ব্যর্থ সমাজ জানে না কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তোমায় আমি প্রতি সূর্য্যোদয়ে প্রতি সূর্য্যাস্তে ভাবি তোমার কথা মাটির নীচে জমে আছে কয়েকটা বছর কী ভীষণ অগ্নিময় নিবে যাওয়া আগুন ঘিরে ওরা কারা এলো! সবার আড়ালে মাটি শোকতপ্ত হ’লে আকাশ কি ভালো থাকে, নিবে আসে তারার আলো তোমরা সমাজের জঞ্জার গিলে দূষণে প্রাণ দিলে শহীদ হ’লে না শকুনেরা বিমু হ’লো। চারিদিকে এত মৃতদেহ, ওদেরও ঘেন্না হয়, সেদিন তোমাদের মরণোত্সবে বেঁচে থাকা ভীরু যৌবনের চোখ ফেটে রক্ত ঝরেছিল সেদিন বাংলার মাটিতে মৃত্যুযজ্ঞের ছাই ওড়ে আকাশের গায়ে মাটি শোকতপ্ত হ’লে আকাশ ক্রুদ্ধ হয়, সত্তরের ঢেউ নিয়ে তোমাদের স্মৃতিতে সে শুরু করে সৃষ্টি ও ধ্বংসের খেলা। ফিরে এসো রাতের আকাশ জুড়ে নক্ষত্রের গায়ে আজও প্রজ্জ্বলিত তোমাদের কথা ফিরে এসো ব্যর্থ সমাজ জানে না অসম্পূর্ণ সঙ্গমের ব্যথা
এ এক বিরাট ঠাট্টা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
পাথুরে অন্ধকার বরানগরের প্রতি ঘরে সেদিন ভাঙা শঙ্খের আর্তনাদ মায়ের বুক হতে ওরা কেড়ে নিল বীর পুত্রদের মুছে যাওয়া যৌবনের শোকে সেদিনের দর্শক ছাদে উপবিষ্ট চিলটি আজও উন্মাদ। শ্রাস প্রশ্বাসে বেঁচে থাকা বৃদ্ধপিতা ঘরের বাইরে চোখ মেলে দেখে সময় আজ ঘেয়ো কুকুরের তার চিত্কারে বৃদ্ধে নড়বড়ে স্রবণো ক্লান্ত হয় একবার চিতা থেকে, সমৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকা যক্ষ পিতার কাছে ফিরে আয় পিতা আমি, তবু মরতে পারিনি হ্যাংলার মতো আমার আয়ু বয়ে চলে ভুলতে চাই একাত্তরে অশ্বত্থের ছায়ায় কতশত অগ্নিশিখা ছিল এ পাথুরে অন্ধকারে সময়ের গালের ব্রণতে আজ কত না হলুদ সর বাটা দুনিয়া ঘুরে বরানগরের বাতাস বলে এ এক বিরাট ঠাট্টা
পৌরেষেয় হাওয়া বয় কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
কিশোরী ঋতুমতী হ’লে আকাশের তারা উজ্জ্বলতর হয় সৎ ইচ্ছের মতো কিশোরীর জীবনবোধ পুকুরের গায়ে শাপলার ফুল, বনে বাদাড়ে স্বাধীনতার মতো পবিত্র হাওয়া বয়, হাওয়া তুমি কোন্ আদি থেকে এসেছো মরুর প্রান্তর অথৈ জলে পড়ে থাকা ধর্মের চিবুক ছুঁয়ে! একাত্তর ব্যর্থ হ’লে পাপাকীর্ণ এ সমাজ মনুষ্যসমাজে ধর্ম তুমি কোন্ আবাসনে বাস করো কোন্ বহুতলের ছাদ জুড়ে আমার জানতে ইচ্ছে করে সদ্য গজানো বাড়ীর নীচে চাপা পড়া পুকুরের মনের কথা আমার জানতে ইচ্ছে করে কিশোরী কপালের টিপ জুড়ে আলোকবর্ত্তিকা এল কোন্ ধানভানা চাল হতে সে পেল এমন ইচ্ছে ইচ্ছের পিঠ জুড়ে শীতের রোদ। দুহাজার দুই সনে কিশোরীর ইচ্ছে অনেক দাগা স’য়ে ফিরে আসে উঠোন জুড়ে কে রেখে গেছে এমন অন্নজল! তৃষ্ণার্ত কিশোরী জলটুকু চুমুকে শেষ করে চারিদিক হতে ধেয়ে আসা আঘাতের বৃত্তান্ত বৃত্তান্তটুকু বর্ণে বর্ণে সত্য বলে, আকাশের তারা উজ্জ্বলতর হয় কিশোরী ঋতুমতী হ’লে সময় অধিকতর যুবক হ’য়ে ওঠে ধর্মের চিবুক ছুঁয়ে যথার্থ হাওয়া বয় হাওয়া বয় স্বাধীনতার মতো পবিত্র জেদ কিশোরীর তর্জনী ছুঁয়ে অন্ধ বৃদ্ধ হারানো দণ্ড ফিরে পায় স্বাধীনতার মতো শেকল ছেঁড়া পৌরুষেয় হাওয়া বয়
সত্তরের দিনগুলো লেখা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আমি সেই লগ্নভ্রষ্টা নারী যার বিবাহের কথা ছিল জাতপাত কুষ্ঠী মেনে এক পরিচ্ছন্ন যাতকের সঙ্গে জাতকের দেহ মিথ্যা দিয়ে গড়া সব দেশজ আচার। সে সময় সত্তর সনে, নকশাল নামে এক ঝাঁক বকের আগমনে আকাশ তোলপাড় বকেরা ধর্মের কথা শুনিয়ে গেল গৃহবাসীর কানে জাতপাত কুষ্ঠী মেনে বকেরা তীরবিদ্ধ হলো শত সহস্র বাধ্য জাতকের পিতা অথবা মাতার আদেশে তীরবিদ্ধ বকেদের মৃত্যুধ্বনি যেন শঙ্খনিনাদ সেই শঙ্খ বেজে চলে সমাজের স্তূপীকৃত জঞ্জালে কান পেতে শোনো ওই শব্দের আঘাত আজও বাঙ্ময় আমি সেই লগ্নভ্রষ্টা নারী যার কপালের রক্ষতায় বরাভয় হ’য়ে সত্তরের দিনগুলো লেখা কত মৃত্যু আমার প্রেমিকের গায়ে ক্ষতচিহ্ন দিয়ে আঁকা কত পরিবারের ধ্বংসের গান তিরিশ বছর পার হ’য়ে আমি আবারও বিবাহের সাজে সাজি সত্তরের নামে তীরবিদ্ধ বকেদের যন্ত্রণায় আমার সীমন্তের সিঁদূর ঝরে পড়ে
আগামীর দিকে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আমার যৌবনের এক তীব্র রঙ আমি সজত্নে নিয়ে যাবো আগামীর দিকে সঙ্গে তুমি থেকো আমার চোখ হতে ঝরে পড়া খরার মতো অবসাদ ভাসাবো তোমার মনে, তুমি শুষে নিও তোমায় বলেছি অনেক রেখেছি কিছু চুলের কালোয় সভ্যতার প্রায় শিখরে ওরা পৌঁছে গেল আমায় ফেলে একদিন সত্তরের দিনগুলো গেছে সবাই চলে গেলে বিদায় বেলায় বিংশ শতক একা যাবে ? বিদায় বেলায় আমি নিরন্ন করতল মেলেছি সময়ের দিকে চলেছে আমার চেতনা, ঘরে আমি একা তীব্র রোদের লোভে আমার সমস্ত ভেজা চুল ছড়ানো গাছের ডালে পাতায় শীতের বেলা যায় যায় চলে যাবার সময় একবারও পিছু ফিরে তাকালে না। সভ্যতার প্রায় শিখরে মানুষের কোলাহলে সত্তরের দিনগুলো ফিরে আসে পরিত্যক্ত যুবকের বজ্রমুঠিতে অকালবৃষ্টিতে এক অবসাদ ভাসাবো তোমার যৌবনে জ্বলে ওঠা পৌরুষ চলেছে আগামীর দিকে
যথার্থ বর্ণমালা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সমাজের কানাগলি দিয়ে খানিকটা এগোলে কিশোরীকে মনে পড়ে তার জামফলের মতো স্তনবৃন্ত যেন দুঃখের অক্ষ যুবতীর সবটুকু জুড়ে কিশোরীর চিন্তাধারা সে বয়ে নিয়ে চলে আদিকাল হ’তে আগামীর দিকে সত্তরের মঞ্জরী ঝরে ঝরে যাওয়া মঞ্জরী কিশোরী কুড়িয়ে নেয় মাটি হতে জাত মূল্যবোধ সকালে সূর্যালোকে মূল্যবোধটুকু কেমন ঝলমলে। বেলা বাড়ে। দায়িত্বটুকু ভাগ করে নেবে বলে কে যেন কাকে খোঁজে তার আপনার কেউ শেখানো বুলি কাকাতুয়ার আর ভালো লাগে না সে যুবতীর কাছে পাঠ নেয় বৈশাখী ঝড়ের কাছে নাকি মন্ত্রপূত বর্ণমালা আছে সেদিন থেকে তার শেখার শুরু সে দেখে সমাজের কানা গলি জুড়ে সমাজের এক বদ্ধ হাওয়া সে দেখে ইঁট নয় কাঠ নয় ভালোবাসার খড়টুকু দিয়ে সঠিক সভ্যতার চালটুকু ছাওয়া আধিনিকতার ঘেরাটোপে সংশয় জাগে মনে উন্মুক্ত প্রান্তরে সংজ্ঞাবিহীন প্রশ্নাতীত উদার হাওয়া বয় যুবতীর চুল হতে জমা ধুলো ঝরে য়ায় খুচরো সংশয় ঝড়ের কাছে সে নতুন বর্ণমালা শেখে বিন্দু বিন্দু দুঃখ হতে সূর্য্যালোক বিচ্ছুরিত হয় আধুনিকতার বহিরঙ্গে ক্যাটক্যাটে রঙগুলো চোখে লাগে যবতী বিনম্র শ্রদ্ধায় সত্তরের ঝরে যাওয়া মঞ্জরীকে চুম্বনের তীব্রতায় কাছে টানে উন্মুক্ত প্রান্তরে হাসিখুশি কাকাতুয়া ওড়ে যথার্থ বর্ণমালা
সূর্য্য গেছে পাটে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
পাগলকে নিয়ে আর পারা গেল না আমার বাড়ির সম্মুখে রাস্তায় বসে সে সারাদিন বক্ বক্ করে। যত সব আজেবাজে কথা সে বলে একাত্তরে যৌবন নিধন যজ্ঞ সমাপ্ত হ’লে তোরা নরমাংস রেঁধে খেলি হোমাগ্নিতে বদ্ধ পাগল। ও’কে কী আমি বোঝাবো! সূর্য্য গেছে পাটে, দু হাজার এক সনে নুয়ে আছে গোধূলির আলো তিরিশ বছর আগে কি যেন ঘটেছিল বাংলার ঘরে! বরানগরের গঙ্গায় ভেসে যাওয়া মৃতেরা প্রাণহীন দেহে আজও সূর্য্যের স্তব করে এভাবে মৃত্যু জীবনের কাছে এসে ভাবায়। এভাবে কোথাও কোন পাগল বধ্যভূমির হাওয়াকে চীত্কারে ভাঙে কপট নিয়মাবলী আকাশ ভরা সূর্য্য তারা, সত্য কোথায় ? ব্যস্ত সভ্যতা তাড়াহুড়োয় চলেছে কাজের বাজারে। এগোতে গিয়ে একবার পিছু ফিরে যুবতী দেখে কেটে যাওয়া ঘুড়িটি চলেছে বেশ, একা, ভয়হীন কেন গঙ্গার কাছে এলে চোখে পড়ে, মনে পড়ে কত কি! সূর্য্য গেছে পাটে। শেষ হ’য়ে আসে দিন। নিয়মাবলী মঞ্চে রেখে পর্দার আড়ালে বেপরোয়া বেহুঁশ স্বৈরাচার নাচে।