‘স্ট্রেস সিরিজ’ থেকে একটি কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা”, ১৯৯১, থেকে নেওয়া |
হালকা গোলাপী আলোয় আঙুল তুলে আমার সঙ্গে কথা বলো কেন ! তোমার অস্বাভাবিক উঁচু নাক আমায় তাড়া করে ঘুমের মধ্যে | তর্ক করি না, তবু তোমার অকরুণ প্রশ্ন, উচিত কথাগুলো আমি বলেছি, সত্যি ? না ভীতু কাপুরুষ, চুপ করে মেনে নিয়েছি অপমান ? বিব্রত করো কেন শংরপ্রসাদ, আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাই |
রাজগীরে নিসর্গ সামনে, আমার অতীত নোটবুক খুলে দেখাও | তুচ্ছ দানখয়রাতের তালিকা মেলে ধরো | বই কিনি, পড়ি না, শুধু পেজমার্ক দিয়ে রাখি কেন জানতে চাও | কতোকাল আগে খেলতে খেলতে আমার ভাইয়ের সামনের দাঁত—মনে হয় পেছন থেকে ঠেলেছিলাম—আমি ভুলতে চাই |
কাত হয়ে শুয়ে থাকি, তুমি আমার ওপর তারের খাঁচা চেপে ধরো | শিক দিয়ে খোঁচাও | শান্তি নষ্ট হয় | চোখ বাঁচাতে লেজ বেরিয়ে পড়ে, আমার কষ্ট হয় | লোম ফুলিয়ে ভয় দেখাতে চাই, কিন্তু গলার কাছে ধুকধুক করে প্রাণ |
সাম্রাজ্য ফিরে পাবার আশায় কতো শাহেনশা পালিয়ে বেড়াচ্ছে | সাম্রাজ্যের লোভ নেই আমার | ঘুমোতে দাও শংকরপ্রসাদ | আমি মহৎ নই, সাহসী নই | আমি লেখাপড়া কিছু শিখিনি |
নারকোলগাছের ওপর মলমের মতো জ্যোত্স্না পড়েছে | ব্যান্ ডেজ বাঁধা শাদা বাড়িটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, একলা | তুমি যাও | আর একটু পরে আলো ফুটলে শান্তি | বসিরহাট বারুইপুর থেকে কলকাতায় ঢুকবে সারি সারি ট্রাক বোঝাই আরাম | . **************** . সূচীতে . . .
তিনটি ঘষা শব্দ কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা”, ১৯৯১, থেকে নেওয়া |
‘বিদায়’ শব্দটি আমি ধুয়ে মুছে পরিস্কার করি | কাদা, কালি, ময়লা সাফ করে ওকে রোদ্দুরে রেখেছি | এখন ওটাকে একটু তামাটে দেখাচ্ছে | দেখা যাক ‘দায়মুক্ত’ অর্থে ওকে ব্যবহার করতে পারি কিনা |
‘বিবাহ’ শব্দটি বড়ো চটচটে বলেই আমি কোনোদিন ওকে পছন্দ করিনি, মেয়েরা সিঁদুর দিয়ে ওই শব্দ চুলে মাখতে চায়— আমার অশ্লীল মনে হয় | পন্ডিত লোকের মতে, সামন্ততান্ত্রিক আর বিবর্ণ ‘বহন’ বিবাহ শব্দের সূত্র ! কে কাকে বহন করে আজ ? আমি ভাবি মুকুল ফোটার আগে গাছের বিবাহ হয় ? ডিম প্রসবের আগে কোন্ ভাইবোন পাখি— সমাজের সন্মতি নিয়েছে, জানতে চাই | বিবাহবন্ধন ! দুই কুকুরের যৌনগিট হিতবাদী মানুষ চেয়েছে ভালোবাসা শেখেনি বলেই |
‘বিদ্রোহ’ শব্দটি তুলে নেড়ে দেখি, নেড়েচেড়ে দেখি : সে-ও নয় তেমন ধারালো | ছোট-ছোট কাজে মানুষ ঘষেছে তাকে দীর্ঘকাল, ওই চাকু দিয়ে কেউ পেনসিল বেড়েছে কেউ ছাড়িয়েছে খোসা, ওকে দিয়ে আর কোনো বড় কাজ হবে না এখন |
অথচ অনেক কৃত্য রয়েছে স্থগিত দেখতে পাই, স্বাধীন ও অনুচ্ছিষ্ট শব্দের অভাবে কত ক্রিয়াকান্ড স্থগিত রয়েছে | মানুষকে বলতে চাই : যা কিছু বিকৃত তাকে দায়মুক্ত করো, তাকে দাযমুক্ত করো, বিদায় জানাও | . **************** . সূচীতে . . .
বাজার কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় অনুপকুমার মহাপাত্র সম্পাদিত “সহজ পাঠের কবিতা”, ২০০৩, কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
ভীমের মতন কাতলা অর্জুনের মতো পাকা রুই ডাক্তারবাবুর সামনে বলল না কিছুই উঠে এল প্রকাণ্ড ঝুড়িতে |
প্রবীণ ভেটকি ছিল স্থির, যেন যুধিষ্ঠির--- . মসৃণ শরীর, বীতক্রোধ, গর্ভিণী ইলিশ ছিল পাশে, কিলো কুড়ি শুনে সাহাবাবুদের গোমস্তামশাই মীন-দম্পতিকে তুলে হাসে |
ছিল বীর কর্ণ যেন নীল গল্ দা, বর্ম পরিহিত চোখে তার যুদ্ধের ইশারা ; ‘মোর অঙ্গ স্পর্শ করে এমন সাহস আছে কার ?’ ব্যাঙ্কের দু-চার জন ছাড়া ?
ভূপেন হাজারি—তার বেতন হাজার টাকা মাসে, পুত্রকন্যা ও তাদের জননীর মুখ মনে করে তিন বার চক্কর দিল, কোথাও থামল না— . সবশেষে দাঁড়াল যেখানে পাণ্ডবপুত্র হয়ে শুয়ে আছে পাশাপাশি ঈষৎ নরম চারা-পোনা | . **************** . সূচীতে . . .
টুলুর গন্ধ কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী সম্পাদিত “বাংলা কবিতার ভুবন”, ২০০৭, কাব্য সংকলন থেকে নেওয়া |
টুলু ও টুলুর বর--- একসঙ্গে ছানি কাটা হল, তার ফলে দুজনেই বেশি করে দেখে সবকিছু | যে-বস্তু আড়ালে তাও আলোকিত বলে আগুপিছু খুঁজে পায় অনায়াসে, তাই ওদের বিস্ময় ফুরোল |
বিস্ময় ফুরোনো, সে কী সাংঘাতিক, সে জানে সে জানে | পদবি বদল করে যে-টুলু এসেছে একদিন তার মেয়ে শরীরের মূল্য কমে গেলে যুক্তিহীন বেদনায় বিছানার ধুলো ঝাড়ে, ধুলো সবখানে |
টিভি সিরিয়াল তবু দুজনেরই রোজ দেখা চাই ; টুলুর আঙুলে কাঁটা, তাঁর হাতে পশমের গোলা— অভিভূত থাকে বলে, দুজনার মুখ ফোলা-ফোলা কিছুই ঘটে না কেন—বলে টুলু ফোঁপায় বৃথাই |
স্মৃতিভারাক্রান্ত আমি অন্ধ সেজে বসে থাকি পাশে, আচারের মৃদু গন্ধে নিহত পুলক ভেসে আসে | . **************** . সূচীতে . . .
দূর থেকে দেখা : বাবাকে কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভূমিকা সহ, পৃথ্বীরাজ সেন সম্পাদিত “দশ দিগন্তের বাংলা কবিতা” ২০১০, কাব্য সংকলন থেকে নেওয়া |
দেখো তোমার হাত ধরলাম, দেখো তোমার পা ছুঁয়েছি, একটু বসি তোমার ছায়ায়, বাবা, এখন রাগ কোরো না— চোখ মেলে চাও, তোমার কষ্ট খানিকটা দাও কুপুত্রকে |
মৃত্যু তোমায় বিষম শীতল করতে চাইছে--- নিরভিমান, একলা কেন প্রহর নিচ্ছ, আমি রয়েছি পায়ের কাছে কোথায় শত্রু দেখিয়ে দাও-না, বাবা, আমরা দুজন মিলে যুদ্ধ করি |
আজো আমায় দূরে রাখলে, তোমার জ্বরের ভাগ দিলে না, একলা তুমি কি শক্তিমান--- ময়দানবের সঙ্গে লড়ো ! শেষে তোমার পরাস্ত মুখ আমার মলিন রুমাল দিয়ে মুছতে হল !