কবি রয়ময় লাহার কবিতা
শেষ-বেশ
কবি রসময় লাহা
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত অর্চনার পত্রিকার পৌষ ১৩১৬ সংখ্যায় (ডিসেম্বর
১৯০৯) প্রকাশিত কবিতা।


“বিয়ে কর্লে খাওয়ালে না একি সদানন্দ?”
“কি ছাই গদা দাদা কপাল বড় মন্দ ;---
স্ত্রীটি আমার বদ্ধ পাগল।”
.                                “পাচ্চ তবে কষ্ট?”
এমন কষ্ট নয়ক কিছু---বলে ফেলি স্পষ্ট
বিয়ের সঙ্গে পেলেম আমি বিষয় শ্বশুরের---”
“ভাল ভাল”
.                “কিন্তু তাতেই ঘটল বিপদ ফের
সে বিষয়ের কর্লে দাবী বৈমাত্র সম্বন্ধী ;”
“দুঃখের কথা---কর্লে কিহে?”---
.                                “শালার সঙ্গে সন্ধি।---
সে নিলে জোৎ জমা আমি পেলেম
.                                ভেড়ার পাল,”
“মন্দের তবু ভাল বটে”---
.                                “হা পোড়া কপাল!
ঘরে আনতেই ভেড়াগুলোর ধর্ল বিষম রোগ
একেবারে মল যে সব---”
.                        “কেবল কর্ম্মভোগ?”
“কর্ম্মভোগই কেন? তাতে হয়নি বড় ক্ষতি ;”
“বটে, বটে কেমন করে? কি কর্লে তার গতি?”
“পশমশুদ্ধ চামড়া বেচে পেলেম কিছু টাকা,
চর্রিগুলো জড় করে হয়েছিল রাখা।”
“বটে, সেত লাভের কথা---”
.                        “মোটেই লাভের নয়”
“কেন কেন---কি ঘটল আবার?”
.                                “বলছি সমুদয়---
চর্বি থেকে কর্বে বলে তৈরী মোমের বাতি
কলেজ পড়া ছেলেটা ঐ--”-
.                        “দেবাখুড়োর নাতি?”

“হাঁ---চর্বি গলাতে আগুন সে লাগালে ঘরে”
“কি দুর্ভাগ্য।”
.                “দুর্ভাগ্য বা বলি কেমন করে?”
“সে কি?”
.           “ঘরের সঙ্গে প্রিয়া---দগ্ধ হলেন মোর
পাগলীর হাত এড়িয়ে গেলেম---”
.                          “খুবত বরাত জোর!”
“শেষ ভালটাই ভাল দাদা---”
.                         “ঘটিও না আর মন্দ---
“এবার বিয়ের সময় খাইয়ে দিও সদানন্দ।”

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কোথায় আমার ছেলে
কবি রসময় লাহা
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “অর্চ্চনা” পত্রিকার কার্তিক ১৩১৯ সংখ্যায় (অক্টোম্বর
১৯১২) প্রকাশিত কবিতা।

.                ১
তুমি মাঝি?---সাগর থেকে এলে?
আমার ছেলে, কোথায় আমার ছেলে?
“তোমার ছেলে? কি নাম বাছা তার?
কোন্ নায়ের সে ছিল চড়ন্ দার?”

.                ২
আমার ‘সমীর’ সাগর গেছে চলে,---
কোন্ নায়েতে যাইনিত সে বলে’
তুমি যখন সাগর থেকে এলে---
জাননা কে সমীর? ---আমার ছেলে।
এ নগরে চেনেনাক তারে,
এমন কেহ নাইক পারাপারে।

.                ৩
সাগর থেকে তুমি ফিরে এলে,---
কোথায় ‘সমীর’ কোথায় আমার ছেলে?
তুমি যদি চেননা বাছারে---
মাঝি তিমি---বলবে কে তোমারে?
মিছে তোমার দাঁড় বোয়া আর হাল্ ;
মিছে তোমার দড়াদড়ি ও পাল ;
তীরে মতন নৌকা ছোটায় সমীর---
“আস্তে বল---হ’য়োনা অধীর।”

.                ৪
আস্তে কেন বলতে বলছ মাঝি?
বাছা আমার সকল কাজের কাজী।
তাহার খ্যাতি রাষ্ট্র সহর ময়,
শুনে আমার বুক যে দশহাত হয়!
আর কথা কি আস্তে বলা চলে?---
“ডুবেছে তার নৌকাখানি জলে।”

.                ৫
যাক্ গে নৌকা কি হয়েছে তায়?
আমার বাছা ‘সমীর’ সে কোথায়?
মাঝি তারে কোথায় দেখে এলে?
কোথায় ‘সমীর’ কোথায় আমার ছেলে?
নৌকাভরা যাত্রী ছিল যারা,---
দেখ্ তে দেখ্ তে তলিয়ে গেল তারা।

.                ৬
কি ফল মাঝি তাদের কথা তুলে?
আমার বাছা কোথায়---বল খুলে।
মায়ের প্রাণ আর সইবে কতক্ষণ---
বাছা আমার বুক-জুড়ান ধন!
আমার বাছা---আমার বাছা মাঝি,
‘সমীর’ ‘সমীর’ কোথায় কোথায় আজি।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মিনতি
কবি রসময় লাহা
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “অর্চ্চনা” পত্রিকার পৌষ ১৩২৬ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৯) প্রকাশিত
কবিতা।


তোমরা ললনা                        ধ্যৈর্য্য-প্রতিমা
একাধারে দেবী-দাসী ;
কি সাহসে সহ                        শতেক যাতনা
আননে সলাজ হাসি।


সরলা, কোমলা,                        মধুর শীতলা,
তোমরা সংসার-গতি ;
কভু না মানিনী                        প্রবলা দামিনী
চকিতে সদয়া অতি।


ধরমে করমে                        সদা পূত মতি,
অকারণ কর “আহা”,
কারণ দেখাও                        খরচের বেলা
কি নিপূণ ভাবে তাহা।


তোমরা বিনীতা                        অশ্রু গলিতা
কথায় কথায় দেখি,
ও চরণ তলে                        রয়েছে পড়িয়া
কত যে ঘরের ঢেঁকি!


থাক পরিপাটী                        সুরুচি সোহাগে
তোমরা নিরন্তর,
সাজিয়া যতনে                         ভূষণে রতনে
আলো করে’ আছ ঘর।


বসুধার সেরা                         কুসুম তোমরা
বিধির অবাক্ সৃষ্টি!
প্রীতি-প্রেম-স্নেহে                        পরিমল তরা
সংসারে শুভ দৃষ্টি।


জননী, ভগিনী,                     জায়া, সুতা রূপে
করপুটে সেবা ভরা ;
কি স্বচ্ছন্দে                            চালাও সংসার
তোমাদের হাতে গড়া।


সোণার এ ঘর                        করে’ ছারখার
বিলাসে ঢালিয়া প্রাণ---
এস না বাহিরে                        পুরুষের কাছে
হারাতে নারীর মান।

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বিধান
কবি রসময় লাহা
বিজয়চন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত “বঙ্গবাণী” পত্রিকার চৈত্র ১৩২৮ সংখ্যায় (মার্চ ১৯২২)
প্রকাশিত কবিতা।


দিলেন ব্যবল্থা আসি শেষে পুরোহিত---
“এ রোগের প্রায়শ্চিত্ত এখনি উচিত ;”
রোগী কহে “প্রায়শ্চিত্ত করে কোন্ জন,
যার কোন আশা নাই নিকট মরণ।”
শিহরিয়া পুরোহিত ক’ন্ “যমদূত
সিঁড়িতে উঠিতে আমি দেখিনু অদ্ভুত।”
“সত্য না কি” কহে রোগী “চেহারা কেমন?”
“ঘোর কালো ভীষণ সে মোষের মতন।”
“বুঝিয়াছি” কহে রোগী হাসিয়া খেয়ালে
“দেখেছেন আপনারি ছায়া সে দেয়ালে।”

.              ********************
           

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বুড়ার আবদার
কবি রসময় লাহা
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার ভাদ্র ১৩২৩ সংখ্যায় (অগাস্ট ১৯১৬) প্রকাশিত
কবিতা। কবির “মণি-মুক্তা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


আবার বালক হ’তে চাই যে এক মুহূর্ত্ত তরে
গত তরুণ যৌবন আমার বারেক ফিরিয়ে দাও ;
শিশু হয়ে কোঁকড়া চুলে হাসব আমোদ ভরে,
বুড়ার মাথার রূপার কেশের মুকুট খুলে নাও।


ফেলে দাও এ লোল তনু, চিন্তা-জীর্ণ মাথা,
ভেঙ্গে উচ্চ চূড়া---জ্ঞান-গরিমায় ভরা ;
তত্ত্বময় এ জীবন-পুঁথির পুড়িয়ে ফেপাতা,
নিবিয়ে দাও এ যশের বাতি, আশার আলো করা।


নিমেষ তরে, করে দাও এ জীবন-স্রোতস্বিনী,
শৈশবের সেই গৌরবভরা উৎসে সমুন্নত
আবার উঠুক্ স্বচ্ছ প্রেমের লীলা-নির্ঝরিণী,
প্রাণে প্রাণে, শিরায় শিরায়, সুখের স্বপ্ন মত


এ প্রার্থনা শুনে আমার স্বপ্নে ভাগ্যরাণী,
বল্লেন ঈষৎ হাস্যাননে, আমার পানে চেয়ে ;---
“তোমার পলিত কেশে যদি ছোঁয়াই আমার পাণি.
মিট্ বে বটে আশা তোমার শৈশব দশা পেয়ে।”


“কিন্তু তুমি ফেলবে হারিয়ে ভাব্ ছ কি তা মনে,
এত দিনের অর্জ্জিত যা’ তোমার সফল আশা?---
পিতার স্নেহ, মাতার আদর, দয়া-ধর্ম্ম সনে
বন্ধু-প্রীতি, ও সংসারে জায়ার ভালবাসা।”


শুনে বল্লেম, “ভাগ্যদেবি, একি সত্যি কথা,
এ সব আবার লুপ্ত হ’বে শিশু হ’বার পরে?
দেবতার নির্মাল্য---আমার জীবন-তরুর লতা---
প্রিয়ার ছেড়ে, একা আমি রইব কেমন করে’?”


রত্নাক্ষরে লিখলেন দেবী শুনে আমার কথা,
উন্দ্রধনুর রেখা যেমন ফোটে সুনীল নভে,---
“বুড়ার শিশু হ’বার এ সাধ, বিচিত্র যে প্রথা,
কারণ, সঙ্গে সঙ্গে যখন পত্নীটিও র’বে।


“তা’ হ’বে না, শিসু হ’লে থাক্ বে না এ সব,
এ সব স্মৃতি মুথে যা’বে, সকল দুঃখ সুখ,---
আতিথ্য, তিতিক্ষা, নিষ্ঠা, দেবার্চ্চনা, স্তব,
পাবে না আর নাতি-নাত্ নির দেখ্ তে হাসিমুখ।”


“সে কি? আমি ছাড়ব না যে অতীত পুণ্যস্মৃতি,
চিরজীবনব্যাপী আমার দুঃখের মধ্যে সুখ,---
পিতামাতার স্নেহাশিস্ , আর পুত্র কন্যার প্রীতি,
ঠাকুর দাদার চোখের কাজল---নাতি নাতনির মুখ।”

১০
হেসে বললেন ভাগ্যদেবী কলম ফেলে দিয়ে,---
“কেশের সঙ্গে বুড়ার দেখছি বুদ্ধি হ’ল সাদা ;
মরি আমার যাদু, তোমার আশার বালাই নিয়ে,
ছোকরা হ’বেন অথচ সেই র’বেন ঠাকুরদাদা!”
হো হো করে হেসে উঠলেম স্বপ্ন থেকে জেগে,
সে ধ্বনিতে বাড়ী শুদ্ধ জেগে উঠল সব ;
“কি হয়েছে ঠাকুরদাদা?” নাতি নাতনি বেগে
চারি দিকে আমায় ঘিরে তুললে কলরব।

.              ********************            

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বাঙ্গালী পল্টন
কবি রসময় লাহা
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার পৌষ ১৩২৩ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৬) প্রকাশিত
কবিতা।

(১)
ধনের লোভে মানের লোভে হওনি বদ্ধ পরিকর,
কর্ম্মের ডাকে ধর্ম্ম যুদ্ধে হোচ্ছ তোমরা অগ্রসর।
দেশের কাজে জাগ্রত আজ নিদ্রা করি পরিহার,
পুত্র যত কর্ম্মে রত তোমরা সোণার বাঙ্গালার।

(২)
বাক্যে নবে কার্য্য তোমরা দিচ্ছ তেজের পরিচয়,
দেখাবে তাই পৌরুষভরে পুরুষকারের চিরজয়॥
আমরা ভীরু রণে বিমুখ একথা আজ বল্ বে কে আর।
পুত্র যত কর্ম্মে রত তোমরা সোণার বাঙ্গালার।

(৩)
কিসের চিন্তা? হোক্ না কেন স্বল্প বাঙ্গসৈন্যদল,
শক্তি যখন উদ্বোধিত দৃঢ় তখন বাহুবল ;
স্মৃতি যখন বইছে প্রতাপ বিজয়সিংহের পুণ্যভার।
পুত্র যত কর্ম্মে রত তোমরা সোণার বাঙ্গালার।

(৪)
চেয়ে আছে দেশের চক্ষু তোমাদেরি প্রতি আজ,
দেখাো তোমরা মানুষ বটে বীরের জাতি জগত মাঝ ;
ধর্ম্মে বাঁধা বিজয়লক্ষ্মী দেখাো আর্য্য শৌর্য্যসার।
পুত্র যত কর্ম্মে রত তোমরা সোণার বাঙ্গালার।

(৫)
ঘরে শুয়ে মর্ ছে ক্লেশে রোগে নিত্য কত জন,
তোমরা নিতে যাচ্ছ হেসে সেই মরণে আলিঙ্গন ;
কর্ত্তব্যে দেয় আত্মবলি রণে ছোটায় রক্তধার,
পুত্র যত কর্ম্মে রত তোমরা সোণার বাঙ্গালার।

(৬)
ফিরবে যবে সগৌরবে সার্থক হবে অভিযান।
তোমাদের সেই পুণ্যকীর্ত্তি ধন্য করবে দেশের মান।
জন্মভূমি যুক্তকরে যাচে আশিস্ বিধাতার,
পুত্র যত কর্ম্মে রত তোমরা সোণার বাঙ্গালার।

.              ********************            

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বিংশশতাব্দীর শিবের গান
কবি রসময় লাহা
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত  মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৩ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ১৯১৬)
প্রকাশিত কবিতা।

(১)
সতী তিনি দাক্ষাণী, আমি পাগল শিব,
পতির নিন্দা শুনে কাণে
ঘা লাগে না আর সে প্রাণে,
বাপের বাড়ীর গুণগানে নিয়ত উদগ্রীব।

(২)
তপস্বিনী উমা তিনি, আমি তাপস শিব,
ছেলে বেলা আমার ধ্যানে
ছিলেন কি না কে বা জানে?
এখন তাঁহার প্রেমের টানে বেরিয়ে আসে জিভ।

(৩)
তিনি ধন্যা অন্নপূর্ণা আমি কাঙাল শিব
পাই না এখন খেতে পায়স,
পাচ্ছি বটে ছাতার ডাঙস্
সাবাস তাহার শক্তি সাহস, পুরুষ যে হয় ক্লীব।

(৪)
তিনি জায়া মহামায়া, আমি অঘোর শিব,
দেখলে তাঁহার করাল বদন
আঁৎকে থামে হৃদস্পন্দন---
চরণতলে লভি’ শয়ণ গণি যে নসিব।

(৫)
গৌরী তিনি, গরবিনী, আমি ভোলা শিব,
স্বামী আমি ভুলে হা-রে
সব ক্ষমতা দিলাম তাঁরে
এখন বাঁধা কারাগারে---তিনি যে মনিব।

(৬)
তিনি নারী বিশ্বেশ্বরী, দিগম্বর এ শিব,
বিশ্ব দিয়ে তাঁহার করে
নিঃস্ব আমি,---কাজ কি ঘরে?
ভস্ম মেখে তাই ত ঘোরে এ নিরীহ জীব।

.              ********************            

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কবির প্রতিভা
কবি রসময় লাহা
সুকুমার সেন সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয় ১ম খণ্ড” (১৯৯১) কাব্য সংকলনের কবিতা।

তোমার কবিতা দেখিয়া পিতার
ঝরিল নয়ন আজ---
শুনি সুখে কবি কহিলেন, “প্রিয়ে
দেখিলে লেখার ঝাঁজ!”
বলিলেন পিতা, “সঁপিনু কন্যায়
দিয়ে মোর সর্বস্ব ;
শেষে কি-না এক পাগলের হাতে---
লেখা যার ছাই ভস্ম।”

.              ********************            

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
পতিতা
কবি রসময় লাহা
“প্রয়াস” মাসিক পত্রিকার অক্টোবর ১৮৯৯ সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা।


হের ওই অভাগিনী নারী,
তুচ্ছগণি জীবন বন্ধন।
না ভাবিয়া ব্যকুস হৃদয়ে,
জলে প্রাণ দিল বিসর্জ্জন।


ধর তারে সুকুমার করে,
তোল তারে পরম যতনে।
কৃশাঙ্গিনী ক্ষীণাতনুখানি,
বিকাশিতা তরুণ যৌবনে।


হের তার সজল বসন
প্রতি অঙ্গে গেছে জড়াইয়া।
উঠিতেছে পড়িতেছে কত,
ঢেউগুলি ঢলিয়া ঢলিয়া।
এখনই লও ঘৃণা ভুলে,
সকরুণ প্রেমে তারে তুলে।


হেলা করি ছুঁয়ো না ও দেহ,
উদারতা শুধু কথা নয় ;
দোষ ভুলে ভাব তার ব্যথা,
থাকে যদি মানব হৃদয়।
রমণী সুলভ পবিত্রতা,
এখন ও দেহে বিরাজিতা।


তৃক্ষ্ণদৃষ্টে চেয়োনা চেয়োনা,
আত্মনাশ ভাবিয়া উহার।
অনুচিত অশিষ্ট হলেও,
ত্যজেছে সে অপমান ভার।
মৃত্যু নিয়ে গিয়েছে সকল,
রেখে গেছে সুষমা কেবল।


যদিো সে বিপথ গামিনী,
তথাপি সে অবলা যে হায়।
আহা দাও মুছায়ে অধর,
মুখ ব’য়ে সলিল গড়ায়।


বেঁধে দাও শিথিল কবরী,
সুকেশিনী আহা ওই নারী।
লভেছিলা জনম কোথায়
বুঝে দেখ বিস্মিত হিয়ায়।


কেবা এর ছিল পিতা, মাতা,
কেবা এর ছিল ভাই বোন।
অথবা কি ছিল প্রিয়তম,
কেহ এর হৃদয়ের ধন?


হায়, হায়, কোথায় করুণা
মানবের উদার পরাণ?
এত বড় এ নগর মাঝে,
কেহ কি দেয়নি তারে স্থান।

১০
পিতা মাতা কিবা ভাই বোন
সবে গেছে স্নেহ মায়া ভুলে,
প্রখর যে দারুণ আঘাতে,
স্বর্গ হতে পতিত ভূতলে।
বিধাতার মহান বিধান,
বিপথে কে করিল প্রয়াণ।

১১
প্রতি গেহে শত দীপ মালা,
ছায়া তার কাঁপে নদী জলে।
অসহায়া দুঃখিনী অবলা,
সেতু’পরি ঘোর নিশাকালে।
দাঁড়াইয়া ছিল শূন্য মনে,
একদৃষ্টে উদাস নয়নে।

১২
শিশির শীতল বায়ু বহি।
কাঁপাইল প্রতি অঙ্গ তার,
নহে কাল জল---নদী বুকে
নাচিয়া যে ঢালে অন্ধকার।
আপন জীবন গাথা স্মরি।
ঝাঁপ দিতে গেল মত্ত হয়ে,
মরণের অজানিত দেশে।
পশিবারে প্রফুল্ল হৃদয়ে ;
হোক না যেখানে সেই স্থান
ধরা হতে লভিবারে ত্রাণ।

১৩
কোন দিকে না চাহিয়া সে
ডুবিল যে অসীম সাহসে।
তখন তটিনী কূলে কূলে,
কেঁপেছিল শত ঢেউ তুলে।
এছবি আঁকিয়া সেও মনে,
ভেবে দেখ মরমে মরমে।
অপবিত্র পুরুষ সকল,
পার যদি মাখ ভব তবে
আর পানকর হোথাকার জল।

১৪
ধর তীরে সুকুমার করে,
তোল তারে পরম যতনে।
কৃশাঙ্নী ক্ষীনা তনু খানি
বিকাশিতা তরণ যৌবনে।

১৫
করুণ হৃদয়ে সন্তর্পণে,
প্রতি অঙ্গ না হতে কঠিন,
সুরচিত করি’---ঢেকে দাও
খোলা দুটী আঁখি দৃষ্টিহীন।

১৬
স্থির দৃষ্টি অহো কি ভীষণ
ভেদিয়া আবিল আবরণে
নিরাশার শেষ দৃষ্টি ওই,
চেয়েছিল ভবিষ্যের পানে।

১৭
অধীর হইয়া অপমানে,
মরেছে সে আঁধার পরাণে।
পাশব আচার নিদারুণ,
জ্বেলে ছিল মত্ততা আগুণ
তার চির শান্তির মাঝারে ;
ধীর চিত্তে দাও যোগ ক’রে
বুকে তার হাত দুইখানি
ধ্যানমগ্না যেমন যোগিনী।

১৮
ক্ষীণ মন হীন আচরণ
যেন সে বলিছে অকপটে
পাপভার করিয়া অর্পণ
মুক্তি তরে বিধির নিকটে।

.              ********************            

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বিষম দম্পতী
বি-শ্রীবেঁটে কবি
কবি রসময় লাহা
“প্রয়াস” মাসিক পত্রিকার অগাস্ট ১৮৯৯ সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা।


পত্নী সদা ছোট হয়
পতি বড় নিঃসংশয়
বয়স ও আকৃতিতে বটে ;
বিপরীত মোর ভালে
বয়সেো ছোট হ’লে
পত্নী মোর লম্বা, আমি বেঁটে।


এ আমার বড় দুঃখ
সংসারে নাহিক সুখ
যত মন্দ আমারই ঘটে ;
সেই “সার” সংসারেতে
আমি “সং” তা’র হাতে
তাহারি হুকুমে মরি খেটে ;
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


যদি বা সে ভালবেসে
চায় মুখ পানে হেসে
তাহাতেও তৃপ্তি নাই মোটে ;
শতধিক্ বিধাতায়
নাগাল না পেনু হায়,
চুমিতে সে মিশি মাখা ঠোঁটে
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


আছে তার গলগণ্ড
সেই মোর সুধাভাণ্ড
কায়ক্লেশে তথা মুখ ওঠে ;
মন সাধ মিটাইটে
চুমি তাই আচম্বিতে
দুগ্ধ স্বাদ ঘোলে যথা মেটে ;
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


যকন বচসা হয়
সেই সদা লভে জয়
কাঁপি তার তাড়নার চোটে ;
কথা কই মৃদু স্বরে
সে চেঁচায় বড় জোরে
জয় ঢাক যেন বেজে ওঠে ;
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


সে যেন গো প্রভু মম
আমি ক্রীতদাস সম
ভয়ে ভয়ে থাকি পাছে চটে ;
ঝাঁটা ধরে অদ্যাবধি
বাড়ীতে আসিতে যদি
ভুলে কভু রাত হয়ে ওঠে
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


মোরে দেন বাসি পান
নিজে সদ্য সাজা খান
আমিই সাজিয়া দিই বটে ;
যদি কোন কথা বলি
তেড়ে আসে বঁটি তুলি
এমনই বুদ্ধি তার ঘটে ;
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


সে যদি মরিতে চায়
আপদ চুকিয়া যায়
দিই দড়ি কলসি নিকটে ;
দেখে দেখে তার গুণ
ইচ্ছা হয় করি খুন
তেমন যে বাগ্ নাহি জোটে ;
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।


বলিতে যে করে ভয়
যদি লম্বা ক’রে দেয়
শুনিয়া সে প্রহারের চোটে ;
গুমুরে ফাটিছে বুক
এ মিলনে কোথা সুখ
জীবন যেতেছে বৃথা কেটে ;
কারণ সে লম্বা, আমি বেঁটে।

বি-শ্রীবেঁটে কবি।

.              ********************            

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*