| কবি নন্দকিশোর-এর বৈষ্ণব পদাবলী |
| গোকুল মাধুর্য্য সিন্ধু কৃষ্ণ তাহে পূর্ণ ইন্দু কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের প্রথমোধ্যায়ের পদ। ॥ যথারাগঃ॥ গোকুল মাধুর্য্য সিন্ধু, কৃষ্ণ তাহে পূর্ণ ইন্দু, সদা রহে প্রকাশ রূপেতে। বিশাখার সুহৃত্তম, রাধা অঙ্গে অনুক্ষণ, বিলাসয়ে আনন্দ চিত্তেতে॥ ১॥ শুন কৃষ্ণচন্দ্রের মাধুরী। স্বমাধুর্য্যামৃত দানে, অহ্লাদয়ে ত্রিভূবনে, অখিল রসের বৃদ্ধিকারী॥ ধ্রু॥ আপন সৌন্দর্য্যে করি, তারাপালী খর্ব্বকারী, চিত্রা অনুরাধা আদি করি। নিজ প্রিয়গণ সঙ্গে, সদাই বিহরে রঙ্গে, বৃন্দাবন মণ্ডলি উপরি॥ ২॥ ব্রজবন বিলাসিনী, ব্রজবধূ কুমুদিনী, বৃন্দা প্রতি আহ্লাদক চিতে। নিজ কর আলিঙ্গনে, স্বমাধুর্য্য সুখদানে, সদা যেই করে প্রফুল্লিতে॥ ৩॥ ব্রজবাসী গণ যত, সে চকোর অবিরত, সে মাধুর্য্যামৃত পান করে। পুনঃ পুনঃ পিয়ে যত, তৃষ্ণা বাড়ে অবিরত, ক্ষণমাত্র ছাড়িতে না পারে॥ ৪॥ অতি রোগত্কণ্ঠা মনে, রহে কৃষ্ণচন্দ্র সনে, যার যেন তৃষ্ণা তেন মতে। স্বমাধুর্য্যামৃতে হরি, সবায় আনন্দকারী, বিলসয়ে অতি হর্ষ চিতে॥ ৫॥ নিরবধি শান্তগণ, যে রূপে করয়ে মন, দাসগণ যে মাধুর্য্য আশে। সখা সে মাধুর্য্যময়, বাত্সল্যে সুরস হয়, মধুরে মাধুর্য্য পরকাশে॥ ৬॥ যার রসে হাস্য হয়, যে রস অদ্ভুতময়, বীরে বীর করুণে করুণ। ক্রোধি জনে রৌদ্র হয়, যে মতি বিভত্সময়, রসাশ্রয় কৃষ্ণচন্দ্র হন॥ ৭॥ দীননাথ নারায়ণ, ভগবান্ অনুপম, জগতের উপরি বিলাসে। আপন প্রচণ্ড গুণে, অজ্ঞান তিম্র হানে, পদ্মাদির সুখ যে প্রকাশে॥ ৮॥ সেইত পদ্মালি পুনঃ, দেখি কৃষ্ণচন্দ্র গুণ, অতি সুমাধুর্য্য রসময়। বহুকাল তপ করি, আপনা অযোগ্য হেরি, মনোদুঃখে সঙ্কুচিত হয়॥ ৯॥ দেখি কৃষ্ণচন্দ্র শোভা, অতিশয় মনোলোভা, ব্রজাঙ্গনা ভাগ্য অনুভবি। শ্রুতিগণ নিজ মনে, উত্কণ্ঠাতে নিমগনে, গোপী অনুগতি মনে ভাবি॥ ১০॥ গোপিকা স্বরূপ প্রেমা, ভাব দেহ অনুপণা, লভিলা শ্রীব্রজ বৃন্দাবনে। অনূর্দ্ধ অসম রূপ, কোটি মন্মথের ভূপ, সে মাধুর্য্যামৃত করে পানে॥ ১১॥ রমার দুর্ল্লভ যাহা, শ্রুতিগণে পাইল ইহা, শুনিয়া সন্দেহ যার মনে। সাবধানে শুন সবে, নিজ চিত্ত অনুভবে, বিশেষিয়া কহি সে কারণে॥ ১২॥ ঐশ্বর্য্য মাধুর্য্যময়, ব্রজে কৃষ্ণ বিলসয়, ঐশ্বর্য্য করিয়া সঙ্গোপন। কেবল মাধুর্য্যরূপে, রসময় স্বস্বরূপে, বিহরয়ে ব্রজেন্দ্রনন্দন॥ ১৩॥ সে মাধুর্য্য রসরাজে, ঐশ্বর্য্য ভাবে যে ভজে, তার সেই মাধুর্য্য দুর্ল্লভে। ব্রজলোক ভাব লঞা, যে ভজয়ে লাভী হৈয়া, সে জন মাধুর্য্যামৃত লভে॥ ১৪॥ বিবিধ বয়সে করি, সর্ব্ব রসাশ্রয় হরি, সর্ব্বজন আনন্দিত করে। সকল স্বরূপে তার, কিশোর স্বরূপ সার, বৃন্দাবনে যেরূপে বিহরে॥ ১৫॥ কৃষ্ণ সেই কিশোরে, ত্যাগ সহ রসভরে, পিত্রাদি বাত্সল্য বল হৈতে। বিলসয়ে বাল্য প্রায়, দেখি তারা সুখ পায়, আস্বাদন করি লীলামৃতে॥ ১৬॥ তৈছে রহি গোষ্ঠবনে, সব গোষ্ঠবাসী সনে, বিহারে সবারে সুখী করে। তাসবারে প্রেম দেখি, কৃষ্ণ হয়ে মহাসুখী, ব্রজমাধে আনন্দে বিহরে॥ ১৭॥ যেত গোপ গোপীগণ, নন্দ যশোমতি সম, কৃষ্ণ সম অনুরাগী মনে। সবাত্সল্য বল হৈতে, অতীন্দ্রিয় উত্কণ্ঠাতে, কণ্ঠাগত জিউ রস মানে॥ ১৮॥ নিজ পরিকর সঙ্গে, কৃষ্ণের বিহার রঙ্গে, যে যৈছে চাহে দেখিবারে। কৃষ্ণ তাসবার মত, বিহরয়ে অবিরত, সদাই সবারে সুখী করে॥ ১৯॥ ঐছন বাত্সল্য প্রেমা, কে কহিবে সে মহিমা, শুকদেব যে পেরম বাখানে। সে প্রেম যাহার মনে, সে আনন্দ সবে জানে, আহা কি কহিতে পারে আনে॥ ২০॥ এইমত সখাগণ, যবে উত্কণ্ঠিত হন, গৃহে বনে থাকে যে যেখানে। মিত্রগণ করি সঙ্গে, কৃষ্ণ বিহরে রঙ্গে, বিবিধ বন্ধানে সে সেখানে॥ ২১॥ হাস্যালাপ করে সঙ্গে, কোথাহ ভোজন রঙ্গে, কার সঙ্গে শয়ন বিহারে। গোচারণ কার সনে, নৃত্য গীত কোনখানে, সখাগণ সংহতি বিহরে॥ ২২॥ পৌগণ্ড সখার সঙ্গে, কৈশোরে অশেষ রঙ্গে, বয়স্য সহিত করে খেলা। সে রসে বিভোর মন, যার হয় অনুক্ষণ, সে জন দেখয়ে সেই লীলা॥ ২৩॥ কিশোর শেখর রঙ্গে, কান্তাগণ করি সঙ্গে, বৃন্দাবন মধ্যেতে বিহরে। নিরবধি কৃষ্ণে মন, সে আনন্দে নিমগন, সধীর ললিত কহি তারে॥ ২৪॥ মহাভাবের স্বভাবে, হয় সে বিবিধ ভাবে, সে রত্ন ভূষিতা যার অঙ্গে। সঙ্গে নিজ পরিবার, প্রতিকুঞ্জে তাসবার, মরণ করয়ে রস রঙ্গে॥ ২৫॥ অপরা গোপিকা সনে, অদ্রিগৃহে বৃন্দাবনে, সভা করি অভিমত রূপে। সর্ব্বত্র সবার সঙ্গে, বিহার করয়ে রঙ্গে, অলক্ষিতে অনন্ত স্বরূপে॥ ২৬॥ কোনখানে কার কার, সঙ্গে নিজ পরিবার, ক্রীড়ারস করেন বিস্তারে। কার সনে হাস্যোল্লাস, কাহো অরণ্য বিলাস, ভ্রমরিকা রূপেতে বিহরে॥ ২৭॥ কার সঙ্গে দোলাখেলা, কোনখানে করে খেলা, বসন্ত উত্সব লীলাভরে। কোনখানে পাশা খেলে, নিজ চিত্ত কুতূহলে, নৃত্য গীত রাসাদিক করে॥ ২৮॥ এইমত কৃষ্ণচন্দ্র, সঙ্গে ব্রজাঙ্গনাবৃন্দ, বৃন্দাবনে সতত বিহরে। এ রসের অধিকারী, যার হয় ভাগ্যভারি, সে মাধুর্য্যামৃত পান করে॥ ২৯॥ ব্রজ ছাড়ি একক্ষণ, নাহি চলে কৃষ্ণ মন, সদা ব্রজ প্রেমায়ে বিভোর। সে রসে রসিক যেই, হেন সুখ জানে সেই, অন্য জনের না হয় গোচর॥ ৩০॥ প্রপঞ্চ অতীত হয়, প্রাকৃতের দৃশ্য নয়, অপ্রকট লীলা সেই হয়। এই ব্রজে কৃষ্ণ নিতি, গোপ গোপীর সঙ্গতি, প্রকট রূপেতে বিলসয়॥ ৩১॥ প্রপঞ্চাদি প্রেমিজন, সেই দেখে অনুক্ষণ, আর কেহ দেখিতে না পায়। তবেযে কহে শাস্ত্রেতে, কৃষ্ণ এই স্বস্থানেতে, প্রকটা লীলা করিয়া দেখায়॥ ৩২॥ সত্য হয় সেই কথা, নাহি হয় অন্যথা, কহি তার আশয় শুনহ। নিজ বাক্য সত্য লাগি, কৃষ্ণ হয়ে অনুরাগি, ভক্তে করিতে অনুগ্রহ॥ ৩৩॥ কেন যে দ্বাপর শেষে, কৃষ্ণ হয়ে পরকাশে, তেঞি প্রকট সকলে দেখয়ে। কৃষ্ণ সকল দ্বাপরে, প্রকটিয়া না বিহরে, আগে তার কহিব নির্ণয়॥ ৩৪॥ যুগ অবতারী যেই, যুগে অবতরি সেই, ধর্ম্ম সংস্থাপন আদি করে। সাধু জন নিস্তারিতে, দুষ্টজন সংহারিতে, প্রতি যুগে যুগে অবতরে॥ ৩৫॥ উপাসনা মতসার, তত্ত্ববস্তু সুনির্দ্ধার, নানাবিধ ভক্তের বিষয়। ধামরে অচিন্ত্যশক্তি, শ্রীকৃষ্ণাকর্ষিণী ভক্তি, এ নন্দকিশোর দাস কয়॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| স্বপদ কমল সৌরভ চঞ্চল কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের বিংশতিতমোধ্যায়ের পদ। ॥ যথারাগঃ॥ স্বপদ কমল, সৌরভ চঞ্চল, ভ্রমত ভ্রমরা হেরি। তহি প্রতি জল্পতি, দিব্যোন্মাদবতী, শ্রীবৃষভানু কিশোরী॥ তুমিত মধুপ, মধুপুরাধিপ, তোমারে কে দূত কৈলা। পীতাম্বর সখ, প্রেমাসুমুরুখ, ব্রজপুরে কেন আইলা॥ ধ্রু॥ শুন হে মধুপ, ধূর্ত্তজন বন্ধু, তোরে নিষেধিয়ে আমি। কি তব বচনে, মোসবা চরণে, পরশ না কর তুমি॥ যদি কর মনে, হেন কহে কেনে, কৃষ্ণের ধূর্ত্ততা কিবা। সেইত বচন, কহিব এখন, সাবধানে মন দিবা॥ বৃন্দাবন বাসে, আপনি সে ভাষে, মুঞিতো সবার ঋণী। গমনের কালে, দূতদ্বারে বলে, তুরিতে আসিব আমি॥ এতেক কহিয়া, রহে পাসরিয়া, প্রবঞ্চক অতিশয়। অতএব তারে, ধূর্ত্ত কহি তোরে, বৃথা দুঃখ উপজয়॥ এত সব শুনি, বন্ধু দোষ মানি, পুনরপি তুমি কহ। তোমার চরণে, করিতে প্রণামে, কি কারণে নিষেধহ॥ তবে যে বচন, কহি তাহা শুন, পুষ্পরসে মাতোয়াল। মদ্যপ সদৃশ, তোমার পরশ, কখন না হয় ভাল॥ পরশিলে মাত্র, হৈব অপবিত্র, এ লাগি কহিয়ে তোরে। যদি নমস্কারে, থাকে প্রয়োজন, তবে কহ যাই দূরে॥ যদি কহ অয়ি, কৃষ্ণপ্রিয়ে ময়ি, মিথ্যা অপবাদ দেহ। পুষ্পরস খাই, কভু দুষ্ট নই, মাতাল কেমনে কহ॥ তাহার কারণ, কহিব এখন, শুনি বিচারহ মনে। পরিবাদ নহে, সহজ কহিয়ে, মাতাল সমান গুণে॥ স্বপত্নী কুচেত, কৃষ্ণবক্ষকৃত, বিলোলিতা যেই মালা। কুচযুগে করি, কৃষ্ণবক্ষে ধরি, কিবা নিমর্দ্দিত ভেলা॥ তাতে সব কুচ, কুঙ্কুমসংযুত, মালার সৌরভ পাঞা। তার মধুপানে, হৈয়া মাতোয়াল, এথা আইলা দূত হৈয়া॥ সেইত কুঙ্কুম, চিহ্ন পতি সম, দেখিয়ে তোমার মুখে। ও মুখে চরণে, ছুঁইবে কেমনে, তেঞি নিষেধিয়ে তোকে॥ আমরা মানিনী, এই তত্ত্ব জানি, প্রসাদন লাগি আইলা। সে কুচকুঙ্কুম, বিনা প্রক্ষালন, না বুঝিয়া দূত হৈলা॥ বিবেক অভাবে, হেন কৈল যবে, সে মদ্যপান লক্ষণে। তোর দরশনে, বাড়ে আর মানে, বিচারি দেখহ মনে॥ যদি কহ শুন, হও পরসন্ন, যৈছে তৈছে হই আমি। শুন হে মধূপ, মদ্যের পালক, মধুপুরে যাও তুমি॥ নিজ প্রভু রেয়, সে মদ্য পালয়, পিব তাহা নিরবধি। সে কর্ম্ম করণে, দূত প্রকরণে, তোমারে সে হয় বিধি॥ যদি কহ মোরে, কৈলে তিরস্কারে, চলি যাব মধুপুরে। আপনে আসিয়া, গোপেন্দ্রনন্দন, প্রসাধন করু তোরে॥ তাহার কারণ, শুনহ এখন, সে কেনে সাধিবে মোরে। নানা সুবন্ধানে, করিয়া সাধনে, যবে ছিলা ব্রজপুরে॥ ব্রজে ব্রজেশ্বরী, গর্ভজাত হরি, ব্রজেন্দ্রনন্দন সেহোঁ। ভাগ্যবশ হৈতে, ক্ষত্রিয়কুলেতে, মধুপতি হৈল তিহোঁ॥ অতএব মানিনী, ক্ষত্রিয়-রমণী, গণের প্রসাদ বহু। সদা সবাকার, সহিতে বিহার, করি সবা প্রসাদউ॥ মধু-স্ত্রী অগণ্যা, রূপ গুণ ধন্যা, সদাই বিহার করে। একের সহিতে, বিহার করিতে, অন্যমনে নাম ধরে॥ তার প্রসাদনে, মানবতী আনে, তবে প্রসাদন করু। প্রবাহ রূপেতে, সবার সহিতে, সে মধুপতি বিহরু॥ তাহাতে এখানে, করিতে গমনে, অবসর নহে তাঁর। অথবা এখানে, গোপাঙ্গনাগণে, কিবা প্রয়োজন আর॥ যদি কহ পুনঃ, করি নিবেদন, কৃষ্ণপ্রিয়ে দেবী রাধে। তুমি সেই হরি, প্রিয়া সর্ব্বোপরি, সব সৌভাগ্যের নিধে॥ যদি বা তোমাতে, নহে তার চিত্তে, তবে কেনে তিহোঁ মোরে। এই ব্রজপুরী, পাঠাইলা হরি, সাধন করিতে তোরে॥ তবে কহি শুন, অতি বিলক্ষণ, যার দূত তোমা হেন। যাদব-নাগরী, রতি-চিহ্নধারী, যদুসভা বিড়ম্বন॥ তাহা সবাকার, পতিব্রতা সার, সে কৃষ্ণ করই নাশে। ব্যক্ত হবে যবে, যদুগণে ভবে, বিড়ম্বন সুবিশেষে॥ তুমি যার দূত, শুন এ অদ্ভুত, যদুর দেশের দোষে। যাদব-রমণী, কৃষ্ণভোগ্যা জানি, নিন্দা হৈবে সর্ব্ব দেশে॥ শ্লেষেত কহত, তুমি যার দূত, ঈদৃশ সে মধুপতি। মধুনামিতি, মদ্যানাং পতি, মদ্যপ নিশ্চয় অতি॥ যে মদ্যপ বিক্ষেপে, তোমা হেন রূপে, ভ্রমরেতে দূর কৈল। সে হরি যেখানে, যাহ সেইখানে, তোরে এ বচন কৈল॥ কিতবের বন্ধু, মধুপ কহিতে, প্রথমে অসূয়া হৈল। সপত্নীর কুচ, কুঙ্কুম বোলিতে, ঈর্ষা ভাব উপজিল॥ আমার চরণ, না কর স্পর্শন, এই অহঙ্কার হয়। মথুরা-নাগরী, গণ প্রসাদউ, মুদ্রাবধীরণে কয়॥ যদু যদশীতি, বচনে বদতি, প্রিয় অকৌশলোদ্গার। চিত্রজল্প হেন, শুন শ্রোতাগণ, রাধা-ভাব-গুণ-মতি। এ নন্দকিশোর, দাস তহি ভোর, সেই ভাব অনুগতি॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| ইন্দ্র নীলমণি জিতি কৃষ্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা অতি কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের চতুর্বিংশতিতমোধ্যায়ের পদ। ॥ যথারাগ॥ ইন্দ্র নীলমণি জিতি, কৃষ্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা অতি, দলিত অঞ্জন সুচিক্কণে। ইন্দিবর পরশিতে, যত সুখ হয় চিতে, ততোধিক কৃষ্ণাঙ্গ স্পর্শনে॥ সখি হে অপরূপ রূপের মাধুরী। জিনি নবজলধর, অতি স্নিগ্ধ কলেবর, নাগরীগণের চিত্তহারী॥ ধ্রু॥ অগুরু কস্তুরী আর, কুঙ্কুম কর্পূর সার, এ সকল একত্র ঘষিয়া। অতি সুচিত্রিত করি, লইয়াছে অঙ্গোপরি, হেরিয়া অধৈর্য্য হয় হিয়া॥ কোটি কোটি চন্দ্র জিনি, যাহার শ্রীমুখখানি, বাক্যামৃত তাহাতে প্রচার। মার্জ্জিত দর্পণ সম, ললাট উজ্জ্বল পুনঃ, অলকা তিলক তদুপর॥ সুকুঞ্চিত কেশ চূড়া, তাতে গুঞ্জাহার বেড়া, শিখণ্ড শোভয়ে তদুপরে। মল্লিকা রঙ্গণ ফুল, শোভে চূড়া দুইকুল, মত্ত মধুকর তঁহি ঘুরে॥ নীলোন্নত ভ্রূ বিলাসে, কন্দর্পের দর্প নাশে, নেত্রারক্ত আকর্ণ পর্য্যন্ত। তার ভঙ্গি চমত্কৃত, দেখি কুলঙ্গনা-চিত, কৃষ্ণসঙ্দ রঙ্গেতে একান্ত॥ নাসিকার শোভা অতি, লোলিত মুকুতা তথি, অধর বান্ধুলি বন্ধু জিনি। তাহে মন্দ মন্দ হাসি, বাজায় মোহন বাঁশী, আকর্ষয়ে ত্রিজগত প্রাণী॥ কি কহিব গণ্জশোভা, অতিশয় মনোলোভা, মকর কুণ্ডল তাহে দোলে। কুলবতী চিত্ত মীনে, গ্রাসিবেক হেন মনে, রহিয়াছে কৃষ্ণ-কর্ণমূলে॥ সুনির্ম্মল ভুজদণ্ড, জিনি করিবর-শুণ্ড, রত্ন বলয়াদি বিভূষিত। সুবিস্তার বক্ষ অতি, শ্রীবত্স কৌস্তুভ তথি, কণ্ঠহার মাঝে করে দীপ্ত॥ মুকুতা প্রবালজাল, চন্দ্রহার মণিমাল, ক্রমবন্ধে হৃদয় উপরে। পদক মণি সংযুত, পুষ্পমালা হয় যত, শোভে নাভি অধো ঊর্দ্ধোপরে॥ পীতাম্বর শোভে কটি, তাহে বেড়া স্বর্ণধটি, ঘাগর ঘুঙ্গুর তছুপরে। যুগল চরণোপরে, বঙ্করাজ নূপুরে, অতি মনোহর শোভা করে॥ বাম চরণোপরি, দক্ষিণ চরণ ধরি, বামহস্ত নিতম্বে হেলায়্যা। দক্ষিণ হাতেতে করি, অধরে মুরলী ধরি, বাজাইছে ঈষৎ হাসিয়া॥ এইমত কৃষ্ণভঙ্গি, দেখি ব্রজাঙ্গনা রঙ্গী, লজ্জা ধর্ম্ম দূরে তেয়াগিয়া। পুলকিত সব গায়, কৃষ্ণের নিকটে যায়, দেখি কৃষ্ণ আনন্দিত হিয়া॥ কেহ অমৃত কেলি করে, যায় কৃষ্ণ বরাবরে, কেহ বা তাম্বুল লৈয়া যায়। কেহ বা করে ব্যজন, আনন্দে মগন মন, কোন সখী চামর ঢুলায়॥ আনন্দে তা সবা সঙ্গে, কৃষ্ণ বিলসই রঙ্গে, পরম নিভৃত স্থানে লৈয়া। রসে মত্ত হৈয়া তথি, বিবিধ বন্ধানে রতি, কেলি করে অতি মত্ত হৈয়া॥ এইমত কৃষ্ণ সঙ্গে, ব্রজবধূগণ রঙ্গে, বিহার করিয়া ততক্ষণ। নিজ নিজ গৃহে সবে, গমন করিল তবে, অতিশয় বিরস বদন॥ সিঙ্গারবট কথন, এই লীলা বর্ণন, হইলেক প্রসঙ্গ ক্রমেতে। রসিক ভকত জন, অনুক্ষণ নিমগন, অন্য কেহ না পারে বুঝিতে॥ লীলাস্থলী বিবরণ, ছত্র বনাদি বর্ণন, হারোয়ানে পাশক খেলান। সিঙ্গারবটের কথা, সুমাধুর্য্য রস মতা, এ নন্দকিশোর দাস গান॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| করিতে প্রকট লীলা ব্রজে অবতীর্ণ হৈলা কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের দ্বাত্রিংশত্তম অধ্যায়ের পদ, ২৩৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ তথাহি॥ করিতে প্রকট লীলা, ব্রজে অবতীর্ণ হৈলা, মহাবনে নন্দের ভবনে। কৃপা করি ভক্তগণে, সে সুধা করাতে পানে, নিজ রস আস্বাদ কারণ॥ সংক্ষেপে কহিনু কথা, জন্মলীলা গুণ গাঁথা, পরম রহস্য অতিশয়। শুনিতে ভক্তের সুখ, দঃখ পায় বহির্ম্মুখ, সর্ব্বোত্কর্ষ এই লীলা হয়॥ নিত্যালীলা পরিবার, ব্রজ ব্রজবাসী আর, নন্দ আদি করি হয় নাম। আর যে সাধকগণে, জন্মিলেন ব্রজবনে, কহেন নন্দকিশোর আখ্যান॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| একদিন রঙ্গে বলরাম সঙ্গে কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের পঞ্চত্রিংশত্তম অধ্যায়ের পদ, ২৫৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ যথা রাগঃ॥ একদিন রঙ্গে বলরাম সঙ্গে নবঘনশ্যাম হরি। পীতাম্বর ধর, বেশ মনোহর, শিশুগণ সঙ্গে করি॥ যমুনার তীরে গিয়া। হৈল অতি বেলা, খেলে নানা খেলা, আনন্দে মগন হৈয়া॥ রামের জননী, দেখি সে রোহিণী, দোঁহারে আহ্বান করে। নীলমণি শ্যাম, বাপু বলরাম, ত্বরায় আইস ঘরে॥ দেখিল দেখিতে, নিমগন চিতে, না শুনে আমার বাণী। ত্বরা করি গেলা, ও পুত্র-বত্সলা, আইলা যোশোদা রাণী॥ দেখিল ক্রীড়াতে, অগ্রজ সহিতে. নীলমণি নিমগণে। প্রেমার আবেশে, গদ গদ ভাষে, স্নেহের স্রবে দুই স্তনে॥ কৃষ্ণ কৃষ্ণ শুন, কমল নয়ন, তাত কোলে আইস ধায়্যা। ক্ষুধায় মলিন, হৈয়াছে বদন, স্তনপান করসিয়া॥ খেলি নানা খেলা, শ্রীন্ত হৈয়া গেলা, ভোজনের কাল হৈল। বাপুরে বলাই, অনুজ কানাই, সৈয়া ঝাট ঘরে চল॥ বিহানে ভোজন, করি দুইজন, খেলা করিবারে আইলা। খেলারসে ভোলা, হৈল অতি বেলা, সময় নাহিক গেলা॥ ওথা ব্রজেশ্বর, আকুল অন্তর, আছে দুহুঁ পথ চায়্যা। ভোজন করিতে, না পারে যাইতে, ত্বরিতে আইস ধায়্যা॥ সব শিশুগণ, আপন আপন, গৃহের মাঝারে গিয়া। করিয়া ভোজন, সঙ্গে দুইজন, পুনঃ খেলাইহসিয়া॥ আজি জন্মদিন, আনিয়া ব্রাহ্মণ, ধেনুগণ কর দানে। দেখ শিশুগণে, স্নান বিভূষণে, খেলায়ে তোমার সনে॥ শুনহ কানাই, বাপুরে বলাই, চলহ গৃহের মাঝে। ধূলায় ধূসর, দুহুঁ কলেবর, করহ সিনান কাজে॥ পরি বিভূষণ, করিলে ভোজন, নন্দের আনন্দ হয়। শুন দুই জন, না ঠেল বচন, এ নন্দকিশোর কয়॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| কি কহিব ও রূপ মাধুরী কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের পঞ্চচত্বারিংশ অধ্যায়ের পদ, ২৯৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ যথা রাগঃ॥ কি কহিব ও রূপ-মাধুরী। শ্রীরাধিকা বামভাগে, সেবা করে অনুরাগে, নিজ সম সখী সঙ্গে করি॥ ধ্রু॥ নব গোরোচনা গৌরী, নীল পট্ট মনোহারী, অভ্যন্তরে রক্তবাস পরে। মণি স্তবক বিদ্যোতি, বেণী অতি চমত্কৃতি, ব্যালাঙ্গনা ফণার সোসরে॥ ও মুখ মণ্ডল ছটা, সকল উপমা ঘটা, জিনিয়া সৌন্দর্য্য পরকাশে। নবীনেন্দু নিন্দি ভালে, চঞ্চল অলকাজালে, কস্তুরী তিলক চিত্র ভাসে॥ কামের কামান জিনি, বঙ্কিমাভ্রু ধনু জানি, মদনমোহন জয় কাজে। তিলফুল সম নাসা, সুমাধুর্য্য পরকাশা, আগে গজমুক্তিকা বিরাজে॥ কজ্জ্বলে উজ্জ্বল ভাঁতি, মধুর চঞ্চল গতি, চকোরী সুন্দর বিলোচনা। অধরে বন্ধুক নিন্দু, চিবুকে কস্তুরী বিন্দু, কুন্দশ্রেণী সুন্দর দশনা॥ রত্নযুত স্বর্ণ পদ্ম, কর্ণিক মাধুর্য্য সদ্ম, শ্রবণ যে করিল কর্ণিকা। রত্ন গ্রৈবেকাজ্জ্বলা, অঙ্গদ কঙ্কণ কলা, দীপ্তি করি ভুজ মৃণালিকা॥ বলারি রত্ন বলয়, ঝলমল অতিশয়, তার কলা লম্বিত লাবিকা। বিচিত্র রত্ন অঙ্গুরী, দীপ্ত কলাঙ্গুলী করি, করাম্বুজ সুষমা অধিকা॥ হৃদয় উপরে যার, মনোহর মহাহার, বিলসিত সকুচ কুট্নলা। ঊর্দ্ধগতি রোমাবলি, সুষমা ভুজগ কালী, রত্নদ্যুতি সংযুত তরলা॥ শঙ্কিত হইয়া ধাতা, বান্ধিল ত্রবলী লতা, ক্ষীণতর ভঙ্গুর মধ্যমা। মণি সার সমাধার, বিস্ফার নিতম্ব যার, কে কহিবে সে মাধুর্য্য সীমা॥ হেমরম্ভা মদারম্ভ, তাহারে যে করে স্তম্ভ, ঊরুযুগ সুন্দর আকৃতি। পীত রত্নের সম্পূট, জ্বলিত সুন্দর ছোট, জিনিয়া অপূর্ব্ব জানুদ্যুতি॥ সারন্নীরাজনি রাজ্য, অপূর্ব্ব মাধুরী আর্য্য, চরণে মঞ্জীর ভাল বাজে। রাজেন্দ্র কোটি সৌন্দর্য্য, জিনিয়া উজ্জ্বলধুর্য্য, পদনখ দ্যুতি অতি রাজে॥ প্রেমভরে স্তম্ভপ্রায়, স্বেদবিন্দু সব গায়, গদগদ বচন অতিশয়। রোমাঞ্চ বৈবর্ণ্য হয়, আনন্দাশ্রুধারা বয়, ক্ষণে কম্প ক্ষণে যে প্রলয়॥ স্মরণে সঙ্গমে আর, প্রিয় আলোখনে যার, সকল সাত্বিক সদা হয়। অনুক্ষণ প্রেমভরে, ধৈরজ ধরিতে নারে, মোদন মাদন ভাবময়॥ মুকুন্দের সব অঙ্গে, মধুর মাধুর্য্য রঙ্গে, অপাঙ্গ ধরিল বিচলিতা। গোবিন্দ অপাঙ্গ দ্বারে, যাহার মাধুর্য্য হেরে, অনঙ্গ ঊরমি তরঙ্গিতা॥ অঙ্গুষ্ঠ তর্জ্জনী করি, তাম্বুল বিটিকা ধরি, প্রিয়মুখাম্বুজে সমর্পয়। কর্পূর খপুরযুতা, পর্ণ চূর্ণ সমন্বিতা, সুখে কৃষ্ণ তাহা আস্বাদয়॥ এইমত সখীগণ, নানা চিত্র বিভূষণ, বস্ত্র অলঙ্কার বিভূষিতা। ব্যজন চামর আদি, সেবা করে নিরবধি, সকলে রাধিকা অনুগতা॥ কৃষ্ণ তা সবার সঙ্গে, নানা রস লীলা রঙ্গে, বিহরয়ে যোগপীঠ স্থানে। বৃন্দাবন মধ্যস্থলে, সেই কল্পতরু মূলে, অতি শোভা পরম নির্জ্জনে॥ সকল শাস্ত্রেতে কহে, প্রপঞ্চ গোচর নহে, কৃষ্ণধাম লীলা পরিবার। বিশেষতঃ বৃন্দাবনে, যোগপীঠ গুহ্যতমে, রাধাকৃষ্ণলীলা চমত্কার॥ শ্রীগুরু চরণ হৈতে, অতি সুনির্ম্মল চিত্তে, শ্রদ্ধান্বিত শ্রবণ কীর্ত্তনে। গোপিকার ভাব লৈয়া, যে ভজয়ে লোভী হৈয়া, প্রেমে গর গর অনুক্ষণে॥ তবে ভাব সিদ্ধ হয়, গোপীদেহ প্রেমোদয়, বৃন্দাবন যোগপীঠ স্থানে। রাধাকৃষ্ণ দরশন, সেবানন্দে নিমগন, এ নন্দ কিশোর দাস গানে॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| শুনিয়া সরস গাঁথা নির্য্যাস প্রেমের কথা কবি নন্দকিশোর দাস এই পদটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, নন্দকিশোর দাস রচিত “শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত” গ্রন্থের পঞ্চচত্বারিংশ অধ্যায়ের পদ, ৩৪৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ যথা রাগ॥ শুনিয়া সরস গাঁথা, নির্য্যাস প্রেমের কথা, কাতর হইল কৃষ্ণ মনে। করিতে বাঞ্ছিত পূর্ণ, গমন করেন তূর্ণ, প্রেমরস বিলাস কারণে॥ শ্রোতাগণ শুন মোর বিনয় বচন। কৃষ্ণলীলামৃত গান, শ্রবণে বদনে পান, করি আনন্দিত কর মন॥ ধ্রু॥ আগে ধ্রুবপদ সাধি, ত্রিপদ ত্রপদী বিধি, করিয়া সকল গোপীগণ। সুমধুর করি তান, প্রেমরসময় গান, যূথে যূথে কৈল আস্বাদন॥ এই যে গোপিকাগণে, শ্রীধর করিল পানে, কৃষ্ণলীলামৃত রসপূর। ভাবার্থদীপিকা মাঝ, দেখিয়ে রসিকরাজ, প্রেমরসময় সুমধুর॥ গোসাঞি শ্রীসনাতন, করিল যে আস্বাদন, রসিক ভকতে করি দান। সে রস আস্বাদ চিত্তে, বৃন্দাবন লীলামৃতে, এ নন্দকিশোর দাস গান॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |