রমণী তার জানলা খুলবে না কোনোদিন কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা” সংকলনের পঞ্চম সংস্করণ, ১৯৭৩।
রমণী তার জানলা খুলবে না কোনোদিন অর্থাৎ নয়ন, পাছে এমন কিছু সে দেখে ফেলে যা তার চেয়েও সুন্দর, অর্থাৎ রমণীয়। আর, যে সুন্দর সে অদূরে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছে। জানা কথা--- সে জানলায় টোকা দেবে না দরজায় ঠোকা দেবে না সটান ঢুকে পড়বে ঘরে। তারপর রমণী আর সুন্দর একত্র বসবাস করবে কিছুদিন। কিছুদিন।
পাশাপাশি দু-খানা ঘর কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা” সংকলনের পঞ্চম সংস্করণ, ১৯৭৩।
পাশাপাশি দু-খানা ঘর ভাড়া ক’রে থাকে দুজন অবশ্য একটাই বাথরুম একটাই রান্নাঘর, বাকি সব নিজের নিজের। কোনোদিন এ হয়তো বললো : ক্লান্ত, আজ রাঁধতে ইচ্ছা করছে না আমার জন্যে একমুঠো চাল নিয়ে নিন ; আবার কোনোদিন ও এসে বললে : আজ আমি ক্লান্ত, আপনার ঘরে গিয়ে একহাত দাবা খেলি, চলুন। এছাড়া অন্যান্য দিন, অধিকাংশ--- ওদের দেখাই হয় না পরস্পরের সঙ্গে--- কাজ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে আনন্দ আনন্দ নিয়ে।
মানুষের পাশাপাশি কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ১৯৮৩-২০০৭ ), ২০১০, থেকে নেওয়া |
অশ্বশক্তি, মানুষের ঘোর অশ্বশক্তি প্রবণতা লোভ, অধীরতা লক্ষ্য করে সুঠাম ঘোড়ার দল ইয়োরোপ ছেড়ে চলে গেল, রূপবান ছবির ক্যানভাসে কেশর, খুরের চিহ্ন পড়ে আছে দেখো |
শুনি চিনদেশে পাখি নেই | ওরা যে ডাকাত ছিল, বলে কাকাতুয়া, ওদের বিলোপ ছিল বিষম জরুরি, জেনে রাখো | প্রয়োজন বুঝেছেন অন্তর বোঝেননি সাম্যবাদী, তাই গাছেরা নিঃসঙ্গ চিনে, মেঘেরা অনাথ | নাকি এতদিনে আলাস্কার সাইবেরিয়ার নীলাভ ধূসর টীল মানুষের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার কথা ভেবে, ক্ষমা করে ফিরেছে আবার ? ভয়ে-ভয়ে দেখে গেছে চিনাজল ? আমি যে পাখির চোখে সন্ত্রাস দেখেছি বহুবার |
কেবল আমরা এই পৃথিবী ভোগের অধিকারী— এই তত্ত্ব প্রচার করেছে কিছু দুর্জ্ঞেয় মানুষ সাম্য ও বৈষম্যবাদী, উভয়ত | মানুষের দেহে ক্রমে জমেছে হলুদ মেদ, কত শ্রমসংক্ষেপের ছালি | সংহার-সংবৃত নধরতা | যোদ্ধার সন্ততি শুধু প্রতিযোগী, দেখো লেবরেটারির কাচে অনুর্বর চোখ পেতে আছে | অপেক্ষায় |
এই পৃথিবীর শস্য মাছ তেল অ্যালকোহল লোভী ও অধীর পুরুষ-রমণী মিলে একদিন নিঃশেষে সাবাড় করে দেবে, মনে হয়, রেখে যাবে তাদের জেরক্স-কপি, যাদুঘর |
তারপর পুরুষের দিকে ফিরে তাকাবে পুরুষ রমণীর দিকে ফিরে তাকাবে রমণী সে যে সমবেদনায় নয়, মমতায় নয়, আজ বোঝাতে পারি না |
রতনপল্লীর পথ কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ১৯৮৩-২০০৭ ), ২০১০, থেকে নেওয়া |
ওই নীচে প্রান্তিক স্টেশন দেখা যায় | বোলপুরের মতো নয়, খিড়কিপথ, বৈষ্ণবকবির গান রবীন্দ্রকবিতা তাকে সমৃদ্ধ করেনি |
একগুচ্ছ শালফুল দোলাতে দোলাতে ভোরবেলা এদিকে আসছে কেউ খানিক চড়াই উঠে আচমকা দাঁড়াল | ওটা কি পাকুড়গাছ ? ওই সব ধরাশায়ী নক্ষত্র--- ওরা কি কাঠটগর ? মাথার ওপরে প্রায় কোকিলের মতো চোপা করছে--- ও কি বেনেবউ ? শহুরে মানুষ কিছু শনাক্ত করে না, গতকাল অন্ধকারে বহুক্ষণ ডাহুক ডেকেছে, ওর জানা নেই |
তারে বসা আঙুলপ্রমাণ কালো পাখি জোড়া-জোড়া | এই আছে এই নেই | শহুরে মানুষ জানে ও প্রণয় নয়, খিদের তাড়না | যেতে যেতে শহুরে মানুষ ফাঁপা থাম ছোঁয় কান রাখে অস্ফুট অথচ দ্রুত খবর চলেছে শুনতে পায় |
রতনপল্লীর পথ নির্জন ও উঁচুনিচু , শুখা অনাবিল শুখা খাল, লাল কাঁকরের চাঁই ভাঙা-ভাঙা আরে ওখানে ও কীসের ভাস্কর্য ? সারবন্দি প্রাচীন হাতির পিঠ ? না কি এ চোখের ভ্রম ?..
আধুনিক মানুষের বাড়ি ও বাগান, গেট দূরে নয়, ওই রিকশা দেখা যায়— শহুরে মানুষ দেখেছে, শান্তিনিকেতনে প্রকৃতি, জীবন, সবই পরিচ্ছন্ন, বড় বেশি পরিচ্ছন্ন, অঙ্গে তার অবক্ষিপ্ত মাপাজোখা শিল্পের সুষমা |
এই জন্মে কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ১৯৮৩-২০০৭ ), ২০১০, থেকে নেওয়া |
চুল নিয়ে লীলার বিষম ঝঞ্ঝাট--- একবার খোঁপা করে বাঁধে একবার এলিয়ে দেয় পিঠের ওপর ; একবার হলুদ রঙে ছোপায় একবার কালো দিয়ে মাজে এখন অনেক কৌশল শিখে নিয়েছে ও আগে কিছুই জানত না |
রাস্তার লোকগুলো কেমন অসভ্য চোখে তাকায় ! যে-কোনো ছুতোয় গা ঘেঁষে চলে যায়, ওতেই ওদের আনন্দ ! পরের জন্মে লীলা আর মেয়ে হয়ে জন্মাবে না | টুলুর বাবা বলে, “এবার পূজো-আচ্চায় মন দাও”, --- ওর বয়ে গেছে |
টুলু বলে, “এত সেন্ট মাখে কেন ?” --- বেশ করে, মাখে | টুলু খোঁটা দেয়, “শ্যাম্পু করেছ বুঝি ?” ---- ওর তাতে কী | টগবগে মেয়েটা যা ঠোঁটকাটা কোনদিন টুকে দিলেই হল : ‘বাবা আইন অমান্য করে জেল খেটেছিল, মানুষের করা আইন,
তুমি বলতে, বৃথাই, আর এখন তুমি নিজে তার চেয়ে বড় আইন অমান্য করে জেল খাটছ কী জন্যে ?’
বলে না, কারণ মেয়েটা মাকে ভালোবাসে মায়ের জন্য ওর কষ্ট হয় |
অলীক কাঠামো এই কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ১৯৮৩-২০০৭ ), ২০১০, থেকে নেওয়া |
শুধু নিজে বাঁচার তাগিদে মানুষ জঙ্গল কাটে, নিরালম্ব পশুপাখি পোষে | মানুষের ছেলে—সে-ও কী ছেলেমানুষ : দূরের হস্টেল থেকে চিঠি লেখে, “আমি ভাল আছি এ মাসে আরেকটু বেশি টাকা পাঠাইবে | প্রয়োজন |”
শীতের বিকেল | মাঠে বিনামূল্যে আলো | দলবদ্ধ আধ সিধা রয়েছে দাঁড়ানো শিল্পীর তুলির ছোঁয়া ধনিয়ায়, দোদুল বেগুনে, দেখো দেখো | সকলই অপেক্ষমাণ, মানুষ বিকৃত করে ক্রমাগত যা কিছু উদার ক্ষতের ওপর ছোড়ে ধুলো খয়রাত বাড়ায় যাতে আরো কমে যায় আয়কর | ভ্যাবাচাকা খেজুর বৃক্ষের ঘাড় জ্বালা করে কোলকুঁজো হাঁড়ির আশ্লেষে | পরশ্রমে দূষিত বৈভব, সব মানুষের হাই বারান্দায় ওড়ে সমস্ত দুপুর ঠোঁটচাপা ক্লিপের কৃপায় | ওদিকে মলম হাতে অকারণ ব্যতিব্যস্ত মিশনারিগণ |
হৃদয়হীনের বামহাতে ধরা শুশ্রূষার টিয়া সভ্যতার অলীক কাঠামো এই মানুষ গড়েছে বহুকাল ধরে | ভেঙে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে টাল খেয়ে আজও | আরো কতদিন ? কলির ব্রাহ্মণ আমি আমার কী শক্তি, তাকে দুই হাতে প্রণোদিত করি |
প্রভুকে জীয়াতে চাই দেবের নগরে কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ১৯৮৩-২০০৭ ), ২০১০, থেকে নেওয়া |
আজও বেহুলার জন্য কষ্ট হয় | কতটুকু মেয়ে--- খাটো লালপাড় শাড়ি, খোলা চুল | দেখতে পাই শুধু দুটি চোখের প্রতিজ্ঞা | তার জোরে ভাসানে চলেছে |
বিপুল সুন্দরবন জলা-জংলা | ধোপা, ডোম, জেলেদের গ্রাম | গাঙুরের দুই পাড়ে ওরা ভিড় করে | দেখে, কী বিচিত্র ভেলা, তাতে হিঙ্গুলের রং ময়ূরপুচ্ছের চন্দ্রাতপ কোলে পুরুষের শব, ওই রোগা মেয়ে বেহুলা চলেছে ধেয়ে মোহনার দিকে | কেন এত অন্ধকার ? দূর হরপ্পায় আমাদের অন্য এক বোন কুয়ো জানে, মাটি জানে, নিকোন উঠোনে বসে রুটি সেঁকে, পশুমাংস দিয়ে খায় তার শ্রান্ত স্বামী ও সন্তান | ওরা বহু পরিচ্ছন্ন শহর গড়েছে | কতকাল আগে, রুদ্ররূপ শিবের বন্দনাগান করে গেছে | প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে তিনি রক্ষা করেছেন |
তেরশো খ্রিস্টাব্দে এসে বাংলাদেশ, বাঙালির লৌকিক দেবতা নেতাধোবানির বাঁকে শিবঠাকুর | কীসের প্রতীক ? আমি ভাবি--- অশিক্ষা, আলস্য, অবক্ষয় ! সেই গান মনসামঙ্গল, ছন্দা লাচাড়ী ত্রিপদী !
যদি থাকে প্রেম কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ১৯৮৩-২০০৭ ), ২০১০, থেকে নেওয়া |
‘আমি কিছু রেখে যাচ্ছি’, একথা বলব না, কত লোকে পুরনো আসবাব, গ্রন্থ, ভাঙাবাড়ি, নানা আবর্জনা রেখে যায় উত্তরাধিকার, অকাতর আত্মকথা মিথ্যায় সাজানো | কিছু নেই তোমাকে দেবার --- কোনো নীল জামা, কাঁসার বাসন, আখরোট কাঠের বাটি--- উত্তর প্রজন্ম --- শুধু ছাপার অক্ষরে কয়েকটি কবিতা রইল | বইপড়া মানুষের জন্য লেখা বইপড়া মানুষের কথা | জানি না, দেখেছি কিনা তেমন অভ্রান্ত কোনো সুন্দরের ছবি যা তোমার ঐতিহ্য চেনাবে, অন্যদের পাশাপাশি একজীবন ক্ষুব্ধ হতাশায় কিছু তীব্র অনুরাগ লেখা আছে, চোখে দেখা ব্যর্থতার উদ্ধত গৌরব, অবিমৃশ্যকারী অভিমান | এই সব তোমাদের কাছে খুব কুন্ঠিত শোনাবে |
যৌবনের প্ররোচনা : প্রেম---- তাই ভাবা গিয়েছিল যা কিছু ভণিতা প্রবঞ্চনা, স্বভাববিরুদ্ধ, অন্ধ, যা কিছু কৃপণ, অসঙ্কোচে শুদ্ধ করে নেওয়া যাবে শিল্পে | কই, কেউ তা পারিনি | আজীবন দেখে গেছি মানুষ কী পরিতৃপ্ত নিপাট নির্ভার ! ভিতরে কোথাও তার জোড় খুলে গেছে মনে হয় | প্লাস্টিক নারীর বুকে রবারের স্তন মুখে প্রদর্শপ্রতিভা, কাচের ঠোঙায় ঠান্ডা দুধ হাতে পুরুষ চলেছে | আমি কতবার চিত্কার করেছি : . ‘সুমিত্রা বিশ্বাস, আপনি যেখানে থাকুন . শীঘ্র চলে যান ঘেরা প্যান্ডেলের কাছে— . সেখানে আপনার বন্ধু অপেক্ষা করছেন |’ কিন্তু যে একাগ্র, তাকে ফেরাতে পারিনি | মানুষের প্রসারিত মুখ কেউ ধুয়ে দিতে পারিনি চেষ্টায় | এই সব উপলব্ধি রেখে যাচ্ছি ছাপার অক্ষরে --- হয়তো সবই ভুল | ভুল নয় | বলে যাচ্ছি, ‘বিংশ শতকের অনেকটা সময় ছিল দীর্ঘ মলমাস | হিজিবিজি ফেনা সবই মুছে দেবে কাল | কিন্তু পারো উত্তর প্রজন্ম, তোমরা এখনো তো দৃঢ় ও নির্মম হতে পারো যদি থাকে প্রেম, মনে অতিক্রম থাকে |’
শব্দ টুলু কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় শামসুর রহমান ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “দুই বাংলার প্রেমের কবিতা”, ২০০৩, থেকে নেওয়া |
সকলেই ভাবে আমি টুলুর প্রেমিক সেই ছোটবেলা থেকে যখন ফোটেনি ওর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে মেয়েলি মুকুল, যখন ও হৃষ্টপুষ্ট বালিকাই--- খুশি হত টক—ঝাল চেখে আর সব সখীদের সঙ্গে, কথা বলে যেতো পুতুল-পুতুল— একথা যেমন সত্যি, অন্যভাবে তেমনই আবার সত্যি নয়, ও ছিল আমার বন্ধু, ও আমার একমাত্র পরামর্শদাতা--- তখন চারপাশে সব ভয়ঙ্কর লোকজন, টুলুই অব্যয়, টুলুই আমার কথা শুনতে ডাকে, বলে, বোসো, বন্ধ করো . খাতা টুলুই বলেছে, কবে বাবা গেছে টুরে আর মা গেছে বেড়াতে, টুলুই জানাতো কোন্ বুধবারে ভূগোলের টিউটর আসবে না, টুলুই শিখিয়েছিল গোপন ইচ্ছের কথা বলা যায় ছাতে, টিফিনের পয়সা থেকে অনুচিত ওর জন্য উপহার কেনা | মনে আছে, একদিন গিয়ে দেখি বাড়িময় বড্ড চেঁচামেচি--- টুলু বলেছিল, আর এসো না কমল, আমি বড় হয়ে গেছি |
সে সব কষ্টের কথা আজ কেন, বোঝানো যাবে না . কোনওদিন--- মেয়েদের বড় হওয়া লাল হয় ফল পেকে ওঠার মতন, গন্ধে তার পৃথিবী অস্থির হয়, আততায়ী করে প্রদক্ষিণ | দূর থেকে দেখে গেছি, কী ভাবে টুলুকে জব্দ করেছে যৌবন |
নিয়মিত দেখা হয় না, টুলুর অস্তিত্ব থাকে তবুও নির্ভুল— যখন সে মাঝে মাঝে পৌঁছে যায় এপাড়ার দর্জির দোকানে ফর্সা শাড়ি পরা এক সংসারে আবদ্ধ রাধাফুল খুব মৃদু চেনা গন্ধ পৌঁছে যায় অবচেতনার মাঝখানে |