কবি শমীন্দ্র ঘোষের কবিতা
বোকার ভালবাসা
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১২। প্রকাশিত হয়েছে  ২০১২ থেকে ফেসবুকে, ব্লগে এবং পশ্চিমবঙ্গের
১৩টি পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাতে।


আমি শুধু বোকার মতন ভাবতাম---
বুঝি ভালোবাসলেই পাওয়া যায় ভালোবাসার দাম!
ভালোবাসার পাপড়িগুলো বুঝি ঝ'রে ঝ'রে পড়ে
আমার সর্বাঙ্গে মনের ভিতর ঘরে,
সেই ঘরে পাপড়িগুলো থরে থরে থাকে সাজানো
ভ্রমরের গুঞ্জন, সুগন্ধ মন আনন্দঘন,
আশা রাখে বিশ্বাস খোলা নিশ্বাস হবে না ক্ষয়
---এ যেন আপনতম ঘর ভালোবাসাময়!
#
আমি বোকার মতন শুধু ভাবতাম,
ভালোবাসলেই বুঝি ভালোবাসামাখা নাম
আমার পথের পাশে হেসেহেসে
.                  বৃষ্টির মতন নেমে আসে,
ভোরবেলাকার গান,
.                    যেন আলোক হয়ে জানায় আহ্বান,
সেই হসি-গান-বৃষ্টি ধুইয়ে দেবে পথের  ক্লান্তি-ক্ষত,
ভেঙে দেবে রুদ্ধদ্বার, খুলে দেবে বন্ধ পথও।
---এসব শুধু বোকার মতন ভাবতাম!
বুঝি ভালোবাসলেই এমন সত্যি ঘটে,
.                                        তাই ভালোবাসতাম!
#
এই সমাজে সমাজ মিলেছি যবে
.                                    মানুষই আমাকে শেখালো--
ভালোবাসলেই ভেবোনা তুমি--- ভালোবাসা  পাবে,
ভালোবাসা পেলে বুঝোনা, সেখানে ভালোবাসা ছিল।
এখানে ভালোবাসা আছে, আমাকেও ভালোবাসে
বস্তু-পণ্য নিরিখে অনেকে শুধু হিসেব কষে।
#
তবুও যদি রাতের তারারা আকাশে জোনাকির দীপ জ্বেলে
.                                                                  ভালোবাসা
রাখে
জ্যোত্স্নার চাঁদ পাতার ফাঁকে ফাঁকে বিলিকেটে
.                                                      আলপনা আঁকে
যদি, নিকটে বা দূরে নূতনের সুরে
.                                        বাজে বাঁশি


যদি, হৃদয় মথিত উদাত্ত স্বর বলে  ওঠে---
.                                                  'ভালোবাসি',
যদি, প্রভাতের শ্বাস আলো উদ্ভাস
.                                        চুমু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় মাটিতে,
বাউলের গান আগমনী প্রাণ
.                                ভাসে, এপথে হাঁটিতে হাঁটিতে
যদি, কোনো টুকরো দুপুরে বড় কাছাকাছি
.                      নির্জন কোণে এসে একজনে বলে---
.                                                              'আমি আছি',
সেই সেইখানে প্রবাহিত মনে
.                                    বিভোরে গাই!
আমি আবারও ভালোবেসেফেলি,
.                                      আমি বোকা হয়ে যাই!

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
তবু জেগে আছি
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০০২। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আন্দোলন”-এ ২০১৪ তে এবং তত্পূর্বে মাসিক
পত্রিকাতে প্রকাশিত।


পারলে একটা স্বল্প-মনার গল্প লিখো তুমি
অন্ধকারের রান্নাঘরে হারিয়ে গেছে যে
শয্যা-কাঁটায় রক্ত ঝ'রে  রিক্ত হলো ভূমি
অবসন্তে হাওয়া-হাহন্তে আমি সাধারণ মেয়ে।
#
ছোটবেলা পুতুলখেলা হাতগুলো আজ নেই,
চল-দুরন্ত মন-ছুটন্তর পায়ের পাতা ফাটা,
গায়ে হলুদ সিঁদুর-খেলা মন্ত্রে বাঁধা যেই---
সবাই আছে নিজের কাছেই, আমার মাথা কাটা!
#
দীর্ঘ, বড় দীর্ঘ এ-পথ, দীর্ণ শুধুই 'একা',
পাথর-জলে  জঙ্গলে মন-মানুষ খুঁজি আজও!
মধ্য-সাগর ঘুর্ণী-গুমর, বাইরে না যায় দেখা,
সেই ভিতরে "স্বপ্ন-মানুষ" কল্পনাতে বাজো!
#
উতল বুকে জ্বলে ফগুন আগুন ঝরানো,
ডুকরে ওঠা ঝড়-ছোটাকে--- দেখার চোখে দেখো,
স্নিগ্ধ সতেজ স্পর্শে আবার প্রাসাদ বানানো,
নূতন যুগেই উঠছি জেগে--- এই কথাটাও লিখো।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
করো দান
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১৩। দাবদাহ পাক্ষিক পত্রিকা, জুলাই, ২০১৩ এবং বঙ্গসমাজ পত্রিকায়
২০১৪, ব্লগে ২০১৪-তে প্রকাশিত।


আমাকে দাও আরও
যতটা আছে যতটা পারো--
.      বিষ, নাহয় অমৃত,
ভালবাসো নাহয় করো আহত
.              তোমার শেষ শক্তিতে
.              পৃথিবীর ক্রমমুক্তিতে।
#
যা কিছু তোমার আছে সঞ্চয়
.                      তা নেবে কোথায়,
.                            যাবে বা কোথায়?
পরোকাল বলে তো কিছু ছিল না,
.                              নেই আজও,
.                      যা আছে ভরা সঞ্চয়ে,
.      আমাকে দান ক'রে তা
.                              আনন্দে বাজো।
#
তুমি করো দান পারো যত
.                    হয়ে অকুতনির্ভয়,
শুধু বিষ, নাহয় অমৃত,
.                    অন্য কিছু নয়।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
শাহবাগকে শ্রদ্ধা
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১৩। শাহবাগ আন্দোলনকে উত্সর্গকৃত ও প্রকাশিত: ফেসবুকে এবং
শাহবাগে ; ফেব্রুয়ারি ২০১৩, পেট্রাপোল সীমান্তে শাহবাগ সংহতিমঞ্চের মিছিলে।


পঠিত-গীত, ফেব্রুয়ারি ২০১৩

শাহবাগ আজ ডাক পাঠাল----
.              বাংলাজুড়ে খবর দে,
গোষ্ঠে গোষ্ঠে ঘেরাও ক'রে
.              মৌলবাদরে কবর দে।
ঘৃণ্য পিশাচ রক্তলোলুপ
.              আর যেন না মাথা তোলে,
রক্ত যেন আর না ঝরে
.              স্নেহের-ছায়া-মায়ের কোলে।
কর প্রতিরোধ, মগজ শানা
.              বাংলা গড়ার আনন্দে
কাঁধ মিলিয়ে পরস্পরে
.              মৌলবাদরে কবর দে।
#
মুক্তি-হাওয়া আজান দিলো
.              মুক্তির গান আজন্মের
উড়ছে ধুলো পদধ্বনির
.              নতুনতর প্রজন্মের।
বাঁধভাঙা ওই জনস্রোতই
.              পথ ক'রে নেয় সানন্দে
ধর্মহীনের সংস্কৃতি
.              এক বাংলায় গড়েই নে।
কর প্রতিরোধ মগজ শানা
.              বাংলা গড়ার আনন্দে
গোষ্ঠে গোষ্ঠে ঘেরাও ক'রে
.              মৌলবাদরে কবর দে।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
মোমবাতি
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১৩। প্রকাশিত : আজকের এষা, বইমেলা সংখ্যা, ২০১৪, প্রতিলিপি বাংলা
অনলাইন, ২০১৫-১৬।


মোমের সলতে জ্বালালে
সলতে মোমকে বলে---
“আমি উঠলে জ্বলে জ্বলে
তুমি তবে পড়ো কেন গলে?'
#
শুনে মোম বলে তারে---
"যে আছে অন্তরে
সে যদি জ্বলে পোড়ে
অশ্রু তো পড়বেই ঝ'রে”

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
দিকপতি কবিয়াল
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রাচনাকাল: ২০০১। রম্যকবিতা ও ছড়ায় ছদ্মনাম: #আভীরদুলাল, প্রকাশিত : কথা-মেঘ,
শারদীয়া ১৪২১, পশ্চিম মেদিনীপুর।


দিকপতি কবিয়াল না জানি কী খেয়ালে---
লিখে ফেলে কবিতাটা রাখালের দেয়ালে
গরু বেঁধে রাখালদা এ দিকেই দেখল---
দেয়ালটা পড়ে বলে--- বাঃ, ছড়াটা রসালো;
উত্সাহে দিকপতি জ্ঞানহারা মগজে
একটানে কবিতাটা দিলো লিখে কাগজে,
তারপর চিত্কার ক'রে সেটা পড়ল
মাঝে মাঝে তাল বেঁধে সাতসুর জুড়ল
তালে তাল কথা গাঁথা ধ্বনি ধ্বনি ঝংকার
ওই বুঝি শোনা যায় ধনুকের টংকার!
কবিতার ঠ্যালা খেয়ে ঝড় বুঝি উঠল
বাতাসটা চারিদিকে উত্সাহে ছুটল---
মনে হয় গাছেদের গায়ে লাগে ঝাপটা
বাড়ি খেয়ে বড় হলো আকাশের মাপটা;
এইবার মাটি বুঝি কেঁপে কেঁপে ফাটছে
একমনে কবিয়াল ছড়া পড়ে হাঁটছে!
হঠাৎ কী হলো যেন, গরু দিলো তিন লাফ
ঝাঁপ দিয়ে কবিতাটা মুখে পুড়ে খেয়ে সাফ!
চমকিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা, শেষটায় ছেড়ে হাল
পুনরায় ভাব আনে দিকপতি কবিয়াল!

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
আশ্রয়হীন
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল: ২০১৩। প্রকাশিত: সংবাদ খোলাখুলি পত্রিকা, উত্‍সব সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৩।


প্লাবন থেমে গেলে
ঘর বানাবে বলে
উদ্যোগী আশ্রয়হীন
আকাশের চাঁদ জ্বেলে।
#
কতক সময় পর
যখন অর্ধেক হলো ঘর
আবার প্লাবন এলো
ধুয়ে মুছে সাফ হল
থেমে গেল আড়ম্বর।
#
এমনই পরম্পরায় প্রতিদিন
তারা, চলমান আশ্রয়হীন।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
উজানি গান
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১৪। প্রকাশিত : বঙ্গসমাজ পত্রিকা, ২০১৪।


আমরা যাব সেই সেদিকে,
.    যায় না যেদিক কোনই নেয়ে।
মন তবে চল্ মরণ হেঁকে
.    বিপদবরণ নৌকা বেয়ে।
#
দু'পাড় জুড়ে উঠুক-না ঝড়,
.    দিগভ্রমের পাগলা দোলা।
তবুও মাঝি হাল চেপে ধর,
.    উজান স্রোতেই নৌকা চালা।
#
বাঁধভাঙা ঢেউ আসুক ধেয়ে,
.    ঢেউ ভেঙে ঢেউ এগিয়ে চল্;
বইঠা-ঢেউয়ে উজান গেয়ে
.    জলস্রোতে দল বেঁধে দল।
#
নৌকা ভাসাও সেই সে-উজান,
.    যায় না মাঝি দুঃসাহসে।
ডুবলেও আজ তুলব তুফান,
.    যাক ডুবে সব উজান-হেসে।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
সাম্যপথের গান
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১৪। প্রকাশিত : বঙ্গসমাজ পত্রিকা, ২০১৪।


কারাগার কে গড়েছে,
.                মন জেনেছে,
.                      ভরেছে অন্ধকারের দিন---
তাই,
.    চেতনায় আগুন জ্বালো
.    চেতনার আগুন জ্বালো
.    পুরোনো পুড়িয়ে ফেলো
.                      এগিয়ে চলো,
.                            আনো নতুন এক দিন।
#
.    সকালের বার্তা এল
.    সকলের বার্তা এল
.    উল্লাসে এগিয়ে চলো
.                    আগুন জ্বালো
.                                একদিন প্রতিদিন।
#
শুনে গান অট্টহাসে    শোষকেরা দৌড়ে আসে
শাসনের অক্টোপাসে    আমাদের রক্ত চোষে
বোমা-গুলি সন্ত্রাসে        ধূলি হয় রক্তে রঙিন।
.        নেমে আসে অন্ধকারের দিন।
আমরাও নই তো ভীত  চামড়াও নয় কুপিত
মগজও সুশানিত          জনস্রোত উচ্ছ্বসিত
প্রতিরোধে উদ্বেলিত      ঝেঁটিয়ে সরাই এই দুর্দিন।
.            আসে শিকল ভাঙার দিন।
#
.      আমাদের ঘাম ঝরানো প্রতিটি রক্ত ফোঁটা
.        হবে না ব্যর্থ কোনও মগজে অশ্ব ছোটা
ঘরে-ঘর কর্ প্রতিরোধ    দোরে-দোর জাজা রে বোধ
মানবতায় লাগা দরদ        জাগা প্রাণ গোটাগোটা।
.      এসো আজ আগুনঝরা আলোয় প্লাবন দিন।
মন-আগুন ঢল লেগেছে    কোল ছেড়ে জন জুটেছে
শোষকের ইমারতি          আনাজপাতি সব ভেঙেছে,
.          ভেঙেছে শাসনের বেয়োনেট-সঙ্গীন।
.      এসো আজ আগুনঝরা আলোয় প্লাবন দিন।
#
শোষণের নাগপাশে        শোষক আজ নিজেই ফাঁসে
প্রকৃতিটা উঠছে হেসে      আমাদেরই আশেপাশে,
দেখো হাসি ধানের শীষে  খুশি ওড়ে শিশির ঘাসে,
.      পাখিদের মুক্ত ডানা সাদা-নীল ওই আকাশে,
ওই শোনো উত্‍সব গান    বনে বনে প্রতিধ্বনি
মাঠে-ঘাটে অবাধ ছুটি      নদীজলে আলোর মণি
.                  সুরধুনী মুক্ত স্বাধীন,
আয় হেসে, ভালোবেসে গড়ব শুধু সাম্যের সেই দিন।
#
.      জীবন আজ ওই যে হাসে
.      জীবনের মহাকাশে
.      খোলা গান দেশে দেশে
.                                ইতিহাসে
.                                      বাজায় নূতন এই বীণ।
.          এসো-না আলোয় প্লাবন
.                                    উত্‍সব-মন
.                                          একদিন প্রতিদিন।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
চলাচল
কবি শমীন্দ্র ঘোষ
রচনাকাল : ২০১০। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : আন্দোলন, ২০১৪।


পাগল ঝড়, ঝড় উঠেছিল,
.          জিরাফের গলার মতন
.              সময়টা ছিল;
.            ঝড় থেমে গেছে
.          ডিমের কুসুমের মতন
.                সূর্য উঠেছে।
#
এবার, আকাশের গায়ে
.          ঊষার আলো লাগে
এমন নূতন আলো
.          দেখিনি তো আগে।
#
.           এই আলো-আকাশ-সূর্য-এ
.                                  কলঙ্ক এলে
.            আবার ঝড় এসে
.                            ধুয়ে মুছে ফেলে।
#
.    এভাবেই প্রাণ জীবন্ত ও সবল,
সময়ের সরণীতে জীবনের চলাচল।

.            ************************                                           
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর