মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . . “. . . রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয় মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন, মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন। মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা গাহিয়াছেন।”
আমরা মিলনসাগরে কবি ভাগবতাচার্য্য-এর বৈষ্ণব পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
ভাগবতাচার্য্যের “শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” - পাতার উপরে . . . ভাগবতাচার্য্যের রচনাসম্ভারে “শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” নামের একটি গ্রন্থ পাওয়া যায়। এটি “ভাগবত পুরাণ”-এর একটি সংক্ষিপ্ত ছন্দোবদ্ধ অনুবাদ। একাধিক প্রাপ্ত পুথি থেকে এই গ্রন্থ একাধিক বার প্রকাশিত হয়েছে। এবং তাদের মধ্যে অনেক পার্থক্যও দেখা গেছে। কোন পুথিটি আসল ভাগবতাচার্য্যের রচিত এবং কোন পুথি পরবর্তী অন্য কারও রচনা তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না।
আমাদের হাতে এসেছে ১৩১২বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ্ থেকে প্রকাশিত, পূর্ণচন্দ্র দাস কর্ত্তৃক মুদ্রিত ভাগবতাচার্য্যকৃত শ্রীমদ্ভাগবতের পয়ারানুবাদ “শ্রীকৃষ্ণপ্রেম-তরঙ্গিণী”। ১৩৬৮বঙ্গাব্দে (১৯৬১খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য গ্রন্থে তিনি ৪টি ভাগবতাচার্য্যের পদ সন্নিবেশ করেছেন। দুঃখের বিষয় এই যে, বিমানবিহারী মহাশয় কোন প্রকাশনীর “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” থেকে পদ সংগ্রহ করেছিলেন তা তাঁর গ্রন্থ থেকে জানা যায় না। আমরা সেই পদগুলির সঙ্গে আমাদের সংগ্রহের “শ্রীকৃষ্ণপ্রেম-তরঙ্গিণী” গ্রন্থের সংশ্লীষ্ট অংশের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই মিলিয়ে কোনও মিল দেখতে পাই নি। কেবল ভণিতার কলিতে যা সামান্য মিল পাওয়া গিয়েছে। সেই পদগুলি দুটি গ্রন্থ থেকে নিয়ে এখানে তুলে দেওয়া হলো পাঠকের সুবিধার জন্য।
সুকুমার সেন তাঁর History of Brajabuli Literature গ্রন্থে গ্রন্থের ৪৬৭-পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে তিনি বঙ্গবাসী প্রকাশনীর কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী গ্রন্থ থেকে একটি ব্রজবুলির পদ তুলেছেন।
মাধবাচার্য-এর পদাবলীর পাতা তৈরী করার সময়ে আমরা একটি পদ পেয়েছিলাম মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য থেকে। সেই পদটি ভাগবতাচার্য্যের ভণিতাতেও পাওয়া গিয়েছে। আমরা সেই পদটি এই পাতাতেও তুলে ছিয়েছি।
অন্যদিকে সাধারণভাবে বৈষ্ণব পদাবলী যেমন শ্রীরাধাকৃষ্ণ কেন্দ্রিক হয়, শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে গোপীগণের উল্লেখ থাকলেও শ্রীরাধার উল্লেখ নেই। তাই “শ্রীকৃষ্ণপ্রেম-তরঙ্গিণী” গ্রন্থেও শ্রীরাধার উল্লেখ পাওয়া যায় না। রাসলীলার বর্ণনায়, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে কেবল গোপী গণের উপস্থিতি রয়েছে।
শ্রীগদাধর পণ্ডিত উপশাখা মহোত্তম ; তাঁর উপশাখা কিছু করি যে গণন। শাখা শ্রেষ্ঠ ধ্রুবানন্দ, শ্রীধর ব্রহ্মচারী ; ভাগবতাচার্য্য, হরিদাস ব্রহ্মচারী।
কবি ভাগবতাচার্য্য - শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস নেবার পরে বরাহনগরে (বর্তমানে কলকাতার উত্তরে অবস্থিত বরানগর) এক বিপ্রের গৃহে একরাত্রি ছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ তাঁকে ভাগবত পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য সেই পাঠ শুনে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে নৃত্য করতে শুরু করেছিলেন। তিনি এত প্রসন্ন হয়েছিলেন যে সেই গৃহকর্তাকে “ভাগবতাচার্য্য”
সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . সুকুমার সেন তাঁর History of Brajabuli Literature গ্রন্থে ভাগবতাচার্যের সময়কাল ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দ জানিয়েছেন। তিনি এই কবি সম্বন্ধে গ্রন্থের ৪৬৭-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
"In the Bangabasi edition of Krsna-prema-tarangini (কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী) there is a mixed Brajabuli poem. The corresponding portion of the VSP edition of the same work is an entirely different poem, a Bengali poem in tripadi metre. Raghunatha Bhagabatacarya was a follower of Caitanyadeva, He was a deciple of Gadaghara Pandita, and lived at Barahanagara (modern Baranagore, a northern suburb of Calcutta). On his way back to Nilacala from Kanai-natasala the Great Master stopped for a night at the house of the house of Raghunatha. He was so pleased with Raghunatha’s recital of Bhagavata-Purana that he conferred on him the tittle Bhagavatacarya [ vide Chaitabya-bhagavata, iii, 5 ]. Kavi-katnapura in his Gaura-ganiddesa-dipika (completed in Saka 1498 = 1575 A.C.) mentions the Krsna-prema-tarangini. So the work must have been completed some time before that date. The Krsna-prema-tarangini is a metrical, abridged translation of the Bhagavata- Purana.
In the absence of old and authentic MSs, it is hard to decide whether the Barajabuli poem is genuine or not. I quote the poem below. It is corrupt at places, and so I do not add a translation." (আমরা এই “কৃত অপরাধি ভুজঙ্গ দেবা দেবা” পদটি, নীচে কবির কবিতা বা পদাবলীর পাতায় বাংলা হরফে তুলে দিয়েছি।)
ভাগবতাচার্য সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ মাইতির উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৬২ সালে প্রকাশিত, রবীন্দ্রনাথ মাইতি রচিত “চৈতন্য পরিকর” গ্রন্থের ৩৫৬-পৃষ্ঠায়, তিনি ভাগবত- আচার্য্যের পরিচয় এবং ভাগবতাচার্য্যের রচিত “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” নামক গ্রন্থ সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখেছেন . . .
"চৈতন্যচরিতামৃতের মূল-স্কন্ধ-শাখা এবং অদ্বৈত ও গদাধর-শাখায় একজন করিয়া মোট তিনজন ভাগবতাচার্যের নাম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে মূল-শাখার ভাগবতাচার্য্য সম্বন্ধে চৈতন্যভাগবতে বর্ণিত হইয়াছে যে মহাপ্রভু গৌড়মণ্ডল হইতে দ্বিতীয়বার নীলাচল গমন পথে বরাহনগরে ‘মহাভাগ্যবন্ত এক ব্রাহ্মণের ঘরে’ গিয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি ভাগবত পাঠে ‘সুশিক্ষিত’ ছিলেন এবং তাঁহার ভাগবত পাঠে মহাপ্রভু এতই মুগ্ধ হন যে তাঁহার পাঠকালে তিনি ভাবাবেশে ‘বাহ্য পাশরিয়া’ নৃত্য আরম্ভ করেন এবং
প্রভু বোলে ভাগবত এমত পঢ়িতে। কভু নাহি শুনি আর কাহারো মুখেতে॥ এতেকে তোমার নাম ভাগবতাচার্য। ইহা বই আর কোন না করিহ কার্য॥
জয়ানন্দও এই ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। কয়েকটি পুখিতে ভাগবত-আচার্য এবং তত্পত্নী উভয়কেই এই সময়ে মহাপ্রভুর সহিত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হইয়াছে। ‘পাটপর্যটন-‘ ‘পাটনির্ণয়-‘ এবং বৃন্দাবনের ‘বৈষ্ণববন্দনা’-মধ্যে বরাহনগরেই ভাগবতাচার্যের পাট লিখিত হইয়াছে।"
ভাগবতাচার্যের কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ মাইতির উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৬২ সালে প্রকাশিত, রবীন্দ্রনাথ মাইতি রচিত “চৈতন্য পরিকর” গ্রন্থের ৩৫৬-পৃষ্ঠায়, তিনি ভাগবত- আচার্য্যের পরিচয় এবং ভাগবতাচার্য্যের রচিত “কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী” নামক গ্রন্থ সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখেছেন . . .
"কবিকর্ণপূর জানাইয়াছেন যে শ্রীমদ্ভাগবতাচার্য ‘কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী’' নামক গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ডাঃ সুকুমার সেনই দেখাইয়াছেন যে গ্রন্থটির মধ্যে একটি মিশ্র-ব্রজবুলি ভাষার পদ রহিয়াছে।
কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী-গ্রন্থখানি কোন ভাগবতাচার্যের রচিত সে লইয়া মতবিরোধ আছে। ১৩৪৪ সালে (১৯৩৭খৃষ্টাব্দ) হরিদাস ঘোশাল মহাশয় তাঁহার শ্রীভাগবত আচার্যের লীলা প্রসঙ্গ নামক প্রবন্ধগুলিতে জানাইয়াছেন যে গ্রন্থখানি বরাহনগরের রঘুনাথ-আচার্য কর্তৃকই রচিত হইয়াছিল। পাটবাড়ী-গ্রন্থাগারে প্রবন্ধগুলি রক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু হরিদাসবাবু তাঁহার উপরোক্ত সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে কোনও কারণ প্রদর্শন করেন নাই। অপর পক্ষে, রাধেশচন্দ্র শেঠ মহাশয় ভাগবতাচার্য-প্রণীত বাঙ্গালা শ্রীমদ্ভাগবতের হস্তলিখিত পুথি একখানি প্রাপ্ত হইয়া ১৩০৬ সালের (১৮৯৯ খৃষ্টাব্দ) সাহিত্য-পত্রিকার আষাঢ়-সংখ্যায় নানারূপ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া জানাইয়াছিলেন যে চৈতন্যচরিতামৃতের চৈতন্য-শাখাভুক্ত ভাগবতাচার্য প্রেমভক্তিতরঙ্গিণীর (কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী?) রচয়িতা নহেন, উক্ত গ্রন্থের গদাধর-শাখাভুক্ত ভাগবতাচার্যই আলোচ্যমান গ্রন্থের রচয়িতা। প্রবন্ধকার যে সকল যুক্তি দিয়াছেন, তাহাতে অবশ্য গদাধরকেই নিঃসন্দেহে গ্রন্থকারের গুরু বলিয়া ধরিয়া লইতে পারা যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে গৌরগণোদ্দেশদীপিকা-গ্রন্থে চৈতন্য-শাখাভুক্ত বরাহনগরবাসী সুপ্রসিদ্ধ ভাগবত-পাঠাকের নামের অনুল্লেখের কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তবে বরাহনগরবাসী ভাগবতাচার্যের পক্ষে যে গদাধর-শিষ্য হওয়া সম্ভব নয়, তাহাো জোর করিয়া বলা যায় না। চৈতন্যচরিতামৃত-গ্রন্থে এক ব্যক্তিকে দুইটি শাখার অন্তর্ভুক্ত-হিসাবে বিবৃত করিবার আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত আছে। গদাধর-শাখার মধ্যে যে ভাগবতাচার্যের নাম পাওয়া যায়, তিনি গদাধর দাসের তিরোধান-তিথি- মহোত্সব এবং খেতুরির মহামহোত্সবে যোগদান করিয়াছিলেন। গদাধর শিষ্যবৃন্দের সহিত তাঁহার উল্লেখ হইতেই তাহা বুঝিতে পারা যায়।"
ভাগবতাচার্য্যের কোনও পদ পদকল্পতরুতে নেই - পাতার উপরে . . . আনুমানিক ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে বৈষ্ণবদাস সংকলিত, সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু সংকলনে, ব্যাস রচিত শ্রীমদ্ভাগত থেকে তিনটি শ্লোক পদ হিসেবে সংকলিত হয়েছে (পদসংখ্যা ১২৬৭, ১৬৩০ ও ১৬৩১)। কিন্তু যে ভাগবতাচার্য্যের ছবি আঁকা হয় শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে তারই কোনও পদ সেখানে সংকলিত হয় নি।
আধুনিক যুগে (১৯৬১খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত "ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য" পদাবলী সংকলনে আমরা প্রথম ভাগবতাচার্য্যর কোনও পদ সংকলিত হতে দেখলাম। তার পূর্ব্বের তথা কোনও প্রাচীন বাংলা পদাবলী সংকলনে ভাগবতাচার্য্যর পদ চোখে পড়ে নি। এর কারণ কি এই যে এটি ভাগবতের অনুবাদ মাত্র এবং এতে রাধার আবির্ভাব হয়নি? বিশেষজ্ঞদের কাছে এই প্রশ্নটি রেখে আমরা এই বিষয় থেকে এই আলেখ্যর মূল বিষয়ে চলে যাচ্ছি - বৈষ্ণব-পদাবলী। আমরা তাঁর মাত্র ৮টি পদ তুলেছি।
শ্রীচৈতন্যের জীবিতাবস্থায় আঁকা ছবিতেভাগবতাচার্য্য -পাতার উপরে . . . ১৯১১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, দীনেশচন্দ্র সেনের History of Bengali Language and Literature গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে, ছবিতে (ছবিটি আংশিক তোলা হয়েছিল বোধহয়) দেখা যাচ্ছে সপার্ষদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভগবদ্গীতা পাঠ শুনছেন। ছবিটি আঁকা হয় পুরী বা নীলাচলের রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের আদেশে, ১৫১২ - ১৫৩৩ খৃষ্টাব্দের সময়কালে। ছবিটি শ্রীনিবাসাচার্য্য নদীয়ায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হওয়ার পরে। শ্রীনিবাসাচার্য্যের বংশধরদের মাধ্যমে ছবিটি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী খ্যাত মহারাজ নন্দকুমারের বা নান্ কুমারের পরিবারের হাতে আসে এবং শেষপর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলার কুঞ্জঘাটায় রক্ষিত রয়েছে। এই ছবিতে মধ্যমণি হিসেবে দেখা যাচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে। তাঁর ডানদিকে রয়েছেন প্রভু নিত্যানন্দ। এছাড়া রয়েছেন ভাগবতাচার্য্য এবং এই ছবির আদেশকর্তা রাজা প্রতাপরুদ্র দেব কে দেখা যাচ্ছে সাষ্টাঙ্গে প্রণামরত। রাজার সামনে একটি ময়ূর দেখা যাচ্ছে, যা সম্ভবত মহারাজের উচ্চ মর্যাদাক্রম দর্শাতে আঁকা হয়েছে। কোথাও এই ছবির শিল্পীর নামের উল্লেখ নেই।
এর সঙ্গে আমরা আরও কয়েকটি তথ্য যোগ করে দিতে পারি, পাঠকদের জন্য। ১। এই ছবিতে শ্রীচৈতন্যের পার্ষদদের মধ্যে কারা কারা আছেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মতান্তরে, মধ্যমণি হিসেবে রয়েছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। সঙ্গে রয়েছেন প্রভু নিত্যানন্দ, গীতাপাঠরত গদাধর পণ্ডিত, অদ্বৈতাচার্য্য সম্ভবত পক্ককেশে, শ্রীবাস, রূপ এবং সনাতন গোস্বামী, দণ্ডায়মান যবন হরিদাস যাঁকে আমরা দেখতে পারছিনা ছবিটি এখানে আংশিক রয়েছে বলে এবং সাষ্টাঙ্গে প্রণামরত স্বয়ং রাজা প্রতাপরুদ্র দেব।
২। যুধিষ্ঠির জানা ওরফে মালিবুড়ো, তাঁর ১৯৫৮ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য” গ্রন্থের, ৩০৬-৩০৭ পৃষ্ঠায় প্রতাপরুদ্র দেব ও শ্রীচৈতন্যদেবের ছবি (আলেখ্য), নিয়ে লিখেছেন . . . “সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদ তাঁর “শ্রীক্ষেত্র” পুস্তকে লিখেছেন : কথিত হয় যে, শ্রীনরেন্দ্র সরোবরের তীরে সপার্ষদ শ্রীচৈতন্যদেবের সম্মুখে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যখ্যারত শ্রীগদাধর পণ্ডিত গোস্বামিপ্রভু ও সপার্ষদ শ্রীগৌরহরির শ্রীপাদপদ্মমূলে সাষ্টাঙ্গ প্রণত শ্রীপ্রতাপরুদ্রের একটি আলেখ্য তাঁহার আদেশেই প্রকাশিত হইয়াছিল। কেহ কেহ বলেন, ঐ আলেখ্যেরই একটি প্রতিলিপি মুর্শিদাবাদ কুঞ্জাঘাটার রাজবাড়ীতে রক্ষিত আছে।”
৩। নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ১৯১১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, The archeological Survey of Mayurbhanja গ্রন্থের Pratappur অধ্যায়ের ৩৫-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . . “Prataprudra had ordered a likeness of Chaitanya to be painted in water-colours, in which the king himself is represented as lying prostrate before his great religious master. The painting, which is a rare specimen of art, is still preserved at Kunjaghata Rajabati, Murshidabad.”
৪। শ্রীনিবাসাচার্য্যের পুরী যাত্রার পথেই শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হবার খবর পান। তাঁদের দেখা হয়নি। তাই ছবিটি তিনি শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হবার পরেই নিয়ে এসেছিলেন। শ্রীনিবাসাচার্য্যের বংশধর ছিলেন রাধামোহন ঠাকুর যিনি নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর দরবারে “স্বকীয়াবাদ” বনাম “পরকীয়াবাদের” তর্কযুদ্ধে জয়প্রাপ্ত হয়ে “পরকীয়াবাদ”-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি “পদামৃতসমুদ্র” নামক ৭৪৬টি পদবিশিষ্ট একটি বিশাল পদাবলী-সংকলন রচনা করেছিলেন। এই রাধামোহন ঠাকুরই ছিলেন মহারাজ নন্দকুমারের দীক্ষাগুরু। তাই তাঁর হাত দিয়েই মহারাজ নন্দকুমারের কাছে এই ছবিটি এসেছিল এটা বলা চলে। নন্দকুমারের কন্যা সুমণির সঙ্গে বিয়ে হয় কুঞ্জঘাটার জমিদার পুত্র জগত চাঁদের। সেই সূত্রে উপরোক্ত ছবিটি কুঞ্জঘাটার জমিদার বংশের হাতে আসে বলে কথিত আছে।
৫। দীনেশচন্দ্র সেনের বই থেকে জানতে পারি যে ছবিটি, ১৫১২-১৫৩৩ খৃষ্টাব্দের সময়কালে, রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের রাজত্বকালে, তাঁরই আদেশে আঁকা হয়েছিল। শ্রীচৈতন্যের যুগকে আমরা বলছি বাংলার প্রথম নবজাগরণের যুগ। ঠিক তেমনই সেই সেময়েই ইউরোপে চলছিল সেখানকার নবজাগরণের যুগ বা “রেনেসাঁ”। ইউরোপে, শিল্পী-স্থপতি-বৈজ্ঞানিক লিওনার্ডো-ডা-ভিঞ্চী, ১৫০৩ খৃষ্টাব্দে আঁকেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি “মোনালিসা”। তাই শ্রীচৈতন্যের এই ছবি এবং মোনালিসা প্রায় সমসায়িক বললে অত্যুক্তি করা হবে না। বলাবাহুল্য এই ঐতিহাসিক ছবিটির মূল্য অসীম।