কবি সতীশচন্দ্র রায়-২ এর কবিতা
*
আজি
কবি   সতীশচন্দ্র রায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত, বঙ্গদর্শন [ নবপর্য্যায় ], বৈশাখ ১৩১১ (মে ১৯০৪) সংখ্যায়
প্রকাশিত।


আজি পূর্ণ হ’ত যদি আজিকারি মাঝে!
তপনখচিত এই নভ চন্দ্রাতপ,
সুগভীর নীল ছটা মাথায় বিরাজে,
বান্ধববিটপী যত পল্লব-সৌষ্ঠব
বিকাশে কবির মত সুন্দর প্রচুর,---
সহকারে বাড়ে ফল নিটোল কঠিন
সরস কৈশোরসম! তপ্ত সুমধুর
সোমরসসম আলো! জরালসহীন
সারাদিন চলে যায়---ক্ষণে কর্ম্মপর,
ক্ষণে নেত্রবারিমোছা, ব্যথিত অন্তর,---
কতু তীব্র রৌদ্রালোকে বহ্নিময় পথে
চলে যাওয়া বহুদূর বাধাহীন পদে,
কভু স্থির বসে থাকা ক্ষান্ত দিয়া কাজে!
আজি পূর্ণ হয়ে যাক্ আজিকার মাঝে।

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিশীথিনী
কবি    সতীশচন্দ্র রায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত, বঙ্গদর্শন [ নবপর্য্যায় ], বৈশাখ ১৩১১ (মে ১৯০৪) সংখ্যায়
প্রকাশিত। কবির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত বলে তাঁর নামের আগে স্বর্গীয় চিহ্ন দিওয়া হয়।
আমরাও সেইভাবেই এখানে তুলে দিলাম। কবিতাটি, ১৯৯১ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেন
সম্পাদিত "বাংলা কবিতা সমুচ্চয়" প্রথম খণ্ডে সংকলিত করা হয়েছিল।


সোনার সন্ধ্যার পরে এল রাত্রি, বিকাশিল তারা,
দিগন্ত মিলায় বনে, নভস্তল চন্দ্রকলাহারা।
কালো অন্ধকার যেন কালো এক ভ্রমর বিপুল
আবরিয়া বসিয়াছে মধুময় ধরণীর ফুল।
সেই আলো-প্রস্ফুটিত লক্ষদল কুসুম সুন্দর,
তারি ‘পরে বিস্তারিয়া কালো ডানা, গভীর অন্তর
বিদারি’, অতল মধু বিহ্বলিয়া করিতেছে পান,
ধরণী-গগনে লাগে মধুরস-জোয়ারের টান!
রসভরা বহে বায়ু বনস্পতিশাখায় সঞ্চরি,
রসাবেশে বনস্পতি আপনারে রেখেছে আবরি!
প্রান্তরের ক্ষুদ্রতম তৃণমুখে লাগিয়েছে শিশির,
অতল নিদ্রার রসে ডুবে গেছে জীব ধরণীর।
সত্য কোথা নাহি জানি, নাহি জানি সত্য কারে কই,
মনে হয় এ আঁধার একেবারে নহে রস বই!

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দুঃখদেবতার মূর্তি
কবি সতীশচন্দ্র রায়
চৈত্র ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে ( এপ্রিল ১৯৯১ ) প্রকাশিত, প্রমথনাথ বিশী ও তারাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত
"কাব্যবিতান" কাব্য সংকলনের কবিতা।


পশ্চিম দিগন্তে যেথা গভীর সিঁদুর
যেন কোন উপন্যাস-রাজার মহাল-মালা
ভাঙিয়া পড়েছে চুর-চুর---

যেথা ওই ঊর্ধ্বভাগে                                সন্ধ্যার কালিমা লাগে
মসীর প্রাকার যেথা বনান্ত সুদূর---
যেথা জানি তরঙ্গিণী                                পড়িয়া বনের ছায়ে
লোটায়ে কাঁদিছে রুদ্ধসুর---
সেখানে বসিয়া আছে,
কষ্টে শ্লথ গ্রীবা ’পরে
স্থির রাখি’ মাথাখানি তার---
বেশবাস অযত্নশিথিল
ঢালা বাহু স্ফুরে বার বার!

বিরাট সে পুরুষের ছবি!
বিরাট তাহার দেহ,                                নভ-কেন্দ্রে উড়ে কেশ,
গভীর সিঁদুর-আভা লভি’!
বয়ান স্ফুরিছে মাঝে,                                বনান্ত-প্রাকার ’পর
বসেছে সে---পদতলে তামসী জাহ্নবী ;
তামসী জাহ্নবী কাঁদে ফুলে ফুলে করি সোর,
গেছে দিন, কোথা গেছে রবি!

সুর্য কোথা গিয়াছে ঘুরিয়া
দুঃখের মু’খানি হের                                গভীর ব্যথায় ওই
রক্তরাগে যাইছে পুড়িয়া!
শুন, সে একটি গাহে গান---
মনে লয় চরাচর                                শুনিয়া সে গীতস্বর
হয়েছে হৃদয়ে কম্পমান!
“আমার সহস্র বাহু ভুবনে গেছিল ছুটে
মোর যত বেশবাস নভে পড়েছিল লুটে!
সারাদিন কলনদী ধুয়ে মোর পদতল
কুসুমিত তীর হানি’, বহেছিল নিরমল।
ফুল-ফল লতা পাখী আমারে ঘিরিয়া সবে
সারাদিন নেচে নেচে ছুটেছিল কলরবে।
লক্ষ নরনারী-প্রাণ গাহিয়া আনন্দগান
আমারি হৃদয় ’পরে হয়েছিল লুণ্ঠ্যমান।
শত মরকত মাঠে এলাইয়া মহাকায়
মাথাটি হেলায়ে দিনু পর্বত-পাদপছায় ;
ধরার জীবনরস পশিয়া সর্বাঙ্গে মোর
বিহ্বল করেছে মোরে, সুখমদে ছিনু ভোর!
কোথা ছিল দুঃখ, হায়, লুকায়ে ঘুঘুর মত
সুদূর মরম মাঝে ? ---সুথ সে কেমন হত ?
.        হায় কি অশুভ খন!
.        দেবতা কি দুরজন,
.        দুরদৃষ্ট পড়িল ঝরিয়া
.        নভতল ভস্মে আবরিয়া!
.        নয়নে পড়িল মোর ছাই,
.        আর কিছু দেখিতে না পাই!
.        চারিধারে ফিরিছে আঁধার,
.        মাথায় নামিছে গুরুভার!
সাপিনীর ফণাসম তমফণা তুলি’
সহসা কে দাঁড়ায়েছে দশদিক্ খুলি’।
আনন্দশয়ন ছাড়ি’ উঠিনু আয়াস ভরে---
থর থর কাঁপে তনু, মাথা ঢুলে ঢুলে পড়ে।
.        কেবল এ গভীর ব্যথায়
.        আননে সিঁদুর-রাগ ধায়!
দুরবল পদতলে কাঁদিছে আকুল জল,
হৃদয়ের মাঝে শুধু চেয়ে দেখি অবিরল!
সেথা কোনে ভস্মগিরি চূর্ণ হয়ে উড়ে যায়,
সব ম্লান হয়ে আসে! ভস্মে সব ভস্ম ছায় ?
কাঁপিতেছে কর পদ, মুহুঃ কাঁপিতেছে শির,
হে রজনি, তব শয্যা ঢালো ঘোরা রজনীর!
একটি মরণ সেথা নিভৃতে মিলায়ে দিব---
এ বিরাট দুর্বলতা বিস্মৃতিরে সমর্পিব!
বনরাজি যদি চায়, যেন সে সংগীত গায়
শিয়রে দাঁড়ায়ে মোর রজনীর কিনারায়!
সে মৃত্যুর শান্তি ’পরে তামসীর চূড়াদেশে
দু’চারিটি স্মৃতিফুল হয়তো আসিবে ভেসে
তোমার স্বকর হতে, মধুর তারকা-রূপে
চারিটি প্রহর ধরি, রজনী সে চুপে চুপে
দাঁড়ায়ে কাঁদিবে একা,---ক্রমে শীর্ণ গণ্ড তার
পাণ্ডুর ললাটে তার চুম্ব রাখি, মেলি দ্বার
বিজয়ী দিবস এসে, টেনে লবে আলো’পর---
নীলাম্বরে ঝরে যাবে জ্যোতি-বৃষ্টি ঝর ঝর!
তারকা চমকি দিয়া মূর্ছি দিয়া চরাচর
জ্যোতির আনন্দ-গান উল্লসিবে নভোপর।”

.        এই সুরে সন্ধ্যা মরে যায়
.        কাঁদে বসি বিশ্ববাসী লোক!
.        মোর প্রাণ ব্যথা-পরিপূর
.        হইয়ে বিরাট এক শোক
.        লুটি পড়ে সহস্র ছায়ায়
.        তারা সনে কাঁদিছে বিধুর॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . .
.
  


মিলনসাগর
*
কবির বিকল্প
কবি সতীশচন্দ্র রায়
চৈত্র ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে ( এপ্রিল ১৯৯১ ) প্রকাশিত, প্রমথনাথ বিশী ও তারাপদ মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত "কাব্যবিতান" কাব্য সংকলনের কবিতা।


আমি তব বাগানের ফুলতরু সখা।
রজনী শিশিরে সেঁচি বিমল করিবে, তনু,
ঝরিবে আমার শিরে ভ্রষ্ট তারকা!
গভীর নিশীথকালে অপ্সরী অমৃতকণা
দুলায়ে অলকে মোর ফিরিবে অলকা।
সারারাতি সঞ্জীবনরস করি পান
প্রাণ ভরি সঞ্চি লব তব প্রেমগান।

খদ্যোতেরা সারারাতি জ্বালায়ে অধীর বাতি
ইন্দ্রের নয়নসম রবে চারিধার।
আমার কুসুমকলি তাহাদের অনুকারে
নবীন উঠিবে ফুটি, বিন্দু সুষমার ;---
পরানের আশেপাশে ফুল-ফোটা অনুভবি
গম্ভীর দাঁড়ায়ে রব আনন্দে অপার!
প্রভাতে তোমারি বাণী কিরণে ভরিয়া
তুলিবে পরাণ মোর আকুল করিয়া!

আনন্দে বাহিরে যাবে কবিতা-কুসুম!
স্বরগের নিদ্রা শেষ চক্ষে মোর লেগে রবে
ললাটে রহিবে মোর অপ্সরার চুম।
নরনারী ডালা লয়ে আসিবে তুলিতে ফুল
পড়ে যাবে হরষের কোলাহল ধুম।
পল্লবপরশ সম সম্ভাষি শীতল
তাহাদের চিত্তে দিব শান্তি নিরমল!

তোমার পবন মোরে লুটিবে হরষে,
তব জ্যোতি তব বায়ু তব দান পরমায়ু
ভোগ করি বেড়ে যায় বরষে বরষে!
সহসা দেখিব চাহি---আমি রে অমর-তরু,
আর ত এ শাখা হতে পত্র নাহি খসে!
রজনীর আশীর্বাগ, তারকার প্রীতি,
মানবের প্রেম মোরে ঘিকে নিতি নিতি!

ধরা ঘুরে চন্দ্র ঘুরে দিবা রাতি আসে,
গড়ায় গ্রহের দল গগন প্রাঙ্গণে,
কভু ইন্দ্রধনু উঠে, কভু ধূম্রকেতু ছুটে,
সোহাগ করিছে রাহু রবি চন্দ্র সনে---
আমি রে অমর তরু --- কল্পতরু নাম,
কুসুম ফুটিছে মোর শাখে অবিরাম॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর