কবি শম্ভু মিত্র - জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার ভবানীপুরে তাঁর মাতামহ ডঃ আদ্যনাথ বসুর গৃহে। পিতা
শরত্কুমার মিত্র এবং মাতা শতদলবাসিনী। শম্ভু মিত্রের পরিচয় নাট্যকার, প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা, বাংলা
নবনাট্যের পুরোধাপুরুষ ইত্যাদি। এসব গুণাবলী, স্বমহিমায় থাকার পরেও তিনি যে একজন কবি ছিলেন,
আমরা সে কথাই বলার চেষ্টা করছি, মিলনসাগরে তাঁর রচিত একাধিক কবিতা প্রকাশিত করে।

তাঁর স্কুল জীবন কেটেছে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে। এরপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন।

১৯৩৯ সালে তিনি পেশাদারী নাট্যমঞ্চ রঙমহল ও পরে মিনার্ভায় যোগ দেন। শিশিরকুমার ভাদুড়ীর  
"আলমগীর" নাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন। এরপর তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি.সি.  
যোশীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর অনুপ্রেরণায় ১৯৮৩ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে
(I.P.T.A.) যোগ দেন।
চল্লিশের দশকে গণনাট্যসংঘের উদ্যোগে ১৯৪৪-এ
কবি বিজন ভট্টাচার্যের “নবান্ন” নাটকের সহযোগী-
পরিচালক হিসেবে বাংলানাট্যের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন। ওই সময়ে তাঁর অন্যান্য অভিনীত নাটকের
মধ্যে ছিল “আগুন”, “লেবরেটরি”, “জবানবন্দী” প্রভৃতি।

গণনাট্য সংঘে থাকাকালীনই, ১৯৪৫ সালে তিনি বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও নাট্য ব্যক্তিত্ব
তৃপ্তি ভাদুড়ীর সঙ্গে। তাঁদের কন্যা, নাট্যব্যক্তিত্ব শাঁওলী মিত্র।

১৯৪৮-এ গণনাট্যসংঘের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরে মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের প্রেরণায় “বহুরূপী”  
নাট্যদল গঠন করেন। ১৯৪৯ - ১৯৭১ এই সময়কালে “বহুরূপী” নাট্যদলের ব্যানারে শম্ভু মিত্রের পরিচালিত
নাটকের মধ্যে রয়েছে “নবান্ন”, “ছেঁড়া তার”, “পথিক”, “দশচক্র”, “চার অধ্যায়”, “রক্তকরবী”, “পুতুল খেলা”,
“মুক্তধারা”, “রাজা”, “বাকি ইতিহাস”, “পাগলা ঘোড়া”, “চোপ আদালত চলছে” প্রভৃতি।

কন্যা, নাট্যব্যক্তিত্ব শাঁওলী মিত্রের লেখা “আমার প্রতিদেন” শিরোনামের একটি প্রতিবেদন সহ শম্ভু মিত্রের
“চাঁদ বণিকের পালা”-র ত্রয়োদশ সংস্করণের “লেখক পরিচিতি” থেকে তাঁর নাটক সম্বন্ধে, খানিকটা উদ্ধৃতি
তুলে দেওয়া হলো . . .

১৯৫৪ সালে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনা বাংলা নাট্যের ক্ষেত্রে অপর এক দিগ্-দিশারী
প্রযোজনা বলে স্বীকৃত হয়। এর মধ্যে অবশ্য তুলসী লাহিড়ীর ‘পথিক’ ও ‘ছেঁড়াতার’, রবীন্দ্রনাথের ‘চার
অধ্যায়’ এবং ইবসেনের ‘এ্যান এনিমি অফ দ্য পীপ্ ল্’র রূপান্তর ‘দশচক্র’ দর্শকজনের চিন্তার দিগন্ত
বহুমাত্রায় প্রসারিত করেছে। নতুন নাটকের নতুন দর্শক গ’ড়ে তোলবার কাজও একই সঙ্গে চলছিল।
১৯৫৮-তে আরো একটি যুগান্তকারী প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয়, -- ইবসেনের ‘আ ডল্ স্ হাউস’-এর অনুবাদ ‘পুতুল
খেলা’।”

১৯৬৪-তে বহুরূপী প্রযোজনা শম্ভুমিত্র-অনূদিত-নির্দেশিত ও অভিনীত সোফোক্লেসের ‘রাজা অয়দিপাউস’
নাট্যমোদী দর্শককে যেমন চমকিত করেছিল, তেমনিই অনুপ্রাণিত করেছিল রবীন্দ্রনাটক ‘রাজা’-র প্রযোজনা।
এর পরে শ্রীমিত্র সমসাময়িক নাটককার-দের নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। এই নাটককারদের মধ্যে ছিলেন শ্রী
বাদল সরকার, শ্রী নীতিশ সেন এবং শ্রী বিজয় তেণ্ডুলকর। এই সময়ে শ্রীমতী তৃপ্তি মিত্র নির্দেশিত, বহুরূপী
প্রযোজিত নাটকে অভিনয়-ও করেছেন।

১৯৭৮ সাল থেকে বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে তার দূরত্ব রচিত হয় | এবং একসময়ে ‘বহুরূপী’ তাঁকে
অস্বীকার করে। নান্দীকার, চেনামুখ এবং পরবর্তীকালে পঞ্চম বৈদিকের প্রযোজনায় তিনি অংশ নিয়েছেন।
১৯৮০-৮১ সালে ছ’টি নাট্যদলের উদ্যোগে গঠিত ক্যালকাটা রেপর্টারি থিয়েটার প্রযোজিত ব্রেখ্ টের নাটক
‘গ্যালিলেও-র জীবন’ নাটকে গ্যালিলেও-র ভুমিকায় অভিনয় করে দর্শককে নির্বাক করে দিয়েছিলেন, এ
নাটকের নির্দেশক অন্যতম জার্মান নিদের্শক ফ্রিৎজ্ বেনেভিৎজ্।

এই অন্যধারার নাট্যদলের পোক্ত পাটাতনের জন্য তাদের নিজস্ব একটি নাটমঞ্চ থাকবে এইরকম এক স্বপ্ন
তাঁকে আজীবন তাড়না করেছে। বহু প্রয়াস সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি, ----এ তাঁর
জীবনের এক মর্মান্তিক ঘটনা
।”

তাঁর রচনার মধ্যে রয়েছে প্রবন্ধের বই “সম্মার্গ সপর্যা”, “নাটক রক্তকরবী’, “কাকে বলে নাট্যকলা”, “নাট্যভাষ”
প্রভৃতি। তাঁর রচিত পাঁটটি গল্প ও দুটি নাটিকার গ্রন্থ “পাঁচ-দুই”। তাঁর রচিত নাটকের সংখ্যা দশ।


তিনি নাট্যজগতের পশাপাশি সিনেমার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাংলা ছায়াছবির মধ্যে রেয়েছে
"অভিযাত্রী" (১৯৪৭), "ধরিত্রী দেবতা" (১৯৪৮), "আবর্ত" (১৯৪৯), ‘’৪২" (১৯৪৯), "পথিক" (১৯৫৩),
"বৌঠাকুরাণীর হাট" (১৯৫৩), "মহারাজ নন্দকুমার" (১৯৫৩), "মরণের পারে" (১৯৫৪), "শিবশক্তি" (১৯৫৪),
"দুর্লভ জন্ম" (১৯৫৫), "মানিক" (১৯৬১), "সূর্য্যস্নান" (১৯৬২), "পান্না" (১৯৬৭), "নতুন পাতা" (১৯৬৯), "নিশাচর"
(১৯৭১) প্রভৃতি। তাঁর হিন্দী সিনেমার মধ্যে রয়েছে "ধরতি কে লাল" (১৯৪৬), "হিন্দুস্তান হমারা" (১৯৫০),
"জাগতে রহো" (১৯৫৬)।


তাঁর অভিনীত “রক্তকরবী”, “ডাকঘর”, “চারঅধ্যায়”, “তাহার নামটি রঞ্জনা”, “রাজা অয়দিপাউস” প্রভৃতি
নাটকের অডিও ক্যাসেট জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর নাট্যপাঠের ক্যাসেট “অয়দিপাউসের গল্প” এবং তাঁর
কন্যার সাথে “চাঁদ বণিকের পালা”।

তিনি আবৃত্তিকার হিসেবে খুব সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৪৩সালের মন্বান্তরের পটভূমিকায়  রচিত,
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর (বটুকদা) “মধুবংশীর গলি” কবিতাটি শম্ভু মিত্রর অসামান্য পাঠে, ভীষণ জনপ্রিয়
হয়েছিল।
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর “মধুবংশীর গলি” কবিতাটি পড়তে পড়তে, শম্ভু মিত্রর কণ্ঠে  কবিতাপাঠ
শোনার জন্য, মিলনসাগরে, একটি লিঙ্ক শম্ভু মিত্রর কবিতার সূচীর সঙ্গে দেওয়া হয়েছে।


শম্ভু মিত্রর প্রাপ্ত সম্মাননার মধ্যে রয়েছে ১৯৫৭ সালে হিন্দী সিনেমা জাগতে রহোর জন্য কার্লোভি ভারী
ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ক্রিস্টাল গ্লোব সম্মান (গ্রাঁ প্রী পুরস্কার)। ১৯৭৬ সালে তিনি ম্যাগসেসে
পুরস্কারে ভূষিত হন। ওই বছরই তাঁকে ভারত সরকার দ্বারা পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৭
সালে এক বছরের জন্য তিনি বিশ্বভারতীর ভিজিটিং প্রফেসার ছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি.লিট. উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৮২ সালে মধ্যপ্রদেশ
সরকার তাঁকে কালিদাস সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৮৩ সালে বিশ্বভারতী তাঁকে দেশিকোত্তম উপাধিতে
সম্মানিত করে।


দেশভাগে অভিশপ্ত হতভাগ্য বাঙালী জাতির একটি অন্তত সৌভাগ্যের দিক আছে! তাঁদের প্রায় সব  
ঐতিহাসিক চরিত্ররাই হয় কবি ছিলেন  নয় তো কবিতার মতো লেখা লিখে গিয়েছেন। এই মানুষগুলির  
জীবন ছুঁয়ে এলেই আমরা বাঙালীর ইতিহাসের একটা সাম্যক ধারণা করে নিতে পারি। কি হিন্দু  কি  
মুসলমান, ধর্মিয় নারী-পুরুষ, সমাজ সংস্কারক, রাজা-মহারাজা-নবাব-বাদশাহ, রাজনেতা-নেত্রী, আইনজ্ঞ-জজ-
উকিল-ব্যারিস্টর, উদ্যোগপতি-ব্যাবসাদার, খেলোয়াড়, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বৈজ্ঞানিক,  নাবিক,  
প্রযুক্তিবীদ, চিকিত্সক, সৈনিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, অটোচালক-রিক্সাচালক, এমন কি নানা অপরাধে
অভিযুক্ত এবং যাঁরা প্রধাণত কবি, বাঙালী  জীবনের সব দিকের মানুষেরাই কবিতা লিখে গিয়েছেন এবং
লিখে চলেছেন! মিলনসাগর তাই কবিতার মধ্য দিয়ে কবিদের ধরে এবং তাঁদের জীবনীর মধ্যে দিয়ে
বাঙালীর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজ করে চলেছে।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি শম্ভু মিত্রর “চাঁদ বণিকের পালা” নাটকের থেকে কিছু অংশ কবিতা বা গীত
হিসেবে, এখানে তুলে এই কবিকে মিলনসাগরের কবিদের সভায় স্থান দিতে পেরে এবং তাঁর রচিত কবিতা
আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টাকে সার্থক মনে করবো।



কবি শম্ভু মিত্রর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন

আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


উত্স -  
  • শিশিরকুমার দাশ সম্পাদিত "সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী", ২০০৩।
  • অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান", ২য় খণ্ড, ২০১০।
  • ১৯৭৮ সালে শম্ভু মিত্র রচিত “চাঁদ বণিকের পালা” নাটকের গ্রন্থ ২০০০।


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২৯.১১.২০১৭
...