রাজনীতির পাঁকে প্রোথিত কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আকাশ থেকে নেমে এসে শকুনেরা বরানগরের শহীদ বেদীতে বিশ্রাম করে ওদের অক্ষরজ্ঞান নেই শিক্ষিত মানুষের মতো ওরা শহীদ বেদীতে, উত্কীর্ণ শব্দগুলোর মর্ম বোঝে না এ কি প্রায়শ্চিত্ত! আমি তুমি, ছড়ানো যৌবন, সূর্য্যালোক ছেড়ে বাল্বের আলোয় আজ কিসে মত্ত! পিছু ফিরে মনে পড়ে! খানিকটা মনে পড়ে প্রায় সবটুকু একদিন একরাত নাকি একরাত একদিন যথেষ্ট ছিল, পাখিদের কাকলি স্তব্ধ হ’ল। গবাক্ষের ফাংক দিয়ে কোন ভীরু ব্যথিত চোখ সবটুকু দেখে ভাবে মহাপাপ কাকে বলে ? রাজার পেয়াদা বুঝি নাবালক, অবাধ্য হয়নি প্রতিপক্ষ আর তো জাগেনি বরানহরে পূণ্যতোয়া কালঘুমে ছিলে ? ওদের বিকৃত উল্লাসে বনে পশুও মুখ নীচি করে সমগ্র সৎ অথচ ভীরু দেশবাসী শকুনেরা এত মৃতদেহ দেখে বুঝি বিস্মিত হায়! শকুনের ভোজ শুরু হবার আগে মৃতদেহগুলো রাজনীতির পাঁকে প্রোথিত
থাকবে বলে আছে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তেমাথার এক কোণে গাছটি থাকবে বলেই আছে আছে, তা বেশ শতাধিক বছর পার ক’রে পাশে চায়ের দোকানটি, সেও আছে, যেন এক চলমান গল্প যুবক যুবতীরা আসে, ওদের চাইনিতে যুবতীর কপালের টিপে সুধাসাগরের সবটুকু রাখা মানুষটিকে মাঝে মাঝে দেখা যেতো, মনে পড়ে, দূরে কোন্ সে দিকে তার অপলক তাকিয়ে থাকা কি যেন ভাঙতে গিয়ে নতুন কিছু গড়তে গিয়ে তার আঙুলগুলো গেছে খসে জংধরা আইনের করাতে কৃষকেরও ক্ষিদে পায়, জমির ফসল প্রাসাদে যায়, জঙ্গলের হুংকারে প্রাসাদের দেওয়ালে একটু যেন কাংপন লাগে প্রায় তিন যুগ পার করে চায়ের দোকানী বলে, তখন আমি সদ্য কিশোর যুবক বলে, তার কথা কেন ভুলতে পারো না, কেটে গেল এতগুলো বছর তেমাথার এক কোণে গাছটি থাকবে বলেই আছে ওঁদের স্মৃতি কথা ব্যর্থ কি সার্থক, এভাবে নয় সহজ নয়, ওদের জীবনদান সান্ধ্য পানীয়ের মতো পাত্রে ঢালা
সহস্র ক্ষুদিরামের তালিকা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
জলে ভেসে চিতায় পুড়ে শেষ হ’লে তোমরা কেউ শহীদ হ’লে না আমরা সেদিন বেঁচে থাকা যুবক যুবতীরা আজও বেঁচে আছি এক ফ্যাকাসে নৈরাশ্য নিয়ে, বিছানায় মিলিত হই কিছু নপুংশকের জন্ম দেবো বলে মা হয়ে সন্তানকে এভাবে বলা! ব্যথায় নয় রাগে নয় ঝুঁকে পড়া মেরুদণ্ডের ফসল কখনও হেমরঙা হয় ? তোমাদের নামাঙ্কিত শহীদ বেদী! শকুন বলে আমি তো ওখানেই মহিলার সঙ্গে হাস্য পরিহাসে সঙ্গম করি আমার অজ্ঞতা সামনে দেয়াল তুলে ধরে কত ভুল শব্দাবলী কত ফুলের গন্ধে ঘুমিয়ে আছো তোমাদের নাবালক স্বপ্নে সময় বলে তোমাদের চিতার ছাই আজও বাতাসের হৃদয়ে রাখা সহস্র ক্ষুদিরামের তালিকা মহাকাল তার বিচারে মনুষ্য পশুদের তোয়াক্কা রাখে না
জঙ্গল পার হ’য়ে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
কেন এত মনে পড়ে! অনেক কটা বছর পেরিয়ে শহুরে ডামাডোলে ভোগসামগ্রীর দোকানের পর দোকান পেরিয়ে ওই তো আকাশ আমরা তখন ঘরের নিরাপত্তায় আকাশ দেখেছে, ঠিক যেন কচি ডালপাতা, এমন করেই শাসকশ্রেণী কত যুবক যুবতীকে উপড়ে দিল জীবন থেকে জীবন গেলেও শেকড়টুকু রয়ে গেল শেকড়ের শাখা প্রশাখা ছড়ানো ওদের চিন্তা বাতাসের মতো প্রায় সর্বত্রগামী সে চিন্তা বাহিত হয় পুষ্পরেণু ছুঁয়ে, প্রেমাস্পদের কাছে চলেছে যে নারী, সে-ও আনমনা হয় ওদের কথা ভেবে কেন ব্যর্থ হ’লো ? ওদের আপাত হিংস্র পথে শ্বাপদেরা ঢুকে গেল সংগোপন চাতুর্যের শেষ কথা হ’য়ে দীপ নিভে গেল। আমরা তখন ঘরের নিরাপত্তায়, একাত্তর পেরিয়ে নিয়ম নিষ্ঠার দিকে বাংলার বইগুলে মলাট ধারণে ব্যস্ত সভ্যসমাজ। কতশত জীবন গেলেও শোকড়টুকু রয়ে গেল শহুরে ধূসরতা পেরিয়ে চোখে পড়ে ওই তো আকাশ আকাশ দেখেছে সবটুকু। জঙ্গল পার হ’য়ে কোথা যেন যথার্থ লোকালয়ের শুরু ?
ধর্ম বলে মানি কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
বাবার খদ্দেরের পোষাকে আজো দেশপ্রেম বিধৃত কাগজে কলমে দেশ স্বাধীন হ’ল ভেঙেচুড়ে, স্বাধীন দেশ-এ নিয়মেরা সব বিকৃত আগুন জ্বেলে ক্যানেস্তারার শব্দে ভালোমানুষেরা সমাজের এক কোণে কুঁড়েঘরে ঠাঁই পেল স্বাধীন ভারতে হতদরিদ্রেরা ধনীদের ভাই, ওদের আর কি চাই, এমন কতশত শক্ত কথা নেতারা সহজ মধুরতা দিয়ে মঞ্চের ভাষণে বুঝিয়ে গেল যারা বুঝলো না তাদের রাতের ঘুম আজও প্রলম্বিত আকাশর তারায় তারায় এরই জন্যে এত রক্তপাত জীবন দান, খেয়াঘাটে দড়ি ছেঁড়া নৌকো ভেসেছে ঝঞ্ঝায়। অভাবের ছ্যাঁকাগুলো সারা গায়ে মেখে আমার বোকা বাবা আজও শঠতাকে ঘৃণা করে মনুষ্যপিতার কীটকন্যা আমি হায়রে কী ভীষণ মূর্খতায় বাবাকে বলি একাত্তরে দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নক্শাল যুবকেরা ভূমিহীন কৃষকের পাশে এলে, ওদের বীরোচিত মেঘগর্জনে, চাদর ঢেকে শুয়ে পড়ি মনুষ্য পিতার কীটকন্যা আমি কাগজে কলমনে স্বাধীন ভারত-এ অসত্যের অন্যায়ের কুয়াশা চারিদিকে গভীর ব্যথায় অনেক ভুল পার হ’য়ে - ধর্ম বলে মানি পিতা তোমাকে তোমাকে
জঙ্গলের ডাক শোনো কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আড়ম্বরে ডুবতে চাই। এভাবে বন্দী করে কেন রাখো ? মৃত্যুর পরেও কি প্রখর ভাবে বেঁচে আছো তোমাদের আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ওই খালপাড়ে তার পাশে কৃষকেরা তোমাদের চিতা থেকে আবিনশ্বর ভাবনা তুলে আনে। যা কিছু সত্য যা ধর্ম, মাটি চাকে ছুঁয়ে আছে তোমার স্বপ্নে সূর্য্য আজও ভাস্বর জমি বন্টনের ভার তোমার বৃষস্কন্ধে হতভাগাদের অশ্রু বয়ে গেছে কত ঝড় আজও কোথাও কোনখানে, তোমার ভাবনা জ্বলে যেখানে বাতাস মুক্ত, তার শরীর ঘেঁষে কীটের জীবনে তার আঁচ এসে লাগে কার আলগা মননে ভোগবাদের কারাগারে স্বেচ্ছা বন্দী এ সমাজ, রঙচটা মুখ তার মাছির মতো মৃত্যুর পরেও সময়ের অনুনয়ে কি প্রখর ভাবে বেঁচে আছো
বসে আছি চায়ের দোকানে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
বসে আছি এক চায়ের দোকানে হাটের মাঝে কয়েক জন্ম ধরে যোদ্ধা যুবকেরা ছিল, আজও আছে মাটির আশ্রয়ে আছি ঝড় ঝঞ্ঝায় রাতের অন্ধকারে এবং অমলিন সূর্য্যোদয়ে মন পড়ে সেই তীরবিদ্ধ একাত্তর দোকানটিতে কত মানুষ আসে কত না যায় কাঁদে হাসে কত কথা ধূমায়িত কাহারও বুক ভেঙে সর্বংসহা সময় বিজ্ঞাপিত হ’য়ে যুবতীর দুচোখে তার সবটুকু অবসাদ ঢেলে দেয় ধানুকীর অভিনিবেশ রাতের আকাশে নক্ষত্ররাজি, হে একাত্তর, সবই তোমার হারিয়েছে কিছুই না হয়তো উঠোনের এককোণে, চড়ুই এর চলাফেরা ওদের খুঁটে খাওয়া ওদের উড়ে যাওয়া পুকুরপাড়ে সিঁড়ির ক্ষয়টুকু মেনে হারিয়েছে কিছুই না, গৌষের ভোরে নদীর বুকে কুয়াশা জমে আজও বিগত তিরিশ বছরের স্মৃতিভারে নুয়ে। যুবতী পণ করে সে স্মৃতি থেকে যৌবনের শস্যটুকু খুঁটে নেবে উপবাস শেষে সে এক চায়ের দোকানে কয়েক জন্ম ধরে চারিদিক হতে ভেসে আসা কলরবের প্রতিটি শব্দ অক্ষর যুবতী ছড়িয়ে দেয় বাইরের উঠোনে একাত্তর বলে আজও আছি কেন আছে, উত্তর কারো অজানা নয় রাতের আকাশে প্রজ্জ্বলিত সমকালের ও কালোত্তীর্ণ নক্ষত্ররাজি
উজানের মাধবীলতা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
অপরাহ্নে এই পরন্ত যৌবনে শরীরী কামনা মাটিতে পুঁতে দিতে পারি যদি একাত্তর ফিরে আসে অহিংস হ’য়ে সভ্যতার আদালতে মানুষের দাঁত ও নখ ক্রমে বেড়ে চলে তার অভব্য চাহিদা যেন কুমীরের হাঁ-মুখ ভোগেই নাকি আধুনিকতার সঠিক প্রকাশ ভোগে নাকি তোমার আমার রাম শ্যামের আসল সুখ দিনভোর ছাতাপড়া কথাগুলো শুনে অবসন্ন চৈত্রের হাওয়া পুকুরের জল ছুঁয়ে বসন্তে প্রেমালাপ শুনতে চায় এমন শ্রবণের লোভে রাত গভীর হ’লে সে প্রবেশ করে নগ্ন নারী পুরুষের শয়নরক্ষে সেখানে বিছানা জুড়ে খাবার জমি ফসলের চিহ্ন নেই ধারে কাছে তেপান্তরের মাঠ পার হ’য়ে এতো অন্ধকার পথ চেনা দায়। আকাশে চাঁদ তারা নক্ষত্র গেলেন কোথায়! শুধু দূরে প্রতিরাতে আজও একাত্তর আলো জ্বালে তার একটু ভুল অনেক ঠিকটুকু নিয়ে বাঁশরিয়া সেই আলোটুকু তাঁর বাঁশীর সুরে তুলে নেয় মানুষের দাঁত ও নখ ক্রমে বেড়ে চলে তার অভব্য চাহিদা যদি একাত্তর ফিরে আসে অহিংস হ’য়ে, আমি তুমি রাম শ্যাম হয়তো বুঝবো, বসন্তে আজও প্রস্ফুটিত হয় আমাদের বোধটুকু জুড়ে উজানের মাধবীলতা
আমায় টানে সংখ্যাহীনতা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
বেদনার পা ধরে আমার বোধমুক্তি হল প্রেমহীনতার মুখ হিংস্র অস্ত্রের মতো কালো রাতের তারা সংখ্যাহীনতায় আমায় টানে সত্তরে চলে যাওয়া যুবকেরা কতটুকু গেল কিবা আছে, কে ভাবে, যে ভাবে সে ভাবে এক বালিকা ধ্বংসের মতো ছুটে যায় অমর্ত্য যৌবনের দিকে সে বড়ো একা যুবকটি প্রলয়ের বাজনার মাঝে যুবতীকে খোঁজে বিকেলের রক্তিম আলোয় মাটি ও আকাশ মিলে মিশে একাকার বালিকার চুলে অনাদিকালের বিন্যাস যুবকের দুঠোঁটে প্রেমের আশ্বাস যুবতীর কানের দুলে সত্তর একাত্তর টলমল করে যদ্ধাস্ত্রের মতো হিংস্রতার মুখ কদর্য, কালো তার চেয়েও কালো আর হিংস্রতা নয় বেদনা ও ভালোবাসা আমায় টানে সংখ্যাহীনতায়