| কবি সরসীবালা দাসীর কবিতা |
| দলিতা কমল কবি সরসীবালা দাসী (সরকার) “প্রয়াস” মাসিক পত্রিকার জানুয়ারী ১৮৯৯ সালের প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত। হায় সেই দিন! যেদিন সরসী জলে, ফুটেছুল শতদলে, রূপেতে আলোকি বিশ্ব, অফুট নলিন্। সেই একদিন আর এই এক দিন। হায় সেই একদিন! সেদিন শরম ভুলি পাতার ঘোমটা তুলি, দুলিত মলয় স্পর্শে বদন নবীন। সেই একদিন আর এই এক দিন। হায় সেই একদিন! তরুণ অরুণ পানে, একান্ত আকুল প্রাণে, চাহিয়া চাহিয়া যবে পোহাইত দিন। সেই একদিন আর এই একদিন। হায়! সেই একদিন। মধুর সুরভী তরে মধুপ মধু ঝঙ্কারে আসিত মধুর আশে হয়ে জ্ঞান হীন। সেই একদিন আর এই একদিন। হায়! সেই একদিন। হইয়া পাগল পারা, সুধাংশু সুধার ধারা, ঢালিত রজত ধারে মুছায়ে মলিন। সেই একদিন আর এই একদিন। হায়! সেই একদিন। কলকণ্ঠ মধুমাসে সরসী পুলিনে এসে, শুনাত মধুর গীত বাজাইয়া বীণ। সেই একদিন আর এই একদিন। হায়! সেই একদিন। মরাল সাঁতারি ধীরে সোহাগে চিবুক ধ’রে আদরে জানায়ে যেত মমতা অসীম। সেই একদিন আর এই একদিন। হায়! সেই একদিন। মেঘ হ’তে হাসি মুখে শিহরিয়া তব বুকে রূপসী বিজলী সখী হইত গো লীন। সেই একদিন আর এই একদিন। হায়! সেই একদিন। আছে কি স্মরণে আজ যেদিন মরম মাঝ ঢালিলে অমিয় ভ্রমে গরল অসীম। সেই একদিন আর এই একদিন। বৈশাখের শুভ রজনীতে। পঙ্ক হতে পঙ্কজেরে তুলিয়া সস্নেহ করে ধরিল বুকের মাঝে কত আদরেতে। সে আদর সে সোহাগ, নরের সে অনুরাগ, শোভে না, সে শোভে শুধু দেব হৃদয়েতে। তার পরে কত ভালবাসা। ভুলিলে শৈশব স্মৃতি পেয়ে তা’র স্নেহ প্রীতি হরষে পুরালে শত জনমের আশা। প্রণয়ের মধু জোছনায়। ঢেলে দিয়ে মন প্রাণ শুনিলে সে প্রেম গান শুনিলে প্রেমের বীণা ভরা মমতায়। মানবের তপ্ত বক্ষঃস্থলে। শুকাল কোমল দল, ঝরিল নয়ন জল, মিটিল প্রণয় মধু ঝরিয়া অকালে। মিটিল হৃদয় আশ আবেশ বিহ্বল। নেহারিয়া মান শতদল। বক্ষঃ হতে ভুমিতলে অযতনে দুয়ে ফেলে যতনে পরিল গলে নবীন মৃণাল। আজও তার আছে কোমলতা। স্নিগ্ধরূপে মুগ্ধ মন গুণ গ্রাহী কয়জন কে বোঝে দলিতা শুষ্ক হৃদয়ের ব্যথা! কিসে আর ফিরিবে সে স্নেহ ? নাহি রূপ নাহি গন্ধ যাহাতে হইবে অন্ধ নাহি সে যৌবন যাহে তৃপ্ত হইবে দেহ। বনে তুমি ফুটেছিলে জলে। কেন বল এসে হেথা জাগালে হৃদয় ব্যথা মানবে হৃদয় দিয়ে কি ফল লভিলে ? কেন আজ দীর্ঘশ্বাস কাঁদিছ ভূতলে ? আর যত অফুট কমলে। চেতাইও বাঁচায়ো মুকুলে। যেন আর আত্মদানে কুহকী মানব সনে না মজে ভাসিতে শেষে নয়নের জলে। স্বরগের মরীচিকা নরকের ভুলে। বলে “ওগো দলিত নলিন্। আমার ও ছিল গো একদিন। আমিও বুকের পরে শোভিতাম প্রেম ভরে আজ আমি পদতলে ধুলায় মলিন। চিনিয়া হৃদয় দিও তোমরা নলিন।” সুখে কার যায় চিরদিন ? একদিন ছিল সে তোমার ছিলে তুমি কণ্ঠহার নলিন্। আজ সেই স্মৃতি বুকে লয়ে ব্যাথিতা স্মর সেই একদিন আর এই একদিন। হৃদয়ে লইয়া আকুলতা। নয়নেতে অশ্রু ল’য়ে তা’রি পানে থাক চেয়ে সে তোমার --- তোমারি সে হৃদয় দেবতা উপেক্ষায় মুছে নাক হৃদি পবিত্রতা। . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| মৃণ্ময়ীর পুরস্কার কবি সরসীবালা দাসী (সরকার) সুরেন্দ্রচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” মাসিক পত্রিকার শ্রাবণ ১৩১৫ বঙ্গাব্দ (জুলাই ১৯০৮ খৃষ্টাব্দ) সংখ্যায় প্রকাশিত। দুয়ারে থামিল গাড়ী ; মীনু নামে তাড়াতাড়ি, ছুটিয়া অঙ্গন দিয়া চলে। চলিতে উছট খায়, অঞ্চল লুটায়ে যায়, ললাটে মুকুতা-বিন্দু ফলে, নয়নে উছলে হাসি ; মায়ের নিকটে আসি, “মাগa, দেখ, ‘প্রাইজ’ কেমন!” ‘প্রথম হয়েছি বলি’ ‘দিদি’ দিয়েছেন ‘ডলি’--- ঠিক্ যেন খুকীর মতন! ‘কালো কালো চোখ দিয়ে, জু’লু জুলু আছে চেয়ে, চুলগুলি ওড়ে ফর্ ফর্, ‘ঘাগরাটী পরা গায়, ছোট-জুতা দুটি পায়, “মা গো, দেখ কেমন সুন্দর!” গৃহ-কর্ম্মে ব্যস্ত মাতা, শুনিয়া মেয়ের কথা, হাসি’ চাহিলেন তার পানে,--- মীনুরাণী মা আমার! ও ‘ডলি’ ছুঁয়ো না আর, তুলে রেখে দাও ওইখানে। বিদেশী, নাই ও নিতে।---” মেয়ে চাহে চারি ভিতে, ছল ছল প্রফুল্ল নয়ন! মা দেখিয়া কোলে নিয়া, কহে মুখে চুমো দিয়া, “ডলি নিয়ে খেলা কর ধন!” কোন কথা নাহি বলি’ ধীরে মীনু গেল চলি ; লুকাইল কে জানে কোথায়! ছোট ভাই ‘বেণু’ তার খুঁজি ফিরে চারিধার, দিদি কোথা দেখা নাহি পায়। সেদিন সাঁঝের বেলা, আর তো হ’ল না খেলা, বাবার সাথেতে লুকাচুরী ;--- মেনী শুধু ঘরে আসে, খুঁজে দেখে চারিপাশে--- ‘মিউ মিউ’ করি’ ঘুরি’ ঘুরি’। পর দিন বিদ্যাবাসে, ছাত্রীগণ চারিপাশে, শিক্ষয়ত্রী শিক্ষাদানে রতা ; আজিকার পাঠ “শিখ” ; কি তেজস্বী, কি নির্ভীক, বুঝাইয়ে বলেন সে কথা। মৃণ্ময়ী দুয়ারে আসে, দেখিয়া মেয়েরা হাসে,--- “দেখ, মীনু ‘প্রাইজ’ তাহার--- “কোলেতে করিয়া ‘ডলি’ স্কুলে এসেছে চলি’, ছাড়িতে পারে না বুঝি আর! মীনু কিছু নাহি কহে, শুধু নতমুখে রহে, মুখে উড়ে পড়ে কালো চুল, শিক্ষয়িত্রী পাশে গিয়া, বলে তাঁর হাতে দিয়া--- “ফিরে নাও বিদেশী পুতুল।” * * * * * * * * * মায়ের নিকটে আসি’, মৃণ্ময়ী দাঁড়াল হাসি, চোখে আর নাহি জল তার। মা তাহারে কোলে করি’, কচি ঠোঁট দুটি ভরি’, ‘চুম্বন’ দিলেন পুরস্কার! দেখিয়া ঈর্ষ্যায় জ্বলি’, বেণু দিল বাঁশী ফেলি’, লাঠিম পুকুরে ফেলি দিয়া, কত রাজ্য জয় করে’ যেন আসিয়াছে ঘরে! মায়ের আঁচল ধরে গিয়া! . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |