কবি ভক্তরাম দাস - ছিলেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা গ্রামের বাবু গগনচন্দ্র সেন মহাশয়ের পূর্বপুরুষ। তাঁর আসল নাম সম্ভবত ছিল কবি রামদাস সেন।
মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ১৯০৩সালে “সাহিত্য” পত্রিকায় প্রকাশিত “গোকুল-মঙ্গল” নামক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন যে তাঁর অনুমান, কবি ভক্তরাম দাসের রচনাকাল ২০০বছরের প্রাচীন। সেই অনুমান অনুযায়ী রচনাকাল দাঁড়ায় ১৭০০সালের আশেপাশে। অর্থাৎ এই কবি ভক্তরাম দাস, রাধামোহন ঠাকুরেরও পূর্ববর্তী কবি ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন যে ভক্তরাম দাস ভণিতার কবি, কবি মুক্তারাম সেনের সম্ভবত খুড়তুতো ভাই, রামদাস সেন।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার ১৩১০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় (মে ১৯০৩ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের “গোকুল-মঙ্গল” নামক প্রবন্ধে কবি ভক্তরাম দাসের পদাবলী সম্বন্ধে বিস্তারিত লেখা পাই। সেখান থেকে জানা যায় যে গোকুল-মঙ্গল পুখি ভাগবতের দশম স্কন্ধের অনুবাদ বা তার অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ। গ্রন্থটি আমরা হাতে পাইনি। তাই তার সব পদ এখানে তোলা সম্ভব হলো না। তবে মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের “গোকুল-মঙ্গল” প্রবন্ধ এবং সাহিত্য-পরিষৎ- পত্রিকায় ১৩২০ (১৯১৩) বঙ্গাব্দের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত, তাঁরই সঙ্কলিত, বঙ্গীয় “বাঙ্গালা প্রাচীন পুথির বিবরণ, ১ম খণ্ড” থেকে মোট ৯টি পদ তুলে দিতে সমর্থ হলাম।
গোকুল-মঙ্গলের রচনাকাল সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . "গোকুল-মঙ্গল" গ্রন্থটি পাওয়া যায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা গ্রামের বাবু গগনচন্দ্র সেনের কাছে। গ্রন্থের রচনাকাল সম্বন্ধে মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ লিখেছেন . . .
“গ্রন্থখানি চট্টগ্রাম---আনোয়ারা গ্রামে শ্রীযুক্ত বাবু গগনচন্দ্র সেন মহাশয়ের বাটীতে পাওয়া গিয়াছে। তিনি বলেন, গ্রন্থখানি তদীয় পিতামহ ঁরামদাস সেন মহাশয়ের রচিত। তাঁহার এই উক্তির প্রমাণস্বরূপ কেবল তাঁহার পিতামহের গভীর সাহিত্যানুরাগিতার কথা ভিন্ন তিনি আর কিছু বলিতে পারেন না। তাঁহাদের বংশ বিশেষ প্রাচীন। সেন-বংশ পূর্ব্বকালে অতি সমৃদ্ধ ও বিদ্যালোকসম্পন্ন ছিল। এই বংশে পূর্ব্বে দুই জন কবির আবির্ভাব হইয়াছিল। এক জন মুক্তারাম সেন সারদামঙ্গল ও অপর ব্রজলাল সেন চণ্ডীমঙ্গল নামক কাব্যের রচনা করিয়া গিয়াছেন। এই কারণেই গগনবাবুর কথায় আমাদের একটু আস্থা জন্মে বটে, কিন্তু তথাপি এই গ্রন্থের ভাষা বহু প্রাচীন বলিয়াই বোধ হয়। ইহা আনোয়ারায় সেনবংশীয় লোকের রচনা, ইহা যদি সত্য হয়, তবে তাহা গগন বাবুর পিতামহ রামদাস সেন মহাশয়ের রচনা না হইয়া @ উক্ত ব্রজলাল ও মুক্তারাম সেনের সমকালবর্ত্তী খুল্লতাত ভ্রাতা রামদাস সেনের রচনা হইবার বিশেষ সম্ভাবনা। আমাদের এই অনুমান সত্য হইলে, পুঁখিখানি প্রায় দুই শত বত্সরের পূর্ব্ববর্ত্তী রচনা হইয়া পড়ে। ভাষার আলোচনা দ্বারাও এই অনুমানের সমর্থন হয়, পাঠকগণ পরে তাহা দেখিতে পাইবেন।”
প্রবন্ধে ভাষার প্রাচীনতার বিষয়ে সাহিত্যবিশারদ মহাশয় বিস্তারিত আলোচনা করে, ভাষার প্রাচীনতার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, যা আমরা এখানে উদ্ধৃত করলাম না। তবে আমরাও এই গ্রন্থের ভাষার প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করি এবং মনে করি যে এই কবি ভক্তরাম দাস, কবি মুক্তারাম সেনের খুড়তুতো ভাই রামদাস সেন হতে পারেন। তা হলে এই গ্রন্থটি ১৭০০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ রচিত হয় বলে অনুমান করা যায়।
@ - পাদটীকায় আবদুল করীম সাহিত্য বিশারদ মহাশয় লিখেছেন --- “গগনবাবুর মুখে তাঁহার পিতামহের নাম রামদাস সেন শুনিতে পাওয়া যায় ; কিন্তু তাঁহাদের কুলজীতে তত্স্থলে রামরাম সেন দেখা যায়। বলিয়া রাখা ভাল, এই বংশের কেহ এখন দাস উপাধি ব্যবহার করেন না। বিষয়টি সমস্যাপূর্ণ,---কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। --- লেখক।”
গোকুল-মঙ্গলের ভণিতা সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -পাতার উপরে . . . “গোকুল-মঙ্গলে”-এর পদাবলীর ভণিতা সম্বন্ধে মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, তাঁর “সাহিত্য” পত্রিকায় প্রকাশিত “গোকুল-মঙ্গল” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“গ্রন্থ ভণিতির স্থলে “ভক্ত রামদাস” এই নাম ভিন্ন গ্রন্থকারের আর কোনএ পরিচয় পাওয়া যায় না। তিনি “ভক্ত” শব্দ ছাড়িয়া একটি স্থলেও “রামদাস” ভণিতি দিয়া যান নাই। যেখানে “রাম” শব্দের যোগে ভণিতি দিবার সুযোগ পান নাই, সেখানে “ভক্তদাস” লিখিয়াছেন, তথাপি সমাক্ষরযুক্ত “রামদাস” লেখেন নাই। ইহা হইতে আমরা অনুমান করি, “ভক্তরাম” পদের গঠন অবিশুদ্ধ বোধ হইলেও, তাহাই রচয়িতার নাম ছিল। সেকালে ইহা অপেক্ষা কত অদ্ভুত নাম লোকসমাজে প্রচলিত ছিল, ভাবিয়া দেখিলে, ভক্তরাম নামে বিস্মিত হইবার অবকাশ থাকে না।