স্বপ্নের রং যখন কালো হয়ে আসে তখন ভাবতে হয় আমাদের কোথাও ভুল হয়েছিলো! পৃথিবীকে এক জায়গায় জড়ো করে এই কথাটা বোঝাচ্ছিলাম একটি পাখী আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলো, সে তার হিরণ্য আঙ্গুল দিয়ে শরীর ছিঁড়ে দুহাত ভরে রক্ত দিয়ে উড়ে চলে গেলো ! আমি তাকে ডাকলাম, এলোনা, বলে গেলো --- স্বপ্নে আর পতাকায় আমার রক্ত ছড়িয়ে দিস, মানুষের রক্তে কিছু রাত্রির ছায়া লেগে আছে! সেই থেকে স্বপ্নে আর পতাকায় আমি পাখীর রক্ত . মেশাচ্ছি রং রক্ত মেশাচ্ছি, রং
নবযুগ আনবে বলে যে ছেলেটা গাঁয়ে গাঁয়ে ধানের শেকড় খোঁজে তুমি তো ঘুমিয়ে আছো, সে কখন চোখ বোজে? জড়িয়ে ধরেছো কখনো যেমন আকাশ ধরে বাতাস মৌসুমী কমরেড কাকে বলো তুমি?
বুকের উপর ধানগাছ বিছানো ছিলো স্বপ্নের ধান! এখন তো হৃদয়ের ভিতরে ভিতরে জলহীন বাঁকুড়ার বাঘের দাঁতের মতো ভয়ঙ্কর মাঠ পড়ে আছে এতটুকু রং নেই! কোথায় বসবে পাখী নিযেই জানে না! জীবনের মিছিল সব অন্ধকারে বাদুড়ের মাংস হয়ে আছে!
মৃত্যু যদি এসে পড়ে মুখে সাদা চাদর দিও না চোখ ঢেকো না --- আমি সারাটা জীবন পৃথিবীর রং দেখেছি এখনো রং-এর ভিতর দাঁড়িয়ে গীটার বাজানো শেষ হয় নি এখনো সাগরের শেষতম জলের ইমন শুনিনি |
আমি মে দিবসের কবিতা লিখতে পারিনি বীরেনদা কবি সমীর রায়
বীরেনদা, ক্ষমার অযোগ্য নই, তাই ক্ষমা করবেন আমাকে। আপনারা যখন কলকাতা শহর জুড়ে সাতটা নয়, পাঁচটা নয় - অন্ততঃ একটা সমুদ্র কাঁপিয়ে লক্ষ হাতে লাল নিশান উড়িয়ে কবিতা লিখছেন তখন আমি এইখানে এই কলকাতার প্রেসিডেন্সী জেলে চাঁদের লাবন্যকে খুঁজে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে শুধু হাতেই আমার মায়ের মুখে হাত বোলাই; মা আমার অসুস্থ, রুগ্ন, গায়ে জ্বর। আমি মে দিবসের কবিতা লিখতে পারিনি বীরেনদা।
রাত্রে আমার ঘুম আসে না আমি সারা রাত জাগি আর শুনি আমার ডান পাশে বিশ ছরের কিশোর অসীম রাতভোর মাকে ডেকে ডেকে হয়রান জালের এপাশে দাঁড়িয়ে অনেকদিন দেখেনি ও মাকে --
আমার বাঁদিকে রঘুনাথ বীর প্রধান, বলিষ্ঠ চেহারা গ্রীসের যুবক যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এ জেলে আসার পর ওর বাবা মারা গেছেন মা সেই থেকে শয্যাশায়ী, একটি মাত্র বোন। সংসার অচল; তবু আমি বীরের চোখে জল দেখিনি পাথরের চোখে জল নেই বুঝি! কিন্তু এ পাথর হাসে কথা বলে এ পাথরে লাল সাদা রক্ত আছে যতটা দরকার হাসবার জন্য, কথা বলার জন্য -- তবু যখন সেন্সারড এন্ড পাসড -- মায়ের চিঠি আসে কেমন যেন পাথর, পাথর তবু গলে আমি বীরের চোখের দিকে তাকালেই মায়ের চোখের জল দেখতে পাই আঙ্গুরের ফল বুঝি চোখ থেকে জল হয়ে ঝরে তাই আমার ঘুম আসে না, সারারাত সেন্ট্রাল টাওয়ারে ঘন্টার শব্দ শুনি আর মায়ের চোখের দিকে হাত বাড়াই। মা আমার ঘুমাও ঘুমাও আমি তো লক্ষ্মী ছেলের মত তোমার পাশেই বসে আছি। তবু কি করি বলুন তো মা আমার ঘুমাবে না তেষ্টা পেলে জল গড়িয়ে খাবে না। আমি মে দিবসের কবিতা লিখতে পারিনি বীরেনদা।
আমার বাঁদিকে একটু দূরে মাথায় গামছা বেঁধে ছটফট করছে অরুণ। সারা জীবন জেলে থাকার ছাড়পত্র দিয়েছেন ঈশ্বর - ভুল করবে না বলে ঘর থেকে বেরিয়েছিলো সেই কবে মা বলেছিলেন, "আশীর্বাদ করি বাছা, জয়ী হয়ে ফিরে আসিস আমার কোলে।" অরুণ ফেরেনি মায়ের কাছে। সেন্ট্রাল বক্সে ঘেরা জেলের ভিতর ছটা বছর কেটে গেছে ছটা বছর ভুলের তরঙ্গ, ঢেউ সাঁতরে পার হতে হতে এখন নদীতীরে এসে ক্লান্ত, বেশ ক্লান্ত অরুণ। ছোট ভাইটি মারা গেছে বাবা এসে খবর দেন, "মা তোকে দেখতে চায়। বিছানা ছাড়েনি এখনো।" প্যারোল পিটিশন, বাবার টেলিগ্রাম, সব শরৎবাবুর অভাগীর স্বর্গযাত্রা ধোঁয়ার কুন্ডলী যেন কোথায় মিলিয়ে যায়। মাকে আর দেখা হলো না অরুণের। মাথায় গামছা বেঁধে ছটফট করছে অরুণ। একটু পরে উঠে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে গান গাইবে না হলে লেনিনের বই টেনে নেবে। চোখ দুটো গ্রীষ্মে গ্রীষ্মকে লজ্জা দিয়ে জ্বলে। আমার আর মে দিবসের কবিতা লেখা হলো না বীরেনদা।
আমার ডান পাশে পঞ্চাশ গজ দূরে ইয়াসিন মোল্লা মা ওর হারিয়ে গেছে অনেক, অনেক দিন, সেই শৈশবে সেই থেকে ঘর ছাড়া কেমন যেন পাঁজা পাঁজা মেঘের গড়ন -- মেশিনের সবগুলো পার্টস ওর চেনা তবু যেন মেশিন পার্টসের ছন্দে আর জীবনের গানে বেণী বাঁধা হলো না -- বার বার সংঘর্ষে ছিন্নভিন্ন ইয়াসিন মেশিনে মাকে পায় নি, জীবনে মাকে পায় নি তাই উদভ্রান্ত যুবক ইয়াসিন সারা জীবন ঘুরেছে রোদ্দুরে - সেই ইয়াসিনের মায়ের চিঠি এলো কুড়ি বছর বাদে। ইয়াসিনকে আমি দেখেছি স্রেফ কাঁপতে অন্য কোন উপমা-টুপমা এখানে খাটবে না ইয়াসিন স্রেফ কাঁপছে, মায়ের চিঠি হাতে নিয়ে এই আমারই সামনে -- ইয়াসিনের মা রোববার আসবেন এসেছিলেনও। কিন্তু দীর্ঘ কুড়ি বছর বাদে কুন্তীর প্রবেশপত্র মেলেনি বীরেনদা চ্যালেঞ্জ গেট পার হয়ে ছেলেকে দেখে যেতে পারেনি ইয়াসিনের মা - আমার চোখের সামনে এখন ইয়াসিনের মা চ্যালেঞ্জ গেটের কাছ থেকে ফিরে যাচ্ছেন ইয়াসিনের মা, আমার মা। আমি মে দিবসের কবিতা লিখতে পারিনি বীরেনদা।
পাশাপাশি চারটে ওয়ার্ড তারই একটাতে কাত হয়ে শুয়ে রবি কবিতা লিখছে ছন্দকে ছাপিয়ে যায় বুকের জ্বালা বর্ষার মাতলা নদী; ঢেউয়ে ছন্দের লাবণ্যকে খুঁজো না -- মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে সে যেন এগিয়ে আসছে নিজের ভয়ংকর জ্বালা বুকে নিয়ে -- কলম কাগজকে বিদ্ধ করে, সব রক্ত হাতে। রবি উঠে বসে। মনে পড়ে আকাশবানীর জল পড়ে পাতা নড়ে -- এমনই সহজ সরল সংবাদ। "পুলিশের সাথে সংঘর্ষে যুবক নিহত"" -- অজয় নদীর জলে ভেসে গেলো ভাইয়ের লাশ। সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা নিয়ে যখন দিল্লীর পার্লামেন্ট ভবনে পোলো খেলছেন ঈশ্বর তখন ভাইয়ের কপালে, বুকে, পেটে তিনটি বুলেট যেন তিনাটি সোহাগী চাঁদবদনী মেয়ে জড়ালো, আহা -- রবি উঠে দাঁড়ায় চারটি ওয়ার্ড তছনছ করে হাঁটছে রবি ইন্টারোগেশন চেম্বারে মায়ের মুখ সেই কোন সকালে বেড়িয়েছে দুটি জেলা, দশটি জেল খুঁজে খুঁজে এখন ইন্টারোগেশন চেম্বারের সামনে মায়ের মুখ -- হায়, এত বড় বুকে ঐটুকু নিজের ছেলেকেও আদর করে জড়াতে দেবে না, লুকোতে দেবে না ঈশ্বর ! চোখের জল সামলাতে গিয়ে বুকে আছাড় খেলো পাগল ঘোড়া মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মায়ের পলাশ শিমুলের দেশে মা তুই লজ্জা দিলি এত রক্ত লাল!
ইন্টারোগেশন চেম্বার থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামছেন মা বুকের রক্ত মুখে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছেন রবির মা - "একবার কোল খালি হলে মায়ের বুক আর ভরে না লো ভরে না"" আমি মানি না, আমি মানি না, আমি মানবো না এই গ্রাম্য প্রবাদ মাগো। মা তুমি ঘুমাও আমি তো লক্ষ্মী ছেলের মত তোমার পাশেই বসে আছি। চাঁদের লাব্ণ্যকে পাইনি খুঁজে তাই শুধু হাতে তোমার মুখে হাত বোলাই - মা তুমি ঘুমাও, ঘুমাও ঊষার আলোয় ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমাকে ছুটি দিও। আমার চোখের সামনে এখন রবির মা ইন্টারোগেশন চেম্বার থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামছেন রবির মা বুকের রক্ত মুখে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছেন রবির মা।