহারি বঙ্গনারী তোমার মহিমা!
জলো দুধে পুষ্টদেহ তেলে জলে নেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
সমুখে দুধের কড়া---কাটীতে ঘোটন,
খোলা চুলে চুলো জ্বেলে ধোঁয়াতে ক্রন্দন!
তপ্ত ভাতে ভরা হাঁড়ী বেড়ী ধরে তোলা,
মদ্গুর মৎস্যের ঝোলে ধনে বাঁটা গোলা,
খাড়া বাড়ী শাক্ পাতাড়ে বিলক্ষণ টান,
কালিয়ে কাবাব্ রেঁধে দেমাকে অজ্ঞান!
শাঁখেতে পাড়িতে ফুঁক চূড়ান্ত নিপুণ,
হুলুধ্বনি কোলাহলে চতুর্ম্মুখ খুন!
রান্নাঘরে হাওয়া খাওয়া, গাড়ি মুদে যাওয়া
দেশশুদ্ধ লোকের মাঝে গঙ্গাঘটে নাওয়া!
বাসর-ঘরে ঝুমুর কবি চখের মাথা খেয়ে,
প্রভাত হ’লে পিস্ শাশুড়ী ঘোমটা মুখে চেয়ে,

সাবাস্ সাবাস্ তোরে বাঙালীর মেয়ে!
ব্রতকথা, উপকথা, সেঁজুতি পালন,
কালীঘাটে যেতে পেলে স্বর্গে আরোহণ!
মেয়ে ছেলের বিয়ে পর্ব্বে গাজনের গোল,
যাত্রা সঙ্গে নিদ্রা ত্যাগ---ছেলে ভরা কোল,
ভূত পেরেতে দিনে ভয় অন্ধকারে কাঠ,
শক্ত রোগে রোজা ডাকা, স্বস্ত্যয়ন পাঠ,
তীর্থস্থানে পা পড়িলে আহ্লাদে পুঁতুল,
হাট বাজারে লজ্জা হীনা, ঘরে কুঁড়িফুল!
গুঁড়িকাষ্ঠ, নুড়িশিলা, ভক্তিপথে নেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
রসের মরাল যেন জলটুকু ছেড়ে।
দুধটুকু টেনে নেন আগে গিয়া তেড়ে,
চিনের পুতুলে সাধ, রাক্স টেনে পেটা!
“ব়্যাফেল” বাঁধা ছবিগুলি ঘরে দোরে সাঁটা!
খেলায় দিগ্গজ কেঁয়ে, চোরের সদ্দার,
লুকোচুরি যমের বাড়ি---স্পষ্ট করে ঠার!
আয়েস খালি খোঁপা বাঁধা, নয় বিননো ঝারা,
হদ্দ হলো কচি ছেলে টেনে এনে মারা!
কার্পেটে কারচুপি কাজ কারু নব্য চাল,
ঘরকন্নায় জলাঞ্জলি ভাত রাঁধতে ডাল!
নিজে ঘাটে, অন্যে দোষে, মুখসাপটে দড়,
হুজ্জুতে হারিলে কেঁদে পাড়া করে জড় ;
বাঙালী মেয়ের গুণ কে ফুরাবে গেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে---
মৃদু মৃদু হাসিটুকু অধরে রঞ্জন,
সাবাস্ সাবাস্ নাক চোখের গড়ন ;
কালো চুল কিবা ঘটা, চোখে কাল তারা,
দেখে নাই যারা কভু দেখে যাক্ তারা!
ভাসা ভাসা খাসা চোখ তুলি দিয়ে আঁকা,
তা উপরি কিবা সরু ভূরুযুগ আঁকা!
থমকে থমকে থির গতি কি সুন্দর,
হাসি হাসি মুখখানি কিবা মনোহর!
আহা আহা লজ্জা যেন গায়ে ফুটে আছে---
কোথা লজ্জাবতী তুই এ লতার কাছে ?
চক্ষু যদি থাকে কারো তবে দেখ চেয়ে---
হায় হায় অই যায় বাঙালীর মেয়ে!

.      *************************

@@@@@ - আমাদের কাছে যেসব গ্রন্থ রয়েছে তাতে এই অক্ষরগুলি অপাঠ্য।


.                                                                                             
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর