কবি ভাগবতাচার্য্য-এর বৈষ্ণব পদাবলী
*
সাধু সাধু মহারাজ ধন্য কলেবর
ভণিতা - ভাগবতাচার্য্য ও মাধব আচার্য
কবি ভাগবতাচার্য্য
আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে রচিত,
মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী
কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও
প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য গ্রন্থের ৪৫-পৃষ্ঠায় “মাধবাচার্য্য” ভণিতাযুক্ত এই পদটি দেওয়া
রয়েছে। পদের পাদটীকায় লেখা আছে যে এই পদটি “ভাগবতাচার্য্য” ভণিতাতে পাওয়া
গিয়েছে ১২৬৩ বঙ্গাব্দে (১৯৫৬খৃষ্টাব্দ) মুদ্রিত “প্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থে।

অথ বনভোজন ও ব্রহ্মমোহন।

সাধু সাধু মহারাজ ধন্য কলেবর।
নির্ম্মল সুমতি তব ভব ভকত শেখর॥
নিরবধি হরিকথা শুন সাবধানে।
তবু নব প্রেম তুমি কর অনুক্ষণে॥
শান্ত-জন যেবা হয় চিত্তে ধরে সার।
শতবাণী চিত্তে সদা হরিপদ যার॥
কৃষ্ণ-কথা নব নব শুনে অনুক্ষণ।
স্ত্রীর কথা শুনে যেন নারীজিত জন॥
গুহ্য কথা কহি রাজা শুন সাবহিতে।
অপরূপ নাট্য-লীলা কৈল যতমতে॥
যমুনা পুলিনে তবে লৈয়া শিশুগণে।
হাসি হাসি বলে কৃষ্ণ মধুর বচনে॥
দেখ দেখ ভাই সব রম্য নদীতীরে।
কোমল বালুকা তট নির্ম্মল সুনীরে॥
প্রফুল্লকমল-গন্ধ ভ্রমর ঝঙ্কার।
জলচর-কোলাহল শব্দ যে সঞ্চার॥
মন্দ মন্দ সমীরণে তরঙ্গ সুসার।
হেথা আসি সকলেতে করিব বিহার॥
বেলা দুই প্রহর ভোজন করি আগে।
পাছে খেলা খেলাইব যেবা মনে লাগে॥
জল দিয়া আন বত্স করুক সন্তোষে।
তবে সভে ভোজন করিব নানারসে॥
কৃষ্ণের বচন শুনি গোপ-শিশুগণে।
জলপান করাইয়া বত্স দিল বনে॥
শিক্যা নামাইল সবে ভোজন করিতে।
মধ্যেতে কৃষ্ণ বসিলা শিশু চারিভিতে॥

চৌদিকে বালকগণ রচিল মণ্ডল।
বিকসিত পদ্মমুখ নয়ন-যুগল॥
বিবিধ মণ্ডল জাল করিয়া রচন।
সম্মুখে শ্রীমুখ দেখে সর্ব্ব শিশুগণ॥
চৌদিকে কমলদল মধ্যে কর্ণিকার।
সেইরূপ শোভে ব্রজশিশু পাটোয়া॥
ক্ষুধার্ত্ত হইয়া সভে বসিল সত্বরে।
ভোজন করয়ে শিশু আনন্দে বিহরে॥
আপন আপন পাক সবাই প্রসংশে।
কেহ কারও পাত্র দেখি করে উপহাসে॥
কেহ হাসে কেহ কেহ হাসিয়া হাসায়।
কেহ কারও মুখ দেখি অঙ্গুলি চালায়॥
জঠর পঠরে বেণি শিঙ্গা বেত কাঁখে।
বামকর-কমলে কবল ধরি রাখে॥
অঙ্গুলির মধ্যে মধ্যে ঝরয়ে ব্যঞ্জন।
মধ্যে নন্দসুত চারিপাশে শিশুগণ॥
হাস্য পরিহাসে প্রভু করয়ে ভোজন।
বাল্যলীলা করে যজ্ঞপতি নারায়ণ॥
এইরূপে ভোজন করয়ে শিশুগণে।
তৃণলোভে বত্স সব গেল দূরবনে॥
ত্রাস পাইল শিশুগণ বত্স না দেখিয়া।
নিবারিয়া রাখে কৃষ্ণ আশ্বাস করিয়া॥
তোমরা ভোজন নাহি ছাড় মিত্রগণ।
বাছুর আনিয়া আমি দিব ত এখন॥
এতেক বচন বলি ভকত-বত্সল।
বামহাথে সেই রূপ ধরিল কমল॥
গিরি গুহা নিকুঞ্জ তিমির ঘোর বনে।
বাছুর খুঁজিয়া হরি বেড়ান আপনে॥
ব্রহ্মলোক হৈতে ব্রহ্মা দেখি এ সকল।
মনেতে সন্দিগ্ধ করি হইল বিকল॥

বিধির অন্তরে দ্বিধা হইল তখন।
সামান্য জ্ঞানেতে তবে ভাবে মনেমন॥
বুঝিব কেমন আজি ত্রিদশ-ঈশ্বরে।
চাতুরী করিতে ব্রহ্মা করিল অম্ভরে॥
এদিকে বালক হরি ওদিকে বাছুর।
অন্তরীক্ষে ব্রহ্মা হরি গেল নিজপুর॥
বাছুর না পায়ে ত্রিভুবন-অধিকারী।
পালটি পুলিনে পুন আইল শ্রীহরি॥
এথা আসি শিশুগণে না পায় উদ্দেশ।
বনে বনে খুঁজিয়া বেড়ান হৃষীকেশ॥
হারাইল বাছুর বালক নাহি বনে।
সর্ব্বজ্ঞশেখর হরি জানিলা আপনে॥
ব্রহ্মা সে সৃজিল মায়া তত্ত্ব জানিবারে।
হেন কর্ম্ম করি যেন লঙ্ঘিতে না পারে॥
গোপ গোপীগণ চাহে বাড়াতে পিরীতি।
বিশেষ জানিতে চাহে ব্রহ্মা সুরপতি॥
ক্ষণেক বিচারি মনে এমত প্রকারে।
বত্সশিশু দুই কৈল প্রভু দামোদরে॥
যে জন লীলাতে করে জগত নির্ম্মাণ।
বাছুর বালকরূপে সেই ভগবান্॥
যত শিশু তত বত্স যার যেই বেশ।
যাহার যেমন হস্ত মুখ নাসা কেশ॥
যার যে বয়স রূপ যার যে আকার।
যাহার যেমন পদ নখ ব্যবহার॥
যার যেমন শিঙ্গা বেণু বসন ভূষণ।
যার যেই শীল ভাষা শিষ্ট সম্ভাষণ॥
যাহার যে আকৃতি প্রকৃতি রতি মতি।
যার যেমন গুণ নাম বিহরণ গতি॥
সর্ব্বভুত-অন্তর্যামী জগতবিলাস।
সর্ব্বরূপ ধরি প্রভু করেন প্রকাশ॥
বিষ্ণুময় জগতে আছয়ে বেদবাণী।
সেই যেন সাক্ষাৎ করয়ে চক্রপাণি॥

আপনি বাছুর বেশ ধরি নারায়ণ।
আপনি বালকন্ধপে করেন পালন॥
আপনে আপনা হরি করয়ে সৃজন।
আপনি আপনে হৈয়া বিহরে আপন।
আপনি আপনি লৈয়া বিহরে তখনে।
ব্রজপুরে নন্দসুত চলিল আপনে॥
যার যার বত্সগণ ভিন্ন ভিন্ন করি।
নিজগৃহে লন সেই শিসুরূপ ধরি॥
সেই শিশু সেই ভাষা সেই মত বেশ।
সেই রূপে প্রবেশ করিলা হৃষীকেশ॥
বাছুরের শব্দ শুনি হরষিতমনে।
হম্বারব করিয়া ডাকিল ধেনুগণে॥
প্রেমানন্দে বাড়াইল পূর্ব্ব-প্রেমছলে।
সেই সেই শিশু বত্স কহে কুতূহলে॥
ধেনুরব শিনি মাতা ধাইল সত্বরে।
দুইহাতে আপন বালক কৈল কোলে॥
বাহুপাশে বেড়িয়া নির্ভয়ে দিল কোল।
পুত্র দরশনে চিত্ত হৈল উতরোল॥
পুত্র-মুখে স্তন দিয়া করাইল পান।
সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম নরসম জ্ঞান॥
মর্দ্দন মাজন করাইয়া শিশুগণ।
দিব্য গন্ধ দিয়া কৈল অঙ্গের লেপন॥
অলঙ্কারে কৈল শিশু অঙ্গের ভূষণ।
দিব্য অন্নপান দিয়া করায় ভোজন॥
এই মতে করে মাতা লালন পালন।
দিনে দিনে আনন্দ বাড়ান নারায়ণ॥
পূর্ব্বমত কৈল কৃষ্ণ পুত্র ভাবাভাব।
পূর্ব্বের চাহিয়া মায়া অধিক প্রভাব॥
একদিন বলরামে করিয়া সংহতি।
বত্সশিশুগণ লৈয়া গেল যদুপতি॥
দিন পাঁচ সাত আছে বত্সর পূরিতে।
বেড়ান নিকট বনে বাছুর রাখিতে॥

বনে বনে বাছুর রাখেন ঙগবান্।
ধীরে ধীরে গেলা গোবর্দ্ধন সন্নিধান॥
পর্ব্বত শিখরে হোথা বৃদ্ধ গোপগণ।
ধেনুগণ চরাইতে আনন্দিতমন॥
দৈবে ধেনিগণ তথা দেখে হেনকালে।
আপন বাছুর তথা পর্ব্বতের তলে॥
বত্স-প্রেমে আপনা পাসরে ধেনুগণ।
ঊর্দ্ধ গ্রীবা ঊর্দ্ধ পূচ্ছ বদ্ধ বিলোচন॥
সভে হাম্বারব করি আকর্ণ পূরিয়া।
দুর্গপথ চলি যায় দ্বিপথ তুলিয়া॥
নিজ নিজ বত্স লৈয়া যত ধেনুগণে।
ক্ষীরপান করাইল আনন্দিত মনে॥
নির্জ্জল পোছন কৈল লালন পালন।
মনঃসুখসাগরে ভাসিল ধেনুগণ॥
ব্রজ-গোপগণ নানা যতন করিয়া।
ধেনু সব রাখিবারে নারে নিবারিয়া॥
ক্রোধ করি কৈল গোপ তর্জ্জন গর্জ্জন।
নানাদুঃখে কৈল দুর্গ পথ বিলঙ্ঘন॥
আজি এত প্রমাদ করিল শিশুগণে।
বত্স লৈয়া হেথা তারা আইল কি কারণে॥
আজিকার গোরস সকল হৈল নাশ।
নিষেধ না মানে কিছু নাহিক তরাস॥
গোপকুলে কলঙ্ক রাখিল শিশুগণে।
আজি শাস্তি সভাকার দিব ভাবে মনে॥
এইরূপে সর্ব্ব গোপ তর্জ্জিয়া গর্জ্জিয়া।
নানাদুঃখ পায়্যা আইল পর্ব্বত লঙ্ঘিয়া॥
যেইক্ষণে শিশুমুখ কৈল দরশন।
সেইক্ষণে সর্ব্বক্রোধ হৈল নিবারণ॥
বুকের উপরে তুলি দিল আলিঙ্গন।
নয়নে আনন্দ-নীর পড়ে ততক্ষণ॥
প্রেমরসে জড়বৎ নাহি অবধান।
পাসরিল গোপগণ আত্মপর জ্ঞান॥

বলরাম দেখি প্রেম-সম্পদ উদয়।
মনে মনে চিন্তিতে লাগিলা মহাশয়॥
স্তনের বালকে প্রেম বাড়িতে জুআয়।
এ সর্ব্ব বালকগণ স্তন নাহি খায়॥
তবে কেন এত বড় হৈল অনুরাগ।
বুঝিতে না পারি নারায়ণ অনুভব॥
ব্রজকুলে উথলিল প্রেমের সাগর।
আমার হৃদয়ে প্রেম বাড়ে নিরন্তর॥
কোথা হৈতে আইল মায়া কাহার ঘটনা।
কিবা দেব মায়া কিবা অসুরমন্ত্রণা॥
অভিপ্রায় বুঝি মায়া রচিল ঈশ্বরে।
অন্যের মায়াতে কিবা মোহিবে আমারে॥
সাত পাঁচ ভাবি রাম মুদিল নয়ান।
ধ্যান করি দেখিলেক সর্ব্ব ব্রহ্মজ্ঞান॥
শিশুগণ দেব-অংশে হৈল উপাদান।
ঋষি-অংশে যতেক বাছুর বিদ্যমান॥
এ সকল কেহ দেব-ঋষি-অংশে নয়।
সর্ব্বরূপ ধরি লীলা করে মহাশয়॥
এ বোল শুনিয়া কৃষ্ণ করিল ইঙ্গিতে।
বলরাম সকল বুঝিলা ভালমতে॥
এিরূপে যেদিন বত্সর পূর্ণ হৈল।
সেদিন আসিয়া ব্রহ্মা সকল দেখিল॥
বত্স আর শিশুগণ পূর্ব্বেতে হরিয়া।
রাখিয়াছিলেন গিরি গহ্বরে লইয়া॥
তখন আসিয়া ব্রহ্মা বিস্ময় হইল।
পুনরায় সেই সর্ব্ব গোকুলে দেখিল॥
নিজ হস্ত বত্স শিশু পর্ব্বত-গহ্বরে।
শয়ন করিয়াছে সেই উঠিতে না পারে॥
যতেক বালক বত্স হইয়া শ্রীহরি।
বিহরে আনন্দে শিশু বত্সরূপ ধরি॥
এ সব দেখিয়া ব্রহ্ম কৈল প্রণিধান।
চিরকাল রহে চিত্ত করি সমাধান॥

কিবা এই সত্য কিবা সেই সত্য হয়।
কিবা সেই মিথ্যে কিবা এই মায়া কয়॥
চৌদ্দভুবনের পতি ব্রহ্মা হেন হয়।
তবু কিছু না বুঝিল যোগমায়াময়॥
নিত্য শুদ্ধ জ্ঞানময় বিশুদ্ধ মোহন।
তিমিরে মজিল যেন নীহার দর্শন॥
মহাব্যস্তে অন্তমায়া কে বুঝে এ স্থলে।
দিবসসময়ে যেন জোনা কীট জ্বলে॥
জ্ঞানচক্ষে ব্রহ্মা তবে দেখেন তখন।
সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম এক এক জন॥
নবঘন শ্যামতনু পীতবাস ধরে।
শঙ্খচক্রগদাপদ্ম শোভে চারি করে॥
কিরীট কুণ্ডল হার বনমলা গলে।
হৃদয়ে কৌস্তুভ মণি সুশোভিত ভালে॥
বলয় কঙ্কণ চারু ভুজে বিরচিত।
সুবর্ণ মঞ্জীর মৃগ চরণে রঞ্জিত॥
কটিতটে পীতবাস কনক-মগলা।
নব জলধর যেন চমকে চপলা॥
আপাদমস্তকে দোলে তুলসীর মালা।
দশনখ বিরাজিত জিনি শশীকলা॥
মকরকুণ্ডলে দোলে কর্ণে চমত্কার।
সুবর্ণে জড়িত কণ্ঠে মণিময় হার॥
বিনোদ চন্দ্রিকা চারু মন্দ মধুহাস।
সত্ত্বগুণে যেন বিশ্বপালন প্রকাশ॥
অরূপিত অপাঙ্গ-ভঙ্গিমা নিরীক্ষণ।
রজোগুণে ধরে যেন সৃষ্টিকর্ত্তা জন॥
আত্মা যদি করি তৃণ স্তম্ব যে পর্য্যন্ত।
চরাচর সর্ব্বজীব হয় মূর্ত্তিমন্ত॥
নৃত্যগীত বহুবিধ অনেক প্রকার।
নানাভাবে স্তুতি ভক্তি করে নমস্কার॥
অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি অষ্ট মহানিধি।
মায়া আদি বিভূতি যতেক কর্ম্ম সিদ্ধি॥

সাক্ষাতে রচিত সেই নিজমূর্ত্তি ধরি।
কালকর্ম্ম স্বভাব সকল আদি করি॥
অনন্ত মূরতি ধরি করে উপাসনা।
অনন্ত মূরতি হরি অনন্ত ভাবনা॥
হেন পরিপূর্ণ হরি অনন্ত মূরতি।
বত্স শিশু সকল দেখিল প্রজাপতি॥
হরণ-কারণ মনে আর অতি ভয়।
সকল ইন্দ্রিয়গণ প্রেমে বশ হয়॥
দেখিয়া জন্মিল মোহ বাক্য নাহি সরে।
চিত্রের পুত্তলি প্রায় পড়ি রহে দূরে॥
থাকুক দূরেতে তার জানিবার কাজ।
দেখিতে শকতি নাই পাইল বড় লাজ॥
নিঃশব্দে রহিল নিজধাম-দরশনে।
চিত্রের পুতলি যেন মুদিল নয়নে॥
অসঙ্খ্য মহিমা যার প্রকৃতির পর।
বেদ নিরসন মুখে প্রমাণ-গোচর॥
সুখময় সুপ্রকাশ আনন্দ সে ময়।
দেখিয়া মোহিত ব্রহ্মা হৈল অতিশয়॥
মহিমা দেখিয়া ব্রহ্মা হৈল অচেতন।
তবে কৃপা কৈল প্রভু জগত-জীবন॥
বিধি-সন্মোহন দেখি কৃপার সাগর।
সে সব বৈভব প্রভু সম্বরে সত্বর॥
মায়া-আচ্ছাদন-পটে ব্রহ্মায় আচ্ছাদিল।
কেবল মরিয়া যেন বিরিঞ্চি উঠিল॥
নয়ন মেলিল ব্রহ্মা অনেক যতনে।
ফিরিয়া চৌদিকে চাহে ঘুর্ণিত লোচনে॥
সন্মুখে দেখয়ে ব্রহ্মা সেই বৃন্দাবন।
সর্ব্বলোক জীবন তরুণ তরুগণ॥
নানা গুল্ম লতা বৃক্ষ ফল মনোহর।
নানাজাতি পক্ষী নদী খগ মৃগবর॥
বৈরী ভাব ত্যজি তথা নর মৃগ বসে।
ক্ষুধা তৃষ্ণা শোক যাতে নাহি কৃষ্ণ-রসে॥

নিরখিয়া দেখ ব্রহ্মা সেই বৃন্দাবন।
গোপশিশু নাট্যলীলা কৈল নারায়ণ॥
অনন্ত পরম ধাম অগাধ সে জ্ঞান।
গোপাল বালক নাট্য কৈলা ভগবান্॥
বাছুর বালক চাহে পূর্ব্বের সমান।
বাস করে কেবল বেড়ান বনেবন॥
সেইরূপ সেই বেশ সেই সব ধর।
সেই প্রভু বনে বনে ফিরে একেশ্বর॥
অদ্ভূত সে নাট্য লীলা দেখি সুরেশ্বর।
হংস হৈতে ব্রহ্মা তবে নামিল সত্বর॥
দণ্ডবৎ হৈয়া ব্রহ্মা পড়ে ভূমিতলে।
পদযুগে পরশিল মুকুট-শেখরে॥
অভিষেক কৈল অষ্ট নয়নের নীরে।
অষ্টাঙ্গে প্রণাম করে সভয় অন্তরে॥
ভয়ে কম্পবান্ গদগদ স্তুতিবাণী।
নানামত স্তুতি করে সুরশিরোমণি॥
শ্রীগদাধরবীর খ্যাতশিরোমণি।
ভাগবতাচার্য্য রচে প্রেমতরঙ্গিণী॥

টীকা -
১২৬৩ সালের মুদ্রিত পুস্তকে শেষ দুটি পংক্তি এইরূপে দেওয়া ছিল . . .
শ্রীকৃষ্ণের লীলা যত অদ্ভূত কাহিনী।
মাধব আচার্য্য রচে কৃষ্ণ-তরঙ্গিণী॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
কৃত অপরাধি ভুজঙ্গ দেবা দেবা
কবি ভাগবতাচার্য্য
এই পদটি সুকুমার সেনের
“History of Brajabuli Literature” গ্রন্থের ৪৬৭-পৃষ্ঠায় এই পদটি ইংরেজী হরফে
তুলেছিলেন। আমরা তা বাংলা হরফে তুলে দিচ্ছি পাঠকের সুবিধার জন্য। পদটি রঘুনাথ ভাগবতাচার্য্য
রচিত “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থের পদ বলে জানিয়েছেন সুকুমার সেন মহাশয়।

কৃত অপরাধি                          ভুজঙ্গ দেবা দেবা
নিবারিলে মদ প্রচণ্ড।
রিপু সুত সমদর-                     শিতা তুঁহু ভগবান
সমুচিত কর খল-দণ্ড॥
গোসাঞি, বারেক দেহ পতি-দান।
হাম নারী-জাতি                      সহজে লোক-গর্হিত
পতি-গত কেবল পরাণ॥
কৃত-দুষ্কৃত-জন-                          দূরিত হরণ দম
অনুগ্রহ পরম তোমার।
কু-যোনি জমন                        ভুজঙ্গম যতি পাপ
কেবল করিলে সংহার॥
নিজ মন তেজি অনা-                   গত জন কৃত মন
কোন তপ করল ভুজঙ্গ।
অখিল-দয়া-পর                          ধর্ম-করণে কিবা
তোষনে জগজনানন্দ॥
না বুঝলু হাম                     ফণির কোন অধিকার
শ্রীচরণের রজ পরশনে।
নিজ গুণ দোষ তেজি                    লক্ষি ও বাঁচাই
তপ যোগ করাই ধেয়ানে॥
ও চরণারবিন্দ-                      রজ অজ-ভব-মাটি
তছু বিনে আন নাহি জানে॥
সুরপতি-পদ আর                     অখিল ক্ষিতি-পতি
প্রজাপতি-পদ নাহি মানে।
অখিল সম্পদ-পদ                          পাদানু-সম্পদ
সম্পদ করি নাহি জানে॥
অষ্ট-যোগ-সিদ্ধি                             নির্বাণ মুক্তি
সকল তরিত সমানে॥
তম-গুণ-জনিত                       ক্রোধ-পুর কলেবর
ফণা-ধরা (সো হো তুয়া) পদ-ধূলি পায়।
কহে ভাগবতাচার্য্য                       যদু চিনতনে এ
ভব-বন্ধন দূরে যায়॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
লক্ষ লক্ষ শিশুগণ সমবেশ বিভূষণ
ভণিতা - ভাগবত আচার্য্য
কবি ভাগবতাচার্য্য
এই পদটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য
সংকলন, গোষ্ঠলীলা, ৩৪৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এটি “ভাগবতাচার্য্য” ভণিতাতে
“কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থের পদ। তিনি জানিয়েছেন যে এই পদটি ভাগবতের ১০ম স্কন্ধের ১২শ অধ্যায়ের ২-
১০ কলির অনুবাদ। কিন্তু এখানে ভণিতা বাদে মাত্র ৮টি কলির অনুবাদই দেওয়া রয়েছে। তিনি কোন
প্রকাশনীর “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থ থেকে এই পদটি পেয়েছিলেন তাঁর গ্রন্থে সেই উল্লেখ নেই।

লক্ষ লক্ষ শিশুগণ                            সমবেশ বিভূষণ
শিঙ্গা বেত্র বিষাণ কাছিয়া।
সহস্রেক নাহি টুটি                     লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি
চলে শিশু বত্সগণ লইয়া॥
কৃষ্ণ বত্স রাখে যত                      ব্রহ্মায় লেখিব কত
সেখিতে কে পারে তার অন্ত।
বত্স যূথ যূথ করি                        একত্রে সকল মেলি
বত্স রাখে করিয়া আনন্দ॥
বিবিধ বালক লীলা                          বহুবিধ শিশুখেলা
বহু ভাঁতি খেলে শিসুগণ।
প্রবাল কুসুম ফল                             বনধাতু নব দল
করে শিশু অঙ্গের ভূষণ॥
কেহ শিঙ্গা করে চুরি                    কেহ ফেলে দূর করি
পুন দেই হাসিয়া হাসিয়া।
কৃষ্ণ যদি থাকে দূরে                    ধাঞা ধাঞা শিশু চলে
পুন আইসে কৃষ্ণ পরশিয়া॥
মুঞি সে সভার আগে                    পরশিনু তোমা এবে
এইরূপে আনন্দ বিহরে।
কেহ শিঙ্গা বেণু পূরে                     কেহ ভৃহ্গরব করে
কোকিল-শবদ কেহ করে॥
কেহ দেখি পাখী ছায়া                  তার সঙ্গে যায় ধাঞা
হংস দেখি হংসের গমন।
বক দেখি বকবৎ                           কেহ হয় ধ্যানরত
কেহ ধরে ময়ূর পেখম॥
বানরের পুচ্ছ ধরি                        কেহ টানাটানি করি
বানরে টানিঞা তুলে গাছে।
বানর-আকৃতি ধরে                       সেরূপ ভ্রুকুটি করে
লম্ফে লম্ফে যায় তার পিছে॥
***                        ***                        ***
ভাগবত আচার্য্য কহে                     শুনিলে দূরিত দহে
পরম মঙ্গল গুণগাথা॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
যবে কৃষ্ণ বেণু বায় সব ধেনু রহি চায়
ভণিতা - ভাগবত আচার্য্য
কবি ভাগবতাচার্য্য
এই পদটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য
সংকলন, গোষ্ঠলীলা, ৩৪৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এটি “ভাগবতাচার্য্য” ভণিতাতে
“কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থের পদ। তিনি জানিয়েছেন যে এই পদটি ভাগবতের ১০ম স্কন্ধের ২১শ অধ্যায়ের ১৩-
১৮ কলির অনুবাদ। কিন্তু এখানে ভণিতা বাদে মাত্র ৪টি কলির অনুবাদই দেওয়া রয়েছে। তিনি কোন
প্রকাশনীর “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থ থেকে এই পদটি পেয়েছিলেন তাঁর গ্রন্থে সেই উল্লেখ নেই।

যবে কৃষ্ণ বেণু বায়                        সব ধেনু রহি চায়
স্রুতিযুগ-পুট ধরে তুলি।
মুদিত নয়ন করি                           হৃদয়ে চিন্তয়ে হরি
দশনে কবল ঘাস ধরি॥
বত্স করে ক্ষীরপান                        যবে শুনে বেণুগান
ক্ষীর-কবল মুখে ধরি।
শ্রুতিযুগ উভ করি                        অমনি ধেয়ায় হরি
প্রেমরসে আপনা পাসরি॥
বলভদ্র সহ হরি                          গোপশিশু সঙ্গে করি
বৃন্দাবনে চরায় গোধন।
দেখিয়া রবির জ্বালে                     মেঘে আসি ছত্র ধরে
দেবে করে পুষ্প বরিষণ॥
যতেক বালক মেলি                        রাম সঙ্গে বনমালী
গোধন চরায় যদি বনে।
চরের স্থাবর-ধর্ম্ম                            স্থাবরের চর-ধর্ম্ম
হেন চিত দেখিলা নয়নে॥
***                        ***                        ***
এ সব চরিত্র লীলা                       কৈলা দেবকীর বালা
ভাগবত আচার্য রচনা॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
চঞ্চল বরিহাপীড় বান্ধল কুসুমে চূড়
ভণিতা - ভাগবত আচার্য্য
কবি ভাগবতাচার্য্য
এই পদটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য
সংকলন, উত্তর-গোষ্ঠ, ৩৫১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এটি “ভাগবতাচার্য্য” ভণিতাতে
“কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থের পদ। তিনি জানিয়েছেন যে এই পদটি ভাগবতের ১০ম স্কন্ধের ২১শ অধ্যায়ের ৫
কলির অনুবাদ। তিনি কোন প্রকাশনীর “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থ থেকে এই পদটি পেয়েছিলেন তাঁর
গ্রন্থে সেই উল্লেখ নেই।


চঞ্চল বরিহাপীড়                        বান্ধল কুসুমে চূড়
নটবরশেখর গোপাল।
দৃঢ়বন্ধ পীত ধটী                     উজ্জবল কিঙ্কিণী কটি
শ্রুতিযুগে শোভে কর্ণিকার॥
বৈজয়ন্তী মালা দোলে                     মণি আভরণ ধরে
অধর-সুধায় বেণু পূরে।
নব নব গোপসুত                        চৌদিগে আনন্দযুত
গায় গুণ, মাঝে বৃন্দাবনে।
অমিত গোধন সঙ্গে                    বিবিধ কৌতুক রঙ্গে
পরবেশ কৈল নারায়ণে॥
***                        ***                        ***
সুমধুর গোষ্ঠলীলা                      কৈলা দেবকীর বালা
ভাগবত আচার্য্য রচনা॥

টীকা -
পদাবলী-সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণকে নারায়ণ ও দেবকীনন্দন বলা হয় নাই। শ্রীরূপ গোস্বামী বিশুদ্ধ মাধুর্য্যরস প্রচার
করায় শ্রীকৃষ্ণ যশোদানন্দন মাত্র---দেবকীনন্দন নহেন। আর তিনি সব সময়েই দ্বিভুজ ; কখনও চতুর্ভুজ
নারায়ণ নহেন। শ্রীমন্মহাপ্রভু রঘুনাথ ভাগবতাচার্য্যের কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে উত্সাহিত
করিয়াছিলেন।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
কিঙ্কণ-কিঙ্কিণী নূপুরের ঝনঝনি
ভণিতা - ভাগবত আচার্য্য
কবি ভাগবতাচার্য্য
এই পদটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত ষোড়শ শতাব্দীর
পদাবলী সাহিত্য সংকলন, উত্তর-গোষ্ঠ, ৪৮৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এটি
“ভাগবতাচার্য্য” ভণিতাতে “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থের পদ। তিনি জানিয়েছেন যে এই পদটি
ভাগবতের ১০ম স্কন্ধের ৩৩শ অধ্যায়ের ৫-৭ কলির অনুবাদ। তিনি কোন প্রকাশনীর
“কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থ থেকে এই পদটি পেয়েছিলেন তাঁর গ্রন্থে সেই উল্লেখ নেই।


কিঙ্কণ-কিঙ্কিণী নূপুরের ঝনঝনি।
অঙ্গ-আভরণ শব্দে পূরিল মোদিনী॥
অতুল শবদ হৈল এ রাস-মণ্ডলে।
রমণীর মাঝে মাঝে কৃষ্ণ শোভে ভালে॥
হেম মণি মাঝে যেন বিচিত্র গাঁথুনি।
দুই দুই গোপী মাঝে দেবকীনন্দন॥
কত গোপী, কত কৃষ্ণ না যায় গণন।
পদ আরেপণ, ভুজ যুগল কম্পিত॥
কটাক্ষ বিলাস দৃগঞ্চল বিরচিত।
ক্ষীণ কটিভঙ্গ, কুচ আলোলিত বাস॥
গণ্ডযুগে তরলিত কুণ্ডল বিলাস।
ধীরশিোমণি শ্রীল গদাধর যান॥
ভাগবত আচার্য্যের মধুরস গান॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর