বয়ে চলে কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
দিবাবসানে প্রায়ান্ধকার মাঠ ঘাট বিল জুড়ে এক স্তব্ধতা নেমে আসে আকাশ ওদের অনেক কাছে এ সময় কোনও কথা ভালো লাগে না তবু এ সময় কখনও কোনও চীত্কার সময়কে ফালা ফালা করে চলে যায় দিগন্তের দিকে পৃথিবী দেখে ওই চীত্কার কান্না বাহিত অন্ধকারে যতদূর চোখ যায় কোনও জনপ্রাণী নেই কোনও প্রাণের উন্মেষ তবু কান্না কেন ? সৃষ্টি সভ্যতা ধ্বংস সকলেই মৃত। অবাক লাগে। মৃত্যুতে তবে শেষ নয়। কোথাও কোনও মাটির গভীরে নদীর জল কল্লোলে অথবা আকাশে মেঘের পরতে রয়ে গেছে বিরহের কান্না, প্রেমের সংশ্লেষ দিবাবসানে প্রায়ান্ধকার নদীতটে মুছে যায় কবিতার শব্দগুলো সুখ ও দুঃখজাত ঢেউ সবই সে সময় ধ্বংসের দিকে বয়ে চলে আকাশ, অনেক ব্যথা নিয়ে ভাবে কোথা সে কান্না, যে কান্না সময়কে চীত্কারে জাগিয়ে তোলে! মৃত নারী লিখে চলে বেঁচে থাকা অক্ষর নিয়ে এ কবিতা শেষ হতে অনেক বাকি ঝড়ে উড়ে গেল উড়ে যায় ছিন্ন হয় তার খাতার পাতা লিখে চলে বেঁচে ওঠা নারী
প্রতিদ্বন্দ্বী কে! কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
প্রতিদ্বন্দ্বী কে! কার সঙ্গে আমার বিরোধ! কোনও বিরোধ নেই, কোনও শত্রু নেই তবু আমি সকাল সন্ধে অস্ত্র শাণিত করি, নিক্ষেপ করি ওই কোকিলের গায়ে, কোকিল গান ভোলে নিক্ষেপ করি ওই পুকুরের বুকে, পুকুর শুকিয়ে ওঠে নিক্ষেপ করি ওই নিরপরাধ নারী পুরুষ শিশুদের দিকে, ওরা জীবন হারায়, আমি তৃপ্ত হই এ ধ্বংস এ হাহাকার এ মৃত্যুধারায় আমি কী একা, একা নই, ওইতো হাততালি দেয় স্তাবকেরা স্তাবকের সংখ্যা বেড়ে চলে গ্রহীতার দল আধার নিয়ে হাতে কীর্ত্তন করে প্রেমভুলে, আজ চুলোয় ঠেলে। স্থলে জলে অন্তরীক্ষে আমার নাম কেবল আমার নাম তোমার কপাল জুড়ে
যুবতীর কপাল জুড়ে ঝুরো চুল অস্থির তার ভাবনায় প্রিয় যুবকের চোখ দুটি। যুবক জেনেছে অনেক পথ বাকি যুবতীকে ঘিরে যুবকের স্বপ্নভাষিত কথা, তার মাতৃভাষা, দেশের মাটি, ছেলেবেলার নদী ডাকে আবারও ডাকে ডাকে
দিকে দিকে ক্ষমতার আগুন জ্বলে শান্ত থেকেছে বহু বর্ষ জুড়ে আশা ছিল যদি বোধোদয় হয় আর নয় অনশ্বর জলরাশি ক্রুদ্ধ হ’লে কিশোরীর পায়ের নূপুর বেজে ওঠে দীপক রাগে সে আহ্বান করে অহম্ সিদ্ধ অগ্নিকে আর্ত্ত সময় ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে কিশোরীর মাতৃক্রোড়ে
খোয়া গেছে কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
খোয়া গেছে ভালোবাসার নদী খোয়া গেছে ছেলেবেলার মাঠ খোয়া গেছে আমার কানের মাঁকড়ি খোয়া গেছে মান অপমান তোমার আমার আবার মান অপমান! নানা কাজে দিন যায়, সন্ধ্যে নামে উত্তরাকাশে জেগে ওঠে ধ্রুবতারা রাত বাড়ে আমার তোমার ঘরে ফেরা, নেই কোনও তাড়া ঘরে ঘর নেই বিছানায় নেই বিছানা কুঁজোয় জল নেই গর্ভে সন্তান রাতের অন্ধকারে দিশেহারা রাত কী শেষ হবে! কে বলে দেবে ? আকাশে জাগরূক ধ্রুবতারা চিহ্ন রেখে গেছে ভালোবাসার নদী চিহ্ন বিনে ফুরালো সকলি তোমার আমার ঘরে ফেরার, ঘর হতে বাইরে উড়াল দেওয়ার নেই কোনও তাড়া রাতের আকেশে চেয়ে আছে ধ্রুবতারা মুখে বলি ভালো আছি চেয়ে দেখি আকাশের ভ্রূকুটি ও সকল সত্ভূমি
মা কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
ছুঁয়ে থাকো। প্রায় ফুরিয়ে গেছি, পাশে রাখো। শাড়িতে হলুদ ছোপ ডান হাতে, বেশিটা সময় কাটে রান্নাঘরে তোমার এক জানালা আছে পুবদিকে। ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ে ঘর ভাসিয়ে তোমার মুখময় সে থিতু হয় ছেলেবেলা যখন অসুখে, কেবলই মনে হতো কাছে থাকো ছুঁয়ে থাকো। বেলাশেষের যৌবনে ভয় হয়, ছেড়ে যাবে নাতো!
মা তুমি কোথায়, মৃতের ডাক শোনো যুদ্ধ শেষে মৃত ও জীবিত সৈনিকেরা একজন মাকে খোঁজে তার ছায়ায় এক সবুজ বনানী, এক আঁজলা পানীয় জল মা তুমি কত দূরে ? যে সেনানী মৃত্যুর হাতে দোল খায় সে তোমাকে ডাকে চিত্কারে, তুমি কান পাতো
যুবতী ও বৃদ্ধা মায়েরা কেমন আছো! সময় যেখানে দুঃসময়ে মেশে, সেই মোহনায় যুবতী দাঁড়িয়ে আছে তার লৌহকঠিন জেদে। সময়কে ফেরাতে হবে রান্নাঘরে আজও এক পুবমুখী জানালায় মা তাকিয়ে আছে উদীয়মান সূর্যের দিকে, মা তুমি স্বাধীন হও আদি মুক্তিতে
আদিতে বৃষ্টি থেমে গেলে কোন্ সে নয়নের অভিঘাতে ধরায় প্রাণ এলো বাবা ও মা। সভ্যতার তুঙ্গে সন্তানেরা মাকে ডাকে জীবিত ও মৃত সেনানী দোল খায় হিংস্রতার হাতে। কে কাকে ছুঁড়ে দেবে কোন্ আগুনে, কেউ কি তা জানে! মা তুমি সংহারে সৃষ্টিতে থাকো। মা তুমি এ কালবেলায় আমাদের ছেড়ে যাবে নাতো ?
স্বাধীনতা এলো কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
গা-ময় এত কাঁটা ছেড়া, কোথাও বা পোড়া দাগের ঘনঘটা কিছু অঙ্গ গেল ছিন্ন হ’য়ে, তবু তুমি উল্লসিত হবে! যে পতাকা হাওয়ায় দোলে তার মনোকষ্ট তুমি টের পাবে কবে তোমার মনে হবে শিউলি কুড়ানোর বেলা শেষ, এবার শুধু পতাকায় ঝরা পাতা জড়ো করা, শীত গেল যে কোকিল ডাকে না কে যাবে, বসন্তকে ডেকে এনে কে বসাবে ভাঙাচোরা দাওয়ায় এককোণে পড়ে থাকা কাপের চা টুকু ঠাণ্ডা হ’য়ে আছে এষ্ঠ অধর ফুলে আছে কান্নার অভিঘাতে ভাঙা মাটি কথা বলবে কবে, ছ-মাস হ’লো সে বোবা হ’য়ে আছে তার সব কথা ফুরিয়ে গেছে ? যেতে হবে, কান্না ছেড়ে উঠে পড় গুছিয়ে নাও, যে টুকু না হ’লেই নয় উদ্বাস্তু হ’লে, বোকার মতো কেঁদো না ছ-মাস হ’ল দেশ তোমার স্বাধীন, ঠাণ্ডা চা টুকু ফেলো না
উদ্বাস্তু শিবিরে, দেশবিহীন দেশবাসীর ললাটে কলম লিখে চলে এক কাহিনী, শ্রুতি সুখকর নয়, তুমি কী শুনবে, কলমের ভয় হয়। তার এ গতি ভয়শূন্য হতে ভাঙামাটির বুকে আছড়ে পড়ে আশ্রয় চায় পিপীলিকার মতো উদ্বাস্তু যত পিপীলিকাও নয়, ওরা ভুলে গেছে কামড়াতে, ভুলে গেছে কী নাম যেন ওদের যে দেশটি ছিল, শেকল গায়ে তার ছিল কষ্ট বড়ো। সে ক্ষণে যৌবন দণ্ডায়মান কৃপাণ হাতে স্বাধীনতা এলো ভাঙা মাটির বিভেদ রেখায় রক্তঝরা কত প্রাণ কবরের মাটির নীচে জ্বলে জায় চিতার আগুনে ঝলসে যায় তোমার আমার মতবাদ ধুলোর চেয়েও নগন্য মানুষেরা এপার হতে ওপারে অবাঞ্ছিত এপারে এসেছে বস্তাবন্দী ওরাও মানুষ শত শত স্বাধীনতা দিবসে ভেরী বাজে আবির ওড়ে স্বাধীনতার একবছর হ’ল স্বাধীনতা দিবসে শহর যত কাঁপে উত্সবের রেশ-এ দেশ-এ অন্নহীন-এর ফলন ভালো স্বাধীনতার বয়স ঊনষাট হ’ল
১লা জানুয়ারী, ২০০৬ কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
ইংরেজী নতুন বছরে, বাংলার যৌবন আর একটু বাঙালী হবে ? ক্ষতি নেই পৌষের আদুরে রোদে তোমার ভাষাকে একটু সেঁকে নিলে, কথা থেকে গান হবে অস্ত্র হতে তীক্ষ্ণতর তোমার চুম্বন, শিশিরের মতো যুবতীর গাল হতে পিছলে নামে গাঢ়তর কোনও বাসনার উন্মেষ, জেগে ওঠে সেই শিশু, তার ড্যাবডেবে চোখ, অপুষ্টিতে ফোলা পেট আবেশের অস্ত্র ছোঁড়ে যুবতীর অনুভবে বছরের প্রথম রাত যুবতী কোথায় কাটাবে ? যুবকের বাহুপাশে দুজনের প্রগাঢ় নিঃশ্বাসে . . . . , অসহ্য ওই এক অনাসৃষ্টির শিশুমুখ ভেসে ওঠে এ কোন্ রাজ্য! ধর্মের পতাকা তলে ইঁদুরেরা চলেছে মাঠে ময়দানে, সভা হবে ধ্বংসের সূচনা সঙ্গীতে কত তারা ঝরে পড়ে আকাশ হতে দুঃখ শোকে পৃথিবীর জলতল কেঁপে ওঠে যুবক যুবতী বাংলার মাঠ পেরে ওঠা ধান নরম শিশিরকণা, বাংলায় কথা বলে ক্ষুধিত যত বালক বালিকা একটু ওদের ছুঁয়ে দেবে ? আপন ঘরের দুয়ার হতে ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ে কাক শালিকের ঠোঁটের মায়ায় যুবতীর খোলা চুল হাওয়ায় ওড়ে ওদের হাসি, দেখবে চলো সত্যি এক অনাথ শিশুর মুখে দিনটি বলে রাতের কানে তোকে আমি অশ্লেষে আঁচড়ে দেবো নরম গালে ভাষার প্রলেপকামনার ক্ষতে রাত গভীর হ’লে যুবকের বিছানায় যুবতীর উন্মেষ বাংলা শব্দের প্রগাঢ় উচ্চারণে আকাশও উঁকি দেয় নির্ভয় ফুল মাটি ফোটে তারা, আরও আরও বাংলা কথা
কে কড়া নাড়ে! কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
না জন্মালেও হ’তো,--- তবু জন্মে গেলাম কিছু ফুলপাতা আকাশ আর সভ্যতার প্রায় শেষ ধাপে নবনির্মিত কিছু সোপান দেখবো বলে সোপানগুলো উঠে গেছে উঁচু হতে আরও উঁচুতে ওই উঁচুতে কি ঈশ্বর থাকেন ? কিছুকাল আগেও হে ঈশ্বর তোমার কথা এমন করে . . . ? না জন্মালে হ’তো। তবু জন্মে গেলাম ইদানিংকালে, আমার বেঁচে থাকা বৃদ্ধা মা আমার মৃত বাবা ওঁদের নিয়ে আমার কত সময় যে কাটে বাবার সঙ্গে একা একা কথা বলে! বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বাধীন এ ভারত তাঁকে তৃপ্ত করেছে কতটুকু, জিজ্ঞেস করিনি তাঁর তেমন পার্থিব কোন চাওয়া ছিল না, তাই না পাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ওঁর খদ্দরের বেশবাসের ছিন্ন অংশ আমার কাছে আজও আছে ওঁ কিছু কথা ওঁর ভালোলাগা ওঁর ভঙ্গুর বার্ধক্য একালের তুলমূল্যে, মা বাবার প্রায় এক রঙা জীবন নিয়ে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে ঈশ্বরকে মনে পড়ে ওই যেখানে প্রলম্বিত আধুনিক সোপানগুলো উঠে গেছে ওখানে কী আমার ঈশ্বর থাকেন ? কিছু ফুলপাতা আর পুকুরের জল নিয়ে আমি প্রবাহিত সময়ের অনাবিল মুক্তিতে জন্মেছি, তাইতো পেরেছি মা’কে ছুঁতে দৈবিক লাগে বাবার জীবনবোধ উঠে আসে আমার চিন্তনে তারি পাশে দখিণা বাতাসে কখনও বিরহ তীব্র হয় ভাবনা ও শরীরী কামনায়। এভাবে পিতামাতা ও ঈশ্বর হতে একটু আল্ গা হ’য়ে যুবকের সঙ্গে তীব্রভাবে আছি তোমাদের কাছেও, জন্মের ঋণ শোধ করবো বলে আমার কপালে জন্ম মৃত্যু আঁচলে পাগল বসন্ত আকুল হ’য়ে আমি অথবা তুমি, কে কড়া নাড়ে!
চড়ুইটি রোজ আসে কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
আমার ঘরে বিজলিবাতির নীচে এক অদৃশ্য অন্ধকার ওই উঠোনের এককোণে চড়ুইটি রোজ আসে, কেন আসে অসময়ে কি পেতে ও’কে জিজ্ঞেস করেছি অনেকবার কোনও উত্তর নেই ও’র মুখে শুধু এক বেঁচে থাকার আস্বাদন ওরে চড়ুই শোন্ তুই, বেঁচে থাকার স্বাদটুকু আমিও পেতে চাই পুকুরপাড়ে অশ্বত্থের ঝুঁকে পড়া ডালপাতা থেকে সময় ঝরে পড়ে টুপ্ টাপ্ আদি পুকুরের জলে সে সময় আমার ঘরে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে আধুনিকতা ডানা ঝাপটায় নকল ফুলের রেণু ছুঁয়ে ‘ও’ বুঝি উড়তে চায় অন্ধকার পার হ’য়ে পেতে চায় যে জীবন হবে বান্ধবহারা কুয়াশার মতো সময়ের মতো বহুরঙা আত্মভেদী অতি ধীরে আদিপুকুরের জলে সন্ধ্যা নামে তমসা পুকুর হতে ঘরের দিকে বহমান আমার ভঙ্গুরতা কোথা হতে কারও কাছে উত্তর চায়, যে প্রশ্ন তার ঘরে বিজলিবাতির নীচে মানবিক মন-সংকোচনে তবু কালবৈশাখী থেমে গেলে যুবতী আশা করে, যুবকের গা বেয়ে ওই সরীসৃপ উচ্চাশা একদিন হবে মনস্তাপে অসাড় বেঁচে থাকার আস্বাদনটুকু নিয়ে, চড়ুইটি রোজ আসে কেন আসে ও’কে জিজ্ঞেস করেছি অনেকবার
লুঠ হবে! কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
যুদ্ধ হয়, যুদ্ধ হবে মৃতদেহ গড়ায় শত শত খোলামাঠে ধানক্ষেতে নদীতীরে আকাশপথে আবারও যুদ্ধ হয় যুদ্ধ হবে গড়ায় মৃতদেহ সভ্যতার উদ্ধত গর্জিত তর্জনীর কাছে সে কী হ’য়েছিল নত! ভীরু ইতিহাস কেমনে উত্তর দেবে ? ঝরাপাত সুদূরে মিলায় যথার্থ প্রশ্ন যত সেনা ও সাধারণ মানুষেরা, দেশজ যত ইঁদুরেরা বস্তাবন্দী হ’য়ে চলেছে নিশ্চিন্দিপুরে, ভর্তার আদেশে যুদ্ধের ভেরী বাজে কে কার ভাই, কে কার বোন থাপ্পরে চুপ কর। মন দিয়ে শোন, ওই যে মাঠ পার হ’য়ে আর এক মাঠের গায়ে এক পাড়া এক গ্রাম ক্রমে এক দেশ, ওই দেশ শত্রু বড়ো, অস্ত্র ধরো, ওকে শেষ করো এক্কেবারে শেষ রাতের আকাশে চাঁদ মুখ তুলে দেখে এতো মৃত্যু হিংস্রতার সর্পাঘাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে কী জবাব দেবে! ভেবেছে চন্দ্র সূর্য, পৃথিবীর মাটি জুড়ে অক্ষর ছড়ালে, ভাষা হবে কাণ্ডারী, দুঃখ সুখ প্রেমে কেটে যাবেমানবের দিবস রজনী, অপরূপ সৃষ্টি এ পুরুষ ও নারী। তার কিয়দংশ ক্ষমতার আস্ফালনে অস্ত্র শাণিত করে দেখ ওই কারাগারের দেওয়ালে বাকি ইতিহাসটুকু লেখা হবে বিজেতার নিজস্ব দোয়াতের কালিতে যুদ্ধের মাঠে বালিকা মৃতদের কানে ঢেলে দেয় কিছু ভাষা কিছু উত্তাপ কীভাবে শুষে নেবে অস্ত্রের নির্মমতা তোমার অভাব চারিদিকে ফুটে ওঠে মানবের প্রেমহীনতা যুদ্ধের ভেরী বাজে বালিকা দু কান চেপে ধরে বৃক্ষের মেরুদণ্ড দিকে দিকে সকলি অন্ধ কে যুদ্ধ চায় কারা! শিশুর বাগানে লুঠ হয়
বোধন হবে কবি স্বপ্না ঘোষ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আছি” (২০০৬) থেকে নেওয়া কবিতা।
প্লাবনের কাছে ধেয়ে আসে নদী করজোরে মিনতি করে, না আর নয়, নিজেকে ফিরাও তুমি এ কি ধ্বংসলীলা তব, তলায় ঘর-বাড়ি, নারকেল তালগাছ যত সারি সারি গৃহহারা পুরুষ ও নারী, অগণিত শিশু, আকাশতলে ওদের তাঁবু হাওয়ায় হাওয়ায় ফুলে ওঠে নিয়মলেখা ভেজা কাগজগুলো, অহেতুক, ফেলে দিলেই হয়, যা কিছু হোক রিপোর্ট লিখো গৃহহাকার মূল্য কি আর এক সিকি কি আধুলি, এসব কিন্তু মুখের কথা, লিখতে হলে ভিন্ন লিখো আবার বলি লেখার পাতায় ওদের প্রতি ভালোবাসার কপট অশ্রু ঢেলে দিও
সততা ছিনতাই হলে মানুষ স’রে যায় মানুষের পাশ হতে ফাটল দিয়ে প্লাবনের জল ঢুকে পড়ে ওদের গ্রামে আর ওই ওদের গ্রামে নদীতীরে বাজনা বাজে আজ মা দুর্গার বোধন হবে শহর জুড়ে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান রোদ ঝল্ মল্ রোদ ঝল্ মল্ মেকি হাসির দান প্রতিদান
কলাবউ অবগুণ্ঠন খোলো গ্রাম্য দেবী মূর্তি ভেসে যায় প্লাবনের জলে ভেসে যাওয়া মানুষের আর্তি শহুরে প্রতিমা শোনো কী ? প্লাবনের কাছে ধেয়ে আসে নদী নদী ক্রুদ্ধ হয়, ঘাসপাতাও দুঃখীজনের পাশে নয় কাগুজে নিয়মগুলো টেবিলে নিদ্রামগ্ন, ত্রাণের কাপড় যত ইঁদুরের হেপাজতে, মানুষ অর্ধনগ্ন, অনাহারে ভুলে যায় লজ্জা কাকে বলে প্রতিবাদ কলাবউ অবগুণ্ঠন খোলো গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে শুধু মৃত্যুর স্বাদ, চেটে নেয় ওই ওরা চেটে নেয় শহুরে প্রতিমার গায়ে জমে ওঠা ধুলো এমন ভক্তি লিখে রাখো খাতার পাতায় মা-দুর্গার বোধন হবে, মৃতেরা ঢাক বাজায়