তোমার ঊনিশ নিয়ে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তোমার ঊনিশ নিয়ে আমি স্বপ্ন বুনি, তোমার ঊনিশ নিয়ে আমি গান গাই। ঊনিশ বছরে তুমি যেমন ঠিক তেমন করে তোমাকে ভাবই। এক যুবতীর কপালের টিপ জুড়ে আলো খেলা করে এক গহণ অরণ্যের ছায়া। সেই ছায়ায় শান্তির আশায় ঘর বাঁধে সৃষ্টির যত দুঃখ তত মায়া। তুমি যেমন করে শুনতে চাও তোমায় তেমনি করে বলি যুবতীর এক ঊনিশ ছিল, তখন সারা বাংলায় ঝড়ের উদ্দামতা শান্ত আকাশ জানালা কপাট মৃতদেহের স্তূপ ঘেঁটে শকুনেরা ক্লান্ত তখন অরণ্য ছাড়িয়ে লোকালয়ের শুরুতে ওদের স্বপ্নগুলো আজও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ওই কুয়োপাড়ে সেখানে হিংস্র সভ্যতার বাইরে কুয়োর স্বচ্ছ জলে আকাশ প্রতিবিম্বিত হয় যুবতীর গাল আলতো ছুঁয়ে আকাশের ছোঁয়া পেয়ে যুবতী শিহরিত হয় রাজ্য জুড়ে এতো হত্যা দেখে তার কপালের টিপ ভাঙে মর্মতল সেই হত্যা ছুঁয়ে চিরবিচ্ছেদ ও বিভেদের কত না কথা জলস্থল বেয়ে উঠে আসে ধূমায়িত কান্না কে কাঁদে! সে দায়ী নয়। তবুর ঊনিশ বছরে চারিদেকে এক ভাঙনের চীত্কার ছাপিয়ে কানে আসে যুবতীর তীব্রতর বাক্যালাপ আকাশের সঙ্গে এভাবে একদিন বাংলার হাওয়া বয়ে আনে ঝড়ের উদ্দামতা যেমন করে ভাবতে চাও তেমনি করে আকাশ কোয়োর জল ও যুবতী মিলে যেন এক সুরবাহার তোমার উনিশে আজও কুয়োপাড়ে নিশ্চুপ সত্তরের বেদনা স্বপ্ন ছুঁয়ে তার সময় পারাপার
একাত্তরের স্মৃতি নিয়ে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
যুবতী অনেক কেঁদেছে এমন হয় নাকি! ভুলতে গিয়ে যুবতী রঙ তুলি দিয়ে কবিতা লেখে, রঙ তুলি ছুঁয়ে গান গায় যুবতী রঙ তুলি দিয়ে জগতসভায় অমৃত বয়ে আনে রঙ তুলি দিয়ে তোমাকে আমাকে ওই আদিম যুগ হতে চেনা পাপিষ্ঠকে ভাবায়
যুবতী অনেক ভেবেছে সবাই বলে যুগটা দারুণ সভ্য। দুহাজার দুই সন এরপর বিজ্ঞান যেন আকও কি বলবে ? না, বিজ্ঞান দোষী নয়। আঁস্তাকুড় ঘেঁটে চলে আমার এ মন শুধু চায় আর চায় ধনমান এক বৃহৎ বাসাবাড়ী
কবিগুরু তোমার সঙ্গে আমাদের সকলের আড়ি তুমি বড়ো সেকেলে। সৃষ্টির আড়ালে আবডালে শুধু আদর্শের কথা আমরা কি বোকা নাকি! ঠকাতে শিখেছি ভালোভাবে এটাই জীবনগাথা
যুবতী অনেক রাত নিদ্রিত থেকেছে আকাশের তারা এসে তার তুলিগুলো ধুয়ে দেয় মেঘের জলকণায় যুবতী তুলি রঙে ডোবায়। আদি যুগ হতে বহমান যে সত্য ও সৃষ্টিধারা তার পথ সে এঁকে দেয় নির্ভীক চিত্ত দিয়ে কবিগুরুর রচনা হতে অকালে শিউলি ঝরে পরে যুবতীর নম্র উন্নত শিরে
সবই ফিরে আসে কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সবই ছেড়ে যায় ধীরে, যৌবন ওই সাঁকোর মধ্যপথে দাঁড়িয়ে একটু থামে সম্মুখে পশ্চিম, প্রতি গোধুলিতে সে ক্লান্ত সূর্য্যকে গ্রহণ করে তার আঁচলের ছায়াতে প্রেমময় হ’য়ে ধরায় রাত্রি নামে পিছনে তাকিয়ে সে দেখে, ওই তো অদূরে তার বাল্য কৈশোর প্রথম যৌবনের গনগনে আঁচ অনেক ঝরাপাতা সে পুড়িয়েছিল নিজস্ব আঁচ-এ কত যৌবন ঘর ছেড়ে এসে দাঁড়ালো আকাশতলে, একাত্তরে। সে ও তাহারা সমাজের অন্যায় অবিচার ঘোচাবে বলে আগুনে সেঁকে নিল যে য়ার হাত ও চিত্ত পরিশুদ্ধ হ’ল, এ যে হোমাগ্নির স্পর্শ, হে আর্য্য দুঃখ কোরো না, যেহেতু এখনও জীবিত। ওরা গেছে অসময়ে অসমাপ্ত যজ্ঞাগ্নিতে এখনও প্রজ্জ্বলিত শিল্পসুধা তুই পান কর জাহান্নামের দ্বার-পথে দণ্ডায়মান হ’য়ে। এভাবেই দেবতা তুষ্ট হন এভাবেই একদিন ধরায় পুষ্পবৃষ্টি হয় এভাবেই একদিন একাত্তর ফিরে আসে অসমাপ্ত যজ্ঞ পূর্ণ হবে বলে দিকে দিকে ধ্বনিত হয় মন্ত্রোচ্চারণ সবই ফিরে আসে ধীরে পশ্চিম দিগন্তে অর্চ্চিষ্মান অবসিত হয় আবারও ভোরে পাখির ডাকে দেখা দেবে বলে আবারও তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয় একাত্তরের সঙ্গে।
ডাকে তীব্র যুবতী কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
হে যুবক সন্ন্যাসীর নিষ্ঠুরতা কেন এ বয়সে তোমার কথনে প্রেমাতুর যুবতীর দুচোখে নেমে আসে ঘুমের ঢল তারপর সে আর কিছুই দেখে না শোনে না বোঝে না কেন তুমি মরুভূমির বাল্ নিয়ে এত উত্সাহী তোমার নিজস্ব মতবাদে অনেক উঁচুতে উঠে পাহাড় পেরিয়ে আর একটু এগোলে ওই যে আকাশ ও’কে তুমি কখনও পাবে না তোমার মনের অলিন্দে তবু প্রতি ভোরে, চড়ুইটি কিছু শস্যদানা চায় তোমার তার্কিক জঠর ক্ষিদের মতো শব্দ আর আছে নাকি তোমার প্রিয়ার ঠোটে জমে যৌবনের কামনা পুণ্যের পথে নিয়ে চলে যথার্থ বিপ্লবীকে এক পরিপূর্ণ চুম্বনের তাপে নিষ্ফলা জমিতে ধান্য ফলে বিবিধ শস্য বিপথ এসে পথের কাছে নতজানু হয় চলতি নিয়ম অপসৃয়মান সত্যের কাছে। এভাবে নিয়ম হতে নিয়মভঙ্গ পার হ’য়ে এক মানবিক নিয়মে সূর্য্য ডুব দেয় আকাশের শরীরে, তরঙ্গ খেলে যায় যুবতীর শরীরে রাত শেষে ভোর হয় নদীর দু-কূল ছাপিয়ে হে যুবক তোমার সন্ন্যাসী নিষ্ঠুরতা ওই ক্ষুধার্ত শিশুটির কাছে পান্ সে লাগে তোমার শান দেওয়া কথাগুলো শিশুটি হেসে ওঠে ও’র ছায়াদাত্রী মা নড়বড়ে দুর্বল হাতে তোমাকে উপেক্ষা ক’রে এই বাংলার মাটিতে আবারও একাত্তরকে ডাকে তীব্র যুবতী যুবতী বোঝে না কেউই, কেন তুমি মরুভূমির বালি নিয়ে এতো উত্সাহী!
এমন হয় কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সময়ের নাভিকুণ্ডে মহাপাপ বিকৃত হাসি হাসে সে হাসি ছড়িয়ে পড়ে সত্তরের হত্যাযজ্ঞ হ’তে বন বনান্তরে ঠিক কোথায় যে ঈশ্বর থাকেন! আমি তুমি ও সে কত মজায়কালো সূতো দিয়ে বেঁধে রাখি আমাদের কার্য্যাবলী নাম ধাম যশ ও ঠিকানা শুধু যুবক ও যুবতী আধুনিক যুগে বোকা, ফলতঃ একা। পারবে কি ? আমরা বলি পারবে না পারবে না, প্রতি দেওয়াল থেকে ধর্মাধর্মের মহাসঙ্গমের পালাগান তুলে ফেলে ওরা কী লিখতে চায়! অরণ্যে এক সভ্যতা আছে, যুবক নদীর বুকে তার ইতিহাস লিখে চলে ঈশ্বরের ঠিকানা কিভাবে পাওয়া যায়! লোকালয়ে পারিপার্শ্ব ওদের দুর্বল করে তোলে ওদের মাথা নুয়ে পড়ে মহাপ্রলয়ের বাজনা বাজে নদীর নাভিবিন্দু হতে উত্সারিত ন্যায়টুকু যুবতীর স্তন হতে ঝরে ভয়হীনতার পানীয় তেষ্টাতৃপ্ত হ’য়ে যুবক যুবতীকে নিয়ে কালোসূতোর জাল ছিঁড়ে ফেলে আমাদের নাম ধাম অপযশ ও ঠিকানা কেন যে এত দুর্বল ও ভীরু ছিল সেদিন ভেবে ওরা আজও হেসে আকুল এমন হয় সত্যের একচিলতে উদ্ভাসন ঠিক বাকিটুকু ভুল
পুরুষ কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তুমি কি সেই পুরুষ যাকে আমি প্রতি রাতে কামনা করি! তুমি কি সেই পুরুষ যাকে আমি স্বচ্ছতোয়ায় প্রতিবিম্বিত হতে দেখি আমারই মায়াদর্পণে ভোরের আলো প্রতিদিনই আমার দুয়ারে এসে থেমে যায়, আমাকে স্পর্শে তীব্র অনিহা ও’র এতো কুৎসিত বলে। এতো কুৎসিত কেন আমি! বড়ো সাধ ছিল হবো বেশ আঁটোসাটো সুন্দরী, শাড়ির আঁচল উড়বে হাওয়ায়, চারিদিকে মুগ্ধ দৃষ্টি, আমাকে কে পায়! কুয়োর মধ্যে ছিলাম বেশ, কুয়োর জল কুৎসিত করেছে আমায়। বাইরের বিস্তৃত ধানের ক্ষেতে তখন কি ভীষণ ঝড়বৃষ্টি, বৃষ্টি নয় চোখের জল। কুয়োর বাইরে চোখ মেলে দেখি, অশ্রু নয়, কারও কোনো গভীর ক্ষত হতে নিঃসৃত রক্ত। কেন এত রক্ত ওরে আমার পলাতক আমি বল আমায় বল। তুই তো দেখেছিস জানালার খড়খড়ি খুলে টাট্ কা মৃতদেহগুলো রয়েছে ছড়িয়ে রাতে দিনে পুলিশের গাড়ি মিলেটারীর পায়চারী। আমি তখন সতেরোয় প্রেমের উন্মেষ দেহে মনে গল্পের বই পাঠ্য বই চাপাশাড়ীর স্বপ্ননীলে দিন কাটে। ওরা গেল, রেখে গেল দিনপোড়া ছাই। সেই ছাই কোথা থেকে উড়ে এসে আমার দেহ হতে রূপটুকু নিয়ে গেল মন হতে সুখ মৃত্যুর পর বয়স বাড়ে না। তুমি সেই যুবা যাকে আমি আমার উত্তর-চল্লিশে আজও কামনা করি তোমায় কোনো যথার্থ যুবতীর কাছে পৌঁছে দেবো বলে যুবতী তোমার ভাবসঙ্গী হবে তীব্র বিজ্ঞান নিয়ে সভ্যতা থেমে আছে ওই যুবতীর ঠোঁটে উচ্চারিত হবে সেই ধার্মিক শব্দাবলী মায়াদর্পণে আজও স্থির রাতে দিনে পুলিশের গাড়ি, মিলেটারীর পায়চারী।
হে কবি লহ প্রণাম কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আমি এখন আমার ঊনিশে মাঝে মধ্যে আগুন নিয়ে খেলা মন্দ লাগে না আগুনে আমার দুহাত পোড়ে, গাল পোড়ে ঠোঁট পোড়ে আমার চেতনা ভিন্ন দেহের টুক্ টাক নেই কোন রাখঢাক আমি আগুনের ফুলকিগুলো ছড়িয়ে দিই ঘরের আনাচে কানাচে সময়-চাপা বইচাপা যেখানে যত দুঃখাবনত ঘটনা বেরিয়ে পড়ে আগুনের ভয়ে আমি ভীত ও কম্পিত হ’য়ে আছি অথচ আগুন খেলা খেলবো বলে আমি বইয়ের পাতা ঘেঁটে সত্তর একাত্তরকে মেলে ধরি সূর্য্যালোকে আগুনের ছোঁয়ায় বইয়ের ওই পাতাগুলো থেকে কালচে রক্ত ছিটকে আসে আমার ঊনিশের ক্রিম লালিত ঠোঁটে আমি আরও এক ঊনিশ কুড়ি একুশের সঙ্গে ওই রক্তকে জিভ দিয়ে গ্রহণ করি সত্তরের ঝড় আজ আমাদের হৃদয়াশ্রিত সত্তর একাত্তরে ওদের মৃত্যুবাহিত যন্ত্রণা ভাবনা সবই আজ হাসির খোরাক ওই ভোগক্লিষ্ট মানুষের কাছে হে পথিক হেথা এ সময়ে ক্ষণকাল তিষ্ঠ। আমাদের ঊনিশেরা আগুনের ফুলকি ছড়ায় হাওয়ায় হাওয়ায় অহিংস বাণী দেখি তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। তোমার ভাবনা দিয়ে আবার হবে শুরু, হে কবি লহ প্রণাম আজ পঁচিশে বৈশাখ
পশ্চিমাকাশের যন্ত্রণা কবি স্বপ্না ঘোষ মাঘ ১৪১১ সালে প্রকাশিত ( জানুয়ারী ২০০৫ ) কবির ‘দিবাবসানে’ কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আর্য্যাবর্ত্তের দিকে চলেছ তুমি ঐহিকের দুঃখসুখ দুকাঁধে নিয়ে অনায়াস গমন তোমার রাজনীতি হতে ধর্ম ছুঁয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের দাওয়া, এ যেন প্রকৃত আশ্রয় ঝড় তুলে ঝড়ের হাওয়া পান করে তুমি ভুলেছ তোমার ক্ষিদে তেষ্টা সেটুকুও যেন তোমার নয় কিছুই। ভাবনায় কখনও ব্যর্থতা ছিল কি এ ভেঙে পড়া রূপ তুমি সবটুকু দেখে গেলে না তোমরা চলে গেলে সময় চলেছে কাল হতে কালান্তরে সভ্যতার জিহ্বা ক্রমে চলেছে বেড়ে তার ভোগ লালসা। লালসার শরীর জুড়ে অগাধ অন্ধকার, হতোদ্যম ব্যথিত সে-ও ব্যথিত একালের যুবক যুবতীরা, ঐহিকের সমস্ত দায় দুকাঁধে নিয়ে চলেছে ওরা আর্য্যাবর্ত্তের দিকে সত্তর একাত্তরকে খুঁজে নিতে ওদের তদ্গত তর্পণে হাওয়া কেঁপে ওঠে তোমাদের মৃতদেহের ছাই চীত্কার করে কিছু বলতে চায় এখনও কি হয়নি সময়, কবে হবে শুরু ? সত্তর একাত্তর তার ব্যর্থতা নিয়ে অধোমুখে আজও জপ করে তোমাদের নাম মৃতের সংখ্যা তোমার ক্ষিদে তেষ্টা আশ্রয়হীনতা সেটুকু যেন তোমার নয়। তোমাদের ব্যর্থতা কাল হতে কালান্তরে অধোমুখে চলেছে ব্যর্থ সময় একালে যুবক যুবতীরা পশ্চিমাকাশের যন্ত্রণা টের পায়