কবি সুদীপ মণ্ডলের কবিতা
*
স্কচব্রাইট
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ১৯.৪.২০১৮


দিনরাত ধরে ঘসে ঘসে
বাসন করো পরিস্কার,
কখনো কি ভেবে দেখো
কত ব্যাথা লাগে বুকে তার।

শাশুড়ী বৌমা দু’জন মিলে
করিছ খান খান,
আমরাও বোনাস পেতে পারি
আমাদেরও আছে পেনশান।

ছাল চামড়া উঠে যায়
ঝলকে ঝলকে ওঠে রক্ত,
ঘসে যাও ঘসে যাও
চোয়াল করি শক্ত।

আমরাও প্রতিবাদ করতে জানি
ডাকতে পারি হরতাল,
তাহলে কিহবে তোমাদের
জন্মদিনের সকাল।

আমরা বুকে মুখে কালি মাখি
তোমরা সবাই পরিস্কার,
আমাদের বুকের রক্তে
সুখে আছে সমাজ এবং সংসার।

তারপর একদিন জীবন শেষ
ছিন্ন ভিন্ন যাবো ছিঁড়ে,
তোমরা তখন অবহেলায় অনাদরে
দেবে ডাস্টবিনে ছুড়ে॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চিতা
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

আমি শিব!
আমি নটরাজ!
আমি ভীষণ, আমি ভয়ংকর,
আমি ন্যায়-দণ্ড হাতে মহাকাল!
আমি দুরন্ত, আমি দুর্বার,
আমি চণ্ডাল!
মানুষের নশ্বর দেহ
নিমিষে করে ছাই-
ঐ ছাই ভষ্ম মেখে
কালের পথে নেচে বেড়াই
তা থৈ-তা থৈ।

দুর্বৃত্তের দল বর্বর খেলায় মাতি,
পূর্ণগর্ভা মায়ের পেটে-
মেরেছিস লাথির পর লাথি।
মা আমার কহে নি কো কোন কথা,
নীরবে সহেছে সব ব্যথা;
ফেলেছে শুধুই চোখের জল,
দেখি – কত নিষ্ঠুর, দয়াহীন, পাষাণ
ঐ দুর্বৃত্তের দল?

কুম্ভ কর্ণের মতো আমি
ঘুমিয়ে ছিলাম নিশ্চিন্তে,
ভাবিলাম জাগিব আমি
ন’মাস ন’দিন অন্তে।
অকালে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো
তোদের অত্যাচার।
দেখি – কত বাড়তে পারিস?
কত তোদের বাড়?
অকালে জেগেছি আমি
তাই আমি অকাল।

হাতে গুনে হিসেব না পাই,
কম্পিউটারে হিসেব করে
বল দেখি ভাই!
রামমোহনের আগে থেকে আজ
আমার চিতায় পুড়ে হ্ল ছাই
কত মা-বোন-স্নেহের দিদিভাই?
জানি তার কোন হিসাব নাই,
তবু হিসাব আমার চাই।
মুক্তির গান গাই-
এ লড়াই বাঁচার লড়াই,
উচ্চকণ্ঠে জেহাদ জানাই,
যারা বহে আনিস যত-
গলিত-মৃত-অর্ধমৃত-জীবিত দেহ;
আমার শ্মশানে তোদেরকে শুধাই-

আজ থেকে
আমার চিতায় জ্বলিবে না রূপ কানোয়ারা,
প্রমাণ দিতে সতী,
আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই
যারা শাসক-শোষক-সমাজপতি।

কেন অকালে ঝরিল দেবযানী?
শুকাল যত নারী জীবনের সাধ,
পণের টাকা দিতে পারেনি-
এই তার অপরাধ।
আমার চিতায় জ্বলিবেনা
দেবযানী অভিমানী,
আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই-
টাকাই যাদের জীবনের মূল্য
স্বপ্ন মেকী ধনী।

আমার চিতায় জ্বলিবেনা-
সাজানো যত ডাইনি,
আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই,
যারা সভ্য সমাজের শুকুনি।
অসহায়ের শেষ সম্বল করিতে গ্রাস,
যারা ফেলিছে ঘন ঘন বিষাক্ত নিঃশ্বাস,
ধীরে ধীরে ভারী হয় পৃথিবীর মুক্ত বাতাস;
দম যে বন্ধ হয়ে আসে
নিতে যে পারিনা শ্বাস।
শোন্‌রে জান গুরু-
তোদের খেল শেষ
এবার আমার খেল শুরু।

আমার চিতায় জ্বলিবে না চুনী
লোধা স্নাতক সেই মেয়েটি,
আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই,
চুনীর প্রাণ কেড়ে নিলো যাদের ভ্রূকুটি।

কোন অতি মহামূর্খ জলের বালতি হাতে-
স্বপনের রক্তের দাগ মোছে রাজপথে?
ও দাগ লেগেছে ইতিহাসের পাতায়।
ডাক তোদের শাসক তারে
দেখি-কেমনে মোছে এ দাগ
কোন ইরেজারে?
আগামী আসিছে, তারা কৈফিয়ৎ চায়
কেন লেখা হলো ইতিহাসে
এই কলঙ্কিত অধ্যায়?
ক’টা আছে তোদের আন্ডার গ্রাউন্ড?
তোরা লুকাবি কোথায়?
কোথায় তোদের ঠাঁই?

আমার যে ক’ভাই
গিয়েছিল মিটিং-মিছিলে দিনটা একুশে জুলাই,
তারা ঘরে ফেরে নাই।
তাদের মা-স্ত্রী-পুত্র
আজও দাঁড়ায়ে পথের ধারে,
আশায় আশায় দিন গুনে-
এই বুঝি ঘরে ফেরে।
ঐ ক’ভাইয়ের ঠিকানা আমার চাই-
তোদের ক্ষমা নাই, ক্ষমা নাই।

গরমের দুপুর-চারিধার নিঃঝুম
গোপালের আজি চোখে নাই ঘুম,
দু’টো আম পাড়িবে, কিশোর মনের খেলা,
কেন ঘনিয়ে এলো জীবন-প্রভাতে-
অপরাহ্ণের কালবেলা।

আমার চিতায় জ্বলিবে না এরাই,
আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই।
সাদা আর খাকি পোষাকে গুন্ডা,
গণতন্ত্রের হিমযন্ত্রে হৃদয় যাদের-
কঠিন বরফের মত ঠাণ্ডা।

স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ভেদিয়া
জীবনের যত প্রাণ বায়ু দিয়া
মা জিজ্ঞাসে দাঁড়ায়ে রাস্তায়,
“খোকা! সোনা মানিক আমার
তুই লুকালি কোথায়?”
ম্যানহোলের ভিতর থেকে
খোকা উত্তর দেয়,
“ডুব আমি দিলাম মাগো
অন্ধকার পঙ্কিল মানবিকতায়।
আমি তোমার খোকা নই
আমি এখন ডুবুরি কৌশিক,
ম্যানহোলের অতল থেকে
খুঁজে আমি আনবই
হারানো রত্ন মানবিক।”

আমার চিতায় জ্বলিবে না-
কৌশিক অবোধ,
আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই,
যারা হারিয়েছে চেতনা মূল্যবোধ।

আমার চিতায় এদের
জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে করে ছাই,
ঐ ছাই ভষ্ম মেখে-
কালের পথে নাচিব আমি
তা থৈ-তা থৈ॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্নেহের দিদিভাই
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

মহাশূন্যে হারিয়ে গেলে নববধূর বেশে,
যে দেশে গেলে দিদি কেউ ফিরে না আসে।

যেথা কবি-মন, গোপন-প্রিয়ারে খুঁজে মরে,
সেথা তুমি দিলে পাড়ি কলম্বিয়া চড়ে।

দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে মেলে রঙীন ডানা,
হাতে তুমি দিলে পাওনি দিদি আমার ই-মেলখানা।

ভাইফোঁটাতে সবাই এলো শুধু তুমি এলে না,
শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা বুঝি আসতে দিলে না?

পণের টাকা দিই নি বলে-পুড়িয়ে করল ছাই,
সাঁঝ আকাশে জ্বলে আছো স্নেহের দিদিভাই।

যুগের পরে যুগ আসে, শতাব্দী আসে যায়-
কল্পনাদি! থাক তুমি কবির কল্পনায়॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি খোলা চিঠি
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

বন্ধু! ওকে বলে দিও-
আমি ভালো আছি।
আমি ভালো আছি-
কন্ডাক্টারের হাতে দু’টাকা নোটের মতো;
আমি ভালো আছি।

বন্ধু! ওকে বলে দিও
আমি বেঁচে আছি।
আমি বেঁচে আছি-
মেছুয়াদের জিয়ানো মাছের মতো;
আমি বেঁচে আছি।

বন্ধু! ওকে বলে দিও
আমি এগিয়ে চলেছি।
আমি এগিয়ে চলেছি-
জ্যামে পড়া গাড়ীর মতো;
আমি এগিয়ে চলেছি॥

.                   ****************                   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জননী কলকাতা
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

কলিকাতা থেকে কলকাতা হলাম-
কেমন আছো হে কবি?
নামটা তোমার বদলেছে ঠিকই,
চোহারায় সেই একই ছবি।

মায়ের পেটে মেরেছিস লাথি
বেরিয়েছে আমার মাথা,
একটি হাতে বেরতো যদি
লিখে ফেলতাম যা তা।

সতীত্ব-লজ্জা শিয়রে তুলে (বৌদি)
পরপুরুষকে বুকে শোয়ান,
আজ কিনে ফিরতেই হবে
এক কোটো ল্যাক্টোজেন-ওয়ান।

একটি পোড়া রুটি চাই-
সাত সকালে শিশু কাঁদে,
বাবার পা ছিঁড়ে গেছে
উগ্রপন্থীর পাতা ফাঁদে।

নাইট ডিউটির নাম করে,
আমার দিদি দাঁড়ালো লাইনে;
রুপ-যৌবন মানি ব্যাগে ভরে
ভোর রাতে ফেরে ট্রেনে।

জানো কর্তা! কত পরিশ্রমে
ফলে হাইব্রীড ধান?
নিরন্ন কৃষক মরেছে মাঠে
বিশ্বায়ন করে পান।

ব্লু-ফ্লিমের ক্যাসেট ভিডিওতে
আদিম খেলা সারারাত,
রেসের মাঠে বিকোয় ভিটে
এমনই বাবুর বরাত।

অশীতিপর বৃদ্ধ প্রেসিডেন্সি
জ্ঞানের ঝুলি খুলে;
অবাক পৃথিবী-শূন্য ঝুলি
বিলিয়ে কালে কালে।

নাবালিকা এলো পুরোহিতের কাছে
একটু বাতাসা প্রসাদ,
চোখের পলকে খোয়াল লজ্জা-
নারীত্ব; জীবন বিস্বাদ।

এধারে ওধারে চারিধারে খোঁজে
ভিক্টোরিয়ার মাথার পরী,
তিলোত্তমার তিল তো গেছে
পাতালের মাটি চুরি।

সেদিন বিকালে নদীর ধারে
আমার প্রেমিকা ধর্ষিতা,
লজ্জাঙ্গ ঢেকে দিলে গাছ
ঝরিয়ে শুকনো পাতা।

জীবনের চেয়ে টাকাই মূল্যবান
পরম সত্য বুঝেছেন,
সেবক ডাক্তার খুলে নিলো
রোগীর প্রাণের অক্সিজেন।

নিম্নাঙ্গটা দেখি ঝুপড়ির পাশে
উর্ধ্বাঙ্গটা আবার কোথা?
গলা কাটা লাশ পাহারা দেয়
রাত জেগে কলকাতা।

মন্দির-মসজিদ-গুরুদ্বার-গীর্জায়
আবহমান কালের ঘণ্টা ধ্বনি,
সভ্যতার ইতিহাস খুবলে খায়
একদল শাসক শুকুনি।

বিগ্রেডে লোক ভরানো চাই
ঘুরছি বাড়ি-বাড়ি,
সকাল-সকাল রেডি থাকিস
রুটি আর তরকারি।

পায়ে পায়ে বিশাল জনসমুদ্রে
কখন যে মিশে গেছি,
একটি ঝাণ্ডা কুড়িয়ে নিয়ে
দেখি কতক্ষণ বাঁচি!

আমি শাসক তুই বিরোধী
আমরা সহোদর ভাই,
হাড় মাংস যা জুটেছে পাতে
ভাগ করে বসে খাই।

নির্বাচনের আগে কত প্রতিশ্রুতি
ত্রাণ নিয়ে রাজনীতি,
চীন জাপানের কাছে শিখুন
কেমন স্বদেশ প্রীতি।

কার ভালোবাসা? কার সন্তান?
কার যে কামজ বীজ?
নারায়ণের বাম হাতে শোভে
চিরন্তন সত্য সরসিজ।

জনসংখ্যা একশ ছাড়ালো-ট্রামে
জন্মনিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞাপন,
কত চাঁদ খসে নাসিংহোমে
হিসেব রাখে কয়জন?

ধীরে চলো পথিক, ধীরে
সাবধান-সামনে যে ম্যানহোল,
কৌশিকের মতো হারাবে অকালে
শূন্য মায়ের কোল।

আমজনতা হাহাকার করে
একফোঁটা আর্সেনিক মুক্ত পানীয়,
অলিতে গলিতে চোলাইয়ের ঠেক
পীয় বন্ধুগণ জীয়।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার মৃত প্রায়
লালফিতের ফাঁসে,
প্রতিদিনের সূর্য ওঠে ডোবে,
আশে আর আশ্বাসে।

ইস্টার্ণ বাইপাশের খালের ধারে
সশস্ত্র যুবকেরা জড়ো,
চাল বাড়ন্ত! দূর বোকা ছেলে!
ধরো বুলেটে মারো।

বাংলার মহারাজের হাতে ব্যাট
ছক্কা উত্তাল ইডেনে,
সল্টলেকে যুবতী নাচে-ঋত্বিকের
‘কহোনা প্যায়ার হ্যায়’ গানে।

সংস্কৃতির পীঠস্থান নন্দন চত্বর
ধুঁকছে অপসংস্কৃতির ক্যানসারে,
সব অপবাদ ঘাঁটি সাদা ছাই
চুল্লিতে জ্বলে পুড়ে।

দিন দুপুরে প্রকাশ্য রাজপথে
অসহায় মানবতা খুন,
বিস্তারিত খবর জানতে হলে
চ্যানেল ঘুরিয়ে দেখুন।

খবর পেয়ে ছুটে আসে
লালবাজারের পোষাবাহিনী,
চোখের পলকে প্রমাণ লোপাট
কোথায় খুন? কেইবা খুনী?

মোড়ে মোড়ে এস.টি.ডি. বুথ
খবর ছোটে ই-মেল,
খাস খবরের এক ঝলক
কবি পচে জেলে।

যে সে কবি তো নয়
বিদ্রোহী সুকান্ত-নজরুল,
নিবে্র ডগায় লুকানো হুল
বিষাক্ত বিপদ সংকুল।

তীব্র সেই বিষের জ্বালায়
রাইটার্স কাঁপে রে থরথর,
নেতারা নামেন ফুটপাতে
গায়ে মারণ জ্বর।

দুধের ঋণ শোধ করবো
ক্ষমা করো কলকাতা,
আগে গায়ে জড়া তোর
হাতে বোনা ছেঁড়া-কাঁথা।

দিনের শেষে সারা হল
যত জমা খরচের খাতা,
রাতের আঁধারে নীরবে কাঁদে
মূক-বধির জননী কলকাতা॥

.                ****************                
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাজপথে শিক্ষকের রক্ত ঝরে
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

রাজপথে শিক্ষকের রক্ত ঝরে-
ঘাম ঝরে শ্রেণীকক্ষে,
এই শিক্ষকই মানুষ গড়ে
বিশাল আশা নিয়ে বক্ষে।

উনানে আজ হাঁড়ি চড়েনি-
ভাঁড়ারে বাড়ন্ত চাল,
মেঝেতে পড়ে চাঁদের আলো-
এমনই ঘরের হাল।

শিক্ষকের বউ কাঁদে রাত-দিন;
মলিন করুণ মুখ,
সরস্বতী তাদের গৃহে বিরাজিতা-
লক্ষ্মী মা বড়ই বিমুখ।

শিক্ষকের বউ পরের বাড়ি
দু’বেলা বাসন মাজে,
ছেঁড়া শাড়ীতে ঘোমটা টানে
যেন কি দারুণ লাজে।

হাতের শাঁখা ভেঙে গেছে,
জোটেনি সিঁথির সিঁদুর;
সুখের খবর দিতে পারো-
আর সে কত দূর?

শিক্ষক গেছে ভিক্ষে করতে
প্রাক্তন ছাত্রের কাছে,
স্টেশনে বুট পালিশ করে-
যদি একটু বাঁচে।

পেনশন বাবদ গুটিকয় টাকা
আজও তো দিলনা সরকার,
ঘরেতে তার যুবতী মেয়ে-
ছেলে শিক্ষিত বেকার।

শুধু শিক্ষা নয়, শিক্ষক!
অগ্নি মন্ত্র দাও,
শাসক শ্রেণীর বিলাসী প্রাসাদ
বিপ্লবের আগুনে জ্বালাও॥

.                ****************                
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিচারের বাণী
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

অন্যায়-অত্যাচার-অবিচার-
চাই যে ন্যায়-বিচার,
বিচারের তরে বসিছে আজিকে
আম জনতার দরবার।

ঐ যে প্রাণের যীশু
ভালোবাসার প্রতিদানে,
ক্রুশবিদ্ধ নত মুখে
চেয়ে মাটির পানে,
ঐ যীশু আজ বিচার চায়।

ঐ যে মোদের সক্রেটিশ
হেমলক বিষে,
অসত্যের প্রতিবাদে
জীবন ত্যজিল শেষে,
ঐ সক্রেটিশ আজ বিচার চায়।

ঐ যে হোসেন ভাই
কারবালার মরু প্রান্তরে,
“পানি দাও, পানি চাই”-
বলে চিৎকার করে,
ঐ হোসেন আজ বিচার চায়,

ঐ যে অভাগী মা
দারুণ খিদের জ্বালায়-
নিজ বুকের সন্তান
গঙ্গার জলে ভাসায়;
ঐ মা আজ বিচার চায়।

ঐ যে উলঙ্গ শিশু
এক টুকরো বসন জোটাতে,
হাত পেতে ভিক্ষে করে
পার্কস্ট্রীটের ফুটপাতে,
ঐ শিশু আজ বিচার চায়।

ঐ যে নবজাতক
খোলা আকাশের নীচে,
একটি কুঁড়ের ঠিকানা
আছে কি কারোর কাছে?
ঐ নবজাতক আজ বিচার চায়।

ঐ যে অবোধ বালিকা
মাস মাইনে বাকি,
কাটা গেল নাম
জলে ভরে ওঠে আঁখি
ঐ বালিকা আজ বিচার চায়।

ঐ যে মৃত্যু যাত্রী
পেল না স্যালাইন-রক্ত,
জীবন দিয়ে প্রমাণ দিল-
মানবতা বিষাক্ত;
ঐ যাত্রী আজ বিচার চায়।

ঐ যে অন্ধ মানুষ
বোমার বিস্ফোরণে
চোখ দুটি গেছে চলে;
আলো হারা এ জীবনে-
ঐ অন্ধ আজ বিচার চায়।

ঐ যে মায়ের জাতি
লজ্জা হারিয়ে পুরুষের লজ্জা,
মুক্তি পেতে চিরতরে-
পেতেছে শেষ শয্যা।
ঐ জাতি আজ বিচার চায়।

ঐ যে ঘরের লক্ষ্মী
ঝুলিছে সিলিং ফ্যানে,
সিঁথিতে অগ্নি সাক্ষী
জ্বলিছে কেরোসিনে,
ঐ লক্ষ্মী আজ বিচার চায়।

ঐ যে চাকর-চাকরানী
খাচ্ছে পোড়া রুটিখানি,
প্রেমিকার হাতে খাচ্ছ তুমি
মোগলাই বিরিয়ানি,
ওরা আজ বিচার চায়।

রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্রের কাছে
বিচার চেয়ে বার বার,
বিচারের বাণী-ক্রন্দন ধ্বনি
শুনিতে চাইনা আর।

সত্যের কাছে-চেতনার কাছে
বিচার হবে ভাই,
তোদের মত নর-পশুদের
ক্ষমা নাই, ক্ষমা নাই।

ঐ যে বাতাসে ভাসে
আগামীর পদ ধ্বনি,
অপেক্ষা করো শোনো
ন্যায় বিচারের বাণী॥

.                ****************                
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
খুকু
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

আকাশ ঘিরে মেঘ করেছে, সূয্যি গেছে পাটে,
ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে খুকুর দিন কাটে।

খুকু গেল জল আনতে পদ্মদিঘির ঘাটে,
তিন যুবক নিয়ে গেল পাশে ফাঁকা মাঠে।

পদ্মদিঘির কালো জলে হরেক রকম ফুল,
রূপের মাঝে অপরূপ হয়ে খুকু হারালো কুল।

হাঁটুর নিচে দুলছে খুকুর গোছা ভরা চুল,
লাশঘরে খুকুর লাশ বাবা চেনে নির্ভুল॥

.                ****************                
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এক ফোঁটা জল
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

জনম-দুখিনী সীতার মতো সারাজীবন আমাদের কান্না,
কই, কান্নার জলে তো ওদের পাষাণ হৃদয় গলে না?

কান্নার জলে খোলে না বন্ধ কলকারখানা;
পরীক্ষার পর পরীক্ষা-অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এলোনা।

হাসপাতালে শিশু বদল; সুপারিন্টেনডেন্ট কিচ্ছু জানে না;
কাকের বাসায় কেমন বাড়ে কোকিলের ছানা।

আমেরিকার রকেট দেয় দেশ বিদেশে হানা,
কান্নার জলে সে তো কোন বাধা মানে না।

পৃথিবীতে বৃহত্তম আমাদের সংবিধান খানা,
তাতে লেখা আছে অভাব জানানো মানা।

আমাদের রাজা বধির-কানে শোনে না,
রাজা কানা-অন্ধ চোখেও দেখে না।

মন্ত্রীদের কনভয় এলে কেউ পথ আটকায় না,
অ্যাম্বুলেন্স সাইরেণ দিলে কেউ সাইড দেয় না।

গাছে-গাছে পাখি আর গান গায় না,
ডালে-ডালে ফুল আর ফোটে না।

কবিদের কল্পনা সে তো চাঁদের সীমানা,
সে কবিতা গরিবের উঠানে নামে না।

এত বড় বর্ষা গেল-হ্ল কত বন্যা,
এক চিলতে পলিথিন কেউ দিল না।

পূজা এসে গেল, বাজে ঢাকের বাজনা,
উলঙ্গ শিশুর দল করে পোষাকের বায়না।

শোকেশের মডেলগুলো পরে কত গয়না,
কই একটিও তো আমাদের ধার দেয় না?

দারুণ খিদে-খিদের জ্বালা যে আর সয়না,
যদি থাকে একটি পোড়া রুটি-আমায় দাও না।

ফুটপাতের উলঙ্গ শিশু দুধ ছাড়া কিছু খায় না,
ওর মায়ের ব্রেষ্ট ক্যানসার-তাতে দুধ ঝরে না।

এক ফোঁটা জল দাও না, এক ফোঁটা জল দাও না,
ছুটে গিয়ে দিয়ে আসি নাহলে ও শিশু বাঁচে না।

সুরধুনী গঙ্গার জল আজ আর কেউ ছোঁয় না,
ও জলে ভেসে যায় যত সভ্যতার আবর্জনা।

সারাদিনের মগজ ধোলাই এত এত পড়াশুনা,
দিনের শেষে ফ্লাস্কে এক ফোঁটা জল থাকে না।

কান্নার জলে হবেনা, মা! ও জল বড্ড নোনা,
নোনা জলে একটিও যে ফসল ফলেনা।

কান্নার জলে হবেনা, মা! কান্নার জলে হবেনা;
এমন এক ফোঁটা জল তুমি আমায় দাওনা।

যে জল হবে বাষ্প-যাবে বাষ্পের বেগে ছুটে;
শাসকের দিবা স্বপ্ন নিমেষে যাবে টুটে।

গাছে গাছে পাখিরা গেয়ে উঠবে গান,
ডালে ডালে ফুল ফিরে পাবে প্রাণ।

শিশুরা হেসে উঠবে হাতে নিয়ে খেলনা
এমন একটা পৃথিবী তুমি আমায় এনে দাওনা।

প্লিজ, অটোগ্রাফ-ইন্টারভিউ চেয়োনা বন্ধু, চেয়োনা;
কান্নার জলে ভেসে গেছে আমার মনের চেতনা,
মানুষের মাঝে খুঁজে দেখো আমার নাম ঠিকানা॥

.                ****************                
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তোমার উদ্ধত রাইফেল হাতে
কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল
মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯

একি! ওমন ভাবে মুখ থুবড়ে
পড়ে আছো কেন তুমি
দিল্লীর প্রকাশ্য রাজপথে?
একটি বার উঠে দাঁড়াও তুমি-
তোমার উদ্ধত রাইফেল হাতে।

যাদের তরে সারাটি জীবন ধরে
তোমার এ লড়াই,
সেই দলিত বোন-ভাই
একজনও নেই তব সাথে?
তবুও তুমি একা পথ চলো
তোমার উদ্ধত রাইফেল হাতে।

দলিত যারা, নিরন্ন যারা,
সারাটি জীবন খেটে-খেটে সারা-
দু’মুঠো অন্ন জোটে না যাদের পাতে,
তাদের মুখে অন্ন জোগাতে
একা তুমি বেরিয়ে পড়ো
তোমার উদ্ধত রাইফেল হাতে।

ভেঙে ফেলো হাতের শাঁখা
মুছে ফেলো সিঁথির সিঁদুর।
একটিবার গর্জে উঠে বলো,
“সাবধান! সাবধান! রে ঠাকুর!”

যারা কেড়ে নেয় দলিতের ঘুম রাতে-
তাদের ঘুম কেড়ে নিতে;
একা তুমি জেগে থাকো-
তোমায় উদ্ধত রাইফেল হাতে।

ভাইয়ের রক্তে ভাই খেলে হোলি
এই দুনিয়াতে-তুচ্ছ জাতপাতে,
অসুরনাশিনী গঙ্গা মা তে
জাতপাত ভাসিয়ে দাও
তোমারই শোণিত স্রোতে।

লাঞ্চিতা-নির্যাতিতা নারী,
গণধর্ষিতা যে নারী,
তোমা পানে তাকিয়ে করুণ আঁখি পাতে,
তাদের তুমি রক্ষা করো-
তোমার উদ্ধত রাইফেল হাতে।

ক্ষুধা-অভাব-দারিদ্র-হতাশায়
জীবন যাদের গড়িয়ে গেছে
মানুষেরই গড়া অন্ধকার খাতে,
তাদের তুমি তুলে আনো
আলোর জগতে
তোমারই পবিত্র দুটি হাতে।

আগামী কাল প্রভাতে
নতুন দিনের সূর্য উঠবে
তোমার চরণ ছুঁতে,
তোকে তুমি শেষ স্যালুট জানাও
তোমার উদ্ধত রাইফেল হাতে॥

.                ****************                
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর