কবি শক্তি পুরকাইতের কবিতা
কবি
শক্তি পুরকাইতের
পরিচিতির পাতায় . . .
*
মা
কবি শক্তি পুরকাইত
কখনো দুঃখ পেলে বাবা বেঁচে থাকার সময় যে চেয়ারে বসতেন
সেই চেয়ারে গিয়ে বসি, সময় কাটাই
দেখি বাইরের ঝক-ঝকে আকাশ।
সকালে স্নান সেরে মায়ের ছবিতে
ফুল দিয়ে প্রণাম করি
রোজ কাজে যাই।
রাতে ঘরে ফিরে দেখি মা’র হাসি মুখ
কাঁচের ভিতর থেকে যেন বলে ওঠে--
‘খোকা কাঁদিস না, আমি তো তোর পাশে আছি।
কাছে আছি।’
কখনো কখনো ঘুমের ভিতর
মা আসে।
ঘর গুছোয়
সংসার সাজায়
এক-এক করে সাজাতে থাকে সব...
স্বপ্নে দেখা আমার লক্ষ্মী মা
তুমি কি—
সত্যিই ভুলে গেছো আমাকে?
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
চাঁদ
কবি শক্তি পুরকাইত
ছোটবেলায় কান্না ভোলাতে
মা ডাকত আয়, আয়...
এখন উঠোনে দাঁড়িয়ে
ছেলেকে দেখানোর জন্য
বউ ডাকে আয়, আয়...
আমি গাছ গাছালি পেরিয়ে
সাদা ভাতের গন্ধে ছুটে আসি
রোজ।
দেখি আমার বউয়ের উপছে পড়া
হাসির মত জ্যোৎস্না লেগে আছে
মাটির দাওয়ায়।
আর দূরে আজও
কপালে ধাবড়া টিপ পরে
আবছা দাঁড়িয়ে থাকে কে—
যত কাছে যাই
ধূ-ধূ প্রান্তর গুলো
মনে হয়, বড়ো আপনজন
আমাদের সংসারের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়ে
আজীবন রাত জেগে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে
খেয়ালি চাঁদ।
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
জমি
কবি শক্তি পুরকাইত
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর
প্রতিদিন জমি দেখে নিই
ঠিক-ঠাক।
পূর্ব পুরুষেরা বলতেন, ‘দাদু ভাই
জমি উর্বর হলে মা বসুন্ধরা
খুশি হয়।’
আমার উঠোনে বসে থাকা
পাখিদের চিনিয়ে দিই
সীমানা।
জমি দেখি
আলপথ দেখি
মাথার উপর ঝুলে থাকা চাঁদ দেখি।
হে ঈশ্বর—
আমাকে সত্যিকারের
জমি দেখিয়ে দাও।
একটা প্রকৃত সুন্দর জমি।
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
ভালো থেকো নীলাঞ্জনা
কবি শক্তি পুরকাইত
ভালো থেকো নীলাঞ্জনা
ভালো থাকুক, তোমার কপালের লাল সিঁদুর
মৈসুদ্দিনের খেলার মাঠ
বামুন পাড়ার সেই পাগলি মেয়েটা ভালো থাকুক।
যার জন্য মায়া একদিন
কেন না, দিন-দিন মৃত্যু হানা দেয়
আমার চিলেকোঠায় আমার স্বপ্নে।
এই শীতে কিংবা সামনের বসন্তে
আমাকে চলে যেতে হবে
চলে যেতে হবে অনেক-অনেক দূরে
নীলাঞ্জনা, অনেক দূরে।
যত কষ্ট হোক তোমার
মৃত্যুর পর আমার কথা একবার ভেবো
অন্তঃত একবার।
ভালো থেকো নীলাঞ্জনা
সুখে থেকো
আর ভালো থাকুক, মৈসুদ্দিনের খেলার মাঠ
কঙ্কাবতীর ঘাট, সবাই ভালো থাকুক।
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
মহিম হালদার শুনতে পাচ্ছো
কবি শক্তি পুরকাইত
ছাদের কার্ণিশে বসে কাকটা ডাকতে ডাকতে
ক্লান্ত।
বুড়ো পিওনটা সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে
ফিরে গেল
একটু আগে।
রাস্তার ওপারে কে যেন
হেঁকে ওঠে—
‘মহিম হালদার শুনতে পাচ্ছো’?
দরজাটা খোলা এখনো
হাতে চিঠি, মেয়েটার সুইসাইড নোটে লেখা
‘বাবা তুমি ভালো থেকো
সুখে থেকো’।
বুড়ো পিওনটা হাঁকতে হাঁকতে
ফিরে গেল
একটু আগে।
‘মহিম হালদার শুনতে পাচ্ছো’?
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
এক আদিবাসী মায়ের দিনলিপি
কবি শক্তি পুরকাইত
ভাতের থালা থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ
বছর সাতাশের ছেলেটাকে।
সেই থেকে ও বাড়ির দরজাটা
খোলা, আজও।
চোখে ঘুম আসছে না, বলে
মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়
বৃদ্ধা মা।
রাস্তা শুনশান হলে লন্ঠন হাতে বের হয়
ছেলেটার খোঁজে।
কাছাকাছি গুলির শব্দ শুনে
সন্দেহ জাগে।
কাদের ছেলে জঙ্গলে ঢুকেছে
কাদের ছেলে?
অন্ধকারে ছুটে আসা টর্চের আলো
মুখে পড়লে
বোনটার কন্ঠস্বর শোনা যায়।
দাদা পালা, পু-লি-শ...
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
বোন
কবি শক্তি পুরকাইত
এখনো নুপুরের শব্দ শুনে
ছুটে যাই।
গাঁয়ের ধুলোয় খেলছে
আমার অবুঝ মেয়েরা চু-কিত-কিত
ক্যানভাসে আঁকা নয়
সত্যি-
মাটির দেওয়ালে সকালে রোদ পড়লে
রোজ পাখি এসে খুঁটে খায়
উঠোন।
মেঠো আলপথ দিয়ে
চোখের জলে আজও ফিরে আসে
বৃদ্ধ মাস্টারমশাই।
সব ভুলে যায়
বাগদি মেয়ের লাজুক হাসিতে
শেষ বিকেলে
বোনকে ডাকতে গিয়ে দেখি
আকাশের বুকে মাথা রেখে দুলছে নদী।
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
বাবা হেঁটে যাচ্ছে
কবি শক্তি পুরকাইত
গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটা দেখলে
মনে হয়, লাঠি হাতে ঝুঁকে পড়া
বাবা হেঁটে যাচ্ছে।
পেরিয়ে আসা
বাঁশের সাঁকো দিয়ে।
মর্মর পাতার ধ্বণী থেকে
ভেসে আসে বাজানো
ভোরের সেতার।
আমাকে স্পষ্ট বলে যাচ্ছে
‘বাজা খোকা, বাজা’।
আর কখন অজান্তে মা ডাকতে ডাকতে
আমি ছুটে যাচ্ছি।
এক ঝাঁক পাখির ভিড়ে।
জলের শব্দ শুনতে গিয়ে—
পিছনের খিড়কির দরজা খুলে দেখি
গলির মোড়ে গাছটা ঠিক দাঁড়িয়ে আছে।
শুধু তার পাশ দিয়ে বাবা হেঁটে যাচ্ছে
বাবা।
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
শত্রু
কবি শক্তি পুরকাইত
কোনদিন কারও সাথে
শত্রুতা করতে শিখিনি বলে
আমার কোন শত্রু ছিল না
কখনো।
ইদানীং দরজা খুললে
ভয় করে
ভয়ে ভয়ে থাকি।
যে কোন মুহুর্তে ছায়া না
এসে পড়ে।
মাঝরাতে নদীর কাছে দাঁড়ালে দেখতে পাই
আমাকে তাড়া করে বেড়ানো
সুদীর্ঘ একটা
ছায়া।
দুপুরে শূন্য মাঠের দিকে তাকালে
দেখি দূরের আকাশও
আমাকে পিছন পিছন
তাড়া করে আসছে।
রুদ্ধশ্বাসে আমি ছুটতে থাকি
ছুটি...
শত্রুকে খুঁজতে গিয়ে ছায়ার ভিতর নিজেকে দেখি বার-বার।
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি শক্তি পুরকাইতের পরিচিতির পাতায় . . .
*
তুলসীতলা
কবি শক্তি পুরকাইত
শৈশবে ঠাকুমাকে দেখতাম
কোন শুভ কাজে বের হওয়ার আগে
কপালে তুলসীতলার মাটি ঠেকিয়ে
বলতেন দুগগা দুগগা...
লাল আল্তা পাড় শাড়ি পরে
সনাতনী রীতি মেনে
মাও ঠিক বলে যেতেন
এমনই কথা।
চলে আসা আমাদের পূর্ব-পুরুষের
প্রথা অনুযায়ী
মাথায় ঠেকিয়ে দেওয়া হয়
পবিত্র তুলসীতলার মাটি।
সে কাজে হোক
সে অ-কাজে হোক।
এখনো তুলসীতলায় দাঁড়ালে
পূর্ব-পুরুষের ছায়া এসে পড়ে
প্রতিটা সময়।
যারা বলে যায় দুগ্গা, দুগ্গা...
. *****************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর