কবি নরেন্দ্র দেব-এর কবিতা
*
আকাশ প্রদীপ  
কবি নরেন্দ্র দেব
১৯৯১ সালে প্রকাশিত সুকুমার সেন সম্পাদিত, "বাংলা কবিতা সমুচ্চয়" ১০০০-১৯৪১,
১ম খণ্ড থেকে নেওয়া।

কুহেলি-আচ্ছন্ন-ঘন শিশির সন্ধ্যার অন্ধকারে
কে যেন প্রসারি দীপ আকাশের নীহারিকা পারে
মেলিয়া সাগ্রহ দৃষ্টি অণ্বেষিছে কোথা শূণ্য-সীমা
সন্ধানে ব্যাকুল যেন নিঃশেষিয়া অনন্ত নীলিমা |
অনিমেষ প্রতীক্ষায় আছে চাহি ছায়া পথ পরে |
সময় গিয়েছে চলি ; কে যেন ফেরেনি ঘরে
গগহ গহন হতে ;
        তারায় তারায় সে কি তার
তুলিয়া প্রদীপখানি খুঁজিয়া ফিরিছে বারে বার
হারানো সে বন্ধুটিরে?
        বহু যুগ হয়েছে অতীত |
ঋতু-চক্র এল ঘুরে ; দূরে ওই আসে বৃদ্ধ শীত,
রজনী বাড়িয়া চলে বিদলিয়া স্বল্প-আয়ু দিনে ;
প্রভাতের অশ্রুকণা কাতরে লুটায় তৃণে তৃণে ;
কেঁপে ওঠে চ্যুত পত্রে অতি মৃদু পদশব্দ কার |
অরণ্য মর্মরে যেন রণি উঠি ধ্বনি বেদনার |
শরতের স্বর্ণ-আভা ঝলমলি কাঁপে যে লগনে
সদ্য ধৌত ধরণীর শ্যাম স্নিগ্ধ নির্মল প্রাঙ্গণে
অজস্র কাশের হাসি শুচি-শুভ্র ওঠে বিকশিয়া
নন্দিত আনন্দিত রসে নিখিলের বেদনার হিয়া |
শুধু তব অন্তরের অবরুদ্ধ পাষাণ মন্দিরে
নিঃসঙ্গ সমাধি কার তিতিয়া উঠেছে অশ্রুনীরে |
লোকে লোকে শুরু হল হেমন্তের হিম অভিযান,
স্পর্শে অকস্মাৎ --- উচকিত হয়ে ওঠে প্রাণ ---
তোমার মর্মের মাঝে |
        আকাশে প্রদীপ জ্বালি তাই,
গৃহবলভির চূড়ে তুলে ধরি ভাব যদি পাই ---
নক্ষত্র নগর পথে আচম্বিতে তাহার সন্ধান?

তোমার ও দীপশিখা দীপ্ত হয়ে করিবে আহ্বান
অখণ্ড আঁধারে তারে, কে তোমারে হেন আশা দিল --- |
খোঁজা কি করেছ শেষ --- সেথা তার যত দেশ ছিল |

.              ******************         
.                                                                                  
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
রসলক্ষ্মী   
কবি নরেন্দ্র দেব
১৯
৬২ সালে প্রকাশিত কবিশেখর কালিদাস রায় সম্পাদিত, "মাধুকরী" কাব্য সংকলন
থেকে নেওয়া।


.              ওগো ঊষার আলোকে হেসে,
কে তুমি আজি এ শিশির প্রভাতে দাঁড়ালে দুয়ারে এসে?
.              তোমারে কখনো দেখিনি ত আগে,
.              তবুও ও মুখ বড় চেনা লাগে ;
কী যেন অসীম স্নেহ অনুরাগে দেহ মন যায় ভেসে ;
দুয়ার আমার কে এলে গো আজ এমন দীপ্ত বেশে?

.              ওগো, তোমার চরণতলে,
আঙিনা আমার ভরি যে উঠিল ফুলে ফলে তৃণদলে |
.              মরি মরি দেবী, এ কি বিস্ময়!
.              নিমেষেই এসে করে নিলে জয়,
আমার কঠিন সুপ্ত হৃদয় না জানি এ কোন্ ছলে!
আঁধার মনের মন্দিরে আজ তোমারই প্রদীপ জ্বলে!

.              দেবী! অবাক এ আগমন,
বিশ্বের এই নিঃস্বেপ দ্বারে তোমার পদার্পণ!
.              হাসিতে যাহার সহাস্য দিক,
.              আঁখিতে উজল নবীন নিমিখ,
কোমল কণ্ঠে কূজে কোটি পিক চঞ্চল ত্রিভূবন ;
দীনের দুয়ারে দাঁড়ালে সে কোন নিখিল পূজিত ধন |

.              দেবী! তোমার করুণাকণা,---
যেন অযাচিত, আশার অতীত আনন্দ-মূর্ছনা |
.              জ্বেলে দিল প্রাণে এ কি অপরূপ
.              নব জীবনের সুগন্ধ ধূপ,
অমৃত সরস প্রতি রোমকূপ, যৌবন উন্মনা!
আমার চিত্তে নিত্য তোমার আরতি ও উপাসনা |   

.              ******************         
.                                                                                  
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার দেবীর দেউলের দ্বারে এ যুগের যত কবি    
কবি নরেন্দ্র দেব
এই কবিতাটি, আষাঢ় ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে (জুন ১৯৩১) প্রকাশিত, রবি রাধারাণী দেবী ও কবি
নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত "কাব্য দীপালি", ২য় সংস্করণ এর ভূমিকা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল!
এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে (এপ্রিল ১৯২৭)।


আমার দেবীর দেউলের দ্বারে এ যুগের যত কবি
এনেছে তাঁদের পূজার অর্ঘ্য --- যজ্ঞের হোম-হবি,
.       প্রতিভার যত উজ্জ্বল-শিখা,
.             কালের ফলকে অক্ষয়-লিখা
চলেছে আঁকিয়া কল্প-লোকের ছন্দ-রঙীন ছবি ---

তাদেরই ভাবের সাগর ছানিয়া মনের মানিক তুলি
গড়েছি আমার এই দীপালির দীপ্ত প্রদীপগুলি!
.        চিত্ত যাদের সবুজ সরস
.              যাদের তুলির তরল পরশ
স্বপন-পুরীর দখিন-দুয়ার জগতে দিয়াছে খুলি ---

আলোকে পুলকে ভূলোকে ঢালিয়া অলোক-অমৃত ধারা
বর্ত্তমানের-মর্ত্ত্য-মরুরে স্বর্গ করিল যারা
.         যাদের ছন্দ-বন্দনা-গীতে
.               জাগে উন্মদ আনন্দ চিতে
ভাব-বিহ্বল আবেশে অবশ নিখিল আত্মহারা ---

শত-বিস্মৃত-লুপ্ত-স্মৃতিরে জিয়াইয়া যারা তোলে,
যাদের আঁখির আগে অনুরাগে প্রকৃতি ঘোমটা খোলে,
.         অরূপে যাহারা দেয় নানা রূপ,
.               ভাব-শতদল-কমল-মধুপ ---
যাদের মেদুর-মৃদু গুঞ্জনে পরাণ উলসি দোলে ---

অখিল-মনের অনুভূতি মাঝে যাহারা জাগায় সাড়া
যাদের কণ্ঠ-নিঃসৃত-গীত বিশ্বেরে দেয় নাড়া,
.         যাদে মুরলী-সুর-মুর্চ্ছনা
.                মর্মরি 'তোলে মর্ম-বেদনা,
ধ্যান-লোক-পথে বন্দী-হৃদয় আনন্দে পায় ছাড়া ---

গেয়ে যায় যারা--- গত ---সমাগত --- অনাগতদের গান,
ত্রিকালদর্শী ত্রলোকস্পর্শি যাহাদের অবদান,
.          রচি 'অভিনব প্রকাশের ধারা
.                 মূকেরে মুখর করিয়াছে যারা
হতাশের বুকে তুলে দুরাশা নব-নব-কল-তান ---

অন্ধে দানিয়া আনন্দ-আলো, অকূলে মিলায়ে তীর
পাষাণেরও বুক চিরিয়া যাহারা বহায়েছে ক্ষীর-নীর
.          সেই যোগী-জন-অমৃত-মন্ত্র
.                 চির-তরুণের জীবন-তন্ত্র
দিয়াছে আজিকে উজলি 'আমার দীপ-শিখা আরতির!

দেবী-মন্দিরে ওই শোন উঠে তাহাদেরই কলরব,
জ্বলে দীপমালা --- রত্নাবলীর --- দীপালি মহোত্সব!
.          জ্বলে কৌস্তুভ-মণি মনোহর
.                  বৈদূর্য্যের জ্যোতি সুন্দর
শত বিচিত্র বরণ-বিভায় এপরূপে অনুভব!

ঝলকিছে কত মতি, মরকত, নীলার নিলাঞ্জন,
হিরণ্য-দ্যুতি, পান্না-প্রবাল, রজতাভা, কাঞ্চন,
.          শ্যাম-সেতারের চমকিছে সুর
.                   হাসে পোখ্ রাজ, গোমেদ মধুর,
ফিরোজার ফিকে রোসনাইটুকু, চূণী-মণি অগণন!
*         *         *        *
দেবীর ললাটে পরায়েছে যারা নবীন ঊষার টিপ,
চরণে দিয়েছে বকুল চম্পা, সজল কেতকী নীপ |
.           এই আরতির শতেক শিখায়
.                   কণ্ঠ তাদের শোন 'গো কি গায়?
জ্বেলেছি আজি এ নব-দীপালিতে তা'দেরই প্রাণের দীপ!

এ মোর দীপ্ত-দীপালি-প্রভার দর্পণে দে'ছে ধরা
কতনা দয়িত-দিঠির দেউটি প্রাণের দরদে ভরা!
.          এ যেন গগনে গোধূলি-দীপালি
.                     চন্দ্র তারার ছন্দ-মিতালি
ভূবন-জনের অন্তর-লোক আনন্দে আলো করা!

.              ******************         
.                                                                                  
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর  
*
বেরিয়ে যখন পড়েছি    
কবি নরেন্দ্র দেব
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও সরল দে সম্পাদিত "পাঁচশো বছরের
কিশোর কবিতা" সংকলনের কবিতা। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়
সংকলিত ও সম্পাদিত, "কিশোর কবিতা সঞ্চয়ন", ২য় সংস্করণে এই কবিতাটি
"
পথের মাঝে" নামে প্রকাশিত হয়। ২০০৯ সালে, উত্থানপদ বিজলী সম্পাদিত "এপার
বাংলা ওপার বাংলার ২০০ কবির ২০০ ছড়া ও কবিতা" সংকলনে এই কবিতাটি
"
চলার গান" শিরোনামে প্রকাশিত হয়।


বেরিয়ে যখন পড়েছি ভাই
.                থামলে তো আর চলবে না,
হিমালয়ের বরফ জ্নো
.                ঘামবে তবু গলবে না।

সাম্ নে চেয়ে এগিয়ে চলো
.                ভয় পেওনা বাদ্লাতে,
পয়সা যদি ফুরিয়ে থাকে
.                চালিয়ে নেব আধ্লাতে।

উপোস করে' চলব তবু
.                কিছুর ভয়ে টলবো না,
মনের কথা লুকিয়ে মুখে
.                শত্রুকে আর ছল্ বো না।

বিঁধ্ ছে  কাঁটা? ফুট্ ছে কাঁকর?
.                ফুটুক তবু ছুট্ বো  হে,
ইন্দ্রদেবের স্বর্গটাকে
.                সবাই মিলে লুট্বো হে।

চাঁদের ঘরে কী ধন আছে
.                উট্ কে  চলো দেখবো রে,
ধাক্কা দিয়ে তারায় তারায়
.                সূর্যে গিয়ে ঠেক্ বো রে।

.              ******************         
.                                                                                  
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কনকাঞ্জলি    
কবি নরেন্দ্র দেব
১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিজনকুমার চট্টোপাধ্যায় সংকলিত, ঐকতান কাব্যসংকলনের
কবিতা।


এ কি ঢেলে দিলে অমৃত মদিরা অধীর অধরে মোর ;
বহে বিদ্যুৎ বেপথু অঙ্গে আঁখিতে ঘনায় ঘোর।
বিপুল পুলক-শিহরণে ঘন দেহ মন ওঠে কেঁপে,
জাগে আনন্দ-অনুভূতি অতি সব অন্তর ব্যেপে!
এ কি অনুরাগ নিবিড় সোহাগ নিবেদিয়া দিলে তুমি।
কোন্ হোম-হবি সোম-রস-ধারা তৃষিতে করালে পান ?
কোন্ দুর্লভ দ্রাক্ষ-আসব বুভুক্ষে দিলে দান ?
তোমার অধর ভৃঙ্গারে এ কি শৃঙ্গার-সুধা ভরা!
গাঢ় মিলনের মোহন মুদ্রা, অন্তর-ক্ষুধা-হরা ?
নন্দন-বন-বসন্ত যে গো বক্ষে উঠিল ফুটে,
নিখিল কোকিল-কুহরণে যেন শ্রবণ ভরিয়া উঠে!
কি ছিল লুকানো কোন্ মায়ামধু সীধু-ধারা বিধুমুখে,
পান করে প্রাণ মেতে ওঠে আজ অসহ্য কোন্ সুখে।
এ কি অপূর্ব প্রীতি-রোমাঞ্চ জাগে প্রতি রোম-কূপে
সুখ-স্বপনের গোপন কুঞ্জে ডাকে যেন চুপে চুপে!
শোণিতে সহসা জ্বলে ওঠে এ কি রঙীন ফাগুন-বিষ
তোমার অধর-আদর আমার কামনা-অহর্নিশ!
পদ্ম-অধর-মন্থন-মদে উন্মাদ আজি প্রাণ।
এ কি অকুণ্ঠ নীলকণ্ঠের আকণ্ঠ বিষ-পান ?
তোমার সরস অধর পরশ করে কি সঞ্জীবিত,
নিখিল সৃজন কামনার বীজ, জীবন অনিন্দিত ?
তাই কি ও মুখ-মধু-আস্বাদে লুব্ধ কাঙাল সম
তীব্র তৃষার হাহাকারে মরে লালায়িত চিত মম ?
শরম দ্বিধার সব সংকোচ নিমেষে হয়েছে দূর
মর্ম বীণার তারে তারে আজ অবাধ মিলন-সুর!
অধর-তীর্থে দুটি চিত্তের বিচিত্র বিনিময়,
বন্দিত ঘন মনোমন্দিরে শাশ্বত প্রেম জয়!
তরুণ তনুর চৌদিকে আজ যৌবন যেন জাগে,
সার্থক করি সকল সাধনা বিহ্বল অনুরাগে!
জীবন-ঊষার অভিষেক আজ অধর-প্রয়াগ তীরে!
তোমার প্রণয়-প্রসাদ-মুকুট গৌরবে শোভে শিরে!
তব চুম্বন-প্রেম-চন্দনে রঞ্জিত দুটি আঁখি,
ললাটে চিবুকে কপোলে কণ্ঠে ধন্য হয়েছি মাখি!
ওগো, এ মিলন-মহামুহুর্তে দেহ মনে শুধু চাই,
তোমাতে আমাতে বুকে মুখে যেন নিঃশেষ হয়ে যাই।

.              ******************         
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অপরিচিতা
কবি নরেন্দ্র দেব
ভারতী পত্রিকা, বৈশাখ ১৩৩৩ সংখ্যা ( এপ্রিল ১৯২৬ ) থেকে নেওয়া।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ১৯.৪.২০১৮।


ভূষিত এ আঁখি যদি লুব্ধ হ’য়ে চায়
.                তোমার ও অকলঙ্ক মুখ-পানে দেবী,
অন্তরের পশু মোর চেতনা হারায়—
.                তোমার ও অপরূপ রূপসুধা সেবি’ !
হৃদয় দলিয়া তাই এই ক্ষোভ জাগে,
হায়, যদি আমাদের দেখা হোতো আগে !
.                হয়ত’ জীবন হোতো অন্যরূপ আজ,
.                অসমাপ্ত রহিত না জগতের কাজ ;
আমার এ জীবনের যৌবন-উত্সবে
কামনার ঐক্যতান বেজেছিল যবে,
.                মনোমন্দিরের পূত বেদীখানি মোর
.                চূর্ণ ক’রে দিয়ে গেছে ঝঞ্ঝা-বায়ু ঘোর !
একদা দেবতা ছিল সে বেদীর ‘পরে
এ কথা বিশ্বাস যে গো কেহ নাহি করে !
.                কেমনে হবে তা’ বলো তা’দের প্রত্যয়
.                তা’রা যে দেখেছে দেবী চিতা-ভস্মময় !
তা’রা তো জানেনা সেটা হোমের বিভূতি—
.                নহে সে শ্মশান-ধুলি অস্পৃশ্য জঞ্জাল !
স্মৃতি যদি উপবাসী-প্রাণের আকুতি
.                পারিত রাখিতে পূর্ণ অফুরন্ত কাল
সে যদি না বিশ্বাসের করি অপচয়
চ’লে যেতো ফেলে মোরে একা অসময়,
.                তা’হ’লে যে পারিতাম সমাধিস্থ চিতে
.                দগ্ধ এ পাপের স্তুপে ডুবিয়া রহিতে |
তুচ্ছ করি সর্ব্ববাধা-বিপদের ভয়
হৃদয় গাহিত শুধু প্রলয়ের জয় !
.                কিন্তু দেবী হোল’ না তা’, সৌন্দর্য্য তোমার
.                কী অপূর্ব মায়া-মন্ত্র করিয়া প্রচার

অকস্মাৎ হৃত-বিষ ভুজঙ্গের মত’
আমারে করেছে যেন তব পদানত !
.                আনন্দ-প্রদীপ জ্বালি মরম-দুয়ারে
.                চিনায়ে’ দিয়াছে মোর অপরিচিতারে !
উষার অনিন্দ্য জ্যোতি মনে হয় ম্লান
.                হেরি তব জ্যোতির্ম্ময় অকলঙ্ক মুখ,
সকল ব্যথায় মোর বেদনা প্রধান
তোমারে এ অবেলায় দেখার সে দুখ !

.              ******************         
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কৃষ্ণা
কবি নরেন্দ্র দেব ও কবি রাধারাণী দেবী
“ভারতবর্ষ” পত্রিকার পৌষ ১৩৫৪ (ডিসেম্বর ১৯৪৭) সংখ্যা থেকে নেওয়া |
কবিতাটি ডাক্তার শ্রীজ্ঞানেন্দ্রনাথ মজুমদারের কন্যার বিবাহ উপলক্ষে, কবি নরেন্দ্র দেব
এবং রাধারাণী দেবীর সম্মিলিত রচনা!
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ১৯.৪.২০১৮।


কৃষ্ণা তুমি তো ‘কালো’ বলে
.        কৃষ্ণ তোমার কাজল দুটি চোখ।
পাঞ্চালে তো নয়কো বাপের বাড়ী,
.        তোমরা শুনি এই দেশেরই লোক।
এ-কটু বলে তোমার মাঝে দেখি
.        নামের মোহে যাজ্ঞসেনীর রূপ,
আগুন আছে, থাক্ সে অনির্বাণ ;
.        হোমের আলে হোকৃ সে প্রেমের ধূপ।
কিন্তু দিদি এমন নজির কৈ
.        মহাভারত পর্ব্বে কোথাও নেই,---
পতির গৃহে গেছ্ লো বারাণসী
.        কৃষ্ণা কভু . . . তাই তো হারাই খেই।
শহীদ্ ছিলেন তোমার শ্বশুর দেশে---
.        মাতৃভূণির মুক্তিসাধক জানি।
পুত্রে হেরি সুদক্ষ রণজিৎ,
.        লক্ষ্যভেদে কৃতিত্ব তাঁর মানি।
আজ যদিও ‘একচক্রা’য় যাবে,
.        ইন্দ্রপ্রস্থে হবেই হবে রাণী!
ময়দানবের মহান স্ফটিক পুরী
.        তোমার তরেই তৈরী হবে জানি।
বীরের সেরা রণজিতেরই প্রাণে
.        প্রেরণা দান করবে জীবন-রণে,
এই ভারতের শ্রেষ্ঠ নারীর মাঝে
.        স্বাধীন ভারত রাখুক তোমায় মনে।

.              ******************         
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাজকুমারী ইলা
কবি নরেন্দ্র দেব
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত, "কিশোর কবিতা
সঞ্চয়ন", ২য় সংস্করণে কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ১৯.৪.২০১৮।


রাজকুমারী ইলা
.        রূপ ছিল তার পরীর হেন
.        দাঁতগুলো সব মুক্তো যেন
.                চোখ দুটি তার নীলা।

গাইতে জানে গান,
.        চুল ছিল তার মেঘের মতো
.        গুণের কথা বলবো কতো
.                সরল সাদা প্রাণ।

ছোট্ট দুটি ভাই
.        চাঁদের মতো দেখতে তারা
.        দিদি বলতে হতো সারা
.                বাপ-মা তাদের নাই।

একদিন সে কবে
.        খেলতে গিয়ে ফিরল না আর
.        ফুলের মতো ভাই দুটি তার
.                চৈত্র মহোত্সবে।

খুঁজলে কত ইলা
.        দেশ-বিদেশে পরের পর
.        সেতুবন্ধ রামেশ্বর
.                সুদূর তক্ষশীলা,

কোথাও তারা নেই
.        হতাশ হয়ে ফিরছে যখন
.        রাজকুমারী হঠাৎ তখন
.                খবর পেলে এই---

মরুদেশের রাজা
.        নিয়ে গেছেন তাদের ধরে
.        সাগর পারে নৌকা কবে
.                হয়ত দেবেন সাজা।

পুরানো সেই রাগে
.        মরুরাজার বাপকে নাকি
.        ইলার দিতা দিছ্ল ফাঁকি
.                অনেক বছর আগে!

ইলা সে সব জানে,
.        তাই কাঁদে --- সে এই খবরে
.        ভাই দুটিকে কেমন ক’রে
.                ফিরিয়ে আবার আনে?

শুন্ লে ইলা, রাজা
.        ভক্ত বড় মিষ্টি গানের
.        খ্যাতিও খুব আছে দানের
.                প্রাণটা বড় তাজা।

অনেক ভেবে, শেষে
.        চলল নিজে রাজকুমারী
.        বাঈজী সেজে মস্ত ভারি
.                মরুরাজার দেশে ;

ইচ্ছাটা তার প্রাণে
.        ভাই দুটিকে আনবে ফিরে
.        ভুলিয়ে মরু-রাজকে ধীরে
.                মিষ্টি মধুর গানে!

.                        *        *        

এসেছে এক বাঈ,
.        পড়ল সাড়া মরুর দেশে,
.        বলছে শুনে সবাই এসে---
.                এমনটি আর নাই!

উঠলো রাজার কানে,
.        মন্ত্রী তাকে আনলে ডেকে,
.        রাজসভা সে সকাল থেকে
.                ভরিয়ে দিলে গানে!

শুনে ইলার গান
.        ধন্য ধন্য সবাই বলে
.        মহানন্দে সভাস্থলে
.                ফুল্ল সবার প্রাণ,

কেবল রাজা নিজে
.        হয়নি খুশি গান শুনে তার
.        বুঝ্ তে পেরে ইলার এবার
.                উঠ্ লো দুচোখ ভিজে।

ভাব্ লে অবিচার ---
.        সবাই খুশি হলেন মনে
.        এক্ লা উনি সিংহাসনে
.                মুখটি ক’রে ভার!

মন্ত্রী বললে প্রভু,
.        তৃপ্ত হল সবার প্রাণ
.        এমন গলা --- এমন গান ---
.                শুনিনি আর কভু।

আপনি শুধু একা
.        উদাস এত কিসের দুখে,
.        আজকে কেন রাজার মুখে
.                যায় না হাসি দেখা?

রাজা তখন বলে
.        মন্ত্রী, আমি গানের সুরে
.        আপনহারা স্বপন-পুরে
.                ভাস্ ছি কুতূহলে!

পাইনি কিছু ভেবে ;
.        নাইক হেথা তুল্য যার
.        এমন গুণীর পুরস্কার
.                কেমন করে দেবে?

বিরস আমি তাই ;
.        রাজভাণ্ডার শূন্য ক’রে
.        দিলেও ইলার আঁচল ভ’রে
.                তৃপ্তি আমার নাই।

কথাপ মাঝে ইলা
.        নূতন কি গান ধরলে হেসে
.        কণ্ঠে বালার উঠলো ভেসে
.                সুরের সে কি লীলা!

এবার রাজা ভুলে
.        ইলার মিঠে গানের ফাঁকে
.        মাথার মণিমাল্য তাকে
.                দিলেন তাঁকে খুলে!

প্রীতি-বিহ্বল মনে
.        গানের শেষে হাতটি ধ’রে
.        জানিয়ে দিলেন আদর ক’রে
.                থাক্ বে  রাজার সনে,

.                        *        *        

যেমনি হ’লো রাণী,
.        অমনি ইলা কোথায় আছে
.        রাথলে আগে নিজের কাছে
.                ভাই দুটিকে আনি!

সেদিন রাজ্যময়
.        শুনে সবাই অবাক ভারি
.        ছদ্মবেশে --- রাজকুমারী!
.                বাঈজী ইলা নয়!

.              ******************         
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভাবী বাংলার ঘুম পাড়ানীয়া গীত
(রাষ্ট্রভাষা অনুসরণে)
কবি নরেন্দ্র দেব
২০০৫ সালে নাথ পাবলিশিং, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা থেকে প্রকাশিত,
রঞ্জনকুমার দাস সম্পাদিত "শনিবারের চিঠি, কবিতা সংখ্যা", থেকে নেওয়া।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ১৯.৪.২০১৮।


আও আও নিদপরী আস্ মান ফোড়কর
.        আওরে নীদোয়ালী উতারো জলদি,
আঁখি রহো মূদকর সাঁঝতক রাতভর
.        তিন-রঙা পিনহো শাড়ি, কাঁচৌলি হলদি।
সোড়কা লেড়কি সব যো যাঁহা শো গয়া
.        বিদ যাও নিদপর ঝটাপট্ আজ,
নেহি তো হুজ্জৎ হাজারো কিসিম হোগা
.        হিন্দী কো জিন-ল্যায়া কংগ্রেসী রাজ।
পাক্ পাকা বর্গীয়োঁ দুশমন বেইমান
.        ঘুস গয়া ঘরপর চুপচাপ ঝাঁপকে
সামালোরে সব কোই দৌলত আপনা
.        তুরন্ত্ ভাগাও ইয়ে শয়তান পাপকে।

.                *                *        
      
নিদ যাও বেটা বিটি নিদ যাও জোয়ানো,
.        দিল্লী বাউরা হোকে দেখলাতে ডর,
হাটাওরে একদম আংরেজী বোল-চাল,
.        মত্ রাখো প্রীতি কোই পরভাষী পর।
ফেক্ দেও সিগ্রেট, খউনি চালাও জোর
.        বিড়ি ফুকো, শুখা ডলো, চুনা ডালো কম,
কাশ্মীরি শাল যব দিল্লী ওড়নে মাঙা
.        হজরত বাল দিয়া উনকো সরম।
দক্ষিণী দ্রাবিড়িয়োঁ মুনেত্রা কাজঘম
.        ডাণ্ডা লাগায়া জোর ফাঁড়কর বাঁশ,
তবভি জবরদস্ত গলেমে লটক্ দিয়া
.        রাষ্ট্রভাষা কো ইয়ে বেয়াকুবি ফাঁস।

.                *                *        
      
নিদ যাও বেটা বিটি, নিদ যাও জোয়ানো,
.        ঝুটমুট এসা কোই করো মত্ চুলবুল,
জরু গরু সাথ তেরা ধান, গেঁহু বাজ্ রা
.        লুটকর ভাগ গিয়া লাগোরিয়া বুলবুল।
কহোতো ক্যায়সে অব খাজনা গুজারো তোম
.        খতম্ তো সব তেরা সোনে দানা চাঁদি,
চড়হায়কে চুল্ হে পর আগ, পিছে দেখা যায়---
.        ঘীউ তেল বিনু তেরা রোতি বহা কাঁদি!
না মিলে চাউল কাঁহা বাজারমে ঢুঁড়কর,
.        না মিলে দাউল, আটা, ছোড়ো অব খানা,
স্বাধীন বন্ কে তাই, তা-ধিন নাচনা চাই,
.        নক্ লি  ভেজাল চিজ নানা মিল যানা।

.                *                *        
      
নিদ যাও বেটা বিটি, নিদ যাও জোয়ানো,
.        চুপচাপ রহো সব খুলো মত্ আঁখি,
নেহিতো নোকরি তেরা ছুট্ যাগে বেকসুর,
.        সরকারি দফতরে হিসাব নে ফাঁকি।
বন্ধ্ কর দিয়া দেখো ফটক তো দুনিয়াকা,
.        ঝটক লটক যাও জিউভর নিদমে,
রাষ্ট্রভাষা তো অব বন চুকা হিন্দীয়োঁ
.        নন্দ্-গোবিন্দ্জী কি বাদশাহী জিদ্ মে।
খুশী সে চিবাও চানা, আলুসে কাবলি বানা,
.        দহিবড়া, পাপ্পড়, পকৌড়ি, ফুচ্ কা,
ছত্তু লাগাও লাল কীল্লেমে বৈঠকে
.        পরোয়া না করো কোই দুনিয়ামে কুছকা।

.                *                *        
      
নিদ যাও বেটা বিটি, নিদ যাও জোয়ানো,
.        নিদমেই মিলবেরে দিলমে আরাম,
হিন্দী যো নেহি পড়ে---কৃপা তারে করো মত্
.        বন্দর-বচ্ছাকো সম্ ঝো  হারাম।
হায় কোই উল্লুক মুল্লুক ভর আজ
.        গর্ রাজা শিখনে যো হিন্দু কা হিন্দী?
পুছো সো উজবুগ কো হিন্দুস্থানো পর
.        রহেগা ও গিধধোর কয়রোজ জিন্দি?
পাকড়ো বেকুব সব ডি-আই-রুলসে সিধা
.        রাখ দেও ফাটকমে ভরকে আটক,
কংগ্রেসী শাসন কো সমঝে কি প্রহসন?
.        সোস্যালিস্ট ধাঁচ পর লিখি হুয়ে এ নাটক।

.                *                *        
      
পিয়ারি, চৌদাভাষা, নিদ যাও গোদ পর,
.        মুছ লেও আঁসু তেরা অঞ্চল ঢাকি,
ভারত কি আত্মা চেন লিয়া চীনলোক,
.        চিনবে সো ভুট্টো, আবদুল্লা কী?
গণতন্তর কি মন্ তরএ করো জপ
.        সংহতি ঐক্য সো আখেরি লক্ষ্য,
অখণ্ড বন যাগা এ ভারত আলবৎ
.        হিন্দী যো মান লিয়া সরকারী পক্ষ।
মার্কিনী-বিটানিয়া-বেয়াদপ দোনো দোস্ত
.        ডরতা ও জোটকোতো রুশভিও আজ!
দেখ রহে ‘ইয়ানো’ লোগ বনকর বুদ্ধু
.        শির দেকে কাশ্মীরি রুখতে হি বাজ।

.                *                *        
      
নিদ যাও বেটা বিটি, নিদ যাও জোয়ানো,
.        নিদপরী দেখ তেরা ডেরামে হাজির,
ফরমায়া এ বিধান ভারত সংবিধান---
.        এক ভোট জায়দা কি কায়দা কাজীর।

.              ******************         
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ধরা-ছোঁয়া
কবি নরেন্দ্র দেব
দীনেশরঞ্জন দাশ সম্পাদিত "কল্লোল" পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৩০ সংখ্যায় (মে ১৯২৩) প্রকাশিত।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ১৯.৪.২০১৮।


আমি ভুলবো না সে নিমন্ত্রণ,
আমায় খুশি ক’রতে তোমার সেই যে আয়োজন ;
সেই যে সেবা, সেই যে প্রীতি
অধর আঁখি হাস্য গীতি
আমায় যাহা করেছিলে যত্নে নিবেদন,
আমি ভুলবো না সে একটা দিনের মধুর নিমন্ত্রণ!
পূজারিনীর মতো বালা
সাজিয়ে এনে অর্ঘ্য থালা
ধরলে যখন সামনে আমার আপন হাতে এসে,
কোন্ অপরূপ শোভায় ওরূপ উঠল সেদিন ভেসে!
তোমার চিকণ কাঁকনগুলি
শুনিয়েছিল অবাক বুলি
তোমার আঁচল ছুঁইয়েছিল পরশ ভালবেসে!
আমার এ মন দুলিয়ে সে কোন স্বপ্ন লোকের দেশে?
সরিয়ে সকল সরম বাঁধ
সেই যে আরও দেবার সাধ,
অসঙ্কোচে আরা নেবার সেই যে অনুরোধ,
সুধার ধারে হৃদয় ক্ষুধার উদার পরিশোধ,---
আমার সেদিন মুগ্ধ ক’রে,
দিয়ে ছিল সকল ভ’রে
তরুণ হিয়ার স্তরে স্তরে অনন্ত আমোদ!
জীবনে মোর সেই ত’ প্রথম চরম তৃপ্তি-বোধ
শূন্য আজি আমার প্রাণে
নাই গো সখী কোন ও খানে
তোমার ভালবাসার দানে পূর্ণ সকল দিক্!
মঞ্জু মনের কুঞ্জ বনে গুঞ্জে কোটী পিক্!
তোমার গতির ছন্দ-গানে
আঁখির চপল ভঙ্গী পানে
নয়ন আমার আপনহারা তাকিয়ে অনিমিখ্  ;
তোমায় নিয়েই ফিরবো সখী দিক্ লো ভুবন ধিক্।
যে অনুরাগ সোহাগ ভরা
আচম্বিতে পড়্ লো  ধরা
এক নিমেষের অসাবধানে ফেল্ লে  যখন তুমি
রইল না গো গোপন কিছু রাখ্ ছিলে যা লুকিয়ে তুমি!
পেয়ে তোমার সেই অনুভব,
হারিয়েছি মোর যা কিছু সব,
রঙিয়ে দেথে হৃদয় আমার তোমার অধর কুঙ্কুমই,
নন্দন বন করলে সৃজন মুঞ্জরি এই মরুভূমি!

.              ******************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*