তোমাকে সাক্ষী রেখে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তোমাকে কিছু বলার আছে গোপনে নয়, সূর্য্য চন্দ্র তারা সাক্ষী রেখে রাতদিন পার হ’য়ে প্রেমময় যুবককে কাছে ডেকে সে কথা বাকি থেকে যায় | সে কথা তারার আলোয় ভেসে চলে বন বনান্তর পার হ’য়ে এক ধানের ক্ষেত, ক্ষেতের মাঝে ক্ষেত মজুর তার সপাট দেহ মন | ওরা তোমার ভালোবাসা চিন্তা বিপ্লব মৃত্যুর পর তোমার বেঁচে থাকা | বলার এটুকু , ফিরে এসো যেখানে যে ভাবে আছো , শহীদের মন্ত্রে ভেসে পাকা ধানের গন্ধে এসো ফিরে তার তরে যে কাজ রেখে গেছো মায়ের গর্ভে পিতার হৃদয়ে বালকের দুচোখে | চলে যায় রাত দিন, গোপনে নয়, তোমাকে সাক্ষী রেখে আমাদের প্রেম বিনিময় বিপ্লব ও মৃত্যুর মাঝে তোমাকে অনেক কথা বলার আছে |
চারু মজুমদার, শ্রদ্ধাস্পদেষু কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
কফি হাউসে বন্ধুদের রঙিন আড্ডায় এসে পরে তোমার নাম যেন কোন সুগন্ধি ফুলের রেণু ওই নামের কাছে আমি জন্ম জন্মাম্তর রয়েছি নতজানু ওই নামে কি যেন ঘটে যায় বন্ধুরা কফির কাপ ফেলে হিমকঠিন নীরবতায় যে যার মতো অন্যপথে আমার মনের অনেক দূরে | আমি পড়ে থাকি ওই নামের কাছে সময়ের হারানো সুরটুকু বেজে ওঠে পোড়া হৃদয় কেন যে এমন হয়, আমার অস্থিরতা আমায় আজ হতে গতকালের মেঠো পথে টেনে আনে এক শূন্য মাঠে সেখানে মাতাল হাওয়ায় আমার চুল ওড়ে সমাজের অন্ধকার সেখানে পাশে এক নদী, তার এ পাড় ভাঙে ওপাড় গড়ে মহাকাল | রঙিন আড্ডায় তোমার নাম আজ সুর হারানো সুরটুকু বাজে ওই মেঠোপথে বাংলার দিক্ চক্রবালে তোমার নাম সৎ-জমির ধান হ’য়ে ঝরে
২০০০ সনে, পিছু ফিরে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তিরিশ বছর আগে এক ঝড়ের বাংলা , তোমায় ভুলতে পারিনা আমি তখন যৌবনের প্রথম সিঁড়িতে তাকিয়ে দেখি আকাশ ঘোলাটে ঘরে ফিরে ভীরু জানোয়ার হ’য়ে আমার কান্না নিরাপদ যন্ত্রণায় ঘরের মেঝেতে উঠোনে শাড়ির আঁচলে যৌবনের বহুবর্ণ মৃত্যু প্রতিদিন খোলা রাস্তায় | কে বলে অপচয়, বিচার করার আমি অথবা তুমি কে, বিচারক কাল পেরিয়ে মহাকাল, তার কখনও ভুল হয় ! সে সময়ে আমি যৌবনের প্রথম সিঁড়িতে, প্রিয় যুবকের খোঁজে গিয়ে দেখি, সোনাঝরা ধানের সন্ধানে সে গেছে ঠিকানা না রেখে, সে ধান ওরা পৌঁছে দেবে ক্ষুধার্তের দুয়ারে একা শূন্য হাতে ফিরে নিরাপদ আশ্রয়ে কেটে গেল তিরিশটা বছর বৃদ্ধ ব্যথিত সন্তানহারা বাংলার, কমজোরি ফুসফুসে আর বাতাস ওঠে না ঢেউ জাগে না, আমার সে প্রিয় যুবকের, আরও কতশত যুবকের নেই কোনও খবর
১২ই আগষ্ট, বরানগর, ১৯৭১ কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
যুবক তাকে কলাবতী ফুল দিয়ে বলে, ঝরে যাওয়া ফুল, গাছ থেকে তোলা নয় যুবতী মনে মনে বলে, তোমার জন্যে ভয় হয় সে-ই শেষ দেখা জীবনের মতো ওদের মৃতদেহ ঘাতকেরা গঙ্গায় ছুঁড়ে দিল বিসর্জনে প্রতিমা এভাবেই গঙ্গায় ভাসে যুবতীর চোখের জল যৌবনের অঞ্জলিতে আজও স্বপ্ন টলোমল সে ভয়াবহ দিনে বালিকাটি আড়াল থেকে গোপন হত্যা দেখে ভাবে , বনের পশুকে মানুষ কেন হিংস্র বলে ? মানবিক হিংস্রতা খেলা করে ঘাতকের চোখে মুখে নাকে কানে ঠোঁটে তারপরও হিংস্রতা হিংস্রই থেকে যায় ঘাতকের হাতে অস্ত্রের রেখা যোদ্ধা যুবকের সঙ্গে যুবতীর সে ভয়াবহ রাতের আগে সে দেখা শেষ দেখা |
বালিকাটি যুবতী হ’লে বালক যুবক হয়
যুবক, যুবতীর খোঁপায় হলুদ কলাবতী ফুল গুঁজে বলে, এ পুষ্প যোদ্ধা যুবকের মনের আলো দিয়ে গড়া | যুবতী বলে, বরানগরের সেই রাতকে আজও স্মরণ করে আকাশের তারা |
ঢিল কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
বালক খেলাচ্ছলে পুকুরের জলে ঢিল ছোঁড়ে জলে আলোড়ন ওঠে জলের সে আলোড়ন স্থির চোখে চেয়ে দেখে এক স্থিত প্রজ্ঞা যুবা | ঘিরে থাকা মাটি জরিপ করে সে সমাজের অনাচারে ছুঁড়ে দেয় তার প্রতিবাদের আমোঘ ঢিল এমন ঝোড়ো যুবকের জন্ম যেখানে নাম তার পুণ্যতীর্থ হাতিঘিষা নক্ শাল বাড়িতে বেনাম যত জমি, ভূমিহীন কৃষকের হবে সেই ভূমি ঢিলের আঘাতে বিদ্রোহী কম্পন একথা বলেছে সেদিন বাংলার ঘরে কড়া নেড়ে সনতারিখ, ঊনিশশো ছেষট্টির চব্বিশে মে শাসকের বিষতীর ছুটে চলে জঙ্গলের পাতায় পাতায়, ভরা যৌবনে বৃক্ষটি শত সহস্র সন্তান হারায় অসমাপ্ত কাজের দায়ে কিছুকাল বেঁচে থেকে ঘাতকের কারাগারে, ভাতের পাশে নুনটুকু সে ঘৃণায় ছুঁড়ে ফেলে | দেশময় বেনাম জনিতে আজ শুধু মালিকের চেতনার ক্ষয় একবিংশ শতাব্দীতে চারিদিকে হুংকার, বিজ্ঞান এগোলে নাকি মানুষ উন্নীত হয়, স্তব্ধ বিজ্ঞানের বুক জুড়ে হাহাকার সে আজ ভাবে জঙ্গলের মৃত শরীর জুড়ে ধরায় বসন্ত আসবে কবে !
চোখে আগুন ছিল কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তাঁর চোখে আগুন ছিল আমরা পতঙ্গ হ’য়ে ছুটেছি তাঁর দিকে যুবক যুবতীর ঝাঁক চলেছিল সব ভুলে এক আদর্শের টানে তিরিশ বছর আগে একবিংশ শতাব্দীতে আমার মৃত্যুর বয়স তিরিশ বছর হ’ল দেহ ছেড়ে দেহাতীত হ’য়ে বাংলার সবুজ ধান মনে পড়ে আরও কিছু কার ভুল কতটুকু ভুল সত্যি কি ভুল, প্রশ্ন জাগে | বক্র মেরুদন্ড নিয়ে যৌবন আস্তাকুড় ঘেঁটে ভোগবাদের অক্ষর খোঁজে যে যার আত্মচরিত | কার্তিকের হিমঝরা সন্ধ্যায় তিনি ছিলেন বড্ড আবেগ তাড়িত বিকেলে অপার্থিব হাওয়া দিলে স্বপ্ন বিপ্লবের সঙ্গে হ’ত তাঁর মাল্য বিনিময় এতোগুলো প্রাণ নিয়ে তাঁর কাজ ছিল গোটা রাজ্য জুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে যৌবন ব্যর্থতা নিয়ে এলো বেসামাল পথে অমূল্য প্রাণ দিয়ে মাটিকে আরও জরিপ করা মানুষের মুখগুলো প্রয়োজন ছিল মানুষের হৃদয়ে আর একটু ঘন ডুব অকারণে মানুষ নিধন অগুণ্ তি প্রাণ নিয়ে নয় ছয়, এ কী ছেলেখেলা, কেন আর একটু ভাবোনি ? সত্তরের পরাজয়ে যৌবনের আদর্শ আজ পচাগলা, মনে হয় ভুল বলিনি |
দেখেছি যোদ্ধার বেশে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আবছা মনে পড়ে, তোমাকে যেন কোথায় দেখেছি যোদ্ধার বেশে। ঠিক এ জন্মে নয়, অথবা এ জন্মে, তিরিশ বছর আগে অগ্ন্যুত্পাতের প্রহরে শুনেছি তোমার মৃত্যুর খবর ও পুনর্জম্ন আবারো এ দেশের মাটি ভেদ করে তুমি এক শ্যামল বৃক্ষ সত্তরের আদর্শ ঘিরে অপ্রতিহত তোমার অক্ষ মানুষকে মানুষের মতো হ’লে মানায় ভালো কিছু প্রেম ভালোবাসা ভোগের প্রতি খানিক লালসা, দেশের মাটি গায়ে মেখে হে যুবক, ধর্মের অর্থ বলো রক্তচোষাদের কশ বেয়ে নেমে আসে নিয়মাবলী, কালাকুলো চাষাটি দুচোখের মশাল নিয়ে ছুটে আসে, সে আগুনে সে ধুয়ে দেবে অনাবশ্যক যত ঝুলকালি অপুষ্টিতে তার সন্তানের পেট ফুলে যেন জয়ঢাক সাতষট্টির মাঝামাঝি যেন উঠিল বাজনা বাজি, কৃষকেরা রেখেছে হাতে হাত কানু ও জঙ্গলের ডাকে, মশালের আগুনে জমির ন্যায্য বন্টন, এতো সরবতের মতো সহজ জেহাদ সহজ হয়নি মানুষকে মানুষ করে তোলা শাসকের বর্মের আড়ালে পুষে রাখা বিষ সর্প, কাজ তার কৃষকের বিদ্রোহকে বধ করা বিদ্রোহের এক শরীর আছে তোমাকে যেন কোথায় দেখেছি যোদ্ধার বেশে তুমি এক শ্যামল বৃক্ষ। এক বিংশ শতকে ঔই দুন্দুভি বাজে ক্ষুধার্ত মানুষের শূন্য পেটে দু দানা শস্য, তোমার লক্ষ্য
নির্দোষের রক্ত ঝরানোয় কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
নির্দোষের রক্ত ঝরানোয় কখনও শুভ হয় ? চারিদিকে তখন এলোমেলো হাওয়া, সবই আগোছালো। প্রিয়ার গালের তিলটিও। তাঁর বুকে পাড় ভাঙা ঢেউ, দিন পাল্টাতে হবে সে সময় হিত ও অহিতের সীমারেখা যেন মুছে গেল আমার আপনার আমাদের কাছে! হৃদয়ের তাগিদে আপনার নির্দেশে ওরা প্রশ্নহীন হাতিয়ার তুলে নিল কচি শ্যামল হাতে আজ এক তীব্র খরা ভোলা কি যায় ঘুমহীন চোখে, সত্তরের দশকে মা মাছি তাড়ান সন্তানের ভাতে সন্তার ফেরে না কতশত রাজকর্মচারী স্পর্ধা নিয়ে যদি বলি আমরা সকলে দায়ী তুমি ও তোমরা হয়ত বা আর কেউ প্রিয়ার গাল হতে তিলটি খসে পড়ে হে দীর্ঘ রজনী তুমিও কেন এলোমেলো হাওয়া বয় দিক হতে দিকে দিন পাল্টাতে হবে মাছিটি ভাবে ভাতটুকু আজও পড়ে আছে যদি কোনদিন ওরা আসে জঠরে বিপ্লবের ক্ষিদে নিয়ে আজও জেগে আছে আকাশের তারা তাঁর বুকে পাড় ভাঙা ঢেউ, সেই ঢেউয়ে ভেসেছে ওরা
সরোজ দত্তের দেহ হতে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
পিস্তলের একটি বা দুটি গুলির আঘাতে সরোজ দত্তের দেহ লুটিয়ে পড়ে ময়দানের ঘাসে এরপর বরানগর কাশীপুরে বেহালা যাদবপুরে, বাংলার আনাচে কানাচে যৌবন নিধন যজ্ঞ মনে পড়ে ? হত্যাকারী ভাবে, সত্তরের দিনগুলির সঙ্গে যৌবনের তাপ বুঝি শেষ হল, অসাম্যের কথা কেউ ভাবে নাকি, সত্তরের যৌবন কি বোকা ছিল একুশ শতকে ভোগ্যপণ্যের বাজারে নীল মাছি ক্লান্ত হয় একুশ শতকে যৌবন মুখ হতে ভোগের চুষিকাঠি ছুঁড়ে ফেলে ফুসফুসে উদাত্ত মাঠের হাওয়া টেনে নেয় এভাবেই ডট্-কমের সঙ্গে পাগল বসন্তের সখ্য গড়ে ওঠে চারু কানু জঙ্গলের থেমে যাওয়া ঝড় আবার কেন্দ্রিভূত হয় যুবক যুবতীর ঘন প্রেমালাপে ধেয়ে আসে মৃত জঙ্গল ছুঁয়ে এক বৈশাখী হাওয়া পিস্তলের একটি বা দুটি গুলির আঘাতে সরোজ দত্তের দেহ ভেঙে বিদ্রোহের ফুলিগুলো ওই দেখা যায় যৌবনের প্রদীপ্ত চোখে