কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
লক্ষ্মীছাড়ার ধারাভাষ্য
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা”, ১৯৯১, থেকে নেওয়া |


আমি সব দেখে যাচ্ছি, অদ্য নয়, বাল্যকাল থেকে
কিলবিলিয়ে সংখ্যা বাড়ে, সন্ত্রাসে ইনসান উবে যায় |
মাতৃগাছে প্রথম পুরুষ্ট ফল, আমি লক্ষ্মীছাড়া,
নির্দোষের দন্ডকথা, গোপন হিংসার কথা লিখি |
নিসর্গের মড়াকান্না, রাস্তাময় স্খলিত চপ্পল –
টুকে রাখছি গোটা গোটা শব্দে এক রুলটানা খাতায় |
বাল্যকাল থেকে দেখছি, অনটনে ক্লিষ্ট কত প্রাণ
নীরবে নিশ্চিহ্ন হয় |  দেহটি উর্বর হল কিসে ?
লজ্জায় সে-প্রশ্ন কেউ করল না, বা করতে ভুলে গেল
ধাক্কা দিতে দিতে তুলল খড়বোঝাই ট্রাকে সন্ধেবেলা |
মিথ্যা বলি নাই জ্ঞানে, অর্ধসত্য তরাসে কদাচ
আত্মরক্ষা ছাড়া কোনো অভিসন্ধি কখনো ছিল না |
আজ মাতৃপিতৃহীন একলা ভাজি ভেরেন্ডার বড়া,
দেখছি, গাঁদাপুষ্প হয়ে সাক্ষাৎ দিদিমা এসেছেন !
‘স্বর্গেও কি গাদাগাদি ? পূণ্যবলে ফুলজন্ম পেলে ?
অমরত্ব চাও ?’  বলি, ‘এক্ষুনি স্তবকে ঢোকো’, ওই  
অচঞ্চল সৈন্যদল, হাঁটি হাঁটি রাষ্ট্রপতি যান
আড়চোখে তাকান--- ওরে দেহরক্ষী সটকালি কোথায় !
সমষ্টি মানুষ নড়ছে, গাছতলায় ব্যক্তি আছে খাড়া,
নিউদিল্লি শাসাচ্ছে – বেশি ট্যাফো করলে মুন্ডু কেটে নেবে !
ফুটপাথে শনির চিত্র, গড় করছে চেয়ারম্যানের ব্যাটা,
বিজ্ঞানের কৃতীছাত্র, বিজ্ঞান চেতনা ক্লাশে ফেল !
উঠতে উঠতে মুখ থুবড়ে পড়ছে ক্লীব ইকুইটি বাজার !!
আমার হাততালি শুনে বউ বলল, ‘বাউরা হলে নাকি ?’
ডাক্তারের কাছে যাই  সে বলে, ‘টেনশন আর ধোঁয়া
চিত্কারের সঙ্গে ঢুকে কলকব্জা নড়বড়ে করেছে |’
অগত্যা ক্যাপসুল গিলি, স্বপ্নে দেখি ক্যাপসুলের সভা :
‘বন্ধুগণ, রক্তদান চক্ষুদান কোরো না কক্ষনো,
খোল নলচে বদলে গেলে যা নেবার সর্বহারা নেবে
আধখানা পাইরুটি দেবে বুদ্ধিজীবী ব্যক্তির খোরাকী |’
তদ্দিন এক কোণে বসে দেখি, ওরা সালিশী চালাক
যাতে রক্ষা পায় সব দুষ্ট শিষ্ট প্রেমিক-অপ্রেমী |
তোমরা যারা যুবশক্তি --- অষ্টাদশ-দশী ভবিষ্যৎ
দিত্সা ত্যাগ করে যাও, যাও হে ভনভন করো গুড়ে  |
আপাতত গুড় সত্য, গুঢ় ধর্ম, গুড়াকাঙ্ক্ষা খাঁটি,
কোথা কে আঙুল চুষছে ভেবে কেন মন খারাপ করা |

এই সবই টুকে রাখছি ভয়ে-ভয়ে, কিছুটা স্পর্ধায়—
জাঙাল টপকিয়ে যদি দু-চারটি মুমুক্ষু টিকে যায় |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
‘স্ট্রেস সিরিজ’ থেকে একটি
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা”, ১৯৯১, থেকে নেওয়া |


হালকা গোলাপী আলোয় আঙুল তুলে আমার সঙ্গে কথা বলো কেন !
তোমার অস্বাভাবিক উঁচু নাক আমায় তাড়া করে ঘুমের মধ্যে |  তর্ক
করি না, তবু তোমার অকরুণ প্রশ্ন, উচিত কথাগুলো আমি বলেছি,
সত্যি ?  না ভীতু কাপুরুষ, চুপ করে মেনে নিয়েছি অপমান ?  বিব্রত
করো কেন শংরপ্রসাদ, আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাই |

রাজগীরে নিসর্গ সামনে, আমার অতীত নোটবুক খুলে দেখাও |  তুচ্ছ
দানখয়রাতের তালিকা মেলে ধরো |   বই কিনি, পড়ি না, শুধু পেজমার্ক
দিয়ে রাখি কেন জানতে চাও |  কতোকাল আগে খেলতে খেলতে আমার
ভাইয়ের সামনের দাঁত—মনে হয় পেছন থেকে ঠেলেছিলাম—আমি
ভুলতে চাই |

কাত হয়ে শুয়ে থাকি, তুমি আমার ওপর তারের খাঁচা চেপে ধরো |
শিক দিয়ে খোঁচাও |  শান্তি নষ্ট হয় |  চোখ বাঁচাতে লেজ বেরিয়ে
পড়ে, আমার কষ্ট হয় | লোম ফুলিয়ে ভয় দেখাতে চাই, কিন্তু গলার
কাছে ধুকধুক করে প্রাণ |

সাম্রাজ্য ফিরে পাবার আশায় কতো শাহেনশা পালিয়ে বেড়াচ্ছে |
সাম্রাজ্যের লোভ নেই আমার |  ঘুমোতে দাও শংকরপ্রসাদ |  আমি
মহৎ নই, সাহসী নই |  আমি লেখাপড়া কিছু শিখিনি |

নারকোলগাছের ওপর মলমের মতো জ্যোত্স্না পড়েছে |   ব্যান্ ডেজ
বাঁধা শাদা বাড়িটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, একলা | তুমি যাও |  আর একটু
পরে আলো ফুটলে শান্তি |   বসিরহাট বারুইপুর থেকে কলকাতায়
ঢুকবে সারি সারি ট্রাক বোঝাই আরাম |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তিনটি ঘষা শব্দ
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা”, ১৯৯১, থেকে নেওয়া |


‘বিদায়’ শব্দটি আমি ধুয়ে মুছে পরিস্কার করি |
কাদা, কালি, ময়লা সাফ করে ওকে রোদ্দুরে রেখেছি |
এখন ওটাকে একটু তামাটে দেখাচ্ছে  |  দেখা যাক
‘দায়মুক্ত’ অর্থে ওকে ব্যবহার করতে পারি কিনা |

‘বিবাহ’ শব্দটি বড়ো চটচটে বলেই
আমি কোনোদিন ওকে পছন্দ করিনি,
মেয়েরা সিঁদুর দিয়ে ওই শব্দ চুলে মাখতে চায়—
আমার অশ্লীল মনে হয় |
পন্ডিত লোকের মতে, সামন্ততান্ত্রিক আর বিবর্ণ ‘বহন’
বিবাহ শব্দের সূত্র !
কে কাকে বহন করে আজ ?  আমি ভাবি
মুকুল ফোটার আগে গাছের বিবাহ হয় ?
ডিম প্রসবের আগে কোন্ ভাইবোন পাখি—
সমাজের সন্মতি নিয়েছে, জানতে চাই |
বিবাহবন্ধন ! দুই কুকুরের যৌনগিট হিতবাদী মানুষ চেয়েছে
ভালোবাসা শেখেনি বলেই |

‘বিদ্রোহ’ শব্দটি তুলে নেড়ে দেখি,
নেড়েচেড়ে দেখি :
সে-ও নয় তেমন ধারালো |
ছোট-ছোট কাজে
মানুষ ঘষেছে তাকে দীর্ঘকাল,
ওই চাকু দিয়ে কেউ পেনসিল বেড়েছে কেউ ছাড়িয়েছে খোসা,
ওকে দিয়ে আর কোনো বড় কাজ হবে না এখন |

অথচ অনেক কৃত্য রয়েছে স্থগিত
দেখতে পাই,
স্বাধীন ও অনুচ্ছিষ্ট শব্দের অভাবে কত ক্রিয়াকান্ড স্থগিত রয়েছে |
মানুষকে বলতে চাই :
যা কিছু বিকৃত তাকে দায়মুক্ত করো, তাকে দাযমুক্ত করো,
বিদায় জানাও |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বাজার
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
অনুপকুমার মহাপাত্র সম্পাদিত “সহজ পাঠের কবিতা”, ২০০৩, কবিতা সংকলন  থেকে
নেওয়া |


ভীমের মতন কাতলা
অর্জুনের মতো পাকা রুই
ডাক্তারবাবুর সামনে বলল না কিছুই
উঠে এল প্রকাণ্ড ঝুড়িতে |

প্রবীণ ভেটকি ছিল স্থির, যেন যুধিষ্ঠির---
.        মসৃণ শরীর, বীতক্রোধ,
গর্ভিণী ইলিশ ছিল পাশে,
কিলো কুড়ি শুনে সাহাবাবুদের গোমস্তামশাই
মীন-দম্পতিকে তুলে হাসে |

ছিল বীর কর্ণ যেন নীল গল্ দা, বর্ম পরিহিত
চোখে তার যুদ্ধের ইশারা ;
‘মোর অঙ্গ স্পর্শ করে এমন সাহস আছে কার ?’
ব্যাঙ্কের দু-চার জন ছাড়া ?

ভূপেন হাজারি—তার বেতন হাজার টাকা মাসে,
পুত্রকন্যা ও তাদের জননীর মুখ
মনে করে তিন বার চক্কর দিল, কোথাও থামল না—
.                সবশেষে দাঁড়াল
যেখানে পাণ্ডবপুত্র হয়ে শুয়ে আছে পাশাপাশি
ঈষৎ নরম চারা-পোনা |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
টুলুর গন্ধ
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী  সম্পাদিত “বাংলা কবিতার ভুবন”, ২০০৭, কাব্য
সংকলন থেকে নেওয়া |


টুলু ও টুলুর বর--- একসঙ্গে ছানি কাটা হল,
তার ফলে দুজনেই বেশি করে দেখে সবকিছু |
যে-বস্তু আড়ালে তাও আলোকিত বলে আগুপিছু
খুঁজে পায় অনায়াসে, তাই ওদের বিস্ময় ফুরোল |

বিস্ময় ফুরোনো, সে কী সাংঘাতিক, সে জানে সে জানে |
পদবি বদল করে যে-টুলু এসেছে একদিন
তার মেয়ে শরীরের মূল্য কমে গেলে যুক্তিহীন
বেদনায় বিছানার ধুলো ঝাড়ে, ধুলো সবখানে |

টিভি সিরিয়াল তবু দুজনেরই রোজ দেখা চাই ;
টুলুর আঙুলে কাঁটা, তাঁর হাতে পশমের গোলা—
অভিভূত থাকে বলে, দুজনার মুখ ফোলা-ফোলা
কিছুই ঘটে না কেন—বলে টুলু ফোঁপায় বৃথাই  |

স্মৃতিভারাক্রান্ত আমি অন্ধ সেজে বসে থাকি পাশে,
আচারের মৃদু গন্ধে নিহত পুলক ভেসে আসে |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দুহাত তুলে বলেছিলাম
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়  সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়” ২য় খণ্ড, ১৯৯৩, কাব্য
সংকলন থেকে নেওয়া |


দুহাত তুলে বলেছিলাম--- ফিরিয়ে নাও
.                আমায় তোমার চাকর করো,
আমার চোখের নোন্ তা জলে আলতা পরো
.                চুল ভিজিয়ে বেণী বানাও—
দুহাত তুলে বলেছিলাম, ছুঁয়েই দেখো
.                সবটা হয়তো পাথর হয়নি,
একটুখানি সেঁক পেলে তো গলতে পারে
.                বুকের খাঁচা, খাঁচার পাখি, পাখিটার বুক |
তুমি এমন কৃপণ হয়েছ, দিলে না সুখ
.                স্বস্তিও না—
এবার নষ্ট হলে আমায় দোষ দিও না |
বলেছিলাম, বসে থাকব,
.                চিরটাকাল ধুলো হয়ে পাশেপাশে থাকব—
যতদিন না চটির থেকে একটু গোবর
.                দিয়ে আমায় শুদ্ধ করছ |
চিরকাল যে অনন্তকাল . . . শুষ্কতা যে বড়ো অসুখ ! . . .
দেখা হয় না, দেখা হয় না,
.                কোন্ বিদেশে বুড়ো হচ্ছ
দিয়ে যাও সেই একটা খবর |
তুমি এমন কৃপণ রইলে, দিলে না সুখ
.                স্বস্তিও না---
এবার নষ্ট হব, আমায় দোষ দিও না |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দূর থেকে দেখা : বাবাকে
কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভূমিকা সহ, পৃথ্বীরাজ সেন  সম্পাদিত “দশ দিগন্তের বাংলা কবিতা”
২০১০, কাব্য সংকলন থেকে নেওয়া |


দেখো তোমার হাত ধরলাম, দেখো তোমার পা ছুঁয়েছি,
একটু বসি তোমার ছায়ায়, বাবা, এখন রাগ কোরো না—
চোখ মেলে চাও, তোমার কষ্ট খানিকটা দাও কুপুত্রকে |

মৃত্যু তোমায় বিষম শীতল করতে চাইছে--- নিরভিমান,
একলা কেন প্রহর নিচ্ছ, আমি রয়েছি পায়ের কাছে
কোথায় শত্রু দেখিয়ে দাও-না, বাবা, আমরা দুজন মিলে যুদ্ধ করি |

আজো আমায় দূরে রাখলে, তোমার জ্বরের ভাগ দিলে না,
একলা তুমি কি শক্তিমান--- ময়দানবের সঙ্গে লড়ো !
শেষে তোমার পরাস্ত মুখ আমার মলিন রুমাল দিয়ে মুছতে হল !

ভেবেছিলাম নালিশ করবে : কাঠের শয্যা কষ্টদায়ক,
ভেবেছিলাম নালিশ করবে :  প্রখর জ্যৈষ্ঠে অগ্নিশিখা ?
যেন তোমার যায়-আসে-না, ক্ষমার চোখে নিষ্ঠুরতা স্নেহ-সমান |

এক মুহূর্তে কেমন করে নিরভিমান অনন্তমূল
হতে পারলে ? বাবা তোমার গায়ের গন্ধ আলনা-জোড়া—
সাধের চেয়ার ছেড়ে দিচ্ছি,  যেও না, বসে কাগজ পড়ো ;

এবার তোমার হাত ধরলাম--- এবার তোমার পা ছুঁয়েছি
মুখ ফিরিয়ে যেও না, একটু দাঁড়াও --- বলো, ক্ষমা করো নি কুপুত্রকে |

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর