চিতা কবি ডঃ সুদীপ মণ্ডল মিলনসাগরে প্রকাশ কাল - ২৪.৯.২০১৯
আমি শিব! আমি নটরাজ! আমি ভীষণ, আমি ভয়ংকর, আমি ন্যায়-দণ্ড হাতে মহাকাল! আমি দুরন্ত, আমি দুর্বার, আমি চণ্ডাল! মানুষের নশ্বর দেহ নিমিষে করে ছাই- ঐ ছাই ভষ্ম মেখে কালের পথে নেচে বেড়াই তা থৈ-তা থৈ।
দুর্বৃত্তের দল বর্বর খেলায় মাতি, পূর্ণগর্ভা মায়ের পেটে- মেরেছিস লাথির পর লাথি। মা আমার কহে নি কো কোন কথা, নীরবে সহেছে সব ব্যথা; ফেলেছে শুধুই চোখের জল, দেখি – কত নিষ্ঠুর, দয়াহীন, পাষাণ ঐ দুর্বৃত্তের দল?
কুম্ভ কর্ণের মতো আমি ঘুমিয়ে ছিলাম নিশ্চিন্তে, ভাবিলাম জাগিব আমি ন’মাস ন’দিন অন্তে। অকালে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো তোদের অত্যাচার। দেখি – কত বাড়তে পারিস? কত তোদের বাড়? অকালে জেগেছি আমি তাই আমি অকাল।
হাতে গুনে হিসেব না পাই, কম্পিউটারে হিসেব করে বল দেখি ভাই! রামমোহনের আগে থেকে আজ আমার চিতায় পুড়ে হ্ল ছাই কত মা-বোন-স্নেহের দিদিভাই? জানি তার কোন হিসাব নাই, তবু হিসাব আমার চাই। মুক্তির গান গাই- এ লড়াই বাঁচার লড়াই, উচ্চকণ্ঠে জেহাদ জানাই, যারা বহে আনিস যত- গলিত-মৃত-অর্ধমৃত-জীবিত দেহ; আমার শ্মশানে তোদেরকে শুধাই-
আজ থেকে আমার চিতায় জ্বলিবে না রূপ কানোয়ারা, প্রমাণ দিতে সতী, আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই যারা শাসক-শোষক-সমাজপতি।
কেন অকালে ঝরিল দেবযানী? শুকাল যত নারী জীবনের সাধ, পণের টাকা দিতে পারেনি- এই তার অপরাধ। আমার চিতায় জ্বলিবেনা দেবযানী অভিমানী, আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই- টাকাই যাদের জীবনের মূল্য স্বপ্ন মেকী ধনী।
আমার চিতায় জ্বলিবেনা- সাজানো যত ডাইনি, আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই, যারা সভ্য সমাজের শুকুনি। অসহায়ের শেষ সম্বল করিতে গ্রাস, যারা ফেলিছে ঘন ঘন বিষাক্ত নিঃশ্বাস, ধীরে ধীরে ভারী হয় পৃথিবীর মুক্ত বাতাস; দম যে বন্ধ হয়ে আসে নিতে যে পারিনা শ্বাস। শোন্রে জান গুরু- তোদের খেল শেষ এবার আমার খেল শুরু।
আমার চিতায় জ্বলিবে না চুনী লোধা স্নাতক সেই মেয়েটি, আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই, চুনীর প্রাণ কেড়ে নিলো যাদের ভ্রূকুটি।
কোন অতি মহামূর্খ জলের বালতি হাতে- স্বপনের রক্তের দাগ মোছে রাজপথে? ও দাগ লেগেছে ইতিহাসের পাতায়। ডাক তোদের শাসক তারে দেখি-কেমনে মোছে এ দাগ কোন ইরেজারে? আগামী আসিছে, তারা কৈফিয়ৎ চায় কেন লেখা হলো ইতিহাসে এই কলঙ্কিত অধ্যায়? ক’টা আছে তোদের আন্ডার গ্রাউন্ড? তোরা লুকাবি কোথায়? কোথায় তোদের ঠাঁই?
আমার যে ক’ভাই গিয়েছিল মিটিং-মিছিলে দিনটা একুশে জুলাই, তারা ঘরে ফেরে নাই। তাদের মা-স্ত্রী-পুত্র আজও দাঁড়ায়ে পথের ধারে, আশায় আশায় দিন গুনে- এই বুঝি ঘরে ফেরে। ঐ ক’ভাইয়ের ঠিকানা আমার চাই- তোদের ক্ষমা নাই, ক্ষমা নাই।
আমার চিতায় জ্বলিবে না এরাই, আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই। সাদা আর খাকি পোষাকে গুন্ডা, গণতন্ত্রের হিমযন্ত্রে হৃদয় যাদের- কঠিন বরফের মত ঠাণ্ডা।
স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ভেদিয়া জীবনের যত প্রাণ বায়ু দিয়া মা জিজ্ঞাসে দাঁড়ায়ে রাস্তায়, “খোকা! সোনা মানিক আমার তুই লুকালি কোথায়?” ম্যানহোলের ভিতর থেকে খোকা উত্তর দেয়, “ডুব আমি দিলাম মাগো অন্ধকার পঙ্কিল মানবিকতায়। আমি তোমার খোকা নই আমি এখন ডুবুরি কৌশিক, ম্যানহোলের অতল থেকে খুঁজে আমি আনবই হারানো রত্ন মানবিক।”
আমার চিতায় জ্বলিবে না- কৌশিক অবোধ, আমার চিতায় জ্বলিবে শুধু তারাই, যারা হারিয়েছে চেতনা মূল্যবোধ।
আমার চিতায় এদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে করে ছাই, ঐ ছাই ভষ্ম মেখে- কালের পথে নাচিব আমি তা থৈ-তা থৈ॥