নবীনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
সরস্বতী-পুজা
[ "ভূবনমোহিনী প্রতিভা" (২য় ভাগ, ১৮৭৭) থেকে নেওয়া ]



                     ১
কবি-কুঞ্জবনে তুলিতে কুসুম
     কে যাবি রে সাথে আয়,
     যদি জুড়াবি তাপিত প্রাণ |
শোক, তাপ, জরা, যন্ত্রণা তথায়
     অনায়াসে ভুলা যায় ;
     ভবে সেই মাত্র সুখ-স্থান!


                     ২
দেবতা-বাঞ্ছিত ত্রিদীব আলয়
     কতই বা শোভা ধ'রে?
     সে'ত কপোলকল্পিত কথা |
কবি-হৃদ-কুঞ্জ অকল্পিত স্বর্গ
     দেখগে অবনী 'পরে,
     আহা, সকলি সুন্দর তথা!


                     ৩
কোথা পারিজাত দেবের পীযুষ,
     ইন্দ্রের অমরাবতী,
     তা'কি দেখেছ কখনও চোখে?
ভ্রান্ত মানবের সুখতৃষ্ণা হেতু
     বাসনা প্রবল অতি,
     তাই স্বরগ স্বপনে দেখে |


                     ৪
কত উচ্চ স্থানে আছে সে স্বরগ,---
     স্বরগই কত দূর?
     স্বর্গ কোথায় আছে কে জানে?
কবি-হৃদ-স্বর্গ সীমা-শূণ্য রাজ্য
     জীবন্ত অমরাপুর
     অতি পবিত্র উন্নত স্থানে |


                     ৫
থাকে যদি সুধা, থাকে পারিজাত,
     ইন্দ্রের অমরাবতী,
     তবে আছে তা' কবির হৃদে |
থাকে যদি সুখ, শান্তি, স্বাধীনতা,
     পবিত্র ভকতি, প্রীতি,
     তবে আছে তা কবির হৃদে |


                     ৬
কবি-কুঞ্জবনে জীবন্ত নন্দন
     স্বর্গাদপি গরীয়সী ;
     আমি কি দিব তুলনা আর?
বৃক্ষে মোক্ষ ফলে, ফুলে সুধা গলে,
     পত্রে শান্তি ছায়ারাশি,
     মূলে ভক্তি-প্রেম-ধারা তা'র |


                     ৭
অনন্ত-প্রসর বিবেক-প্রান্তর
     প্রেমের পরিখা-বেড়া,
     তাহে অমৃত-প্রবাহ বহে |
( মাঝে ) অতি মনোহর শান্তি-সরোবর,
     মোক্ষ-বৃক্ষ, বল্লী-বেড়া,
     চরে চৈতন্য-সারস তাহে |


                     ৮
শ্বেত স্বচ্ছ-দল জ্ঞানের কমল
     প্রস্ফুটিত সারি সারি,
     তাহে প্রীতি-মকরন্দ ক্ষরে |
মনোভৃঙ্গ তায় মত্ত, মধু খায়
     ফুলে ফুলে সবে উড়ি' ;
     সুখ-প্রমত্ত ঝঙ্কার ছাড়ে |


                     ৯
কুঞ্জ-চারি-তীরে, বৃক্ষ চারিধারে
     ফলপুষ্প-পত্রে নত,
     চির অশুষ্ক অচ্যুত তাহা |
সুযশ-সমীরে সুগন্ধ বিতরে,
     বিশ্ব তাহে আমোদিত,
     সুখ কিরূপে প্রকাশি, আহা!


                     ১০
নিকুঞ্জ-কুটিরে কল্পনা কুহরে,
     প্রতিভা-পাপিয়া গায়,
     স্বরে অমিয়-লহরী উঠে |
অবনী মোহিয়া আকাশ শব্দিয়া
     উচ্ছাস উঠিয়া তায়,
     স্বর অম্বর ভেদিয়া ছুটে!


                     ১১
সরসীর কূলে লতাকুঞ্জ-তলে
     ভাবুক-প্রেমিকচয়,
     বসি পুলক-পূর্ণিত প্রাণে,
কাব্য-কুন্দ-ফুলে মালা গাঁথি গলে
     পরিছে মাধুরীময়,
     কিবা গায় মধুমত্ত মনে!


                     ১২
পুষ্প-মকরন্দ পরাগ সুগন্ধ
     রসাল পীযূষ ফল,
     সব যদৃচ্ছা ভুঞ্জিছে সুখে |
ইচ্ছা যার যাহা, লভি'ছে সে তাহা,
     না চাহি যতন বল,
     কবি-কল্পবৃক্ষতলে থেকে |


                     ১৩
কিসের অভাব? কিসের অসুখ?
     যা চাহ তা মিলে তথা |
     তথা অনন্ত ঐশ্বর্যরাশি!
তথায় যা নাই, ব্রহ্মাণ্ডে তা নাই,
     আর কি কহিব কথা,
     সুখ উথলিছে দিবানিশি!


                     ১৪
মণিময় খাতে প্রেমধারা-পাতে
     বহে নদী চতুষ্টয়,
     নাম, ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ |
অনন্ত প্রবাহে নিত্য নদী বহে,
     কে জানে কোথায় যায় |
     তীরে দেব নর যক্ষ রক্ষ |


                     ১৫
বসি' পরপারে যেতে ইচ্ছা করে
     যাইতে পারে না কেহ,
     পারী জমে না সময় মাঝে |
কালের আশ্বাসে আছে তা'রা বসে',
     যায় নিশা, আসে অহঃ,
     নিত্য সাক্ষী রাখি' প্রাতঃ-সাঁজে |


                     ১৬
আজি শুভ দিন সর্গ মর্ত্য জুড়ি'
     আনন্দ-উন্মত্ত সবে,
     ভবে বসন্ত-পঞ্চমী-তিথি |
দেব নর যক্ষ রক্ষ গন্ধর্বাদি
     জয় জয় জয় রবে
     গায় জ্ঞানদা ব্রহ্মাণী-স্তুতি |


                     ১৭
শান্তি-সরোবরে জ্ঞানাম্বুজ 'পরে
     জ্ঞান-রাজ-রাজেশ্বরী,
     সঙ্গে বিদ্যা বুদ্ধি সখীদ্বয়
বিহরে, অধরে হাস্যসুধা ক্ষরে,
     করে বীণা, আহা মরি,
     রূপে ত্রিভূবন তনময়!


                     ১৮
বাল্মীকি, ব্যাসাদি, বাণ, ভবভূতি,
     ভারবি, শ্রীহর্ষ কবি,
     তথা কালিদাস মহামতি
ল'য়ে কাব্য-পুষ্পহার পুষ্পাঞ্জলি মা'র
     পাদপদ্ম' পরি' সঁপি
     কিবা গাইছে সুস্বরে স্তুতি |


                     ১৯
দুঃখী বঙ্গ কবি কোথায় কি পা'বে?
     দারিদ্র্য সম্বল সার,
     আর কি আছে?---কি দিয়া পূজে?
অন্ধ খঞ্জাতুর বধির যে জাতি,
     স্কন্ধেতে দাসত্ব-ভার,
     গৃহে দুর্দশা-দুন্দুভি বাজে!


                     ২০
তা'রা কভু পারে ষোড়শোপচারে
     জ্যেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ পুত্রসম,
     হ্যা মা! পূজিতে ও পদতল?
পূর্ণব্রহ্মময়ি কৃপাময়ি অম্ব!
     জগদম্বা তুমি সত্য,
     তুমি একমাত্র আশা-স্থল |


                     ২১
প্রসন্নে! বরদে! জ্ঞানদে! মোক্ষদে!
      দে মা, পদ দুটি হৃদে,
      আমি একান্তে ধরেছি তোরে |
গাঢ় মন প্রাণে প্রেমাশ্রু-চন্দনে
      চর্চি জ্ঞান-পুষ্প পদে
      যেন দিতে পারি প্রাণ ভ'রে |

.               ****************    

.                                          
                                        সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শৈশব স্বপন
[ "ভূবনমোহিনী প্রতিভা" (১ম ভাগ, ১৮৭৫) থেকে নেওয়া ]




আজ কেন অকস্মাৎ
সুদূর শৈশবস্বপ্ন হইল স্মরণ?
দারিদ্র্য অনল যার,                     হৃদে জ্বলে অনিবার,
সংসারে কার্যশ্রমে ক্লান্ত অনুক্ষণ!
ভয়ঙ্কর ঋণদায়,                        প্রতিবাসী শত্রু তায়,
অস্থির উন্মত্ত প্রায় হয়েছে যেজন!
সে কেন দেখিল স্বর্গ সুখের স্বপন?



বহুদিন ঘন ঘটা,
দুর্যোগী গগন আর আঁধার ধরণী,---
যে জন দেখেছে হায়!                    ক্ষণস্থায়ী চপলায়,
কি সুখ? তাহার মাত্র ধাঁধে আঁখিমণি ;
যে পথিক্ দিক্ ভ্রমে,                     নিদারুণ পথশ্রমে
প্রান্তরেতে ক্লান্ত, তাহে তমিস্রা রজনী,
আলেয়া প্রতারে তারে কেন তা না জানি!



হায়! সে সুখের দিন
সময় সাগর গর্ভে হয়েছে মগন |
নাই সে অবস্থা আর,                   সেই সঙ্গী খেলিবার,
নাই জননীর কোল---স্বর্গ-সিংহাসন!
বসন্ত কুসুমরাশি,                          শরতের পূর্ণশশী,
মলয়ার বায়ু, গঙ্গাজল সম মন
ছিল যে পবিত্র, এবে চিন্তার ভবন!



দুঃখাঘাত প্রতিঘাতে---
নহে তা কোমল কিশলয় সম আর!
নহে ত পাষাণ মত,                 তা হলে ফাটিয়া যেত,
কি জানি কেমন তবে অন্তর আমার!
হৃদয়! কিসের তরে,                    বিষাদ সাগর নীরে,
ঢেলেছে পবিত্র মূর্তি তুমি আপনার?
ভোগতৃষ্ণা, অবিতৃপ্তি আছে কি তোমার?



তাও নাই, তবে কেন---
যে সংসার ছিল মোর প্রমোদ উদ্যান,
ছিল শান্তি সুখ ধাম,                  এবো তার পরিণাম,
শ্বাপদ সঙ্কুল ভীম গহন সমান?
হৃদয়ের প্রিয়তর,                        নয়নের প্রীতিকর,
কুসুমিত লতাকুঞ্জ ফলে নম্রমান
ছিল, তাও এবে বিষবল্লরী বিতান?


.   ****************    

.                                                         
                               সূচীতে . . .   

মিলনসাগর